প্রচণ্ড তেষ্টা পেলেই অনেকেই ধরে নেন ডায়াবেটিস হয়েছে। এই ধারণাটা অর্ধেক সত্য। তেষ্টার পিছনে ডায়াবেটিসের চেয়ে অনেক কম আলোচিত কারণ থাকতে পারে, এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে এই সমস্যাটার আলাদা নাম আছে — পলিডিপসিয়া।
পলিডিপসিয়া মানে শুধু “বেশি জল খাওয়া” নয়। এটা তখন বলা হয় যখন তেষ্টা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা নিজেই স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে। শরীরের জল নিয়ন্ত্রণ করে মূলত ভেসোপ্রেসিন বা অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন, যা মাথার পিছনে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে বেরোয়। এই হরমোন ঠিক কাজ করলে প্রস্রাব ঘন হয় এবং জল শরীরে ধরে রাখা যায়।
এই লেখাটা লেখার আগে আমি বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজের প্রকাশিত তথ্যই পড়েছি — এনআইডিডিকে, এনএইচএস, মায়ো ক্লিনিক, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, মেডলাইনপ্লাস এবং এন্ডোটেক্সট। কারণটা সরল। এই বিষয়ে বাংলায় এবং হিন্দিতে যা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই কনটেন্ট ফার্মের লেখা, যেখানে একই ভুল সংখ্যা ঘুরে ফিরে আসে। নিচে যত সংখ্যা আছে, তার প্রতিটি সূত্র ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজের প্রকাশনা। অনেক বাংলা লেখায় যে সংখ্যাগুলো ঘুরছে, তার সঙ্গে এগুলোর মিল পাইনি।
প্রথমেই দুটো জিনিস পরিষ্কার করা দরকার
প্রথম জিনিস: তেষ্টা আর প্রস্রাব একসঙ্গে দেখা যায় কি না, সেটাই আসল সংকেত। শুধু তেষ্টা, প্রস্রাব স্বাভাবিক — এটা এক ধরনের সমস্যা। তেষ্টার সঙ্গে দিনে অস্বাভাবিক পরিমাণ প্রস্রাব — এটা সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের সমস্যা, এবং এখানেই ডাক্তারি পরীক্ষা লাগে।
দ্বিতীয় জিনিস: “বেশি জল খাওয়া” নিজেই একটা রোগ হতে পারে, এবং সেটাও কম বিপজ্জনক নয়। এন্ডোটেক্সট অনুযায়ী দিনে ৪ লিটারের বেশি প্রস্রাব হলেই বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো উচিত। বয়স্কদের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টায় ৫০ মিলিলিটার প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের বেশি প্রস্রাব হলে সেটাকে পলিইউরিয়া ধরা হয়। অর্থাৎ ৬০ কেজি ওজনের কারও ক্ষেত্রে দিনে ৩ লিটারই সীমার কাছাকাছি।
১. ডায়াবেটিস মেলিটাস — সবচেয়ে পরিচিত কারণ
রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গেলে কিডনি বাড়তি শর্করা বের করে দিতে গিয়ে প্রচুর জল বের করে দেয়। এই জলের ক্ষয়টাই তেষ্টা বাড়ায়। সরাসরি। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এই তিনটি লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দেয় — প্রচণ্ড তেষ্টা, ঘন ঘন প্রস্রাব, এবং অতিরিক্ত খিদে।
কিন্তু এখানেই একটা জরুরি শর্ত আছে। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের শর্করা ঠিক থাকার পরেও যদি প্রস্রাব ও তেষ্টা না কমে, তাহলে অন্য কারণ খোঁজা দরকার। ২০২৫ সালের একটি চিকিৎসা প্রতিবেদনে এমনই এক ৩৮ বছরের মহিলার কথা আছে, যাঁর রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকার পরেও আট মাস ধরে প্রস্রাব ও রাতের তেষ্টা চলছিল। পরে পরীক্ষায় দেখা যায় তাঁর সমস্যা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস।
২. ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস — নাম এক, রোগ আলাদা
এই রোগটাই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়। একেবারে সবচেয়ে। নামের “ডায়াবেটিস” শব্দটা ছাড়া এর সঙ্গে ডায়াবেটিস মেলিটাসের কোনও সম্পর্ক নেই। এখানে রক্তের শর্করা স্বাভাবিক থাকে।
মায়ো ক্লিনিক জানায়, এই রোগে হয় ভেসোপ্রেসিন হরমোন তৈরি কম হয়, অথবা কিডনি ওই হরমোনে সাড়া দেয় না। ফলে প্রস্রাব পাতলা হয়ে বেরিয়ে যায়। এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী গুরুতর অবস্থায় দিনে ২০ লিটার পর্যন্ত প্রস্রাব হতে পারে। এন্ডোটেক্সট বলছে, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাসকে এখন নতুন নাম দেওয়া হয়েছে — ভেসোপ্রেসিন ডেফিসিয়েন্সি এবং ভেসোপ্রেসিন রেজিস্ট্যান্স।
লক্ষণীয় ব্যাপার হল, এই রোগীরা সাধারণত জলশূন্যতায় ভোগেন না। কারণ মস্তিষ্কের তেষ্টা কেন্দ্র তখন একটাই কাজ করে — যতটা জল বেরোচ্ছে, ততটা ফেরাতে হবে। এন্ডোটেক্সট বলছে, রক্তের ঘনত্ব ২৮৫ মিলিওসমোল প্রতি কিলোগ্রাম ছাড়ালেই তেষ্টার সংকেত শুরু হয়।
৩. প্রাইমারি পলিডিপসিয়া — যখন অভ্যাসই রোগ
কিছু মানুষ সত্যিকারের জলের প্রয়োজন না থাকলেও প্রচুর জল খান। কারণ ভিন্ন হতে পারে — স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ভুল ধারণা, মানসিক চাপ, অথবা কোনও মৌলিক মানসিক রোগ। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া দেখা যায় মূলত সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে। ডিপসোজেনিক বা অভ্যাসগত পলিডিপসিয়া দেখা যায় তাঁদের মধ্যে, যাঁরা সচেতনভাবে স্বাস্থ্যের জন্য বেশি জল খান। এনসিআইবি বইয়ের তথ্য অনুযায়ী মানসিক রোগে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে দিনে ৩ লিটারের বেশি জল খাওয়ার প্রবণতা প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়।
এই অংশটাই আমি সবচেয়ে কম জানা পেয়েছি, অথচ এটাই সবচেয়ে জরুরি। কারণ বেশি জল খাওয়া নিরীহ অভ্যাস নয়।
৪. বেশি জল খাওয়া নিজেই বিপজ্জনক হতে পারে
এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ এটি, এবং এটাই আমার সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। কিডনি প্রতি ঘণ্টায় ০.৮ থেকে ১.০ লিটার জলের বেশি বের করতে পারে না। তার চেয়ে দ্রুত জল ঢুকলে রক্ত পাতলা হয়ে যায়, রক্তে সোডিয়াম কমে যায় — এটাকে বলে হাইপোনেট্রেমিয়া।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, রক্ত পাতলা হলে জল কোষের ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং কোষ ফুলে ওঠে। মস্তিষ্কের কোষ ফুললে মাথার ভিতরে চাপ বাড়ে। এনসিআইবির তথ্য অনুযায়ী, লক্ষণ হলো বিভ্রান্তি, আলসেমি, মাথাব্যথা এবং ঘুম ঘুম ভাব।
