ধনু রাশির টিপট: মহাকাশের বিস্ময়কর নক্ষত্রমণ্ডল, পরিচিতি ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় প্রভাব

রাতের পরিষ্কার আকাশ সব সময়ই রহস্য এবং সৌন্দর্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন অজস্র নক্ষত্রের ভিড়ে আমাদের চোখ কিছু পরিচিত আকৃতি খুঁজে ফেরে। এমনই একটি অত্যন্ত…

Pandit Subhas Sastri

 

রাতের পরিষ্কার আকাশ সব সময়ই রহস্য এবং সৌন্দর্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন অজস্র নক্ষত্রের ভিড়ে আমাদের চোখ কিছু পরিচিত আকৃতি খুঁজে ফেরে। এমনই একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সহজে চেনার মতো আকৃতি হলো ধনু রাশির টিপট (Teapot)। অনেক শৌখিন আকাশ পর্যবেক্ষক এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে আগ্রহীদের কাছে এটি একটি কৌতূহলের বিষয়। অনেকে ভুলবশত মনে করেন যে ‘টিপট’ হয়তো কোনো একটি বিশেষ তারার নাম, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি মহাকাশে আঁকা এক কাল্পনিক চিত্র বা নক্ষত্রপুঞ্জ।

গ্রীষ্মকালীন আকাশের দক্ষিণ দিগন্তে তাকালে মনে হয় যেন তারার তৈরি একটি চায়ের কেটলি বা টিপট ঝুলে আছে, আর তার নল দিয়ে বের হচ্ছে ধোঁয়া। এই দৃশ্যটি কেবল কাব্যিক নয়, এর বৈজ্ঞানিক এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গুরুত্বও অপরিসীম। ধনু রাশির টিপট আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা মিল্কি ওয়ের (Milky Way) কেন্দ্রের দিকে নির্দেশ করে, যা একে মহাকাশবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক বা মার্কার (Marker) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই দীর্ঘ আর্টিকেলে আমরা ধনু রাশির এই বিশেষ অংশটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এর গঠনকারী নক্ষত্র, এদের বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য, আকাশ চেনার সহজ উপায়, এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে এর প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

ধনু রাশির টিপট আসলে কী? (অ্যাস্টেরিজম বনাম নক্ষত্রমণ্ডল)

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় ধনু রাশির টিপট কোনো ‘নক্ষত্রমণ্ডল’ (Constellation) নয়, বরং এটি একটি ‘অ্যাস্টেরিজম’ (Asterism)। এখন প্রশ্ন হলো, অ্যাস্টেরিজম এবং নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যে পার্থক্য কী?

‘নক্ষত্রমণ্ডল’ হলো আকাশের একটি নির্দিষ্ট এলাকা যা আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU) দ্বারা স্বীকৃত। যেমন—ধনু রাশি (Sagittarius) একটি সম্পূর্ণ নক্ষত্রমণ্ডল। অন্যদিকে, ‘অ্যাস্টেরিজম’ হলো নক্ষত্রমণ্ডলের ভেতরে বা একাধিক নক্ষত্রমণ্ডল মিলিয়ে তৈরি হওয়া একটি সহজে চেনার মতো আকৃতি। যেমন—সপ্তর্ষীমণ্ডল (Big Dipper) কোনো রাশি নয়, এটি উরসা মেজর বা বৃহৎ ভল্লুক রাশির একটি অংশ মাত্র। ঠিক তেমনি, টিপট হলো ধনু রাশির উজ্জ্বলতম তারাগুলো দিয়ে তৈরি একটি আকৃতি।

ধনু রাশিকে ঐতিহাসিকভাবে একজন অশ্বমানব বা সেনটাউর (অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ঘোড়া) হিসেবে কল্পনা করা হয়, যে তার ধনুক তাক করে আছে বৃশ্চিক রাশির দিকে। কিন্তু আধুনিক আকাশে বা শহরের আলোয় পুরো সেনটাউরের আকৃতি বোঝা খুব কঠিন। তাই জ্যোতির্বিদরা এর উজ্জ্বলতম অংশটিকে ‘চায়ের কেটলি’ বা টিপট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ।

