India's State Finances in Crisis

ঋণের সাগরে রাজ্যগুলি! গত দশকে ২৮ রাজ্যের সম্মিলিত দেনা আকাশ ছুঁয়েছে, উদ্বেগজনক রিপোর্ট CAG-এর

সংসার চলছে ঋণে! গত এক দশকে ভারতের ২৮টি রাজ্যের সম্মিলিত ঋণের বোঝা প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯.৬ লক্ষ কোটি টাকায়। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া (CAG)-এর সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা রাজ্যগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য এবং উন্নয়নমূলক…

Updated Now: September 23, 2025 1:48 AM
বিজ্ঞাপন

সংসার চলছে ঋণে! গত এক দশকে ভারতের ২৮টি রাজ্যের সম্মিলিত ঋণের বোঝা প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯.৬ লক্ষ কোটি টাকায়। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া (CAG)-এর সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা রাজ্যগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য এবং উন্নয়নমূলক ব্যয়ের ক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এই বিশাল ঋণের বোঝা, যা State debt in India নামে পরিচিত, রাজ্যগুলির রাজস্ব ঘাটতি এবং পরিকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ এবং রাজস্থান – এই পাঁচটি রাজ্য সম্মিলিত ঋণের প্রায় অর্ধেক বহন করছে। ক্রমবর্ধমান ঋণের এই প্রবণতা অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তাঁদের মতে, অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়, ভর্তুকির বোঝা এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রাজ্যগুলিকে ঋণের জালে আরও বেশি করে জড়িয়ে ফেলছে।

 এক নজরে

  • বিশাল ঋণের বোঝা: ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের শেষে ২৮টি রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৫৯.৬ লক্ষ কোটি টাকা। (সূত্র: CAG, RBI)
  • দশ বছরের বৃদ্ধি: ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে রাজ্যগুলির সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২১.৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা দশ বছরে প্রায় ১৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • শীর্ষ পাঁচ ঋণগ্রস্ত রাজ্য: দেশের মোট রাজ্য-ঋণের প্রায় ৪৭% বহন করছে তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ এবং রাজস্থান।
  • রাজস্বের বড় অংশ সুদ মেটাতে: বহু রাজ্যের রাজস্ব আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (১০% থেকে ২৪%) চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণ এবং তার সুদ মেটাতে, ফলে উন্নয়নমূলক কাজে বরাদ্দ কমছে। (সূত্র: RBI Bulletin, জুন ২০২৪)
  • GSDP-র তুলনায় ঋণ: বেশ কয়েকটি রাজ্যের ঋণ তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GSDP) ৩৫% অতিক্রম করেছে, যা ফিসক্যাল রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট (FRBM) আইনের নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।

ঋণের ভারে জর্জরিত রাজ্যগুলি: পরিস্থিতি কতটা জটিল?

কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যগুলির আর্থিক অবস্থা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজ্যগুলির রাজস্ব আদায় তলানিতে ঠেকেছিল, অথচ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে রাজ্যগুলিকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিতে হয়েছে।

ক্যাগ (CAG) এবং আরবিআই (RBI)-এর তথ্য বিশ্লেষণ:

  1. ক্রমবর্ধমান ঋণের গ্রাফ: ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে রাজ্যগুলির মোট ঋণ ছিল ২১.৭ লক্ষ কোটি টাকা। দশ বছর পর, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯.৬ লক্ষ কোটি টাকায়। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের বাজেট अनुमान অনুযায়ী, এই অঙ্ক ৬২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। (সূত্র: CAG Report on State Finances, 2024 এবং RBI’s State Finances: A Study of Budgets of 2023-24)
  2. ঋণ-GSDP অনুপাত: আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হল ঋণ-GSDP অনুপাত। FRBM কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, এই অনুপাত ২০%-এর কাছাকাছি থাকা উচিত। কিন্তু পাঞ্জাব, বিহার, কেরালা, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিতে এই অনুপাত ৩৫%-এর উপরে চলে গেছে, যা একটি বিপজ্জনক সংকেত। (সূত্র: RBI Bulletin, জুন ২০২৪ – https://www.rbi.org.in/Scripts/BS_ViewBulletin.aspx?Id=22482)
  3. সুদের বোঝা: রাজ্যগুলি তাদের মোট রাজস্বের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। যেমন, পাঞ্জাব তার মোট রাজস্বের প্রায় ২৪% এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রায় ২১% শুধুমাত্র সুদ মেটাতে ব্যয় করে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কোন রাজ্যের ঋণের বোঝা কত?

যদিও প্রতিটি রাজ্যের ঋণের সঠিক পরিমাণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, ২০২২-২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচ রাজ্যের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:

রাজ্যআনুমানিক ঋণের পরিমাণ (লক্ষ কোটি টাকায়)তথ্যসূত্র
তামিলনাড়ু৭.৫৫RBI/State Budgets
উত্তরপ্রদেশ৭.১০RBI/State Budgets
মহারাষ্ট্র৬.৮০RBI/State Budgets
পশ্চিমবঙ্গ৬.৩০State Budgets 2023-24
রাজস্থান৫.৩৭State Budgets 2023-24

(দ্রষ্টব্য: এই পরিসংখ্যানগুলি বিভিন্ন রিপোর্ট এবং বাজেট নথি থেকে সংগৃহীত এবং সামান্য পরিবর্তন সাপেক্ষ।)

বিশেষজ্ঞ এবং আধিকারিকদের প্রতিক্রিয়া

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ক্রমবর্ধমান ঋণের প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • জনমোহিনী প্রকল্পের বিপুল ব্যয়: ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন রাজ্য সরকার প্রচুর ভর্তুকি এবং অনুদানমূলক প্রকল্প চালায়, যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান আসে ঋণ থেকে।
  • বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির লোকসান: রাজ্যগুলির বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির (Discoms) বিপুল লোকসানের বোঝাও রাজ্য সরকারগুলির ঘাড়ে এসে পড়ে। ‘UDAY’ যোজনার মতো প্রকল্প সত্ত্বেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি।
  • রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা: জিএসটি (GST) চালু হওয়ার পরেও অনেক রাজ্য তাদের নিজস্ব কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। ফলে কেন্দ্রীয় সাহায্যের উপর নির্ভরতা বাড়ছে।

এ বিষয়ে রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর ডঃ সি. রঙ্গরাজন একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলেন, “রাজ্যগুলিকে তাদের ব্যয়ের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। অনুৎপাদনশীল ব্যয় কমিয়ে মূলধনী বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে এই ঋণের জাল থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। আর্থিক অনুশাসন কঠোরভাবে পালন করা অপরিহার্য।” (সূত্র: দ্য হিন্দু বিজনেসলাইন, paraphrased)

সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব

রাজ্য সরকারের বিপুল ঋণের বোঝা সাধারণ মানুষের জীবনকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। যখন সরকারের রাজস্বের বড় অংশ সুদ মেটাতে চলে যায়, তখন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিতে অর্থ বরাদ্দ কমে। এর ফলে:

  • নতুন রাস্তা, স্কুল বা হাসপাতাল তৈরির প্রকল্প আটকে যেতে পারে।
  • বিদ্যমান পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি দেখা দেয়।
  • কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি বিনিয়োগ কমে যায়।
  • রাজ্য সরকার বাধ্য হয়ে বিভিন্ন পরিষেবা এবং করের হার বাড়াতে পারে, যা সাধারণ মানুষের উপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।

পশ্চিমবঙ্গের একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক, অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত বলেন, “আমরা খবরে দেখি সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ধার করছে। কিন্তু আমাদের এলাকার ভাঙা রাস্তাটা গত পাঁচ বছরেও মেরামত হলো না। হাসপাতালের পরিষেবাও আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। এই ঋণের টাকা কোথায় যাচ্ছে, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।”

ভবিষ্যতের পথ: কী করণীয়?

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে রাজ্যগুলিকে একটি বহুস্তরীয় কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

  • রাজস্ব বৃদ্ধি: কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং কর ফাঁকি রোধ করে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
  • ব্যয় সংকোচন: অপ্রয়োজনীয় এবং অনুৎপাদনশীল ব্যয় চিহ্নিত করে তা কমাতে হবে। ভর্তুকিগুলিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক (targeted) করতে হবে।
  • মূলধনী বিনিয়োগ: পরিকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে যা দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
  • অফ-বাজেট ঋণ নিয়ন্ত্রণ: অনেক রাজ্য বাজেটের বাইরে বিভিন্ন সংস্থা বা নিগমের মাধ্যমে ঋণ নেয়, যা সরকারি হিসাবের স্বচ্ছতাকে নষ্ট করে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

কেন্দ্রীয় সরকার এবং পঞ্চদশ অর্থ কমিশন রাজ্যগুলিকে তাদের আর্থিক অনুশাসন মেনে চলার জন্য বারবার সতর্ক করেছে। রাজ্যগুলি যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর।