বায়ু দূষণ আজ বিশ্বব্যাপী একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বহিরাগত বায়ু দূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী ৪২ লক্ষ অকাল মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে ১৪% মৃত্যু শুধুমাত্র শ্বাসনালীর তীব্র সংক্রমণের কারণে হয়েছে। ভারতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, যেখানে PM2.5-এর দীর্ঘমেয়াদী এক্সপোজার গড়ে মানুষের আয়ু ৫.২ বছর কমিয়ে দিচ্ছে এবং ২০০৯-২০১৯ সালের মধ্যে বার্ষিক ১৫ লক্ষ মৃত্যুর সাথে যুক্ত। বায়ুর গুণমান এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই গভীর যে PM2.5-এর প্রতি ১০ μg/m³ বৃদ্ধি শিশুদের মধ্যে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ১১% বৃদ্ধি করতে পারে।
বায়ু দূষণ কী এবং কেন এটি এত বিপজ্জনক?
বায়ু দূষণ হল বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকারক পদার্থের উপস্থিতি যা মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এর মধ্যে প্রধানত পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM2.5 এবং PM10), নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (NO2), সালফার ডাই-অক্সাইড (SO2), ওজোন (O3) এবং কার্বন মনোক্সাইড (CO) অন্তর্ভুক্ত। এই দূষণকারী পদার্থগুলি যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প কারখানার নির্গমন, বায়োমাস পোড়ানো এবং নির্মাণ কাজ থেকে উৎপন্ন হয়। State of Global Air Report 2025 অনুসারে, বিশ্বের জনসংখ্যার ৩৬% PM2.5 দূষণের এমন মাত্রায় বসবাস করে যা ৩৫ μg/m³-এর বেশি, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বায়ু দূষণ বিশেষত বিপজ্জনক কারণ এটি দৃশ্যমান নয় এবং ক্রমাগত আমাদের শরীরে প্রবেশ করে চলেছে। PM2.5 কণাগুলি এত ছোট যে তারা সহজেই ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং এমনকি রক্ত প্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে। ভারতে ২০২৪ সালে PM2.5 স্তর গড়ে ৫০.৬ μg/m³ ছিল, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এই উচ্চ মাত্রার দূষণ শ্বাসযন্ত্রের কোষগুলির ক্ষতি করে এবং তাদের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হ্রাস করে।
দিল্লির বায়ু দূষণ: AQI ৪০০ ছাড়াল, কঠোর ব্যবস্থা নিল প্রশাসন
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং বায়ু দূষণের সরাসরি সম্পর্ক
উপরের শ্বাসনালীর সংক্রমণ
বায়ু দূষণ উপরের শ্বাসনালীর সংক্রমণ যেমন নাক, গলা এবং সাইনাসের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। গবেষণা অনুসারে, শিশুদের মধ্যে জরুরি বহির্বিভাগ পরিদর্শনের প্রায় ৮১% উপরের শ্বাসনালীর সংক্রমণের কারণে হয়। বায়ু দূষণকারী পদার্থগুলি শ্বাসনালীর মিউকাস মেমব্রেনকে জ্বালাতন করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার জন্য প্রবেশ পথ সহজ করে দেয়। NO2 এবং SO2-এর দীর্ঘমেয়াদী এক্সপোজার শ্বাসনালীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়, যা পুনরাবৃত্ত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণ
নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণ, যা ফুসফুস, ব্রঙ্কাই এবং অ্যালভিওলিকে প্রভাবিত করে, বায়ু দূষণের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি। ২০২৫ সালের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা Barcelona Institute for Global Health থেকে প্রকাশিত হয়েছে যে PM2.5, PM10, NO2 এবং O3-এর দীর্ঘমেয়াদী এক্সপোজার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণের জন্য হাসপাতালে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষদের ক্ষেত্রে এই সংযোগ তিনগুণ শক্তিশালী। নিউমোনিয়া এবং ব্রঙ্কিওলাইটিস হল সবচেয়ে সাধারণ নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণ যা দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে আসার ফলে হয়।
দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ
বায়ু দূষণ দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ যেমন COPD (ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ) এবং হাঁপানিকে আরও খারাপ করে তোলে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে বায়ু দূষণের কারণে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগে প্রায় ১৪% মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে COPD প্রধান। ভারতে COPD আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৯৯০ সালে ২৮.১ মিলিয়ন থেকে ২০১৬ সালে ৫৫.৩ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। বায়ু দূষণ এই রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দেয়।
বায়ু দূষণ কীভাবে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ঘটায়?