টিপট বনাম ধনু রাশি: এক নজরে পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য ধনু রাশির টিপট (Teapot) ধনু রাশি (Sagittarius Constellation)
সংজ্ঞা একটি অ্যাস্টেরিজম বা তারার আকৃতি একটি সম্পূর্ণ নক্ষত্রমণ্ডল বা রাশি
স্বীকৃতি অনানুষ্ঠানিক, কিন্তু জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন স্বীকৃত
গঠন ৮টি প্রধান উজ্জ্বল নক্ষত্র নিয়ে গঠিত অনেকগুলো নক্ষত্র ও গভীর আকাশের বস্তু নিয়ে গঠিত
আকৃতি চায়ের কেটলি বা টিপটের মতো তীরন্দাজ অশ্বমানব (Archer/Centaur)
দৃশ্যমানতা সহজে চোখে পড়ে পুরো আকৃতি বোঝা কঠিন

টিপট গঠনকারী ৮টি প্রধান নক্ষত্র: বিস্তারিত পরিচিতি

ধনু রাশির টিপট তৈরি করতে মোট ৮টি নক্ষত্র অংশগ্রহণ করে। এই নক্ষত্রগুলো কেটলির বিভিন্ন অংশ—যেমন নল (Spout), ঢাকনা (Lid), হাতল (Handle) এবং শরীর (Body) তৈরি করে। প্রতিটি নক্ষত্রের নিজস্ব নাম, ইতিহাস এবং বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই নক্ষত্রগুলোর বেশিরভাগ নামই আরবি ভাষা থেকে এসেছে, যা প্রাচীন আরব জ্যোতির্বিদদের অবদানের সাক্ষ্য দেয়।

নিচে প্রতিটি অংশের নক্ষত্রগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:

১. কেটলির শরীর ও নল (Body and Spout)

কেটলির নিচের অংশ এবং নল তৈরি করতে তিনটি প্রধান নক্ষত্র কাজ করে:

  • কাউস মিডিয়া (Kaus Media): এর অর্থ ‘ধনুকের মাঝখানের অংশ’। এটি কেটলির শরীরের সামনের দিকে থাকে।

  • কাউস অস্ট্রালিস (Kaus Australis): এর অর্থ ‘ধনুকের দক্ষিণের অংশ’। এটি ধনু রাশির সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং কেটলির নিচের ডানদিকের কোণ তৈরি করে।

  • আলনাসল (Alnasl): এর অর্থ ‘তীরের ফলা’। এটি কেটলির নলের বা স্পাউটের ঠিক মুখে অবস্থিত। এখান থেকেই কাল্পনিক বাষ্প বের হতে দেখা যায়।

২. কেটলির ঢাকনা (The Lid)

কেটলির উপরের ত্রিকোণাকার ঢাকনাটি তৈরি হয় দুটি নক্ষত্র দিয়ে:

  • কাউস বোরিয়ালিস (Kaus Borealis): এর অর্থ ‘ধনুকের উত্তরের অংশ’। এটি ঢাকনার একেবারে চূড়ায় থাকে। এটি একটি কমলা রঙের দানব তারা।

  • ফাই স্যাজিটারিয়াস (Phi Sagittarii): এটি ঢাকনার বাম দিকের কোণ তৈরি করে।

৩. কেটলির হাতল (The Handle)

কেটলির বাম পাশের হাতলটি তৈরি হয় তিনটি নক্ষত্র দিয়ে:

  • নুনকি (Nunki): এটি ধনু রাশির দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং হাতলের উপরের অংশ। এর নাম প্রাচীন বেবিলনীয় সভ্যতা থেকে এসেছে।

