আঙুলের ছাপ নিয়ে ১০০ বছরের ধারণা কি ভুল? AI-এর নতুন তথ্যে তোলপাড় ফরেনসিক জগত!

আমরা ছোটবেলা থেকেই একটি কথা শুনে আসছি—"এক হাতের পাঁচ আঙুল কি সমান হয়?" রূপক অর্থে এটি মানুষের আচরণের ভিন্নতা বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আমরা জানতাম—সত্যিই, এক হাতের পাঁচ আঙুল…

Avatar

 

আমরা ছোটবেলা থেকেই একটি কথা শুনে আসছি—”এক হাতের পাঁচ আঙুল কি সমান হয়?” রূপক অর্থে এটি মানুষের আচরণের ভিন্নতা বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আমরা জানতাম—সত্যিই, এক হাতের পাঁচ আঙুল আলাদা। শুধু তাই নয়, গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফরেনসিক বিজ্ঞান এবং অপরাধী শনাক্তকরণ ব্যবস্থা একটি অকাট্য সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল: “প্রতিটি আঙুলের ছাপ অনন্য, এমনকি একই ব্যক্তির এক আঙুলের ছাপের সাথে অন্য আঙুলের ছাপের কোনো মিল নেই।”

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) আমাদের এই শতবর্ষের বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এবং তাদের তৈরি শক্তিশালী AI মডেল দাবি করেছে—আমরা ভুল ছিলাম। একই ব্যক্তির বিভিন্ন আঙুলের ছাপের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে, যা মানুষের খালি চোখ বা প্রচলিত ফরেনসিক পদ্ধতি এতদিন ধরতে পারেনি।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা এই যুগান্তকারী আবিষ্কার, এর পেছনের প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতে অপরাধ দমনে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

 প্রচলিত ধারণা: আঙুলের ছাপ কেন ‘ইউনিক’ ভাবা হতো?

এই নতুন আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে প্রচলিত ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট অপরাধী শনাক্তকরণের স্বর্ণমান (Gold Standard) হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

‘মিনুশিয়’ (Minutiae) তত্ত্ব:

প্রথাগত ফরেনসিক বিজ্ঞানে আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণের জন্য ‘মিনুশিয়’ বা সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর নির্ভর করা হয়। আঙুলের ত্বকের ওপর যে ভাঁজ বা রেখা (Ridges) থাকে, সেগুলো কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, কোথায় দুভাগ হয়েছে (Bifurcations)—এসবের একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়। ফরেনসিক বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্যাটার্নগুলো অত্যন্ত বিশৃঙ্খল (Chaotic) এবং আঙুল ভেদে সম্পূর্ণ আলাদা।

তাই এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, আপনার বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপের সাথে আপনার তর্জনীর ছাপের কোনো গাণিতিক বা জ্যামিতিক মিল নেই। এ কারণেই যখন কোনো অপরাধস্থল বা ‘ক্রাইম সিন’ থেকে এমন একটি আঙুলের ছাপ পাওয়া যায় যা পুলিশের ডাটাবেসে থাকা অন্য আঙুলের ছাপের সাথে মেলে না, তখন সেই সূত্রটি অকেজো হয়ে পড়ে।

 কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা: একটি নতুন অধ্যায়

এই ফাটলটি ধরিয়েছেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র গাবে গুও (Gabe Guo) এবং তার দল। কোনো ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নয়, বরং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই ছাত্র একটি পাবলিক ডাটাবেস ব্যবহার করে এই অসাধ্য সাধন করেছেন।

গবেষণার পদ্ধতি:

গবেষক দলটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ডাটাবেস থেকে প্রায় ৬০,০০০ আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন। এগুলো জোড়ায় জোড়ায় ভাগ করা হয়। কিছু জোড়া ছিল একই ব্যক্তির বিভিন্ন আঙুলের (Intra-person), আর কিছু জোড়া ছিল ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির (Inter-person)।

এরপর তারা এই ডেটা একটি বিশেষ ধরনের নিউরাল নেটওয়ার্কে (Deep Contrastive Network) ইনপুট দেন। এই ধরনের AI সিস্টেম সাধারণত ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আঙুলের ছাপের ক্ষেত্রে এটি আগে কখনো এত ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

AI কী খুঁজে পেল?

