ভুট্টা খাওয়ার ৭টি উপকার ও ৩টি ভয়ানক অপকার – আজই জেনে নিন!

health benefits & side effects of corn: আপনার প্রিয় হলুদ দানাদার খাবার ভুট্টার কথা মনে পড়ছে? রাস্তার পাশে গরম গরম ভুট্টা ভাজা কিংবা সালাদে মিশিয়ে খাওয়া এই খাবারটি কি আসলেই…

Debolina Roy

 

health benefits & side effects of corn: আপনার প্রিয় হলুদ দানাদার খাবার ভুট্টার কথা মনে পড়ছে? রাস্তার পাশে গরম গরম ভুট্টা ভাজা কিংবা সালাদে মিশিয়ে খাওয়া এই খাবারটি কি আসলেই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? নাকি লুকিয়ে আছে কোনো বিপদের সংকেত? আজ আমরা জানব ভুট্টা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

ভুট্টা একটি শস্যজাতীয় খাবার যা বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রিয় খাদ্য হিসেবে পরিচিত। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ। একটি মাঝারি আকারের ভুট্টার দানায় প্রায় ৮৮ ক্যালোরি শক্তি, ১.৪ গ্রাম চর্বি, ১৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং ৩.৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে। তবে এর অসংখ্য উপকারিতার পাশাপাশি কিছু অপকারিতাও রয়েছে যা আমাদের জানা অত্যন্ত জরুরি।

ভুট্টার পুষ্টি উপাদান কেমন?

ভুট্টার পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফাইবার। প্রতি ১০০ গ্রাম সিদ্ধ হলুদ ভুট্টায় ৯৬ ক্যালোরি শক্তি, ৭৩% পানি, ৩.৪ গ্রাম প্রোটিন, ২১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৪.৫ গ্রাম চিনি, ২.৪ গ্রাম ফাইবার এবং ১.৫ গ্রাম চর্বি থাকে।

উচ্চ প্রোটিন যুক্ত খাবারের তালিকা: সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি

ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ

ভুট্টা ভিটামিন সি, বি৬, থায়ামিন এবং ফোলেটের চমৎকার উৎস। একটি মাঝারি আকারের ভুট্টায় দৈনিক প্রয়োজনের ১৭% ভিটামিন সি, ২৪% থায়ামিন এবং ১৯% ফোলেট পাওয়া যায়। এছাড়াও এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন এবং জিঙ্ক।

ভুট্টা খাওয়ার অসাধারণ উপকারিতা

হজমশক্তি উন্নতি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য

ভুট্টায় থাকা প্রচুর পরিমাণে ফাইবার আমাদের পরিপাকতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে রয়েছে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় উভয় ধরনের ফাইবার। অদ্রবণীয় ফাইবার মলের পরিমাণ বাড়িয়ে নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়মিত পপকর্ন খাওয়া ডাইভার্টিকুলাইটিস নামক রোগের ঝুঁকি কমায়।

চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা

ভুট্টায় রয়েছে লুটিন এবং জিয়াজ্যান্থিন নামক দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এই উপাদানগুলো ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ছানি এবং অন্যান্য চোখের রোগের ঝুঁকি কমায়। নিয়মিত ভুট্টা খেলে বয়সজনিত চোখের সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

হৃদয়ের স্বাস্থ্য উন্নতি

ভুট্টায় থাকা ফাইবার কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এর পটাশিয়াম উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পূর্ণ শস্য হিসেবে ভুট্টা খেলে হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।

ক্যান্সার প্রতিরোধ

ভুট্টায় থাকা কোয়ারসেটিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়াও এতে থাকা অন্যান্য ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ

আশ্চর্যজনকভাবে, ভুট্টার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম থেকে মাঝারি পর্যায়ে থাকে। এর মানে হল এটি রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ায়, যা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে।

ভুট্টা খাওয়ার অপকারিতা ও ঝুঁকি

ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ক্ষতিকর

ভুট্টায় প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ এবং কার্বোহাইড্রেট রয়েছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা গেছে, কম কার্বোহাইড্রেট খাবার বেশি কার্যকর। তাই ডায়াবেটিক রোগীদের ভুট্টা খাওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অ্যালার্জির সমস্যা

