আমাজনের জ্বলন্ত রহস্য: ফুটন্ত নদী ও মাটির তলার অদৃশ্য স্রোত

আমাজন রেইনফরেস্ট শুধুমাত্র পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন নয়, এটি এমন এক রহস্যময় ভূখণ্ড যেখানে প্রকৃতি তার সবচেয়ে চরম রূপে আবির্ভূত হয়। পেরুর গহীন অরণ্যে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য নদী যার পানি…

Riddhi Datta

 

আমাজন রেইনফরেস্ট শুধুমাত্র পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন নয়, এটি এমন এক রহস্যময় ভূখণ্ড যেখানে প্রকৃতি তার সবচেয়ে চরম রূপে আবির্ভূত হয়। পেরুর গহীন অরণ্যে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য নদী যার পানি প্রায় ফুটন্ত তাপমাত্রায় পৌঁছায়, আর তার ৪ কিলোমিটার নিচে বয়ে চলেছে এক নীরব ভূগর্ভস্থ নদী যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। এই দুই নদী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি এখনো অনেক রহস্য লুকিয়ে রেখেছে, যা বিজ্ঞান ও আদিবাসী জ্ঞান উভয়ের মাধ্যমেই আবিষ্কৃত হচ্ছে।

শানায়-তিম্পিশকা: সূর্যের তাপে সিদ্ধ নদী

অবিশ্বাস্য তাপমাত্রার রেকর্ড

শানায়-তিম্পিশকা নদী পেরুর হুয়ানুকো রাজ্যের পুয়ের্তো ইনকা প্রদেশে অবস্থিত এবং এটি পৃথিবীর বৃহত্তম নথিভুক্ত তাপীয় নদীগুলোর মধ্যে একটি। নদীটির সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ কিলোমিটার, তবে এর মধ্যে মাত্র নিচের ৬.৩ কিলোমিটার তাপীয় প্রকৃতির। নদীটির গভীরতম স্থান প্রায় ৪.৫ মিটার এবং প্রস্থে সর্বোচ্চ ৩০ মিটার পর্যন্ত হয়।

বৈজ্ঞানিক পরিমাপ অনুযায়ী, নদীটির সবচেয়ে উত্তপ্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস একটি উষ্ণ প্রস্রবণে, যখন নদীর গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তুলনামূলকভাবে, নদীর উৎসস্থলে তাপমাত্রা সাধারণ জঙ্গল স্রোতের মতো প্রায় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে যে পানির তাপমাত্রা সাধারণত ৮০ থেকে ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, যা যেকোনো প্রাণীর জন্য মারাত্মক।

আগ্নেয়গিরিহীন তাপের উৎস

এই নদীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো এর আশেপাশে কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি নেই। প্রকৃতপক্ষে, নিকটতম আগ্নেয়গিরি বা টেকটোনিক সীমানা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী আন্দ্রেস রুজো, যিনি ২০১১ সালে এই নদীকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সমাজের কাছে পরিচিত করান, ব্যাখ্যা করেন যে এই তাপের উৎস হলো পৃথিবীর ভূতাপীয় গ্রেডিয়েন্ট।

বৃষ্টির পানি আমাজন রেইনফরেস্টের মাটিতে পড়ে এবং গভীর ভূতাত্ত্বিক ফাটল দিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার নিচে নেমে যায়। পৃথিবীর ম্যান্টলের কাছাকাছি পৌঁছে এই পানি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর প্রাকৃতিক ফল্ট লাইন বেয়ে এই উত্তপ্ত পানি আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে এবং নদীর পানি উত্তপ্ত করে তোলে।

আদিবাসী বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

আশানিনকা আদিবাসীদের ভাষায় “শানায়-তিম্পিশকা” শব্দের অর্থ “সূর্যের তাপে সিদ্ধ”। স্থানীয় শামানরা বিশ্বাস করেন যে এই ফুটন্ত পানির জন্ম দেয় ইয়াকুমামা, একটি বিশাল সর্প আত্মা যা “জলের মা” নামে পরিচিত। আদিবাসীরা এই নদীর পানি দিয়ে ভেষজ চা বানায়, রান্না করে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠান পালন করে।