প্রাথমিকভাবে AI সিস্টেমটি যা দেখাল, তা গবেষকদেরও অবাক করে দিয়েছিল। সিস্টেমটি ৯৯.৯৯% আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে সক্ষম হলো যে, জোড়া আঙুলের ছাপগুলো একই ব্যক্তির নাকি ভিন্ন ব্যক্তির। অর্থাৎ, এক আঙুলের ছাপ দেখে AI বলে দিতে পারছে অন্য আঙুলের ছাপটি ওই একই ব্যক্তির কিনা।

 মানুষের চোখ যা দেখেনি, AI তা দেখল কীভাবে?

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, গত ১০০ বছরে হাজার হাজার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যা দেখতে পাননি, একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তা কীভাবে দেখল?

গাবে গুও এবং তার অধ্যাপক হড লিপসন (Hod Lipson) বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, AI প্রচলিত ‘মিনুশিয়’ বা রেখার শেষ প্রান্ত ও বিভাজনগুলো দেখছিল না। বরং এটি মনোযোগ দিয়েছিল আঙুলের ছাপের একেবারে কেন্দ্রের দিকে।

বক্রতা এবং কোণ (Curvature and Angles):

AI আঙুলের ছাপের মাঝখানের ঘূর্ণি বা লুপগুলোর (Swirls and Loops) বক্রতা এবং তাদের কোণগুলো বিশ্লেষণ করেছে। দেখা গেছে, একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আঙুলের কেন্দ্রের এই প্যাটার্নগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী গাণিতিক সম্পর্ক রয়েছে। আঙুলের ডগার সুক্ষ্ম রেখাগুলো আলাদা হলেও, কেন্দ্রের জ্যামিতিক গঠন বা ‘ওরিয়েন্টেশন ম্যাপ’ একই ব্যক্তির সব আঙুলে প্রায় একই রকম।

অধ্যাপক লিপসন বলেন, “AI এমন কিছু প্যাটার্ন বা ‘মার্কার’ ব্যবহার করছে যা আমরা আগে কখনো সংজ্ঞায়িত করিনি বা খেয়াল করিনি।”

 ফরেনসিক জার্নালের প্রত্যাখ্যান এবং পরবর্তীতে স্বীকৃতি

যেকোনো বৈপ্লবিক আবিষ্কারের মতো এটিও শুরুতে বাধার মুখে পড়েছিল। গাবে গুও যখন তাদের গবেষণাপত্রটি একটি স্বনামধন্য ফরেনসিক জার্নালে পাঠান, তখন সেটি তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। পর্যালোচকরা মন্তব্য করেছিলেন, “এটা সবার জানা যে প্রতিটি আঙুলের ছাপ অনন্য। এখানে নতুন কিছু নেই, আর এই দাবিটি অসম্ভব।”

কিন্তু গবেষক দল হাল ছাড়েননি। তারা আরও বেশি ডেটা নিয়ে সিস্টেমটিকে প্রশিক্ষণ দেন এবং প্রমাণ করেন যে তাদের AI ফ্লুক বা কাকতালীয়ভাবে কাজ করছে না। অবশেষে, বিখ্যাত সায়েন্স জার্নাল ‘Science Advances’-এ তাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এটি প্রকাশের পর থেকেই ফরেনসিক জগতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

 অপরাধ দমনে এই আবিষ্কারের প্রভাব (Real-world Application)

এই প্রযুক্তি যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়, তবে অপরাধ তদন্তের চিত্র আমূল বদলে যেতে পারে। এর প্রধান দুটি প্রয়োগক্ষেত্র হতে পারে:

ক) কোল্ড কেস বা অমীমাংসিত রহস্য সমাধান:

ধরুন, ৫ বছর আগে একটি চুরির ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি ‘বৃদ্ধাঙ্গুলির’ ছাপ পেয়েছিল, কিন্তু চোরকে ধরা যায়নি। আজ অন্য একটি মামলায় পুলিশ সন্দেহভাজন একজনকে ধরেছে এবং তার ‘তর্জনীর’ ছাপ ডাটাবেসে আছে।

প্রচলিত ব্যবস্থায়, পুলিশ এই দুটি ছাপের মধ্যে কোনো সংযোগ খুঁজে পাবে না। কারণ ডাটাবেসে ওই ব্যক্তির বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ নেই। কিন্তু নতুন AI সিস্টেম বলে দিতে পারবে যে, ৫ বছর আগের সেই বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ এবং আজকের এই তর্জনীর ছাপ একই ব্যক্তির। এভাবে হাজার হাজার অমীমাংসিত কেস সমাধান করা সম্ভব হবে।

খ) তদন্তের গতি বৃদ্ধি:

ক্রাইম সিনে অনেক সময় অস্পষ্ট বা ঝাপসা ছাপ পাওয়া যায়। AI যেহেতু আঙুলের কেন্দ্রের বক্রতা দেখে, তাই আংশিক ছাপ থেকেও এটি অন্যান্য আঙুলের সাথে মিল খুঁজে বের করতে পারবে, যা তদন্তের পরিধি বা ‘লিড’ (Leads) অনেক কমিয়ে আনবে।

 বায়োমেট্রিক্স এবং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ

শুধু অপরাধ দমন নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে আমরা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ আনলক করতে নির্দিষ্ট একটি আঙুল ব্যবহার করি। যদি কোনো কারণে সেই আঙুলটি আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা ভিজে থাকে, তখন ফোন খোলা যায় না।

এই নতুন প্রযুক্তির ফলে, ডিভাইসগুলো বুঝতে পারবে যে এটি আপনারই অন্য একটি আঙুল। ফলে, আপনি বৃদ্ধাঙ্গুলির বদলে তর্জনী বা মধ্যমা ব্যবহার করলেও সিস্টেম আপনাকে চিনতে পারবে। এটি বায়োমেট্রিক সিকিউরিটিকে আরও নমনীয় এবং ইউজার-ফ্রেন্ডলি করে তুলবে।

 সীমাবদ্ধতা এবং বিতর্ক

অবশ্যই, এই প্রযুক্তি এখনই আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:

  • ডেটাবেসের আকার: গবেষকরা মাত্র ৬০,০০০ ছাপ ব্যবহার করেছেন। ফরেনসিক সায়েন্সে কোনো কিছুকে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ করতে হলে কোটি কোটি ডেটার ওপর পরীক্ষা চালাতে হয়।

  • নির্ভুলতা: AI-এর নির্ভুলতা এখন পর্যন্ত ৭৭% থেকে ৯৯% এর মধ্যে ওঠানামা করছে। আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হতে হলে এটিকে ১০০% এর কাছাকাছি বা ভুলের ঊর্ধ্বে হতে হবে।

  • বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত: অনেক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এখনো মনে করেন, আঙুলের ছাপের ‘ইউনিকনেস’ বা অনন্যতা পুরোপুরি ভুল নয়। AI হয়তো মিল খুঁজে পাচ্ছে, কিন্তু তাই বলে দুটি আঙুলের ছাপ হুবহু এক নয়।

 AI বনাম মানব বুদ্ধিমত্তা: একটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ

এই আবিষ্কারটি শুধু আঙুলের ছাপের বিষয় নয়, এটি AI-এর ক্ষমতার একটি দুর্দান্ত উদাহরণ। মানুষ সাধারণত যা দেখে অভ্যস্ত, বা বইয়ে যা লেখা আছে, তার বাইরে চিন্তা করতে ভয় পায়। কিন্তু AI-এর কোনো পূর্বধারণা বা ‘বায়াস’ (Bias) নেই।

অধ্যাপক লিপসন যেমনটি বলেছেন, “অনেকে মনে করেন AI শুধু নতুন ছবি আঁকতে পারে বা চ্যাট করতে পারে। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করল যে, AI বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেও মানুষের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। এটি প্রকৃতির এমন সব রহস্য উন্মোচন করতে পারে যা আমাদের চোখের সামনে থাকলেও আমরা দেখতে পাই না।”

“এক হাতের পাঁচ আঙুল সমান নয়”—এই প্রবাদটি হয়তো দর্শনের ক্ষেত্রে ঠিক আছে, কিন্তু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে AI আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, আমাদের শরীরের বায়োলজিক্যাল মার্কারগুলোর মধ্যে আমরা যা ভাবি তার চেয়েও গভীর সংযোগ রয়েছে।

যদিও এখনই পুলিশ স্টেশনগুলোতে এই প্রযুক্তি চালু হচ্ছে না, কিন্তু এটি নিশ্চিত যে ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আসছে। ১০০ বছরের পুরনো বিশ্বাস ভেঙে AI আমাদের দেখিয়েছে—সত্যিটা হয়তো আমাদের হাতের মুঠোয়, বা আরও সঠিকভাবে বললে, আঙুলের ডগাতেই লুকিয়ে ছিল, আমরা কেবল দেখার সঠিক লেন্সটি ব্যবহার করিনি।

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম

আরও পড়ুন