ভুট্টায় থাকা নির্দিষ্ট প্রোটিনের কারণে অনেকের অ্যালার্জি হতে পারে। এর লক্ষণগুলো হলো ত্বকে র্যাশ, চুলকানি, মুখের ভেতর ফোলাভাব, বমি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং মাথাব্যথা। কিছু ক্ষেত্রে এটি অ্যাজমা এবং অ্যানাফিল্যাক্সিসও সৃষ্টি করতে পারে।

হজমের সমস্যা

অতিরিক্ত ভুট্টা খেলে পেট ফাঁপা, বদহজম, ডায়রিয়া এবং পেটে ব্যথা হতে পারে। এর কারণ হলো ভুট্টায় থাকা প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং স্টার্চ। যাদের ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) আছে তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

পেলাগ্রা রোগের ঝুঁকি

ভুট্টায় নায়াসিন (ভিটামিন বি-৩) এবং কিছু অত্যাবশ্যক অ্যামিনো অ্যাসিডের অভাব রয়েছে। যারা প্রধানত ভুট্টার উপর নির্ভর করে খাবার খান তাদের পেলাগ্রা রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ওজন বৃদ্ধি

ভুট্টায় প্রচুর পরিমাণে চিনি এবং কার্বোহাইড্রেট আছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অতিরিক্ত এক সার্ভিং ভুট্টা খেলে প্রতি ৪ বছরে ২ পাউন্ড ওজন বৃদ্ধি পায়। তাই ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদের ভুট্টা সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট সমস্যা

ভুট্টায় অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট নামক উপাদান রয়েছে যা শরীরের পুষ্টি শোষণে বাধা দেয়। তবে ভুট্টা ভিজিয়ে রাখলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়।

মাইকোটক্সিন দূষণ

ভুট্টা অনেক সময় ছত্রাকের দূষণের কারণে মাইকোটক্সিন নামক বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এই বিষাক্ত পদার্থ লিভারের সমস্যা, ফুসফুসের সমস্যা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

কীভাবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ভুট্টা খাবেন?

সঠিক পরিমাণ

স্বাস্থ্যকর ব্যক্তিরা দৈনিক ১ কাপ (প্রায় ১৬৫ গ্রাম) ভুট্টা খেতে পারেন। তবে ডায়াবেটিক রোগীদের অর্ধেক পরিমাণ খাওয়া উচিত।

প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন

প্রক্রিয়াজাত ভুট্টার তৈরি খাবার যেমন কর্ন সিরাপ, কর্ন অয়েল এবং প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস এড়িয়ে চলুন। এগুলোতে পুষ্টিগুণ কম এবং ক্ষতিকর উপাদান বেশি থাকে।

রান্নার পদ্ধতি

ভুট্টা সিদ্ধ করে, গ্রিল করে বা স্টিম করে খাওয়া সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। অতিরিক্ত মাখন, লবণ বা চিনি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

Fruits for Digestive: পেট পরিষ্কার রাখতে দারুণ কার্যকরী এই ৫ ফল!

বিশেষ পরিস্থিতিতে ভুট্টা খাওয়ার সতর্কতা

গর্ভাবস্থায়

গর্ভকালীন সময়ে ভুট্টা খাওয়া নিরাপদ। তবে প্রক্রিয়াজাত ভুট্টার খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

শিশুদের জন্য

৬ মাসের পর থেকে শিশুদের ভুট্টা দেওয়া যেতে পারে। তবে সবসময় ছোট টুকরো করে দিতে হবে যাতে শ্বাসরোধের ঝুঁকি না থাকে।

বয়স্কদের জন্য

বয়স্কদের জন্য ভুট্টা উপকারী কারণ এতে প্রচুর ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। তবে যাদের হজমের সমস্যা আছে তাদের সাবধানে খাওয়া উচিত।

ভুট্টা একটি পুষ্টিকর খাবার যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। তবে ভুট্টা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা দুটোই বিবেচনা করে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। বিশেষত ডায়াবেটিক রোগী এবং যাদের হজমের সমস্যা আছে তাদের অবশ্যই সতর্কতার সাথে ভুট্টা খেতে হবে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য ভুট্টাকে একটি সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করুন, একমাত্র খাবার হিসেবে নয়।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন