Creatinine Level for Dialysis

ক্রিয়েটিনিন কত হলে ডায়ালাইসিস করতে হয়? (Creatinine Level for Dialysis) সঠিক সময় ও লক্ষণ

বর্তমানে কিডনির সমস্যা যেন ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। ব্লাড টেস্টের রিপোর্টে যখনই ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা কিছুটা বেশি আসে, তখন রোগী ও তার পরিবারের ঘুম উড়ে যায়। সবার মনে একটাই ভয় কাজ করে—তবে কি এবার ডায়ালাইসিস শুরু করতে হবে? আমাদের কাছে সবচেয়ে…

avatar
Written By : Debolina Roy
Updated Now: March 12, 2026 2:35 PM
বিজ্ঞাপন

বর্তমানে কিডনির সমস্যা যেন ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। ব্লাড টেস্টের রিপোর্টে যখনই ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা কিছুটা বেশি আসে, তখন রোগী ও তার পরিবারের ঘুম উড়ে যায়। সবার মনে একটাই ভয় কাজ করে—তবে কি এবার ডায়ালাইসিস শুরু করতে হবে? আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, ক্রিয়েটিনিন কত হলে ডায়ালাইসিস করতে হয়? আসলে, গুগল বা সাধারণ মানুষের মুখের কথায় এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া মুশকিল। অনেকেই ভাবেন ক্রিয়েটিনিন ৩ বা ৪ হয়ে যাওয়া মানেই কিডনি পুরোপুরি নষ্ট। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। ডায়ালাইসিস শুরু করার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র একটা সংখ্যার ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, কিডনির ফিল্টার করার ক্ষমতা বা eGFR এবং আরও অনেকগুলো সূক্ষ্ম বিষয়ের ওপর ডাক্তাররা নজর দেন। এই আর্টিকেলে আমরা একেবারে সহজ ও সাধারণ ভাষায় আলোচনা করব, কখন সত্যিই ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়, কিডনি ড্যামেজের স্টেজগুলো কী কী, এবং কীভাবে আপনি আগে থেকেই সতর্ক হয়ে ডায়ালাইসিস এড়াতে পারেন। চলুন, বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

ক্রিয়েটিনিন আসলে কী এবং শরীরে কেন এটি তৈরি হয়?

কিডনির স্বাস্থ্য বুঝতে হলে সবার আগে জানতে হবে ক্রিয়েটিনিন জিনিসটা আসলে কী। এটি হলো আমাদের শরীরের মাংসপেশির স্বাভাবিক ব্যবহারের ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের বর্জ্য পদার্থ বা ময়লা। আমরা যখন হাঁটাচলা করি, পরিশ্রম করি বা আমাদের শরীর যখন খাবার থেকে পাওয়া প্রোটিন হজম করে, তখন পেশিগুলোর কাজের ফলে এই রাসায়নিক উপাদানটি রক্তে মিশে যায়। আমাদের সুস্থ কিডনির মূল কাজই হলো রক্ত থেকে এই ধরনের ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থগুলোকে ছাঁকনির মতো ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীরের বাইরে বের করে দেওয়া । কিন্তু কোনো কারণে কিডনি যখন তার কাজ ঠিকমতো করতে পারে না বা কিডনির ছাঁকনিগুলো নষ্ট হতে শুরু করে, তখন এই ক্রিয়েটিনিন প্রস্রাব দিয়ে বের হতে না পেরে রক্তেই জমতে থাকে। অনেকেই ভাবেন ক্রিয়েটিনিন বাড়াটাই একটা রোগ, কিন্তু বিষয়টি তা নয়। এটি আসলে কিডনি ঠিকমতো কাজ না করার একটা সিগন্যাল বা লক্ষণ মাত্র।

রক্তে ক্রিয়েটিনিনের স্বাভাবিক মাত্রা ও বয়সভেদে পার্থক্য

একজন সুস্থ মানুষের রক্তে ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ ঠিক কতটা হওয়া উচিত, তা নির্ভর করে মানুষের বয়স, লিঙ্গ এবং শরীরে মাংসপেশির পরিমাণের ওপর । সাধারণভাবে, পুরুষদের শরীরে পেশির পরিমাণ নারীদের তুলনায় বেশি থাকে, তাই তাদের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রাও কিছুটা বেশি হয়।

  • পুরুষদের ক্ষেত্রে: স্বাভাবিক মাত্রা হলো ০.৭ থেকে ১.৩ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার (mg/dL) ।

  • নারীদের ক্ষেত্রে: এর স্বাভাবিক মাত্রা ০.৬ থেকে ১.১ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার (mg/dL) এর মধ্যে থাকলে তা একদম পারফেক্ট ধরা হয় ।
    যদি আপনার রিপোর্টে এর থেকে কিছুটা বেশি মাত্রা আসে, তবে সঙ্গে সঙ্গে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। অনেক সময় কম জল খাওয়া বা বেশি মাংস খেলেও সাময়িকভাবে এটি বাড়তে পারে। ডাক্তাররা সাধারণত কয়েক সপ্তাহ পর আবার টেস্ট করে নিশ্চিত হন।

ক্রিয়েটিনিন কত হলে ডায়ালাইসিস করতে হয়?

এটি কিডনি রোগী এবং তাদের পরিজনদের সবচেয়ে কমন প্রশ্ন। সত্যি বলতে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে বা নেফ্রোলজিস্টদের কাছে এমন কোনো ফিক্সড সংখ্যা নেই যা দেখে তারা চোখ বন্ধ করে বলে দেবেন যে, “আপনার মাত্রা এত হয়েছে, আজ থেকেই ডায়ালাইসিস শুরু করুন।” তবে সাধারণত যখন কিডনি তার স্বাভাবিক ক্ষমতার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখনই ডায়ালাইসিসের কথা গুরুত্বের সাথে ভাবা হয় । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ৫.০ থেকে ৭.০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার (mg/dL) বা তার চেয়ে বেশি হলে ডাক্তাররা ডায়ালাইসিসের পরামর্শ দেন । কিন্তু এই নিয়ম সবার জন্য এক নয়। রোগীর বয়স, তার অন্যান্য রোগ (যেমন ডায়াবেটিস বা হার্টের সমস্যা) এবং সবচেয়ে বড় কথা—তার শারীরিক কষ্টের ওপর নির্ভর করে এই সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। তাই ক্রিয়েটিনিন কত হলে ডায়ালাইসিস করতে হয়, তার উত্তর শুধু একটি নাম্বারের মধ্যে আটকে নেই।

ডায়ালাইসিস শুরুর সঠিক সময় ও ডাক্তারদের মতামত

ডায়ালাইসিস শুরু করার সঠিক সময় নির্ধারণ করতে স্পেশালিস্ট ডাক্তাররা রোগীর ওভারঅল স্বাস্থ্যের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দেন। শুধুমাত্র রক্ত পরীক্ষার একটা রিপোর্ট দেখেই এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। যখন রোগীর শরীরে বর্জ্য পদার্থ এতোটাই জমে যায় যে তার সাধারণ জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখনই ডায়ালাইসিস মাস্ট হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ—অনেকের ক্রিয়েটিনিন ১০ mg/dL পার হয়ে গেলেও যদি শারীরিক কোনো বড় কষ্ট না থাকে, ডাক্তাররা ওষুধের ওপর ভরসা রাখেন । আবার উল্টোদিকে, কারও ক্ষেত্রে মাত্রা ৩ বা ৪ mg/dL থাকা অবস্থাতেই যদি ফুসফুসে জল জমে যায়, প্রস্রাব একদম বন্ধ হয়ে যায় বা বমি হতে থাকে, তখন জীবন বাঁচাতে সাথে সাথেই ডায়ালাইসিস শুরু করতে হয় ।

শুধু ক্রিয়েটিনিন নয়, eGFR কেন কিডনির জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি?

অনেকেই শুধু ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ওঠা-নামা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন, কিন্তু ডাক্তারদের কাছে eGFR (Estimated Glomerular Filtration Rate) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটা ইন্ডিকেটর । eGFR হলো এমন একটা পরিমাপ, যা থেকে খুব নিখুঁতভাবে বোঝা যায় আপনার কিডনি প্রতি মিনিটে ঠিক কতটা রক্ত পরিষ্কার করতে পারছে। বয়স, লিঙ্গ এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা—এই তিনটির একটি বিশেষ হিসেব কষে eGFR বের করা হয় । একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের eGFR ৯০ বা তার বেশি থাকা উচিত । যখন কিডনি খারাপ হতে শুরু করে, তখন এই eGFR ধীরে ধীরে কমতে থাকে । যখন এটি ১৫ এর নিচে নেমে যায়, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় ‘এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজ’ (ESRD) বা কিডনি ফেইলিউর । ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন মূলত এই অবস্থাতেই প্রয়োজন হয় ।

কিডনি রোগের ৫টি স্টেজ বা পর্যায় (৫টি ধাপের বিস্তারিত)

দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগ বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD)-কে ডাক্তাররা মূলত ৫টি ধাপে ভাগ করে থাকেন। রোগীর eGFR-এর মাত্রা দেখেই এই স্টেজগুলো নির্ধারণ করা হয় । নিচে একটি সহজ টেবিলের মাধ্যমে এই স্টেজগুলো পরিষ্কারভাবে বোঝানো হলো:

কিডনি রোগের স্টেজ (Stage)eGFR এর মাত্রাকিডনির অবস্থা ও কার্যক্ষমতা
স্টেজ ১ (Stage 1)৯০ বা তার বেশিকিডনি স্বাভাবিক কাজ করছে, তবে হালকা ড্যামেজের লক্ষণ আছে (যেমন প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়া) ।
স্টেজ ২ (Stage 2)৬০ থেকে ৮৯কিডনির কাজে মৃদু সমস্যা বা হালকা ক্ষতি দেখা দিয়েছে
স্টেজ ৩ (Stage 3a ও 3b)৩০ থেকে ৫৯কিডনির মাঝারি ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এই স্টেজে ধীরে ধীরে লক্ষণ প্রকাশ পায়
স্টেজ ৪ (Stage 4)১৫ থেকে ২৯কিডনির অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। এই ধাপে ডায়ালাইসিসের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়
স্টেজ ৫ (Stage 5)১৫ এর নিচেকিডনি সম্পূর্ণ বিকল (Kidney Failure)। রোগীকে বাঁচাতে ডায়ালাইসিস অপরিহার্য

ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হওয়ার প্রধান লক্ষণসমূহ যা আপনার জানা উচিত

শরীরে যখন বর্জ্য পদার্থ এবং অতিরিক্ত তরল বা জল জমতে শুরু করে, তখন শরীর ভেতর থেকে অনেকগুলো সিগন্যাল দিতে থাকে। মুশকিল হলো, কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো কষ্ট হয় না বলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের কিডনি কতটা খারাপ অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু যখন কিডনির কাজ প্রায় শেষের দিকে চলে আসে, তখন শরীর আর মানিয়ে নিতে পারে না। ক্রিয়েটিনিন বাড়ার পাশাপাশি এমন কিছু বিপদ সংকেত আছে, যেগুলো দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে ডায়ালাইসিসের সময় ঘনিয়ে এসেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই লক্ষণগুলোকে ‘ইউরেমিয়া’ (Uremia) বলা হয়। এগুলো অবহেলা করা মানে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।

শারীরিক যেসব সমস্যা বা ওয়ার্নিং সাইন অবহেলা করবেন না

কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হওয়ার পথে থাকলে শরীরে বেশ কিছু গুরুতর পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে কমন এবং বিপজ্জনক লক্ষণগুলো হলো:

  • শরীরে জল জমা (Edema): কিডনি অতিরিক্ত জল বের করতে না পারায় পা, গোড়ালি, পেট এবং চোখের চারপাশে ফুলে যায়।

  • প্রচণ্ড ক্লান্তি ও দুর্বলতা: রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) এবং শরীরে দূষিত পদার্থ জমার কারণে সারাদিন চরম দুর্বল লাগে ।

  • ভয়ানক শ্বাসকষ্ট: ফুসফুসে জল জমে যাওয়ার কারণে রোগী সোজা হয়ে শুতে পারেন না, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠেন ।

  • খাবারে তীব্র অরুচি ও বমি ভাব: মুখে মেটালিক স্বাদ পাওয়া, কোনো খাবার খেতে ইচ্ছে না করা এবং বারবার বমি হওয়া ।

  • চুলকানি ও ঘুমের ব্যাঘাত: রক্তে ইউরিয়া ও অন্যান্য বর্জ্য মাত্রাতিরিক্ত জমার কারণে সারা গায়ে অস্বস্তিকর চুলকানি হয় এবং রাতে একদমই ঘুম আসে না।

ক্রিয়েটিনিন হঠাত বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো কী কী?

আমাদের অনেকেরই ধারণা, শুধু কিডনি খারাপ হলেই ক্রিয়েটিনিন বাড়ে। এই ধারণা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। কিডনি রোগের বাইরেও এমন অনেক দৈনন্দিন কারণ বা বদভ্যাস রয়েছে যার কারণে রক্তে এর মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের কিডনির ফিল্টারগুলো সময়ের সাথে সাথে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তে সুগারের মাত্রা লাগামহীন থাকলে তা কিডনির রক্তনালীগুলোকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। অন্যদিকে, অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড প্রেসার কিডনির ভেতরের সূক্ষ্ম ছাঁকনিগুলোর ওপর মারাত্মক চাপ ফেলে। তাই কেন ক্রিয়েটিনিন বাড়ছে, সেই গোড়ার কারণটি খুঁজে বের করা চিকিৎসার প্রথম এবং প্রধান শর্ত।

ডায়াবেটিস, হাই প্রেসার এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

কিডনির বারোটা বাজার পেছনে মূলত যে কারণগুলো দায়ী থাকে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস: রক্তে অতিরিক্ত সুগার কিডনির ছাঁকনিগুলোকে (নেফ্রন) অকেজো করে দেয়।

  • উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure): প্রেসার বেশি থাকলে কিডনিতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং কিডনি শুকিয়ে যেতে থাকে।

  • মাত্রাতিরিক্ত ব্যথার ওষুধ: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কথায় কথায় পেইনকিলার (Painkillers) খাওয়া কিডনির জন্য বিষের সমান।

  • প্রচণ্ড ডিহাইড্রেশন: শরীরে জলের পরিমাণ মারাত্মক কমে গেলে কিডনিতে রক্ত প্রবাহ কমে যায়, ফলে ক্রিয়েটিনিন বাড়ে।

  • কিডনিতে পাথর বা ইনফেকশন: প্রস্রাবের রাস্তায় বাধা বা বারবার ইউরিন ইনফেকশন হলেও কিডনির কাজের ক্ষমতা কমে যায়।

ক্রিয়েটিনিন কমানোর এবং ডায়ালাইসিস এড়ানোর কার্যকরী উপায়

যাদের ব্লাড টেস্ট রিপোর্টে ক্রিয়েটিনিন বাড়তে শুরু করেছে, তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কিডনির ক্ষতিটা যেখানে আছে, সেখানেই আটকে রাখা। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, ড্যামেজ হয়ে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া কিডনি পুরোপুরি ১০০% আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আপনি যদি সঠিক নিয়মকানুন মেনে চলেন, তবে ডায়ালাইসিসকে বছরের পর বছর ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব । এর জন্য সবার আগে নিজের ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসারকে একদম কড়া শাসনে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ কিনে খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আনতে হবে রোজকার ডায়েট বা খাওয়াদাওয়ায়।

জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে জরুরি পরিবর্তন (কিডনি ডায়েট)

কিডনি রোগীদের ডায়েট সাধারণ মানুষের চেয়ে একদমই আলাদা হয়। ডায়ালাইসিস এড়াতে চাইলে আপনাকে এই নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে:

  • প্রোটিন মেপে খাওয়া: রেড মিট (খাসি বা গরুর মাংস), বড় মাছ বা অতিরিক্ত ডাল খাওয়া কমান। সারাদিনে কতটা প্রোটিন আপনার জন্য নিরাপদ, তা ডায়েটিশিয়ানের কাছ থেকে জেনে নিন।

  • লবণ কমানো: খাবারে কাঁচা লবণ খাওয়া একেবারেই বন্ধ করুন। লবণে থাকা সোডিয়াম ব্লাড প্রেসার বাড়ায় এবং শরীরে জল জমিয়ে দেয়।

  • পটাশিয়াম ও ফসফরাস যুক্ত খাবার বর্জন: কলা, ডাবের জল, কমলালেবু, টমেটো এবং ড্রাই ফ্রুটসের মতো পটাশিয়াম যুক্ত খাবার কিডনি রোগীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

  • জলের কড়া হিসাব: কিডনি রোগীরা বেশি জল খেলে তা প্রস্রাব হয়ে বেরোতে পারে না, উল্টে ফুসফুসে জমে যায়। তাই ডাক্তার আপনাকে ২৪ ঘণ্টায় যতটুকু জল (১ লিটার বা দেড় লিটার) খেতে বলবেন, ঠিক ততটুকুই খাবেন ।

ডায়ালাইসিসের ধরন: আপনার জন্য কোনটি উপযুক্ত হতে পারে?

যখন সমস্ত চেষ্টা, ওষুধ এবং ডায়েট কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং eGFR একদম তলানিতে এসে ঠেকে, তখন শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হলো ডায়ালাইসিস। ডায়ালাইসিস হলো একটি কৃত্রিম প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মেশিনের সাহায্যে আপনার রক্ত থেকে জমে থাকা জল এবং বর্জ্য পদার্থ বের করে আনা হয়—যে কাজটা আগে আপনার কিডনি প্রাকৃতিকভাবে করতো। অনেকেই ডায়ালাইসিস শব্দটা শুনলে ভয় পান, ভাবেন এটাই জীবনের শেষ। কিন্তু সত্যি বলতে, এটি একটি জীবনদায়ী চিকিৎসা যা আপনাকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়। ডায়ালাইসিস মূলত দুই ধরনের হয়, এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা ও সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ডাক্তাররা সঠিক পদ্ধতিটি বেছে নেন।

হিমোডায়ালাইসিস বনাম পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস

  • হিমোডায়ালাইসিস (Hemodialysis): এটি সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি। এতে রোগীকে সপ্তাহে ২ বা ৩ দিন হাসপাতালে বা ডায়ালাইসিস সেন্টারে যেতে হয়। মেশিনের মাধ্যমে শরীর থেকে রক্ত বের করে, তা পরিষ্কার করে আবার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতি সেশনে প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লাগে।

  • পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (Peritoneal Dialysis): এই পদ্ধতিতে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর পেটের ভেতর একটি নরম টিউব (ক্যাথেটার) বসানো থাকে। পেটের ভেতরের আবরণকে কাজে লাগিয়ে বাড়িতে বসেই প্রতিদিন রক্ত পরিষ্কার করা যায়। যারা কর্মজীবী বা যাদের হাসপাতালে বারবার যাওয়া সম্ভব নয়, তাদের জন্য এটি বেশ সুবিধাজনক।

শেষ কথা

সবশেষে এটাই বলার যে, শুধুমাত্র একটি রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ডায়ালাইসিসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। ক্রিয়েটিনিন কত হলে ডায়ালাইসিস করতে হয়, এই প্রশ্নের সহজ ও সোজা উত্তর হলো—যখন আপনার কিডনি তার কাজের ৯০ শতাংশই হারিয়ে ফেলে এবং eGFR ১৫ এর নিচে চলে আসে, তখনই এর প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত ক্রিয়েটিনিন ৫ থেকে ৭ mg/dL এর ঘরে গেলে ডাক্তাররা ডায়ালাইসিস করার প্রস্তুতি নিতে বলেন । তবে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয় আপনার শারীরিক লক্ষণগুলোর ওপর। আপনার যদি শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি বা শরীর ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা শুরু হয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে বিশেষজ্ঞ নেফ্রোলজিস্টের কাছে যাওয়া উচিত। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত চেকআপ এবং ডাক্তারের গাইডলাইন মেনে চললে কিডনিকে অনেক দিন ভালো রাখা যায়। অযথা ভয় পাবেন না, গুজবে কান দেবেন না, সঠিক তথ্য জানুন এবং সুস্থ থাকুন।