  • অ্যাসসেলা (Ascella): এর অর্থ ‘বগল’ (Armpit), কারণ এটি সেনটাউরের বাহুর নিচে অবস্থিত। এটি হাতলের নিচের অংশ তৈরি করে।

  • টাউ স্যাজিটারিয়াস (Tau Sagittarii): এটি হাতলের সংযোগস্থলে থাকে।

নক্ষত্রসমূহের বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অবস্থান

নক্ষত্রের নাম বেয়ার নাম (Bayer) টিপটে অবস্থান আপাত উজ্জ্বলতা (Magnitude) পৃথিবী থেকে দূরত্ব (আলোকবর্ষ) নামের অর্থ
কাউস অস্ট্রালিস Epsilon (ε) Sgr শরীর (নিচে ডান) ১.৭৯ ১৪৫ ধনুকের দক্ষিণ ভাগ
নুনকি Sigma (σ) Sgr হাতল (উপরে) ২.০৫ ২২৮ সমুদ্রের নক্ষত্র (সুমেরীয়)
অ্যাসসেলা Zeta (ζ) Sgr হাতল (নিচে) ২.৬০ ৮৯ বগল (Armpit)
কাউস মিডিয়া Delta (δ) Sgr শরীর (মাঝখানে) ২.৭০ ৩০৬ ধনুকের মধ্যভাগ
কাউস বোরিয়ালিস Lambda (λ) Sgr ঢাকনা (চূড়া) ২.৮২ ৭৭ ধনুকের উত্তর ভাগ
আলনাসল Gamma (γ) Sgr নলের মুখ (Spout) ২.৯৮ ৯৬ তীরের ফলা
ফাই স্যাজিটারিয়াস Phi (φ) Sgr ঢাকনা (পাশে) ৩.১৭ ২৩১
টাউ স্যাজিটারিয়াস Tau (τ) Sgr হাতল (সংযোগ) ৩.৩২ ১২০

আকাশে টিপট খুঁজে পাওয়ার সঠিক সময় ও কৌশল

আকাশে ধনু রাশির টিপট খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয়, তবে এর জন্য সঠিক সময় এবং দিক জানা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো থেকে এটি দেখার সেরা সময় হলো গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষার শুরুর দিক।

কখন ও কোন দিকে তাকাবেন?

  • জুলাই-আগস্ট: সন্ধ্যার পরপরই দক্ষিণ আকাশে এটি উদিত হয় এবং মধ্যরাতে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকে।

  • সেপ্টেম্বর: সূর্যাস্তের পরেই এটি দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে দেখা যায়।

  • শীতকাল: শীতকালে এটি সূর্যের খুব কাছে থাকে, তাই দেখা যায় না।

খুঁজে পাওয়ার সহজ পদ্ধতি (Star Hopping)

১. বৃশ্চিক রাশি খুঁজুন: প্রথমে দক্ষিণ আকাশে বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্নের (?) মতো দেখতে বৃশ্চিক রাশি বা ‘স্কর্পিয়াস’ খুঁজুন। এর লাল রঙের উজ্জ্বল তারা ‘অন্টারেস’ (Antares) আপনার নজর কাড়বে।

২. বামে তাকান: বৃশ্চিক রাশির লেজের বা হুলের ঠিক বাম পাশেই তাকালে আপনি কয়েকটি উজ্জ্বল তারার একটি গুচ্ছ দেখতে পাবেন।

৩. আকৃতি মেলান: সেখানে ৮টি তারাকে কাল্পনিক রেখা দিয়ে যোগ করলে একটি কেটলির আকৃতি ফুটে উঠবে।

দৃশ্যমানতা ও পর্যবেক্ষণ গাইড

সময়কাল দেখার সেরা সময় আকাশের অবস্থান টিপস
মধ্য জুন রাত ১২টা – ২টা দক্ষিণ-পূর্ব আকাশ আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভালো দেখা যায়
জুলাই রাত ১০টা – ১২টা দক্ষিণ আকাশ (Meridian) এটিই দেখার সেরা মাস
আগস্ট রাত ৮টা – ১০টা দক্ষিণ আকাশ সন্ধ্যার পরপরই দেখা যায়
সেপ্টেম্বর রাত ৭টা – ৯টা দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশ দ্রুত অস্ত যায়
প্রয়োজনীয় যন্ত্র খালি চোখ বাইনোকুলার (১০x৫০) আলোকদূষণ মুক্ত স্থান আবশ্যক

টিপট ও আকাশগঙ্গার কেন্দ্র (The Galactic Center)

ধনু রাশির টিপট মহাকাশপ্রেমীদের কাছে এত প্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর সাথে আমাদের ছায়াপথ বা মিল্কি ওয়ের সম্পর্ক। আমরা যখন পৃথিবী থেকে টিপটের দিকে তাকাই, তখন আমরা আসলে আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকি।

টিপটের ‘নল’ বা স্পাউট যেদিকে নির্দেশ করে, ঠিক সেখানেই আকাশগঙ্গার কেন্দ্র অবস্থিত। পরিষ্কার অন্ধকার রাতে (অমাবস্যার আশেপাশে) মনে হয় যেন কেটলির নল দিয়ে সাদা ধোঁয়া বা বাষ্প বের হয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই ‘বাষ্প’ আসলে কোনো গ্যাস নয়, এটি হলো কোটি কোটি নক্ষত্রের সমষ্টি। একে বলা হয় ‘গ্রেট স্যাগিটারিয়াস স্টার ক্লাউড’ (Great Sagittarius Star Cloud)।

আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বা অতিভরের কৃষ্ণগহ্বর, যার নাম স্যাজিটারিয়াস এ-স্টার (Sgr A)*। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। যদিও প্রচুর ধূলিকণা এবং গ্যাসের কারণে আমরা সরাসরি কেন্দ্রটি দেখতে পাই না, কিন্তু টিপটের অবস্থান আমাদের বলে দেয় মহাজাগতিক দানবটি ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে।

গ্যালাকটিক সেন্টার সম্পর্কিত তথ্য

বিষয় তথ্য
অবস্থান টিপটের নলের ঠিক ডানদিকে এবং উপরে
দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬,০০০ – ২৭,০০০ আলোকবর্ষ
কেন্দ্রীয় বস্তু স্যাজিটারিয়াস এ-স্টার (সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল)
ব্ল্যাক হোলের ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৪০ লক্ষ গুণ
দৃশ্যমান বাষ্প মিল্কি ওয়ের স্টার ক্লাউড বা তারার মেঘ
গ্রেট রিফ্ট (Great Rift) আকাশগঙ্গার মাঝখানের কালো দাগ, যা আসলে ধূলিকণার মেঘ

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র ও ধনু রাশির নক্ষত্র (Nakshatras)

পাশ্চাত্য জ্যোতির্বিজ্ঞানে যেমন একে ধনু রাশির টিপট বলা হয়, তেমনি ভারতীয় বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রেও এই নক্ষত্রগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। ধনু রাশির অন্তর্গত নক্ষত্রপুঞ্জগুলো বৈদিক ‘নক্ষত্র’ (Lunar Mansions) হিসেবে পরিচিত। টিপটের তারাগুলো মূলত তিনটি প্রধান নক্ষত্রের অধীনে পড়ে:

১. মূলা নক্ষত্র (Mula): বৃশ্চিক রাশির শেষ এবং ধনু রাশির শুরুতে এর অবস্থান। টিপটের কাছাকাছি কিছু তারা এর অন্তর্ভুক্ত। এটি ধ্বংস এবং নতুন সৃষ্টির প্রতীক।

২. পূর্বাষাঢ়া (Purva Ashadha): টিপটের শরীরের অংশ গঠনকারী তারাগুলো (বিশেষ করে কাউস মিডিয়া এবং কাউস অস্ট্রালিস) এই নক্ষত্রের অন্তর্ভুক্ত। একে ‘অপরাজিত নক্ষত্র’ বলা হয়।

৩. উত্তরাষাঢ়া (Uttara Ashadha): টিপটের হাতল এবং উপরের অংশ (যেমন নুনকি) এই নক্ষত্রের অন্তর্গত। এটি বিজয়ের প্রতীক।

টিপটের নক্ষত্র ও বৈদিক সংযোগ

নক্ষত্রের নাম (পাশ্চাত্য) বৈদিক নক্ষত্র অধিপতি গ্রহ প্রতীক প্রভাব
আলনাসল (Spout) মূলা (অংশবিশেষ) কেতু (Ketu) শেকড় বা গুচ্ছ গভীর অনুসন্ধান ও রূপান্তর
কাউস মিডিয়া ও অস্ট্রালিস পূর্বাষাঢ়া শুক্র (Venus) হাতপাখা বা কুলো জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বিস্তার
নুনকি (Handle) উত্তরাষাঢ়া রবি (Sun) হাতির দাঁত নেতৃত্ব ও অবিচলতা

জ্যোতিষশাস্ত্রে ধনু রাশি ও টিপটের প্রভাব

জ্যোতিষশাস্ত্রে ধনু রাশি (Sagittarius) হলো রাশিচক্রের নবম রাশি। এটি ‘অগ্নি’ তত্ত্বের (Fire Element) রাশি এবং এর অধিপতি গ্রহ হলো দেবগুরু বৃহস্পতি (Jupiter)। ধনু রাশির টিপট যেহেতু এই রাশির মূল নক্ষত্রগুলো ধারণ করে, তাই জ্যোতিষশাস্ত্রে এর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে করা হয়।

যারা ধনু রাশির জাতক-জাতিকা, তাদের ব্যক্তিত্বে টিপটের নক্ষত্রগুলোর প্রভাব দেখা যায়। কেটলির নল যেমন বাইরের দিকে প্রসারিত, তেমনি ধনু রাশির মানুষেরা বহির্মুখী, ভ্রমণপিপাসু এবং জ্ঞানপিপাসু হন। তারা সর্বদা নতুন কিছু জানতে এবং জানাতে পছন্দ করেন।

টিপটের জ্যোতিষিক তাৎপর্য

  • লক্ষ্যভেদ: ধনু মানেই তীরন্দাজ। টিপটের নক্ষত্রগুলো (বিশেষ করে নুনকি এবং কাউস অস্ট্রালিস) জাতককে জীবনের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে।

  • উচ্চশিক্ষা: টিপটের অবস্থান গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছে হওয়ায় এটি উচ্চতর জ্ঞান, দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতার কারক।

  • স্বাধীনতা: এই অংশের নক্ষত্রগুলো মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগায়।

ধনু রাশির মূল বৈশিষ্ট্য

বৈশিষ্ট্য বিবরণ
উপাদান (Element) অগ্নি (Fire)
গুণ (Quality) পরিবর্তনশীল (Mutable)
অধিপতি গ্রহ বৃহস্পতি (Jupiter)
শুভ রত্ন পোখরাজ (Yellow Sapphire)
শুভ দিন বৃহস্পতিবার
টিপটের প্রতীকী অর্থ আধ্যাত্মিক সুধা বা জ্ঞানের পাত্র

টিপট সংলগ্ন ডিপ স্কাই অবজেক্ট (Deep Sky Objects)

যদি আপনার কাছে একটি সাধারণ বাইনোকুলার বা ছোট টেলিস্কোপ থাকে, তবে ধনু রাশির টিপট আপনার জন্য একটি স্বর্গরাজ্য। কারণ টিপটের আশেপাশে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সুন্দর কিছু ‘ডিপ স্কাই অবজেক্ট’ বা নীহারিকা এবং তারার গুচ্ছ ছড়িয়ে আছে। চার্লস মেসিয়ার (Charles Messier) তার বিখ্যাত তালিকায় এখানকার অনেক বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

