ব্রেন হেমারেজে বিদায় নিলেন মঞ্চ-পর্দার প্রিয় অভিনেত্রী ভদ্রা বসু

বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের একজন প্রখ্যাত নাম, প্রয়াত অভিনেত্রী ভদ্রা বসু গতকাল রাতে ব্রেন হেমারেজের জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন। ৬৫ বছর বয়সে তাঁর এই চলে যাওয়া সংস্কৃতি রসিকদের মধ্যে গভীর…

Sangita Chowdhury

 

বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের একজন প্রখ্যাত নাম, প্রয়াত অভিনেত্রী ভদ্রা বসু গতকাল রাতে ব্রেন হেমারেজের জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন। ৬৫ বছর বয়সে তাঁর এই চলে যাওয়া সংস্কৃতি রসিকদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। কয়েকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন ভদ্রা, এবং অস্ত্রোপচারের পরও তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল হয়নি। মঞ্চ-পর্দা দুই মাধ্যমেই অসাধারণ অভিনয়ের জন্য পরিচিত এই অভিনেত্রীকে শেষ বিদায় দেওয়া হয়েছে আজ সকালে কলকাতার কেতলপাড়া শ্মশানে। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়াতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ঢেউ উঠেছে, যা তাঁর জনপ্রিয়তার পরিচয় দিচ্ছে।

ভদ্রা বসুর জীবন ছিল অভিনয়ের এক অনন্য যাত্রা, যা মঞ্চ থেকে স্ক্রিন পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর স্বামী, নাট্যকার ও অভিনেতা অসিত বসুর সঙ্গে মিলে তিনি বাংলা থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। দুই কন্যা দামিনী বসু এবং অনন্দী বসুর মতো প্রতিভাবান অভিনেত্রীদের মা হিসেবে তিনি পরিবারের মূল স্তম্ভ ছিলেন। গতকাল রাতে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস পড়ে, যা বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটকের জগতে একটি অপূরণীয় ক্ষতি। এই ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির এক অধ্যায়ের সমাপ্তির ইঙ্গিত বহন করে।

Ratan Tata Death: শিল্পজগতে যুগাবসান! প্রয়াত রতন টাটা, তাঁর মৃত্যুতে দেশ জুড়ে শোকের ছায়া

প্রয়াত অভিনেত্রী ভদ্রা বসুর জন্ম হয়েছিল ১৯৬০ সালের আশেপাশে, কলকাতার এক সাধারণ পরিবারে। তাঁর প্রাথমিক জীবন ছিল সংগ্রামের, কিন্তু অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে এসেছে থিয়েটারের দুনিয়ায়। ১৯৮০-এর দশকে তিনি অসিত বসুর নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন, যেখানে তাঁর অভিনয় প্রতিভা প্রথম ফুটে ওঠে। ‘টিনকাহন’ নাটকে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়, যা তাঁকে মঞ্চের এক শক্তিশালী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়া, তিনি নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন, যেমন ‘খিরের পুতুল’ এবং ‘কাঁকাবতীর গল্প’—যা তাঁর কন্যা দামিনীর শৈশবকালীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। বাংলা থিয়েটারের এই যুগে ভদ্রা বসু ছিলেন একটি অনুপ্রেরণা, যিনি নারী অভিনেত্রীদের জন্য পথ দেখিয়েছেন। তাঁর মঞ্চ অভিনয়ে সূক্ষ্মতা এবং আবেগের গভীরতা দর্শকদের মুগ্ধ করত।

অভিনয় জগতে প্রবেশের পর ভদ্রা বসু ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকেন। ২০১১ সালে অপর্ণা সেনের ‘ইটি মৃণালিনী’ চলচ্চিত্রে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি দেয়। এই সিনেমায় তিনি একজন প্রৌঢ় অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তাঁর নিজের জীবনের প্রতিফলনের মতো মনে হয়। পরবর্তীকালে ‘টিনকাহন’ (২০১৪) ফিল্মে তাঁর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গল্পের অংশগ্রহণ দর্শকদের মুগ্ধ করে। পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের এই অ্যান্থলজিতে ভদ্রা বসুর অভিনয়কে সমালোচকরা ‘জীবন্ত’ বলে মূল্যায়ন করেন। ২০২৪ সালে ‘তাহাদের কথা’ সিরিজে তাঁর শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ দেখা যায়, যা তাঁর ক্যারিয়ারের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এছাড়া, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ (সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত), ‘বেলা’ (অনিলাভ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত), ‘চট্টোলোক’, ‘আলাপ’ এবং ‘স্যাড লেটার্স অফ অ্যান ইমাজিনারি উইমেন’—এই সব চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি অপরিহার্য ছিল। প্রয়াত অভিনেত্রী ভদ্রা বসুর এই যাত্রা ছিল মঞ্চ-পর্দা দুই মাধ্যমেই অভিনয়ের এক সমৃদ্ধ উদাহরণ।

ভদ্রা বসুর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অভিনয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অসিত বসুর সঙ্গে বিবাহের পর তিনি পরিবারকে অভিনয়ের কেন্দ্রবিন্দু করেন। কন্যা দামিনী বসু, যিনি নিজেও একজন স্বনামধন্য অভিনেত্রী এবং গায়িকা, তাঁর মায়ের প্রভাবে থিয়েটারে পা রাখেন। দামিনী একবার বলেছিলেন, “মা’র মঞ্চ আমার প্রথম স্কুল ছিল। তাঁর অভিনয় দেখে আমি শিখেছি কীভাবে আবেগকে জীবন্ত করতে হয়।” অনন্দী বসুও অভিনয় জগতে সক্রিয়, যা পরিবারের এই ঐতিহ্যের প্রমাণ। ভদ্রা বসু শুধু অভিনয়ই করতেন না, নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণেও হাত বাড়িয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত নাটকগুলোতে নারী চরিত্রের গভীরতা তুলে ধরা হয়েছে, যা সমকালীন সমাজের প্রতিফলন। এই পরিবারের অভিনয় ঐতিহ্য বাংলা সংস্কৃতির এক অংশ হয়ে উঠেছে।

রাজনীতির মাঠ থেকে ওটিটি পর্দায়: সিপিএম নেত্রী দীপ্সিতা ধর এখন ‘জিদ্দি গার্লস’-এর বিদ্রোহী চরিত্রে!

সাম্প্রতিক সময়ে ভদ্রা বসুর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ছিল। কয়েক মাস ধরে তিনি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন, কিন্তু অভিনয় থেকে দূরে থাকেননি। গত সপ্তাহে ব্রেন হেমারেজের ঘটনায় তাঁকে সাশ্রয়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়। সূত্র জানাচ্ছে, অস্ত্রোপচার সফল হলেও জটিলতার কারণে তাঁর অবস্থা খারাপ হয়। পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে দামিনী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়ের শৈশবের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “চিরন্তন রোদের কিরণ.. মা”। এই পোস্টে তাঁর শোকের গভীরতা ফুটে উঠেছে। হাসপাতালের এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, “ভদ্রা বসুর মতো শিল্পীদের জন্য আমরা সবাই শোকাহত। তাঁর সাহসিকতা আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।”

ভদ্রা বসুর মৃত্যুর খবর ছড়াতেই বাংলা অভিনয় জগৎ শোকে মুহ্যমান হয়ে ওঠে। অভিনেতা সোহান বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমার চেহারাটা বড়সড়। গলার আওয়াজ ভারী। দুম করে কেউ ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে না। এই মানুষটা আমায় প্রথম আলাপেই ‘তুই’ করে ডেকেছিল। নাটক দেখে ভালো লাগায় থুতনি ধরে আদর করে নেড়ে দিয়েছিল। সেই মুহূর্ত থেকে বড় আপনার মানুষ মনে হয়েছিল ভদ্রাদিকে। কয়েকদিন আগে সুদীপদার থেকে অসুস্থতার খবর পেয়েছিলাম। মনটা খারাপ হয়েই ছিল। কাল গভীর রাতে জানতে পেরে… আর ত কেউ বলবেনা, ‘পাকামি করিসনা, কানটা মুলে দেব’।” এই শব্দগুলোতে তাঁর সঙ্গে ভদ্রা বসুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ছবি ফুটে ওঠে।

অভিনেতা রাহুল আরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ও শোক প্রকাশ করে বলেছেন, “আমি মনের দিক দিয়ে এক কিশোরী সহ অভিনেত্রীকে হারালাম। আমরা হারালাম অন্যতম শক্তিশালী এক অভিনেত্রীকে। ভদ্রা দি।” এই মন্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা প্রমাণ করে কতটা প্রিয় ছিলেন তিনি সমকক্ষদের কাছে। বাংলা চলচ্চিত্র পরিষদের এক সদস্য জানিয়েছেন, “ভদ্রা বসুর মতো বহুমুখী প্রতিভা কমই দেখা যায়। তাঁর অভাব অনুভব করব আমরা সবাই।” এই শোকের ঢেউ শুধু অভিনয়ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, দর্শকরাও তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

প্রয়াত অভিনেত্রী ভদ্রা বসুর ক্যারিয়ারে কোনো বড় পুরস্কার না থাকলেও, তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি নারী অভিনয়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন, বিশেষ করে মঞ্চ অভিনয়ে। তাঁর চরিত্রগুলোতে সাধারণ মানুষের জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে, যা সমালোচকরা প্রশংসা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’তে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বলা হয়, “ভদ্রা বসু অভিনয়ের মাধ্যমে ইতিহাসকে জীবন্ত করেছেন।” তাঁর শেষ কাজ ‘তাহাদের কথা’তে দেখা গিয়েছে তাঁর অটুট শক্তি, যা তাঁর বয়সকে অতিক্রম করে। বাংলা অভিনয়ের এই যোদ্ধা নারীকে স্মরণ করে অনেকে বলছেন, তাঁর উত্তরাধিকার তাঁর কন্যাদের মাধ্যমে চলবে।

ভদ্রা বসুর জীবন ছিল একটি নাটকের মতো—উত্থান-পতনের মাঝে অভিনয়ের আলোকবর্তিকা। তাঁর মৃত্যু বাংলা সংস্কৃতির জন্য এক বড় ক্ষতি, কিন্তু তাঁর কাজগুলো চিরকাল জীবিত থাকবে। ভবিষ্যতে তাঁর উপর ভিত্তি করে নাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখবে। পরিবার এবং ভক্তরা এখন শোকের মধ্যে, কিন্তু ভদ্রা বসুর শিক্ষা—অভিনয়ের মাধ্যমে জীবনকে স্পর্শ করা—সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে থাকবে। তাঁর আত্মাকে শান্তি মাগা এই শোকসভা শেষ হোক না, বরং এক নতুন যাত্রার সূচনা হোক।

About Author