শ্বাসনালীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে
আমাদের শ্বাসনালীতে সিলিয়া নামক ক্ষুদ্র লোমের মতো গঠন রয়েছে যা ক্ষতিকারক পদার্থ এবং জীবাণু বাইরে বের করে দেয়। বায়ু দূষণকারী পদার্থগুলি এই সিলিয়াগুলির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। PM2.5 কণাগুলি শ্বাসনালীর আবরণী কোষগুলিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা স্থানীয় প্রদাহ সৃষ্ষ্টি করে। এই প্রদাহ ইমিউন কোষগুলির কার্যকারিতা হ্রাস করে এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার জন্য সংক্রমণ করা সহজ করে দেয়।
ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করে
বায়ু দূষণ শরীরের ইমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করে দেয়। দূষণকারী পদার্থগুলি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে, যা কোষের ক্ষতি করে এবং প্রদাহজনক সাইটোকাইনের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। এই অতিরিক্ত প্রদাহ শ্বাসনালীর টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সংক্রমণ থেকে পুনরুদ্ধারকে বিলম্বিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে উচ্চ PM2.5 এক্সপোজার ম্যাক্রোফেজ নামক ইমিউন কোষগুলির কার্যকারিতা ৪০% পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে।
ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি সহজতর করে
বায়ু দূষণ শুধুমাত্র আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে না, বরং রোগজীবাণুদের বৃদ্ধিও সহজতর করে। দূষিত বায়ুর মধ্যে থাকা কণাগুলি ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার জন্য পরিবহন মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে, যা তাদের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। উপরন্তু, দূষিত পরিবেশে ভাইরাসগুলি বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পারে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে বায়ু দূষণ শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস সংক্রমণকে বর্ধিত করে এবং রোগের ফলাফলকে প্রভাবিত করে।
এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) এবং স্বাস্থ্য প্রভাব
এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) হল একটি সংখ্যাসূচক স্কেল যা বায়ুর গুণমান এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্য প্রভাব সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। ভারতে, AQI 0 থেকে 500 পর্যন্ত পরিমাপ করা হয় এবং বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত। নিচের টেবিলে AQI স্তর এবং তাদের শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য প্রভাব দেখানো হয়েছে:
| AQI পরিসীমা | বিভাগ | স্বাস্থ্য প্রভাব | শ্বাসযন্ত্রের ঝুঁকি |
|---|---|---|---|
| 0-50 | ভাল | ন্যূনতম প্রভাব | সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ |
| 51-100 | সন্তোষজনক | সংবেদনশীল ব্যক্তিদের শ্বাস নিতে সামান্য অস্বস্তি | হাঁপানি রোগীদের সতর্কতা প্রয়োজন |
| 101-200 | মাঝারি | ফুসফুস, হৃদরোগ, শিশু এবং বয়স্কদের শ্বাস নিতে অস্বস্তি | সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি |
| 201-300 | খারাপ | দীর্ঘস্থায়ী এক্সপোজারে শ্বাস নিতে অসুবিধা | তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি |
| 301-400 | অত্যন্ত খারাপ | দীর্ঘস্থায়ী এক্সপোজারে শ্বাসযন্ত্রের রোগ | নিউমোনিয়া এবং ব্রঙ্কাইটিসের উচ্চ ঝুঁকি |
| 400+ | মারাত্মক | সুস্থ মানুষেরও শ্বাসযন্ত্রে প্রভাব | জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে |
কলকাতার ২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে, জানুয়ারিতে গড় AQI ছিল ১৭০, যা “খারাপ” বিভাগে পড়ে এবং নভেম্বরে এটি ১৫৫ এ পৌঁছেছিল। দুঃখজনকভাবে, ২০২৫ সালে ৩২৭ দিনের মধ্যে 0% দিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ বায়ু গুণমান সীমার মধ্যে ছিল।
বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী
শিশু এবং শিশুকাল
শিশুরা বায়ু দূষণের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল কারণ তাদের শ্বাসনালী এখনও বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে এবং তারা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় তাদের শরীরের ওজনের অনুপাতে বেশি বায়ু শ্বাস নেয়। গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ স্টাডি ২০১৯ অনুসারে, PM এক্সপোজারের কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৬৯১,৩৭৩ জন মারা গেছে, যার ৯১% নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ঘটেছে। দিল্লিতে ১১,৬২৮ শিশুর একটি গবেষণায় ৩২.১% শ্বাসযন্ত্রের উপসর্গের প্রকোপ পাওয়া গেছে, যা গ্রামীণ এলাকার শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। শিশুদের মধ্যে বায়ু দূষণ ফুসফুসের বৃদ্ধি হ্রাস করে এবং পুনরাবৃত্ত শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ঘটায়।
বয়স্ক জনগোষ্ঠী
৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষদের বায়ু দূষণজনিত শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল থাকে এবং প্রায়শই তাদের অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে। উচ্চ মাত্রার বায়ু দূষণের সংস্পর্শে আসা বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে নিম্ন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের জন্য হাসপাতালে ভর্তির হার তরুণদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। বিশেষত যাদের হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস বা পূর্ববর্তী হৃদরোগ রয়েছে তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
পূর্ববর্তী শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
যাদের ইতিমধ্যে হাঁপানি, COPD, বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ রয়েছে তারা বায়ু দূষণের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই রোগীদের শ্বাসনালী ইতিমধ্যে প্রদাহগ্রস্ত এবং দুর্বল, তাই দূষিত বায়ু তাদের অবস্থা দ্রুত খারাপ করতে পারে। হাঁপানি রোগীদের ক্ষেত্রে, PM2.5-এর প্রতি ১ μg/m³ বৃদ্ধি হাঁপানি বিকাশের ঝুঁকি ৩% বৃদ্ধি করে। এই জনগোষ্ঠীর জন্য এমনকি স্বল্পমেয়াদী উচ্চ দূষণের সংস্পর্শও গুরুতর সংক্রমণ এবং হাসপাতালে ভর্তির কারণ হতে পারে।
বায়ু দূষণের উৎস এবং নিয়ন্ত্রণ
প্রধান উৎস
ভারতে বায়ু দূষণের প্রধান উৎসগুলির মধ্যে রয়েছে যানবাহনের নির্গমন, শিল্প কারখানার ধোঁয়া, নির্মাণ কাজ, কৃষি অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং ঘরোয়া রান্নার জ্বালানি। বায়োমাস জ্বালানির ব্যবহার বিশেষভাবে ক্ষতিকর কারণ এটি উচ্চ মাত্রার PM2.5 এবং CO নির্গমন করে। শহরাঞ্চলে যানবাহনের ঘনত্ব বৃদ্ধি NO2 এবং PM10 স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে। ভারতে PM10 গড় ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা (১৫ μg/m³) এবং ভারতের জাতীয় পরিবেষ্ট বায়ু গুণমান মান (৬০ μg/m³) উভয়কেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অতিক্রম করে।
সরকারি পদক্ষেপ
ভারত সরকার জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি চালু করেছে যার লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে ১২২টি শহরে পার্টিকুলেট ম্যাটার ঘনত্ব ২০% থেকে ৩০% হ্রাস করা, ২০১৭ সালকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরে। পরিবহন ক্ষেত্রে পরিষ্কার জ্বালানির ব্যবহার, শক্তি দক্ষ বাড়ি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উন্নত পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বহিরাগত বায়ু দূষণের প্রধান উৎসগুলি হ্রাস করতে পারে। পরিষ্কার ঘরোয়া শক্তির অ্যাক্সেস কিছু অঞ্চলে পরিবেশগত বায়ু দূষণও ব্যাপকভাবে হ্রাস করবে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা
দৈনন্দিন সতর্কতা
বায়ু দূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিদিন AQI স্তর পরীক্ষা করা অপরিহার্য। যখন AQI 150-এর উপরে থাকে, তখন বাইরের কার্যকলাপ সীমিত করা উচিত এবং বিশেষত সকাল ও সন্ধ্যার সময় যখন দূষণ সর্বোচ্চ থাকে। বাইরে যাওয়ার সময় N95 বা N99 মাস্ক পরিধান করা ক্ষতিকারক কণা থেকে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা প্রদান করে। বাড়ির জানালা বন্ধ রাখা এবং এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা অভ্যন্তরীণ বায়ু গুণমান উন্নত করতে পারে।
স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং শ্বাসযন্ত্রের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ বায়ু দূষণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। যদি কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা ঘন ঘন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ দেখা দেয় তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন নেওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত যা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন
স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার যেমন ফল, সবজি এবং গ্রিন টি শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবেলায় সাহায্য করে। পর্যাপ্ত পানি পান করা শ্বাসনালীর মিউকাস মেমব্রেনকে আর্দ্র রাখে এবং দূষণকারী পদার্থ অপসারণে সহায়তা করে। যোগব্যায়াম এবং প্রাণায়াম ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং শ্বাসনালীর কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বায়ু দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ভারতের নতুন বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সমর-২ এর পরীক্ষা শুরু হচ্ছে ডিসেম্বরে
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণা
বায়ু দূষণ এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মধ্যে সম্পর্কের উপর ক্রমাগত গবেষণা নতুন অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি দেখিয়েছে যে বায়ু দূষণ শুধুমাত্র শারীরিক স্বাস্থ্যই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলে এবং নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ সালে নতুন বায়ু গুণমান নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে যা আরও কঠোর মান নির্ধারণ করে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ এখন রিয়েল-টাইম বায়ু গুণমান পর্যবেক্ষণ সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করছে এবং জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালু করছে।
State of Global Air 2024 রিপোর্ট অনুসারে, শিশুদের মধ্যে বায়ু দূষণ সম্পর্কিত রোগের বোঝা ২০১০ সাল থেকে ৩৫% হ্রাস পেয়েছে, মূলত ঘরোয়া বায়ু দূষণ (HAP) হ্রাসের কারণে। এটি একটি উত্সাহজনক লক্ষণ যে সঠিক পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব। ভবিষ্যতে পরিষ্কার শক্তি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং টেকসই নগর পরিকল্পনা বায়ু দূষণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বায়ু দূষণ এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং উদ্বেগজনক, যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন এবং স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে বায়ু দূষণের কারণে ৪২ লক্ষ অকাল মৃত্যু ঘটেছে এবং এর মধ্যে ১৪% ছিল শ্বাসনালীর তীব্র সংক্রমণের কারণে। ভারতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর, যেখানে PM2.5 স্তর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১০ গুণ বেশি এবং এটি বার্ষিক ১৫ লক্ষ মৃত্যুর সাথে যুক্ত। বায়ু দূষণ শ্বাসনালীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে, ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা হ্রাস করে এবং রোগজীবাণুদের বৃদ্ধি সহজতর করে, যা শিশু, বয়স্ক এবং পূর্ববর্তী শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সরকারি পদক্ষেপ, ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব। পরিষ্কার বায়ু শুধুমাত্র একটি পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, এটি একটি মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার যা আমাদের প্রত্যেককে রক্ষা করতে হবে।











