কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অভিভাবকত্ব: আপনি কি ‘AI Parenting’-এর জন্য প্রস্তুত?

একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি কাজকর্মেও…

Soumya Chatterjee

 

একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি কাজকর্মেও AI-এর প্রভাব অনস্বীকার্য। এই পরিবর্তনের ঢেউ এসে লেগেছে অভিভাবকত্বের জগতেও, জন্ম নিয়েছে এক নতুন ধারণা— AI Parenting। স্মার্ট বেবি মনিটর থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষায়িত লার্নিং অ্যাপ, এআই-চালিত খেলনা এবং ব্যক্তিগত সহায়ক— এই সবকিছুই আধুনিক অভিভাবকত্বের অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি-চালিত অভিভাবকত্ব আমাদের সন্তানদের জন্য কতটা উপকারী? এর সুবিধাগুলো কি এর সম্ভাব্য ঝুঁকিকে ছাপিয়ে যেতে পারে? আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের শৈশব ও ভবিষ্যৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত?

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বব্যাপী ‘AI in Childcare and Parenting’ বাজারের আকার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ইনসাইটএস অ্যানালিটিক (InsightAce Analytic)-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে তা ৩৫.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা ২২.৪% চক্রবৃদ্ধি হারে (CAGR) বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে ভারত-সহ এশিয়ার দেশগুলিতে এর গ্রহণীয়তা চোখে পড়ার মতো। একটি ফরেস্টার (Forrester) রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৫ সালে ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে ৫৬% প্রাপ্তবয়স্ক জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছেন, যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, AI Parenting এখন আর কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা নয়, বরং এক উদীয়মান বাস্তবতা।

এই প্রবন্ধে আমরা AI Parenting-এর বিভিন্ন দিক, এর সুবিধা-অসুবিধা, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

AI Parenting আসলে কী? প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি

সহজ কথায়, AI Parenting হলো অভিভাবকত্বের সেই পদ্ধতি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত টুলস বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্তানের যত্ন, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং সার্বিক বিকাশে সহায়তা করা হয়। এর পরিসর বেশ বিস্তৃত:

  • স্মার্ট মনিটরিং ডিভাইস: এআই-যুক্ত বেবি মনিটর (যেমন Nanit, Owlet) এখন শুধু শিশুর কান্নার শব্দই শোনায় না, বরং তার ঘুমের ধরন, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার, এমনকি শরীরের তাপমাত্রাও বিশ্লেষণ করে অভিভাবকদের সতর্ক করতে পারে।
  • শিক্ষামূলক অ্যাপ ও খেলনা: বিভিন্ন এআই-ভিত্তিক অ্যাপ (যেমন Duolingo Kids, Khan Academy Kids) শিশুর বয়স ও শেখার ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যক্তিগতকৃত (personalized) পাঠ্যক্রম তৈরি করে দেয়, যা শেখার প্রক্রিয়াকে আরও মজাদার ও কার্যকর করে তোলে।
  • ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট: অ্যামাজন অ্যালেক্সা বা গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো ভার্চুয়াল সহকারীরা শিশুদের ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বা শিক্ষামূলক খেলাধুলায় সাহায্য করতে পারে।
  • সুরক্ষা ও অনলাইন সেফটি টুলস: Bark বা Qustodio-এর মতো অ্যাপগুলি এআই ব্যবহার করে শিশুর অনলাইন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে এবং সাইবারবুলিং, ক্ষতিকারক কন্টেন্ট বা অন্য কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখলে অভিভাবকদের সতর্ক করে।

এই প্রযুক্তিগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো অভিভাবকদের কাজকে সহজ করা এবং সন্তানের বিকাশের জন্য একটি তথ্য-নির্ভর (data-driven) পরিকাঠামো তৈরি করা।

সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান: প্রযুক্তির অগ্রগতি

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, AI Parenting-এর বাজারও তত প্রসারিত হচ্ছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রযুক্তির ধরণ বাজারের আকার (২০২৪) পূর্বাভাস (২০৩৪) মূল ব্যবহার
এআই-যুক্ত শিক্ষামূলক অ্যাপ প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা
এআই-চালিত মনিটরিং ডিভাইস প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা পর্যবেক্ষণ
এআই-যুক্ত খেলনা ও গেমস প্রায় ০.৮ বিলিয়ন ডলার প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধান

উৎস: একাধিক বাজার গবেষণা রিপোর্ট (যেমন InsightAce Analytic, Future Data Stats)

ভারতে, বিশেষত শহরাঞ্চলে, কর্মজীবী বাবা-মায়েরা সময়ের অভাবে এবং সন্তানের জন্য সেরাটা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এই ধরনের প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন। মাইক্রোসফটের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ৬৪% ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের বাড়ির কাজে সহায়তার জন্য জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে, যা অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে এই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিভিন্ন কেস স্টাডি

AI Parenting নিয়ে শিশু মনস্তত্ত্ববিদ, প্রযুক্তিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে।

ইতিবাচক দিক:

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, পরিমিত এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে এআই অভিভাবকদের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-তে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে লার্নিং স্পাইরাল-এর প্রতিষ্ঠাতা মণীশ মোহতা বলেন, “বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের (যেমন ডিসলেক্সিয়া, ADHD) জন্য এআই-ভিত্তিক লার্নিং টুলগুলি গেম-চেঞ্জার হতে পারে।” এই টুলগুলি শিশুর শেখার গতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে এবং ক্রমাগত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

উদ্বেগের দিক:

অন্যদিকে, অনেক বিশেষজ্ঞ এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। শিশু মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, অতিরিক্ত প্রযুক্তি-নির্ভরতা শিশুর সামাজিক এবং আবেগিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। হেলদিচিলড্রেন.অর্গ (HealthyChildren.org)-এর একটি প্রতিবেদনে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP) সতর্ক করেছে যে, শিশুরা যখন মানুষের পরিবর্তে এআই চ্যাটবটের সাথে বেশি কথা বলে, তখন তারা বাস্তব জীবনের সামাজিক আদান-প্রদান এবং সহানুভূতি শিখতে পারে না।

একটি কেস স্টাডি:

ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এক অভিভাবক তাঁর পরিবারের এআই-চালিত একটি খেলনা ‘Grem’-এর সাথে কাটানো এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেন, তাঁর ছোট মেয়ে খুব দ্রুত খেলনাটির প্রতি আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সেটিকে তার ‘সেরা বন্ধু’ হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তিনি তাঁর প্রতিবেদনে লেখেন, “যখন খেলনাটি আমার মেয়েকে বলে ‘আমিও তোমাকে ভালোবাসি’, তখন বিষয়টি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।” এই ঘটনাটি মানুষের সাথে যন্ত্রের আবেগগত সম্পর্ক এবং তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে।

AI Parenting-এর সুবিধা ও অসুবিধা

সুবিধা (Advantages):

  1. ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা (Personalized Learning): এআই শিশুর শেখার ধরন বিশ্লেষণ করে তার জন্য উপযুক্ত শিক্ষাপদ্ধতি তৈরি করতে পারে, যা গতানুগতিক শিক্ষার থেকে অনেক বেশি কার্যকর।
  2. উন্নত সুরক্ষা (Enhanced Safety): স্মার্ট মনিটর এবং অনলাইন সেফটি টুলস শিশুর শারীরিক ও ডিজিটাল সুরক্ষাকে আরও মজবুত করে।
  3. সময়ের সাশ্রয় (Time-Saving for Parents): এআই অনেক রুটিন কাজ (যেমন ঘুমপাড়ানি গান শোনানো, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া) সামলে নিতে পারে, ফলে বাবা-মায়েরা সন্তানের সাথে আরও গুণগত সময় কাটানোর সুযোগ পান।
  4. তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত (Data-Driven Insights): এআই শিশুর ঘুমের প্যাটার্ন, খাদ্যাভ্যাস এবং বিকাশের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিভাবকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

অসুবিধা (Disadvantages):

  1. গোপনীয়তা এবং ডেটা সুরক্ষার ঝুঁকি (Privacy and Data Security Risks): এআই ডিভাইসগুলি শিশুর ব্যক্তিগত এবং সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে। এই ডেটা ফাঁস হলে বা ভুলভাবে ব্যবহৃত হলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
  2. অতিরিক্ত প্রযুক্তি-নির্ভরতা (Over-reliance on Technology): শিশু এবং অভিভাবক উভয়েরই প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা সমস্যা সমাধানের নিজস্ব ক্ষমতা এবং স্বজ্ঞা (intuition) কমিয়ে দিতে পারে।
  3. আবেগিক দূরত্বের সৃষ্টি (Emotional Disconnect): প্রযুক্তির মধ্যস্থতা বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যেকার স্বাভাবিক এবং আবেগপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যন্ত্রের সাথে কথা বলা কখনই মানুষের স্নেহের বিকল্প হতে পারে না।
  4. অ্যালগরিদমিক বায়াস (Algorithmic Bias): এআই সিস্টেমগুলি যে ডেটার উপর ভিত্তি করে শেখে, তাতে যদি কোনো সামাজিক বা লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত থাকে, তবে সেই ভুল ধারণাগুলি শিশুর মনেও গেঁথে যেতে পারে।
  5. সামাজিক দক্ষতার অভাব (Lack of Social Skills): শিশুরা যদি বাস্তব মানুষের চেয়ে ভার্চুয়াল সহকারীদের সাথে বেশি সময় কাটায়, তাহলে তাদের সামাজিক মেলামেশা, সহানুভূতি এবং যোগাযোগের দক্ষতা সঠিকভাবে বিকশিত না হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সমাজ, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার উপর প্রভাব

AI Parenting-এর প্রভাব শুধুমাত্র পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়।

  • সামাজিক প্রভাব: এটি অভিভাবকত্বের সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে। প্রথাগত অভিভাবকত্বের জায়গায় আসছে এক ধরনের ‘ডেটা-ড্রিভেন’ অভিভাবকত্ব। এর ফলে সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য আরও বাড়তে পারে, কারণ উচ্চবিত্ত পরিবারগুলি সহজেই এই দামি প্রযুক্তিগুলি ব্যবহার করতে পারলেও, নিম্নবিত্তদের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
  • অর্থনৈতিক প্রভাব: এটি একটি বিশাল নতুন বাজার তৈরি করছে, যেখানে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি অভিভাবকদের উদ্বেগ এবং আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসছে।
  • জীবনযাত্রার উপর প্রভাব: একদিকে যেমন এটি আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে, তেমনই অন্যদিকে এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলে, যেখানে ডিজিটাল বিভাজন (digital divide) এখনও একটি বড় সমস্যা, সেখানে AI Parenting-এর সুফল সকলের কাছে সমানভাবে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমবঙ্গের ডিজিটাল বিভাজন নিয়ে একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও স্মার্টফোন ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের অভাব রয়েছে, যা এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারে একটি বড় বাধা।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সুপারিশ

AI Parenting-এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তি এবং মানবিকতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষার উপর।

সুপারিশ:

  1. এআই-কে সহযোগী হিসেবে দেখুন, বিকল্প হিসেবে নয়: অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, এআই তাঁদের সাহায্যকারী মাত্র, সন্তানের অভিভাবক নয়। প্রযুক্তিকে মানুষের সম্পর্কের বিকল্প হতে দেওয়া উচিত নয়।
  2. ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি: অভিভাবকদের এআই টুলগুলির কার্যকারিতা, ঝুঁকি এবং গোপনীয়তার নীতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
  3. স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ: নিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন টাইম এবং অফলাইন কার্যকলাপের (যেমন খেলাধুলা, গল্প পড়া, একসাথে সময় কাটানো) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
  4. সরকার ও নীতি নির্ধারকদের ভূমিকা: সরকারকে ডেটা সুরক্ষা আইনকে আরও কঠোর করতে হবে এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য নৈতিক নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে, যাতে শিশুদের ডেটা সুরক্ষিত থাকে।
  5. সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ: শিশুদের শেখাতে হবে যে এআই ভুলও করতে পারে। তাদের মধ্যে প্রশ্ন করার এবং তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ Section)

প্রশ্ন ১: AI Parenting কি শিশুদের জন্য নিরাপদ?