মায়ানতুয়াকু, সান্তুয়ারিও হুইশতিন এবং শানায়-তিম্পিশকা সেন্টার—এই তিনটি সম্প্রদায় নদীটির তীরে অবস্থিত এবং এদের জীবনযাত্রা এই রহস্যময় নদীর সাথে গভীরভাবে জড়িত।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার

উত্তপ্ত বনের গবেষণা

২০২৫ সালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, শানায়-তিম্পিশকার আশেপাশের বন পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অফ মিয়ামি এবং পেরুর বিজ্ঞানীদের একটি দল ২০২২ সাল থেকে এখানে গবেষণা পরিচালনা করছেন। তারা নদীর তীর বরাবর ৭০টি ছোট প্লট স্থাপন করেন যেখানে গড় বায়ু তাপমাত্রা ২৪.০ থেকে ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে পরিবর্তিত হয়।

গবেষণায় মোট ৬০০টিরও বেশি গাছ পরিমাপ করা হয় যা প্রায় ২০০টি বিভিন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। ফলাফলগুলি চমকপ্রদ: প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গাছের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। সবচেয়ে উত্তপ্ত বনে শীতল বনের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কম প্রজাতির গাছ পাওয়া যায়, যদিও এই দুই অঞ্চল মাত্র ২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে শানায়-তিম্পিশকার আশেপাশের উত্তপ্ত পরিবেশ ২১০০ সালের মধ্যে সমগ্র আমাজনের জলবায়ু অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। এই “জীবন্ত পরীক্ষাগার” গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনের জীববৈচিত্র্যের উপর কী প্রভাব ফেলবে। উচ্চ তাপমাত্রায় শুধুমাত্র তাপসহিষ্ণু প্রজাতিগুলি টিকে থাকতে পারে, যা বনের সামগ্রিক কার্বন শোষণ ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।

হামজা নদী: পৃথিবীর নিচের নীরব স্রোত

আবিষ্কার ও বৈশিষ্ট্য

২০১১ সালে ব্রাজিলিয়ান বিজ্ঞানী ভালিয়া হামজা এবং এলিজাবেথ তাভারেস পিমেন্টেল একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেন—আমাজন নদীর প্রায় ৪ কিলোমিটার নিচে বয়ে চলে আরেকটি বিশাল নদী। এই ভূগর্ভস্থ নদীকে হামজা নদী নামকরণ করা হয়, যা গবেষণা দলের প্রধান বিজ্ঞানীর নামানুসারে।

হামজা নদী এবং আমাজন নদী উভয়েই পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হয় এবং উভয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার। তবে এদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। আমাজন নদীর প্রস্থ ১ থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে পরিবর্তিত হয়, যেখানে হামজা নদীর প্রস্থ ২০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার—প্রায় শত গুণ বেশি।

প্রবাহ ও গতিবেগ

প্রবাহের হারে দুই নদীর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমাজন নদী প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,৩৩,০০০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত করে যার গতিবেগ সেকেন্ডে ৫ মিটার পর্যন্ত। বিপরীতে, হামজা নদীর প্রবাহ হার প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ৩,৯০০ ঘনমিটার এবং এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১ মিলিমিটারেরও কম—হিমবাহের চেয়েও ধীর।

গঠন ও আবিষ্কার পদ্ধতি

বিজ্ঞানীরা ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে পেট্রোব্রাস কোম্পানি কর্তৃক খনন করা ২৪১টি পরিত্যক্ত গভীর কূপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই নদী আবিষ্কার করেন। কূপগুলোর ভিতরের তাপমাত্রার পরিবর্তন পরিমাপ করে একটি গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে তারা এই ভূগর্ভস্থ নদীর অস্তিত্ব পূর্বাভাস দেন।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ২,০০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ প্রায় উল্লম্ব, এরপর এটি দিক পরিবর্তন করে প্রায় অনুভূমিক হয়ে যায়। হামজা নদী অ্যান্ডিজের নিচে আক্রে অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে সোলিমোয়েস, আমাজোনাস এবং মারাজো অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে খোলে।

পোরোরোকা: সমুদ্রের বিপরীত আক্রমণ

পোরোরোকা একটি জোয়ার বোর যা আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আমাজন নদীতে প্রবেশ করে। এই ঘটনাটি তখন ঘটে যখন নতুন চাঁদ এবং পূর্ণিমার সময় মহাসাগরের জোয়ার সবচেয়ে বেশি থাকে। পানি আটলান্টিক থেকে প্রবাহিত হয় এবং আমাজনের প্রবাহের বিপরীতে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

