আইফোনের সেই আইকনিক লাল রঙটি কোথায় গেল? অ্যাপল কেন আর RED মডেল বানাচ্ছে না?

অ্যাপলের সর্বশেষ আইফোন লাইনআপে একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ রঙের অনুপস্থিতি প্রযুক্তি বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আইফোন ১৭ এবং আইফোন ১৬ সিরিজের ঘোষণায় যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, অ্যাপলের…

Soumya Chatterjee

 

অ্যাপলের সর্বশেষ আইফোন লাইনআপে একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ রঙের অনুপস্থিতি প্রযুক্তি বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আইফোন ১৭ এবং আইফোন ১৬ সিরিজের ঘোষণায় যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, অ্যাপলের সেই আইকনিক, উজ্জ্বল (PRODUCT)RED বা লাল রঙের মডেলটি আর থাকছে না। এটি কেবল একটি রঙের বিকল্প বাদ যাওয়া নয়; এটি প্রায় দুই দশকের একটি মানবিক উদ্যোগের সমাপ্তিকেও নির্দেশ করে। ২০০৬ সাল থেকে, এই লাল রঙের ডিভাইসগুলি কেবল স্টাইলের প্রতীক ছিল না, এটি ছিল গ্লোবাল ফান্ডের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অ্যাপল কেন হঠাৎ এই দীর্ঘস্থায়ী এবং সফল পার্টনারশিপ থেকে সরে দাঁড়ালো? এই প্রবন্ধে আমরা (PRODUCT)RED-এর সম্পূর্ণ ইতিহাস, এর অবিশ্বাস্য প্রভাব এবং এই নীরব প্রস্থানের পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবো।

(PRODUCT)RED-এর জন্ম: এটি কেবল একটি রঙ ছিল না

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা লেটেস্ট টেকনোলজি ট্রেন্ড নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে প্রযুক্তি কীভাবে সরাসরি মানবিক সাহায্যে ব্যবহৃত হতে পারে। (PRODUCT)RED ছিল ঠিক তেমনই এক উদ্যোগ।

২০০৬-এর সূচনা: বোনো এবং ববি শ্রাইভারের উদ্যোগ

(PRODUCT)RED উদ্যোগটি ২০০৬ সালে U2 ব্যান্ডের প্রধান গায়ক বোনো (Bono) এবং অ্যাক্টিভিস্ট ববি শ্রাইভার (Bobby Shriver) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ব্র্যান্ডগুলির শক্তিকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করা: আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলে HIV/AIDS মহামারী।

এই মডেলটি ছিল বিপ্লবী। ভোক্তারা যখন (PRODUCT)RED-চিহ্নিত পণ্য কিনতেন, তখন সেই পণ্যের মূল্যের একটি অংশ সরাসরি দ্য গ্লোবাল ফান্ড (The Global Fund)-এ চলে যেত। এটি গ্রাহকদের তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটার মাধ্যমে একটি বিশাল বৈশ্বিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। (RED)-এর মতে, তাদের এই উদ্যোগের পেছনের মূল ধারণাটি ছিল “জরুরী” অবস্থাকে বোঝানো, আর লাল হলো সেই জরুরী অবস্থার রঙ।

আইফোন ১৭ এয়ার: অ্যাপলের সবচেয়ে পাতলা স্মার্টফোন আসছে!

অ্যাপলের প্রথম পদক্ষেপ: একটি লাল iPod Nano

অ্যাপল ছিল (RED)-এর প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম। ২০০৬ সালের অক্টোবরে, স্টিভ জবস (PRODUCT)RED iPod Nano স্পেশাল এডিশন উন্মোচন করেন। এটি ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ। সেই সময়ে, অ্যাপলের পণ্যগুলি মূলত সাদা, কালো বা সিলভার রঙে সীমাবদ্ধ ছিল। এই উজ্জ্বল লাল আইপডটি কেবল দেখতেই সুন্দর ছিল না, এটি একটি শক্তিশালী বার্তাও বহন করতো।

