ভারতীয় রেলের ফ্ল্যাগশিপ বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এখন আরও বেশি যাত্রী পরিবহনের জন্য ২০ কোচ বিশিষ্ট সংস্করণে চালু হচ্ছে। অত্যধিক চাহিদার কারণে ভারতীয় রেল মন্ত্রক একাধিক রুটে ১৬ কোচের পরিবর্তে ২০ কোচ বিশিষ্ট ট্রেন চালু করেছে, যা দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ অর্ধ-উচ্চগতির ট্রেন হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে মুম্বাই-গান্ধীনগর, তিরুবনন্তপুরম-মাঙ্গালুরু এবং আজমির-চণ্ডীগড় সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে এই ২০ কোচ বিশিষ্ট বন্দে ভারত এক্সপ্রেস পরিষেবা চালু রয়েছে। রেলওয়ে বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই ট্রেনগুলির যাত্রী দখল হার ১০০ শতাংশের বেশি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত। অধিক চাহিদার কারণেই রেল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মুম্বাই সেন্ট্রাল-গান্ধীনগর ক্যাপিটাল রুটে চালু হওয়া ২০৯০১/২০৯০২ ট্রেন নম্বরের বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ভারতীয় রেলের প্রথম ২০ কোচ বিশিষ্ট সার্ভিস। এই ট্রেনটি ৫২১ কিলোমিটার দূরত্ব ৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে অতিক্রম করে এবং সপ্তাহে ৬ দিন চলাচল করে। বুধবার এর সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। ট্রেনটি বরিবলি, ভাপি, ভালসাদ, নাভসারি, সুরাট, ভদোদরা জংশন, আনন্দ জংশন এবং আহমেদাবাদ জংশনে থামে।
তিরুবনন্তপুরম সেন্ট্রাল থেকে মাঙ্গালুরু সেন্ট্রাল পর্যন্ত চলাচলকারী ২০৬৩২ বন্দে ভারত এক্সপ্রেস আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ২০ কোচ সার্ভিস। এই ট্রেনটি ৬২১ কিলোমিটার দূরত্ব ৮ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে অতিক্রম করে এবং সপ্তাহে ৬ দিন চালু থাকে। বুধবার ছাড়া প্রতিদিন এই ট্রেন চলাচল করে। কেরালা ও কর্ণাটক রাজ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই ট্রেনটি কোল্লাম জংশন, আলাপ্পুঝা, এরনাকুলাম জংশন, ত্রিশূর, শোরানুর জংশন, তিরুর, কোঝিকোড, কান্নুর এবং কাসারাগোড স্টেশনে থামে।
আজমির-চণ্ডীগড় রুটে চালু ২০৯৭৭/২০৯৭৮ বন্দে ভারত এক্সপ্রেস দেশের অন্যতম দীর্ঘ পথের ২০ কোচ সার্ভিস। এই ট্রেনটি ৬৭৮ কিলোমিটার দূরত্ব ৮ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে অতিক্রম করে এবং রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি ও চণ্ডীগড়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। জয়পুর জংশন, আলওয়ার জংশন, রেওয়াড়ি জংশন, গুরগাঁও এবং নতুন দিল্লিতে থেমে এই ট্রেন চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছায়।
রেল মন্ত্রকের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, আরও সাতটি রুটে বিদ্যমান ১৬ কোচ ট্রেনকে ২০ কোচে উন্নীত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে মাঙ্গালুরু সেন্ট্রাল-তিরুবনন্তপুরম সেন্ট্রাল, সিকেন্দরাবাদ-তিরুপতি, চেন্নাই এগমোর-তিরুনেলভেলি, মাদুরাই-বেঙ্গালুরু ক্যান্ট, দেওঘর-বারাণসী, হাওড়া-রৌরকেলা এবং ইন্দোর-নাগপুর রুট। এছাড়া চারটি ৮ কোচ ট্রেনকে ১৬ কোচে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিবেচনা করলে, ২০ কোচ বিশিষ্ট বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে মোট ১,২৪৬টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ২টি এক্সিকিউটিভ চেয়ার কার (ইসি) কোচে মোট ১০৪টি আসন এবং ১৮টি এসি চেয়ার কার (সিসি) কোচে ১,১৪২টি আসন রয়েছে। প্রতিটি এক্সিকিউটিভ কোচে ৫২টি আসন এবং সাধারণ এসি চেয়ার কার কোচে ৭৮টি আসন থাকে।
২০২৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ভারতীয় রেলে মোট ১৪৪টি বন্দে ভারত সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৮ কোচ, ১৬ কোচ এবং ২০ কোচ বিশিষ্ট বিভিন্ন ধরনের ট্রেন রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই ট্রেনগুলোর যাত্রী দখল হার ছিল ১০২.০১ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জুন পর্যন্ত বেড়ে ১০৫.০৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের জনপ্রিয়তার কারণ হলো এর আধুনিক সুবিধা এবং গতি। এই ট্রেনগুলো ১৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে এবং ০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে মাত্র ৫২ সেকেন্ড সময় লাগে। এই দ্রুত ত্বরণ ও মন্থরতার বৈশিষ্ট্য যাত্রীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
অভ্যন্তরীণ সুবিধার দিক থেকে এই ট্রেনগুলোতে রয়েছে পূর্ণ এয়ার কন্ডিশনিং, ইলেকট্রিক আউটলেট, রিডিং লাইট, সিসিটিভি ক্যামেরা, অটোমেটিক দোরজা, বায়ো-ভ্যাকুয়াম টয়লেট এবং যাত্রী তথ্য সিস্টেম। এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ঘূর্ণায়মান আসন এবং চেয়ার কারে ভাঁজযোগ্য আসনের ব্যবস্থা রয়েছে।
হাওড়া-পুরী রুটেও ২০ কোচ বিশিষ্ট বন্দে ভারত চালু হয়েছে। ২২৮৯৫/২২৮৯৬ ট্রেন নম্বরের এই সার্ভিস ৫০২ কিলোমিটার দূরত্ব ৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে অতিক্রম করে। বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন এই ট্রেন চালু থাকে। ওড়িশার দীর্ঘতম অর্ধ-উচ্চগতির ট্রেন হিসেবে এটি পরিচিত।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতীয় রেল স্লিপার সংস্করণের বন্দে ভারত ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিইএমএল কোম্পানি এই স্লিপার ট্রেন তৈরি করছে, যাতে এসি ফার্স্ট ক্লাস, এসি ২-টায়ার এবং এসি ৩-টায়ার কোচ থাকবে। ১৬ কোচ বিশিষ্ট এই স্লিপার ট্রেনে মোট ১,১২৮ জন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন।
চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরিতে (আইসিএফ) এই ট্রেনগুলো তৈরি হয়। প্রতিটি ১৬ কোচ বিশিষ্ট রেকের ওজন ৩৯২ টন এবং খরচ ১১৫ কোটি টাকা। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি প্রতিটি কোচের দৈর্ঘ্য ২৩ মিটার। ২০ কোচ বিশিষ্ট ট্রেনের দৈর্ঘ্য হয় ৪৮০ মিটার।
ভারতীয় রেলের এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অংশ। ২০১৮ সালে প্রথম চালু হওয়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম ট্রেনটি উদ্বোধন করেছিলেন।
টিকিটের দাম অন্যান্য প্রিমিয়াম ট্রেনের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক। মুম্বাই-গান্ধীনগর রুটে চেয়ার কার ক্লাসে ৭১০ টাকা এবং এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ১,৯৮০ টাকা ভাড়া। খাবারের খরচ ভাড়ার সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা যাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয়।
রেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই ট্রেনগুলো নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলে এবং বিলম্বের হার অত্যন্ত কম। আধুনিক সিগন্যালিং সিস্টেম ‘কবচ’ ব্যবহারের ফলে এগুলো আরও নিরাপদ। ভবিষ্যতে আরও রুটে ২০ কোচ বিশিষ্ট বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।