উত্তর: এর নিরাপত্তা নির্ভর করে ব্যবহারের ধরনের উপর। যদি গোপনীয়তা রক্ষা করে, নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে না দেখে একটি সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে এটি নিরাপদ হতে পারে। তবে, ডেটা ফাঁস, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং আবেগিক দূরত্বের মতো ঝুঁকিগুলিও রয়েছে।

প্রশ্ন ২: কোন বয়সের শিশুদের জন্য এআই টুলস ব্যবহার করা উচিত?

উত্তর: আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP) ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য (ভিডিও চ্যাট ছাড়া) স্ক্রিন মিডিয়া ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম বাঞ্ছনীয় নয়। শিক্ষামূলক এবং বয়স-উপযোগী কন্টেন্ট বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা উচিত।

প্রশ্ন ৩: এআই কীভাবে শিশুর সামাজিক বিকাশে প্রভাব ফেলে?

উত্তর: যদি শিশুরা বাস্তব জীবনের খেলাধুলা এবং মানুষের সাথে র পরিবর্তে এআই ডিভাইসের সাথে বেশি সময় কাটায়, তবে তাদের সহানুভূতি, মত বিনিময় এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার মতো সামাজিক দক্ষতা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রশ্ন ৪: আমি কীভাবে আমার সন্তানের ডেটার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারি?

উত্তর: যেকোনো এআই ডিভাইস বা অ্যাপ ব্যবহার করার আগে তার প্রাইভেসি পলিসি বা গোপনীয়তার নীতি ভালোভাবে পড়ুন। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন এবং কোন কোন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে সে সম্পর্কে সচেতন থাকুন। সম্ভব হলে, যে ডিভাইসগুলি কম ডেটা সংগ্রহ করে, সেগুলি বেছে নিন।

প্রশ্ন ৫: AI Parenting কি খুব ব্যয়বহুল?

উত্তর: কিছু উন্নতমানের এআই ডিভাইস (যেমন স্মার্ট বেবি মনিটর) বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে। তবে, অনেক শিক্ষামূলক অ্যাপ বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যেও পাওয়া যায়। খরচের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চান তার উপর।

উপসংহার

নিঃসন্দেহে, AI Parenting আধুনিক অভিভাবকত্বের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এটি অভিভাবকদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়ন করতে পারে এবং সন্তানদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে, মুদ্রার অপর পিঠের মতো এর অন্ধকার দিকও রয়েছে। অতিরিক্ত প্রযুক্তি-নির্ভরতা, গোপনীয়তার ঝুঁকি এবং মানবিক সম্পর্কের অবনতি—এই চ্যালেঞ্জগুলিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

শেষ পর্যন্ত, সাফল্যের চাবিকাঠি হলো ভারসাম্য। প্রযুক্তিকে বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা আমাদের মানবীয় মূল্যবোধ এবং সম্পর্কের জায়গা না নেয়। AI Parenting-এর যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে আমাদের সন্তানরা স্মার্ট ডিভাইসের সাথে বেড়ে উঠলেও, তাদের আবেগ, সহানুভূতি এবং মানবিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সন্তানের শৈশবকে সুরক্ষিত রাখা।

About Author
Soumya Chatterjee

সৌম্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং প্রযুক্তি বিষয়ক লেখালিখিতে বিশেষ আগ্রহী। তিনি একজন উদ্যমী লেখক, যিনি প্রযুক্তির জটিল ধারণাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে দক্ষ। তার লেখার মূল ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, গ্যাজেট রিভিউ, সফটওয়্যার গাইড, এবং উদীয়মান টেক প্রবণতা। সৌম্যর প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান এবং অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তাকে পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। টেক জগতে চলমান পরিবর্তনগুলির সাথে তাল মিলিয়ে সৌম্য সর্বদা নতুন ও তথ্যসমৃদ্ধ বিষয়বস্তু নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।