অ্যাপলের অফিসিয়াল নিউজ রুমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি লাল আইপড ন্যানো বিক্রির জন্য ১০ ডলার সরাসরি গ্লোবাল ফান্ডে দান করা হতো। এটি ছিল শুরু। পরবর্তী বছরগুলিতে, অ্যাপল এই উদ্যোগকে প্রসারিত করে—লাল আইপড শাফেল, আইপড টাচ, আইপ্যাড কেস, অ্যাপল ওয়াচ ব্যান্ড এবং অবশেষে, আইফোন।

আইফোন ৭: গেম চেঞ্জার

২০১৭ সালে আইফোন ৭ এবং ৭ প্লাসের মাধ্যমে (PRODUCT)RED প্রথম অ্যাপলের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনে আসে। এটি পার্টনারশিপটিকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে যায়। আইফোন হলো বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত স্মার্টফোনগুলির মধ্যে অন্যতম। যখন কেউ একটি লাল আইফোন কিনতেন, তারা কেবল একটি ফোন কিনতেন না, তারা HIV/AIDS-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরাসরি অবদান রাখছিলেন।

এই মডেলটি অবিশ্বাস্যভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল এবং পরবর্তী প্রতিটি আইফোন জেনারেশনে—আইফোন ৮, আইফোন XR (যা বেস্টসেলার ছিল), আইফোন ১১, ১২, ১৩, ১৪ এবং এমনকি আইফোন ১৫ সিরিজেও—(PRODUCT)RED একটি প্রধান রঙের বিকল্প হিসেবে থেকেছে।

কেন এই লাল রঙটি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

এই লাল রঙটির গুরুত্ব তার নান্দনিক সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এটি ছিল অ্যাপলের সামাজিক সচেতনতা এবং কর্পোরেট দায়বদ্ধতার অন্যতম প্রধান প্রতীক।

HIV/AIDS-এর বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই

(PRODUCT)RED থেকে সংগৃহীত অর্থ মূলত সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলিতে যেত, যেখানে HIV/AIDS-এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে মারাত্মক। এই তহবিলগুলি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হতো:

  1. জীবন রক্ষাকারী ওষুধ (ARV): অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (ARV) থেরাপি সরবরাহ করা, যা HIV পজিটিভ ব্যক্তিদের একটি দীর্ঘ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে সহায়তা করে।
  2. প্রতিরোধ ও পরীক্ষা: কমিউনিটি স্তরে HIV পরীক্ষা, কাউন্সেলিং এবং প্রতিরোধমূলক শিক্ষা প্রদান করা।
  3. মা থেকে সন্তানে সংক্রমণ রোধ: গর্ভবতী মায়েদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা যাতে তাদের সন্তানরা HIV-মুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে।

দ্য গ্লোবাল ফান্ড-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই উদ্যোগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা সম্ভব হয়েছে এবং মা থেকে সন্তানে ভাইরাস সংক্রমণের হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

COVID-19 মহামারীতে তহবিলের দ্রুত স্থানান্তর

২০২০ সালে যখন COVID-19 মহামারী বিশ্বজুড়ে আঘাত হানে, তখন (PRODUCT)RED এবং অ্যাপল দ্রুত তাদের ফোকাস সামঞ্জস্য করে। তারা ঘোষণা করে যে (PRODUCT)RED পণ্য বিক্রি থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ গ্লোবাল ফান্ডের COVID-19 রেসপন্স মেকানিজমে পাঠানো হবে।

এই অর্থ মহামারীর কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলির স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম (যেমন অক্সিজেন এবং পিপিই) সরবরাহ করতে এবং ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে এই পার্টনারশিপটি কেবল একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের জন্য কাজ করেনি, এটি বৈশ্বিক জরুরী পরিস্থিতিতেও দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম ছিল।

অ্যাপলের অবদান: পরিসংখ্যান কী বলে?