পোরোরোকার ঢেউ ৪ মিটার (১৩ ফুট) পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এবং নদীর উজানে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করে। এই ঘটনা মারাজো এবং কাভিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ থেকে এবং পারা রাজ্যের বিভিন্ন নদীতে পর্যবেক্ষণ করা যায়। বিষুবরেখার সময়ে, সেপ্টেম্বর এবং মার্চ মাসে, এই ঘটনা সবচেয়ে তীব্র হয়।

সার্ফারদের জন্য এটি রোমাঞ্চকর হলেও স্থানীয় পরিবেশের জন্য এটি একটি ভয়াবহ শক্তি যা তীর, গাছপালা এবং জীবনযাত্রা ভেঙে দেয়।

আমাজনের পরিসংখ্যান: বিপন্নতার চিত্র

বন উজাড়ের বর্তমান অবস্থা

সময়কাল বন উজাড়ের পরিমাণ প্রধান দেশ শতকরা হার
২০০১-২০২০ ৫৪.২ মিলিয়ন হেক্টর ব্রাজিল ৬২% ৯% বন হারিয়েছে
২০২৪ ১.৭ মিলিয়ন হেক্টর ব্রাজিল ৫৪.৭%, বলিভিয়া ২৭.৩% ২০২৩ থেকে ৩৪% বৃদ্ধি
জানুয়ারি ২০২৫ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৬৮% বৃদ্ধি মাতো গ্রোসো ৪৫% উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

২০২৪ সালে আমাজনে প্রাথমিক বন ধ্বংস ২০০২ সালের পর থেকে পঞ্চম সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ১.৭ মিলিয়ন হেক্টর বন উজাড় হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। ব্রাজিলিয়ান আমাজনে ৯,৫৪,১২৬ হেক্টর প্রাথমিক বন ধ্বংস হয়েছে, যা ২০২৩ থেকে ১৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি।

বলিভিয়ান আমাজন রেকর্ড ভেঙে ২০২৪ সালে ৪,৭৬,০৩০ হেক্টর বন হারিয়েছে, যা ২০২২ সালের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ রেকর্ডের দ্বিগুণ। পেরুভিয়ান আমাজনে ১,৪১,৭৮১ হেক্টর এবং কলম্বিয়ান আমাজনে ৮১,৩৯৬ হেক্টর বন উজাড় হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বন উজাড় ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে পূর্ববর্তী বছরের একই মাসের তুলনায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে ২০২৫ সালে প্রায় ৬,৫৩১ বর্গ কিলোমিটার বন ঝুঁকিতে রয়েছে।

জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব

আমাজন রেইনফরেস্ট পৃথিবীর জ্ঞাত প্রজাতির প্রায় ১৩ শতাংশের আবাসস্থল। এটি ৪ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের বাসস্থান, যার মধ্যে ২২ লাখ আদিবাসী জনগণ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন) অনুযায়ী, আমাজন পৃথিবীর ৩০ শতাংশ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।

নিয়মিতভাবে নতুন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। তবে দ্রুত বন ধ্বংসের কারণে অনেক প্রজাতি বিজ্ঞানীদের দ্বারা আবিষ্কৃত বা অধ্যয়নের আগেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

চরমজীবী অণুজীব: ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

আন্দ্রেস রুজো এবং তার দল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সহযোগিতায় শানায়-তিম্পিশকা নদীর ভেতরে এবং আশেপাশে চরমজীবী (এক্সট্রিমোফাইল) অণুজীবের জিনগত ক্রমবিন্যাস করেছেন। এই অণুজীবগুলি অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে সক্ষম, যা থার্মোফিলিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে।

একইভাবে, হামজা নদীর গভীর চাপযুক্ত পরিবেশে এমন অণুজীবের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে যারা চরম পরিস্থিতিতে অভিযোজিত। এই অজানা বাস্তুতন্ত্র ভবিষ্যতে ওষুধ, জৈবপ্রযুক্তি এবং জীবনতত্ত্বে বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে এই চরমজীবীরা একদিন মানবজাতির চিকিৎসা, শক্তি উৎপাদন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

বিজ্ঞান ও আদিবাসী জ্ঞানের মিলন

শানায়-তিম্পিশকা এবং হামজা নদী উভয়ই প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান এবং আদিবাসী জ্ঞান পরস্পর বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। যেখানে বিজ্ঞান ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে, সেখানে আদিবাসী বিশ্বাস প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে।

আশানিনকা আদিবাসীরা হাজার বছর ধরে শানায়-তিম্পিশকাকে পবিত্র মনে করে আসছে এবং এর সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে গভীরতর করতে সাহায্য করছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত রুজোর বই “দ্য বয়লিং রিভার” এই সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণের এক অসাধারণ দলিল।

সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

বন উজাড়ের হুমকি

শানায়-তিম্পিশকা অঞ্চল পেরুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বন উজাড় এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলের প্রায় ৯৯ শতাংশ বন উজাড় স্থানীয় আদিবাসীদের দ্বারা মূল্যবান কাঠ বিক্রি এবং পরবর্তীতে পুড়িয়ে ফেলার ফলে ঘটে। কেবলমাত্র ম্যাপল এনার্জি নামক একটি তেল ও গ্যাস কোম্পানির ছাড়প্রাপ্ত এলাকা সংরক্ষিত রয়েছে, যা পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে চলে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাজন রেইনফরেস্ট একটি টিপিং পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যেখানে এটি বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ এবং কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের ক্ষমতা হারাবে। শানায়-তিম্পিশকার আশেপাশের উদ্ভিদের চাপের প্যাটার্ন ইতিমধ্যে আমাজন অববাহিকার শুষ্ক অঞ্চলগুলিতে দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

২০২৫ সালের আমাজন অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট সতর্ক করেছে যে অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে আমাজন তার সংযোগ এবং বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা হারাবে। এটি শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্যও বিপর্যয়কর হবে।

সংরক্ষণের পথ

আমাজন সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন:

  • কঠোর আইন প্রয়োগ: অবৈধ কাঠ কাটা এবং কৃষি সম্প্রসারণ বন্ধ করতে হবে।

  • আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা: আদিবাসীরা বনের সেরা রক্ষক, তাদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

  • বৈজ্ঞানিক গবেষণা: শানায়-তিম্পিশকা এবং অন্যান্য অনন্য বাস্তুতন্ত্র নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

  • বিকল্প জীবিকা: স্থানীয় জনগণের জন্য বন ধ্বংস ছাড়া আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে।

  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: আমাজন শুধু দক্ষিণ আমেরিকার নয়, পুরো পৃথিবীর সম্পদ।

ব্রাজিল সরকারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, লিগ্যাল আমাজনে বন উজাড় কিছুটা কমেছে—জুলাই ২০২৫ শেষে ১২ মাসে মোট ৫,৭৯৬ বর্গ কিলোমিটার। তবে এই অগ্রগতি অপর্যাপ্ত এবং অসম।

প্রকৃতির বার্তা শোনার সময়

শানায়-তিম্পিশকা, হামজা নদী এবং পোরোরোকা—এই তিনটি প্রাকৃতিক বিস্ময় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি এখনো মানুষের জ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং শক্তিশালী। একটি নদী যার পানি ফুটে ওঠে কিন্তু কোনো আগ্নেয়গিরি নেই, একটি নদী যা বয়ে চলে কিন্তু দেখা যায় না, এবং একটি ঢেউ যা নদীর স্রোতকে উল্টে দেয়—এগুলি শুধু ভৌগোলিক ঘটনা নয়, প্রকৃতির কাব্য। এই রহস্যগুলো আমাদের শেখায় যে বিজ্ঞান এবং আদিবাসী জ্ঞান একসাথে কাজ করলে আমরা প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমাজন শুধু একটি বন নয়, এটি পৃথিবীর স্মৃতি, জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার এবং মানব সভ্যতার এক প্রাচীন সাক্ষী। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি এই রহস্যগুলোকে বোঝার এবং সংরক্ষণ করার আগে ধ্বংস করে ফেলবো, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাবো? আমাজন আজও কথা বলছে—আগুনে, নীরবতায়, ছায়ার স্রোতে। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই বার্তা শোনা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা, যাতে আমাদের সন্তানরাও এই অসাধারণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য অনুভব করতে পারে।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন