ইসলামে দোয়া একটি শক্তিশালী ইবাদত এবং আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি সম্পর্কের মাধ্যম। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, “আর যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো কাছেই আছি। যে প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তার প্রার্থনা আমি কবুল করি” (সূরা বাকারা ২:১৮৬)। তবে ইসলামী শরীয়তে এমন কিছু কারণ রয়েছে যার জন্য দোয়া কবুল হয় না বা বিলম্বিত হয়। বিশ্বব্যাপী ১.৮ বিলিয়ন মুসলমানের মধ্যে অনেকেই এই বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে বিশ্বের বেশিরভাগ মুসলিম দেশে ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রতিদিন নিয়মিত দোয়া করেন। এই বিশাল সংখ্যক মুমিনের জন্য দোয়া কবুল হওয়ার শর্ত এবং বাধাগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হারাম খাদ্য ও সম্পদ গ্রহণ করা
দোয়া কবুল না হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হারাম খাদ্য ও সম্পদ গ্রহণ করা। সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি শুধুমাত্র পবিত্র জিনিস গ্রহণ করেন।” হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে যে একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে আল্লাহর কাছে দোয়া করছে, তার চুল এলোমেলো এবং ধুলায় ঢাকা, কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম দ্বারা পুষ্ট হয়েছে – তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে? ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, হারাম খাদ্য গ্রহণ করলে ৪০ দিন পর্যন্ত দোয়া কবুল হয় না।
হালাল উপার্জন এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করা দোয়া কবুল হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক শর্ত। ইমাম বাজুরি বলেছেন যে এটি দোয়া কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে পবিত্র রিজিক দান করেছি তা থেকে আহার কর এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও” (সূরা বাকারা ২:১৭২)। সুতরাং ঘুষ, সুদ, চুরি, প্রতারণা বা অন্য কোনো হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদ দিয়ে ক্রয়কৃত খাবার গ্রহণ করলে দোয়া কবুল হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
৫০ টি জুম্মা মোবারক স্ট্যাটাস বাংলা
গুনাহ ও আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকা
গুনাহ এবং আল্লাহর নাফরমানি দোয়া কবুল হওয়ার পথে একটি বড় বাধা। তিরমিজি শরীফে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “একজন বান্দা তার গুনাহের কারণে দোয়া কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।” যখন কোনো ব্যক্তি নিয়মিত গুনাহ করতে থাকে এবং তওবা না করে, তখন তার এবং আল্লাহর মধ্যে একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এই দূরত্ব দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
ইবনে রজব বলেছেন, “হারাম কাজ করা এবং ফরজ কর্তব্য পালন না করা দোয়া প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে।” উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ত্যাগ করা, যাকাত না দেওয়া, রমজানে রোজা না রাখা বা অন্যান্য ফরজ কাজে অবহেলা করা দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই দোয়া কবুলের জন্য গুনাহ থেকে তওবা করা এবং সৎকর্মশীল জীবনযাপন করা অপরিহার্য। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর” (সূরা মুমিনুন ২৩:৫১)।
অধৈর্যশীলতা এবং আশা হারিয়ে ফেলা
দোয়া কবুল না হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তাড়াহুড়া করা এবং ধৈর্য হারিয়ে ফেলা। বুখারি ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের যে কারো দোয়া কবুল করা হবে যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে এবং বলে, ‘আমি দোয়া করেছি কিন্তু তা কবুল হয়নি।'” অনেক মুসলমান দোয়া করার পর তাৎক্ষণিক ফলাফল আশা করেন এবং যখন তা পান না, তখন হতাশ হয়ে পড়েন এবং দোয়া করা বন্ধ করে দেন।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজস্ব সময়ে এবং তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে দোয়া কবুল করেন। সায়্যিদুনা আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে প্রতিটি মুসলিমের দোয়া তিনটি উপায়ে কবুল হয়: হয় আল্লাহ তাকে যা চেয়েছে তাই দেন, অথবা তার পথ থেকে বিপদ দূর করে দেন, অথবা আখিরাতের জন্য তা সংরক্ষিত রাখেন। কুরআনে বলা হয়েছে, “সম্ভবত তোমরা এমন কিছু অপছন্দ কর যা তোমাদের জন্য ভালো এবং সম্ভবত তোমরা এমন কিছু পছন্দ কর যা তোমাদের জন্য খারাপ। আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না” (সূরা বাকারা ২:২১৬)।
পাপকাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করা
যদি কেউ এমন কিছুর জন্য দোয়া করে যা পাপ বা হারাম, তাহলে আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেন না। সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “একজন ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হতে থাকবে যতক্ষণ না সে পাপের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।” উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ হারাম সম্পর্কের জন্য দোয়া করে, সুদভিত্তিক ঋণের জন্য দোয়া করে, বা কারো ক্ষতির জন্য দোয়া করে, তাহলে আল্লাহ তা কবুল করবেন না।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে একটি মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত। যদি কেউ তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখে না বা তাদের ক্ষতির জন্য দোয়া করে, তাহলে আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেন না। দোয়া অবশ্যই ভালো এবং বৈধ কিছুর জন্য হতে হবে। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন যে দোয়া কবুলের জন্য দশটি আদব রয়েছে, যার মধ্যে পবিত্র খাবার গ্রহণ করা এবং হালাল উপার্জন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্বল ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি সন্দেহ পোষণ করা
দুর্বল ঈমান এবং আল্লাহর প্রতিক্রিয়ায় সন্দেহ পোষণ করা দোয়া কবুল না হওয়ার একটি প্রধান কারণ। হাদিসে এসেছে, “আল্লাহকে ডাক এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে যে তিনি তোমার দোয়া কবুল করবেন এবং জেনে রাখ যে আল্লাহ অসাবধান ও উদাসীন অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।” যখন কেউ দোয়া করে কিন্তু মনে মনে সন্দেহ করে যে আল্লাহ তার দোয়া শুনবেন কিনা বা কবুল করবেন কিনা, তখন সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস রাখ” (সূরা বাকারা ২:১৮৬)। দৃঢ় বিশ্বাস এবং আল্লাহর ক্ষমতায় পূর্ণ আস্থা রাখা দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা দোয়া করার সময় দুর্বল বিশ্বাস নিয়ে করেন, তাদের দোয়া কবুল হতে বিলম্ব হতে পারে। ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, দোয়া করার সময় সম্পূর্ণ একাগ্রতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকা আবশ্যক।
ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করা এবং অহংকার
মৌলিক ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করা দোয়া কবুল না হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যদি কেউ নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়ে, রমজানে রোজা না রাখে, যাকাত না দেয় বা অন্যান্য ফরজ কাজ না করে, তাহলে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। একজন খতিবের বক্তব্য অনুযায়ী, “তোমরা আল্লাহকে চিনেছ কিন্তু তাঁর অধিকার পূরণ কর না, তোমরা কুরআন পড় কিন্তু তা অনুযায়ী জীবন যাপন কর না, তোমরা রাসুল (সা.) কে ভালোবাসার দাবি কর কিন্তু তাঁকে অনুসরণ কর না।”
অহংকার এবং গর্বও দোয়া কবুলের পথে বাধা। যদি কেউ নিজেকে অন্যদের চেয়ে উত্তম মনে করে এবং অহংকার করে, তাহলে আল্লাহ তার দোয়া কবুল নাও করতে পারেন। হাদিসে বলা হয়েছে যে আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না। দোয়া করার সময় সম্পূর্ণ বিনয় এবং নম্রতার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে। পিউ রিসার্চের গবেষণা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় ৬০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম প্রতিদিন একাধিকবার দোয়া করেন, তবে দোয়া কবুলের শর্ত পূরণ করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বপ্নে অন্যের বিয়ে দেখলে কী হয়: ইসলামিক ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য
দোয়া কবুলের জন্য করণীয়
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এবং আদব রয়েছে যা প্রতিটি মুসলিমের জানা উচিত। প্রথমত, হালাল উপার্জন এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সকল প্রকার গুনাহ থেকে তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, যাকাত ইত্যাদি ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
দোয়া করার সময় পবিত্র অবস্থায় থাকা, কিবলামুখী হওয়া এবং হাত উঠিয়ে দোয়া করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যখন তোমরা দোয়া কর, তখন আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু কর এবং আমার (নবীর) উপর দরুদ পাঠ কর।” সূরা আল-আম্বিয়া (২১ নং সূরা) কুরআনের একমাত্র সূরা যেখানে “ইস্তাজাবনা” শব্দটি চারবার এসেছে, যার অর্থ “উত্তর দেওয়া হয়েছে”। এই সূরা পাঠ করলে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী কিছু বিশেষ সময় রয়েছে যখন দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাহাজ্জুদ নামাজের সময়, আজানের সময়, বৃষ্টি হওয়ার সময়, জুমার দিনে বিশেষত জুমার খুতবার পরে এবং আসরের নামাজের পর এই বিশেষ সময়গুলোতে দোয়া করা উত্তম। রমজান মাসে বিশেষত লাইলাতুল কদরের রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যধিক বৃদ্ধি পায়।
সাজদার অবস্থায় দোয়া করাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে এসেছে, “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সাজদায় থাকে।” সুতরাং নামাজের সাজদায় বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। আরাফাতের দিনে, আরাফার ময়দানে হাজীদের দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়। এছাড়া সফররত অবস্থায়, মজলুমের দোয়া এবং পিতামাতার সন্তানের জন্য দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়।
দোয়া ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত এবং আল্লাহর সাথে বান্দার গভীর সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। তবে দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত এবং আদব মেনে চলা অপরিহার্য। হারাম খাদ্য ও সম্পদ থেকে বিরত থাকা, গুনাহ থেকে তওবা করা, ধৈর্য ধারণ করা, বৈধ বিষয়ের জন্য দোয়া করা, দৃঢ় ঈমান রাখা এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা দোয়া কবুলের পূর্বশর্ত। প্রতিটি মুসলিমের উচিত এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের দোয়া কবুল করুন এবং আমাদেরকে হালাল পথে চলার তৌফিক দান করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তাঁর প্রতিটি বান্দার দোয়া শোনেন এবং তাঁর নিজস্ব সময়ে ও পদ্ধতিতে সেগুলো কবুল করেন। আমাদের দায়িত্ব হলো শর্ত পূরণ করা এবং ধৈর্যসহকারে আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকা।