এই পার্টনারশিপের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য আমাদের কেবল সংখ্যার দিকে তাকাতে হবে।

অ্যাপল হলো (RED) উদ্যোগের বৃহত্তম কর্পোরেট অংশীদার। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপল নিউজ রুম-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, অ্যাপল তার গ্রাহকদের সহায়তায় (PRODUCT)RED-এর মাধ্যমে গ্লোবাল ফান্ডের জন্য ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি সংগ্রহ করেছে।

তবে, এই পরিসংখ্যানটি কেবল অ্যাপলের অবদান। (RED) সংস্থাটি নিজে জানিয়েছে যে (জানুয়ারি ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী) তারা প্রতিষ্ঠার পর থেকে সমস্ত অংশীদারদের মাধ্যমে গ্লোবাল ফান্ডের জন্য ৭৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে। দ্য গ্লোবাল ফান্ডের তথ্যমতে, এই তহবিলের মাধ্যমে ২৯০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো অবিশ্বাস্য। এটি দেখায় যে কীভাবে একটি একক রঙের পণ্য লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনে সরাসরি পরিবর্তন আনতে পারে।

সারণী: অ্যাপলের (PRODUCT)RED যাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

বছর মাইলফলক আনুমানিক অবদান (অ্যাপল)
২০০৬ প্রথম (PRODUCT)RED iPod Nano রিলিজ প্রাথমিক পর্যায়
২০০৭-২০১৬ আইপড, আইপ্যাড কেস, অ্যাপল ওয়াচ ব্যান্ড ১০০ মিলিয়ন ডলার অতিক্রম (২০১৬ নাগাদ)
২০১৭ (PRODUCT)RED iPhone 7 রিলিজ অনুদানের হার তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়
২০২০ COVID-19 রেসপন্সের জন্য তহবিল ডাইভার্ট ২২০ মিলিয়ন ডলার অতিক্রম (২০২০ নাগাদ)
২০২২ পার্টনারশিপের ১৬ বছর উদযাপন ২৭০ মিলিয়ন ডলার অতিক্রম
২০২৪-২০২৫ iPhone 16 এবং 17 লাইনআপ থেকে বাদ পার্টনারশিপের সমাপ্তি (আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই)

তাহলে অ্যাপল কেন লাল আইফোন বানানো বন্ধ করলো?

এটিই এখন প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অ্যাপলের মতো একটি কোম্পানি, যারা তাদের ক্লিন এনার্জি চার্জিং বা পরিবেশগত উদ্যোগ নিয়ে এত সোচ্চার, তারা কেন এমন একটি সফল এবং জীবন রক্ষাকারী মানবিক উদ্যোগ নীরবে বন্ধ করে দিল?

২০২৪ সালের শেষে iPhone 16 এবং বিশেষ করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে iPhone 17 লাইনআপের উন্মোচনের পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়। MacRumors এবং অন্যান্য প্রযুক্তি বিষয়ক সাইটগুলি রিপোর্ট করতে শুরু করে যে অ্যাপলের নতুন ডিভাইসগুলির রঙের তালিকায় (PRODUCT)RED আর নেই। এমনকি সাশ্রয়ী মূল্যের iPhone 16e (SE-এর উত্তরসূরি) যা পূর্বে লালে পাওয়া যেত, তাও এখন কেবল কালো এবং সাদা রঙে সীমাবদ্ধ।

এই নীরব প্রস্থানের পেছনে বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ এবং তত্ত্ব রয়েছে।

সম্ভাব্য কারণ ১: “ব্র্যান্ড ক্লান্তি” (Brand Fatigue)

যেকোনো মার্কেটিং ক্যাম্পেইন, তা যতই মহৎ হোক না কেন, সময়ের সাথে সাথে তার আবেদন হারাতে পারে। প্রায় ১৮ বছর ধরে চলার পর, এটা সম্ভব যে (PRODUCT)RED উদ্যোগটি গ্রাহকদের মধ্যে আগের মতো আর সেই “জরুরী” অনুভূতি তৈরি করতে পারছিল না।

অ্যাপল হয়তো অনুভব করেছে যে গ্রাহকরা এখন এই রঙটিকে কেবল একটি স্ট্যান্ডার্ড রঙের বিকল্প হিসেবে দেখছেন, এর পেছনের মানবিক দিকটি নিয়ে আর ভাবছেন না। যদি তাই হয়, তবে এই পার্টনারশিপের মূল উদ্দেশ্য—সচেতনতা বৃদ্ধি—ব্যর্থ হচ্ছিল।

সম্ভাব্য কারণ ২: ডিজাইন ও নান্দনিকতার পরিবর্তন

অ্যাপল তার ডিজাইন দর্শনের জন্য বিখ্যাত। প্রতিটি নতুন আইফোন সিরিজের সাথে, তারা রঙের প্যালেটে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনে। ২০২৫ সালের iPhone 17 লাইনআপে নতুন রঙ যেমন ‘কসমিক অরেঞ্জ’ (Cosmic Orange) বা ‘সেজ’ (Sage) দেখা গেছে।

ডিজাইন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অ্যাপল হয়তো তাদের পণ্যের নান্দনিকতাকে একটি নতুন দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। (PRODUCT)RED-এর সেই বিশেষ উজ্জ্বল শেডটি হয়তো তাদের নতুন “প্রো” বা “এয়ার” মডেলগুলির পরিশীলিত (sophisticated) চেহারার সাথে খাপ খাচ্ছিল না। অ্যাপল হয়তো একটি ক্লিনার, আরও ইউনিফাইড কালার প্যালেট তৈরি করতে চেয়েছে, যেখানে এই চ্যারিটি-ব্র্যান্ডেড রঙটি বেমানান ছিল।

সম্ভাব্য কারণ ৩: কৌশলগত পরিবর্তন: সরাসরি অনুদান?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। অ্যাপল বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানিগুলির মধ্যে একটি। এটা খুবই সম্ভব যে অ্যাপল (PRODUCT)RED-এর মতো একটি পণ্য-ভিত্তিক (product-based) চ্যারিটি মডেল থেকে সরে এসে সরাসরি অনুদানের (direct philanthropy) মডেলে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হয়তো অ্যাপল এখন গ্লোবাল ফান্ডকে বা অন্যান্য সংস্থাকে সরাসরি একটি বিশাল অঙ্কের থোক অনুদান দিচ্ছে, যা পণ্য বিক্রির উপর নির্ভরশীল নয়। এই পদ্ধতিটি অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং অনুমানযোগ্য। তবে, এর একটি নেতিবাচক দিক রয়েছে: এটি গ্রাহকদের এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার অনুভূতি থেকে বঞ্চিত করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। (PRODUCT)RED-এর সৌন্দর্য ছিল এটি লক্ষ লক্ষ গ্রাহককে এই আন্দোলনের অংশ করে তুলেছিল।

সম্ভাব্য কারণ ৪: ব্যয় সংকোচন বা জটিলতা?

যদিও অ্যাপলের মতো কোম্পানির জন্য এটি সামান্য ব্যাপার, তবুও একটি লাইসেন্সিং চুক্তি সর্বদা জটিলতা এবং অতিরিক্ত খরচ নিয়ে আসে। (RED) ব্র্যান্ডটি ব্যবহারের জন্য অ্যাপলকে একটি নির্দিষ্ট ফি বা রয়্যালটি দিতে হতো (যা সরাসরি ফান্ডে যেত)।

কিছু বিশ্লেষক (যেমন কিছু ইউটিউব চ্যানেলে উল্লিখিত) মনে করেন যে অ্যাপল তাদের সাপ্লাই চেইনকে আরও সহজ করতে চেয়েছে। প্রতিটি অতিরিক্ত রঙ মানে প্রোডাকশন লাইনে অতিরিক্ত জটিলতা। যদিও এটি সবচেয়ে দুর্বল যুক্তি, তবুও কর্পোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একটি ছোট কারণ হতে পারে।

(PRODUCT)RED-এর উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন

অ্যাপলের এই পার্টনারশিপ থেকে সরে আসা (RED) উদ্যোগের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা, কারণ অ্যাপল ছিল তাদের একক বৃহত্তম অবদানকারী। তবে (RED)-এর পার্টনারশিপ অন্যান্য ব্র্যান্ডের সাথেও রয়েছে, যেমন অ্যামাজন, স্টারবাকস এবং বিটস (যা অ্যাপলেরই মালিকানাধীন, যদিও নতুন বিটস প্রোডাক্টে ‘স্টেটমেন্ট রেড’-এর মতো ভিন্ন নাম ব্যবহার করা হচ্ছে)।

অ্যাপলের জন্য, এটি একটি যুগের অবসান। এই লাল আইফোনগুলি কেবল একটি পণ্য ছিল না; এগুলি ছিল “conscious consumerism” বা “সচেতন কেনাকাটা”-এর একটি প্রতীক। এটি প্রমাণ করেছিল যে একটি বাণিজ্যিক পণ্য একই সাথে লাভজনক এবং জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।

গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অনেকেই এই আইকনিক রঙটি চলে যাওয়ায় হতাশ, বিশেষ করে যারা জেনেশুনেই এই মডেলটি কিনতেন চ্যারিটিতে অবদান রাখার জন্য। অন্যদিকে, অনেক সাধারণ গ্রাহক হয়তো এই পরিবর্তনটি লক্ষ্যই করেননি, বা তারা নতুন রঙগুলি নিয়েই বেশি আগ্রহী।

অ্যাপলের নতুন চমক: বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা স্মার্টফোন iPhone 17 Air

একটি রঙের বিদায়, একটি প্রশ্নের জন্ম

অ্যাপল কেন (PRODUCT)RED আইফোন বানানো বন্ধ করলো, তার কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর অ্যাপল বা (RED) কেউই দেয়নি। এই নীরবতা কিছুটা অদ্ভুত, বিশেষ করে এমন একটি পার্টনারশিপের ক্ষেত্রে যা এত প্রকাশ্যে উদযাপন করা হয়েছে এবং যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য উপসংহার হলো, ১৮ বছর পর, অ্যাপল তার জনহিতকর কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা হয়তো পণ্য-ভিত্তিক সচেতনতা থেকে সরে এসে আরও সরাসরি, পর্দার আড়ালের কর্পোরেট অনুদানের দিকে ঝুঁকছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: সেই উজ্জ্বল লাল আইফোনটি কেবল একটি রঙের বিকল্প ছিল না। এটি ছিল একটি আন্দোলন, একটি আশা এবং একটি প্রমাণ যে প্রযুক্তিকে কেবল লাভের জন্য নয়, মানবতার জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাপলের ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডেভেলপারস কনফারেন্স (WWDC)-এর মতো ইভেন্টগুলি যখন ভবিষ্যতের AI এবং সফ্টওয়্যারের উপর ফোকাস করে, তখন এই ধরনের মানবিক উদ্যোগের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে অনুভূত হয়। এই লাল রঙের প্রস্থান অ্যাপলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালো।

About Author
Soumya Chatterjee

সৌম্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং প্রযুক্তি বিষয়ক লেখালিখিতে বিশেষ আগ্রহী। তিনি একজন উদ্যমী লেখক, যিনি প্রযুক্তির জটিল ধারণাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে দক্ষ। তার লেখার মূল ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, গ্যাজেট রিভিউ, সফটওয়্যার গাইড, এবং উদীয়মান টেক প্রবণতা। সৌম্যর প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান এবং অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তাকে পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। টেক জগতে চলমান পরিবর্তনগুলির সাথে তাল মিলিয়ে সৌম্য সর্বদা নতুন ও তথ্যসমৃদ্ধ বিষয়বস্তু নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আরও পড়ুন