​নারীদের স্পর্শে মানা! তালিবানি ফতোয়ায় ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া আফগান নারীদের আর্তনাদ, উদ্ধার হচ্ছে শুধু পুরুষরাই

​ আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্তূপের নিচ থেকে ভেসে আসছে নারী ও শিশুদের কান্নার রোল, কিন্তু তালিবানের কঠোর ফতোয়ার সামনে অসহায় উদ্ধারকারীরা। নারীদের শরীর স্পর্শ করা যাবে না—…

Srijita Ghosh

 

​ আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্তূপের নিচ থেকে ভেসে আসছে নারী ও শিশুদের কান্নার রোল, কিন্তু তালিবানের কঠোর ফতোয়ার সামনে অসহায় উদ্ধারকারীরা। নারীদের শরীর স্পর্শ করা যাবে না— এই কঠোর নির্দেশের কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিত নারীদের উদ্ধার না করে শুধুমাত্র পুরুষদের বেছে বেছে বের করে আনা হচ্ছে। এর ফলে, চোখের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসংখ্য আফগান নারী, যা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম মর্মান্তিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিদর্শন হয়ে উঠছে।

​২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই আফগান নারীদের ওপর একের পর এক নেমে এসেছে তালিবানের খড়্গ। শিক্ষা, চাকরি, জনসমক্ষে বিচরণ— সবকিছুতেই জারি হয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরেও শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলির রিপোর্ট অনুযায়ী, উদ্ধারকাজে লিঙ্গবৈষম্যের এই ভয়াবহ চিত্রই এখন আফগানিস্তানের রূঢ় বাস্তবতা।

​উদ্ধারকাজে লিঙ্গবৈষম্য: এক ভয়াবহ চিত্র

​চলতি সপ্তাহের শুরুতে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে শত শত বাড়িঘর ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। উদ্ধারকাজে নেমেছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বেচ্ছাসেবকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অমানবিক চিত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উদ্ধারকারী জানান, “আমরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নারীদের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের হাত-পা বাঁধা। কোনো পরপুরুষ মহিলাদের শরীর স্পর্শ করতে পারবে না, এটাই তালিবানের নির্দেশ। ফলে, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জীবিত নারীদের পাশ কাটিয়ে মৃত বা জীবিত পুরুষদের উদ্ধারে বাধ্য হচ্ছি।”

​এই ফতোয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পুরুষ উদ্ধারকারীরা আটকে পড়া নারীদের উদ্ধারে দ্বিধাগ্রস্ত, কারণ এর পরিণতি হতে পারে কঠোর শাস্তি। নারী উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা আফগানিস্তানে প্রায় নেই বললেই চলে, কারণ তালিবান নারীদের বাড়ির বাইরে কাজ করা কার্যত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ফলে, এক জটিল ও মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া তাদের নারী স্বজনদের উদ্ধারের জন্য কাকুতি-মিনতি করছেন, কিন্তু ধর্মীয় বিধানের দোহাই দিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

​আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইউএন উইমেন‘-এর আফগানিস্তান প্রতিনিধি সুসান ফার্গুসন এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “যেকোনো দুর্যোগে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আফগানিস্তানে এই সংকট আরও গভীর, কারণ লিঙ্গভিত্তিক বিধিনিষেধের ফলে নারীরা জীবনদায়ী সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, “নারী স্বাস্থ্যকর্মী ও উদ্ধারকারীদের কাজের সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে অনুরোধ করছি, যাতে লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়।”

​পরিসংখ্যান কী বলছে?

​তালিবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে নারীদের বিরুদ্ধে ৮০টিরও বেশি ফরমান জারি করেছে, যা তাদের জীবনকে কার্যত গৃহবন্দী করে তুলেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী:

  • ​আফগানিস্তানে বর্তমানে ৮০ শতাংশেরও বেশি তরুণী শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে।
  • ​কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪ শতাংশে, যেখানে পুরুষদের হার ৮৯ শতাংশ।
  • ​তালিবানের মন্ত্রিসভা বা কোনো স্থানীয় প্রশাসনিক পদে একজনও নারী সদস্য নেই।
  • ​নারীদের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও তাদের প্রবেশাধিকার নেই।
  • ​কোনো পুরুষ আত্মীয় (মাহরাম) ছাড়া নারীদের নির্দিষ্ট দূরত্বের বেশি ভ্রমণ নিষিদ্ধ। এমনকি, চিকিৎসা পরিষেবা নিতে গেলেও এই নিয়ম প্রযোজ্য।

​এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আফগান নারীরা কতটা প্রান্তিক এবং অসহায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই অসহায়ত্বই তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হেরাতে গত বছরের ভূমিকম্পেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল, যেখানে মৃতদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিলেন নারী। আহতদের মধ্যেও দুই-তৃতীয়াংশ ছিলেন নারী, কারণ তারা সময়মতো উদ্ধার বা চিকিৎসা পাননি।

​শুধু উদ্ধারকাজেই নয়, ত্রাণ বিতরণেও বৈষম্য

​সমস্যা শুধু উদ্ধারকাজেই সীমাবদ্ধ নয়। ভূমিকম্প-পরবর্তী ত্রাণ শিবিরগুলিতেও নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া অনেক নারীই ত্রাণ সংগ্রহ করতে পারছেন না। যাদের পরিবারের পুরুষ সদস্য ভূমিকম্পে মারা গেছেন, তাদের অবস্থা আরও করুণ। একা একজন নারীর পক্ষে ত্রাণ শিবিরে গিয়ে নিজের ও সন্তানদের জন্য খাবার বা ওষুধ সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

​আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই পরিস্থিতিকে ‘লিঙ্গীয় বর্ণবাদ’ (Gender Apartheid) বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, তালিবান পরিকল্পিতভাবে সমাজ থেকে নারীদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করছে এবং এর সবচেয়ে নির্মম প্রভাব পড়ছে এই ধরনের মানবিক সংকটের সময়ে।

​বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আফগানিস্তানে নারীদের মৃত্যুর হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। একটি সমাজ যেখানে নারীদের জীবন-মৃত্যু ধর্মীয় গোঁড়ামির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেড়ে ওঠাও এক বিরাট প্রশ্নের মুখে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া আফগান নারীদের আর্তনাদ আজ শুধু বাঁচার আকুতি নয়, তা গোটা বিশ্বের বিবেকের কাছে এক কঠোর প্রশ্ন— মানবিকতা কি এতটাই ঠুনকো যে তা কয়েকটি ফতোয়ার সামনে ভেঙে পড়বে?

About Author
আরও পড়ুন