টিপটকে গাইড হিসেবে ব্যবহার করে আপনি সহজেই এগুলো খুঁজে পেতে পারেন:

১. ল্যাগুন নেবুলা (M8): এটি একটি বিশাল নক্ষত্র তৈরির কারখানা। খালি চোখেও এটি হালকা গোলাপি আভা বা ঝাপসা দাগের মতো দেখা যায়। টিপটের নলের ঠিক উপরে এর অবস্থান।

২. ট্রিফিড নেবুলা (M20): এটি ল্যাগুন নেবুলার খুব কাছেই অবস্থিত। টেলিস্কোপে দেখলে মনে হয় তিনটি ভাগে বিভক্ত।

৩. ওমেগা নেবুলা (M17): এটি দেখতে অনেকটা রাজহাঁসের মতো, তাই একে ‘সোয়ান নেবুলা’ও বলা হয়।

৪. মেসিয়ার ২২ (M22): এটি আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল গ্লোবুলার ক্লাস্টার (Globular Cluster)। এটি টিপটের ঢাকনার বাম পাশে অবস্থিত এবং লক্ষ লক্ষ প্রাচীন নক্ষত্রের সমষ্টি।

পর্যবেক্ষণযোগ্য বস্তুর তালিকা (DSO Checklist)

বস্তুর নাম মেসিয়ার নম্বর ধরণ টিপট থেকে অবস্থান দেখার জন্য যন্ত্র
ল্যাগুন নেবুলা M8 এমিশন নেবুলা নলের (Spout) উপরে বাইনোকুলার / ছোট টেলিস্কোপ
ট্রিফিড নেবুলা M20 রিফ্লেকশন নেবুলা M8 এর সামান্য উপরে মাঝারি টেলিস্কোপ
ওমেগা নেবুলা M17 এমিশন নেবুলা নলের বেশ উপরে টেলিস্কোপ
স্টার ক্লাস্টার M22 গ্লোবুলার ক্লাস্টার ঢাকনার (Lid) বামে বাইনোকুলারেই স্পষ্ট
স্মল স্টার ক্লাউড M24 নক্ষত্র মেঘ নলের উপরে খালি চোখ / বাইনোকুলার

মহাকাশের বিশাল ক্যানভাসে ধনু রাশির টিপট কেবল কয়েকটি তারার সমষ্টি নয়, এটি আমাদের মহাজাগতিক ঠিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একটি বিশাল ছায়াপথের অংশ এবং আমাদের মাথার উপরেই রয়েছে অসীম রহস্য। বিজ্ঞানের ছাত্র হোন বা জ্যোতিষশাস্ত্রের অনুসারী, কিংবা শুধুই আকাশের সৌন্দর্যপিপাসু—টিপট সবার জন্যই এক আকর্ষণীয় বিষয়।

পরের বার যখন আকাশ পরিষ্কার থাকবে এবং আপনি শহরের কোলাহল থেকে দূরে থাকবেন, তখন দক্ষিণ দিগন্তে এই চায়ের কেটলিটি খোঁজার চেষ্টা করুন। কে জানে, হয়তো নলের মুখ দিয়ে বের হওয়া নক্ষত্রের ধোঁয়া দেখে আপনিও মহাকাশের অসীমতায় হারিয়ে যাবেন। আশা করি, এই বিস্তারিত আলোচনা ধনু রাশির টিপট সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আকাশ দেখার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

About Author
Pandit Subhas Sastri

পন্ডিত সুভাষ শাস্ত্রী একজন দিকপাল জ্যোতিষী। দীর্ঘ ৩০ বছর মানুষের সেবা করে আসছেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রে গোল্ড মেডেলিস্ট, এছাড়াও তিনি দেশ বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এবং তার গণনা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বেশ জনপ্রিয়। তিনি কলকাতা, হাওড়া, বীরভূম, শিলিগুড়ি, দুর্গাপুরে চেম্বার করেন।

আরও পড়ুন