২০২১ সালের একটি পর্যালোচনায় ৫৯০ জন রোগীর তথ্য দেখা হয়েছে। তাঁদের গড়ে দিনে ৮ লিটার জল খাওয়ার ইতিহাস ছিল এবং রক্তে সোডিয়াম ছিল গড়ে ১১৮ মিলিমোল প্রতি লিটার। এর মধ্যে ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কারণগুলোর ৫৫ শতাংশ ছিল সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া। এটা কোনও ছোটখাটো ঝুঁকি নয়।
৫. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধ শরীর থেকে জল বের করে দেয় বা তেষ্টা বাড়ায়। মেডলাইনপ্লাস অ্যান্টিকোলিনার্জিক, ডাইইউরেটিক, ফেনোথিয়াজিন এবং ডিমিক্লোসাইক্লিন জাতীয় ওষুধের কথা উল্লেখ করে। ডাইইউরেটিক বা মূত্রবর্ধক ওষুধ সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।
এখানে একটা সূক্ষ্ম ফাঁদ আছে। এন্ডোটেক্সট সতর্ক করছে, পরীক্ষার আগে ডাইইউরেটিক, এসজিএলটি-২ ইনহিবিটার, ডেসমোপ্রেসিন, কারবামাজেপিন, ক্লোরপ্রোপামাইড, গ্লুকোকর্টিকয়েড এবং ব্যথানাশক ওষুধ অনেকে বন্ধ করে দেন। এটা নিজে নিজে করার কাজ নয়। আবার থায়াজাইড জাতীয় মূত্রবর্ধক ওষুধ হাইপোনেট্রেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, এবং সেই ঝুঁকি হালকা নয়।
৬. কিডনির রোগ ও রক্তে ক্যালশিয়াম বা পটাশিয়ামের গোলমাল
কিডনির ক্ষতি হলে জলের ভারসাম্য নিজেই নষ্ট হয়। এনএইচএসের পরীক্ষা নির্দেশিকায় প্রস্রাব পরীক্ষার আগে কিডনি রোগ, হাইপারক্যালসেমিয়া, হাইপোক্যালেমিয়া এবং থাইরোটক্সিকোসিস বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রক্তে ক্যালশিয়াম বেড়ে গেলে কিডনি জলের প্রতি কম সাড়া দেয়। এছাড়া গুরুতর সংক্রমণ, জ্বর বা ডায়রিয়ার পরেও তেষ্টা বেড়ে যায়। এনএইচএস সন্তানদের ক্ষেত্রে আলাদা করে বলেছে, বাচ্চার দিনে দশবারের বেশি প্রস্রাব হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৭. গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস
এটা একটা আলাদা ধরনের কারণ, যা সাধারণত জানা থাকে না। গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টার এনজাইম ভেসোপ্রেসিনকে ভেঙে ফেলতে পারে, ফলে ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস দেখা দেয়। এন্ডোটেক্সট এই ধরনটিকে আলাদা শ্রেণিতে রেখেছে।
গর্ভাবস্থায় বেশি প্রস্রাব ও তেষ্টা সাধারণত স্বাভাবিক ধরা হয়, তাই এই কারণটা প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সন্তানসম্ভবা হলে এবং লক্ষণ যদি অস্বাভাবিক লাগে, অবশ্যই চিকিৎসককে জানান।
৮. রাতের তেষ্টা ও বিশেষ কিছু অবস্থা
রাতে বাৎশিল্পের পর তেষ্টা পেলে সেটা বাদ দেওয়ার বিষয় নয়। এন্ডোটেক্সটের নির্ণয় স্কোরে “রাতে ১ লিটারের বেশি জল খাওয়া” কে ৩০ পয়েন্ট দেওয়া হয়েছে — অর্থাৎ এটা একটা বড় সংকেত।
সেই সঙ্গে কিছু বিশেষ অবস্থা মনে রাখা দরকার। ম্যারাথন বা দীর্ঘ শরীরচর্চার সময় অতিরিক্ত জল খাওয়া হাইপোনেট্রেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে যদি ইলেক্ট্রোলাইট ফেরানো না হয়। মেথিলিনডাইঅক্সিমেথামফেটামিন বা এমডিএমএ সেবনের পরও শরীর খিদে ও তেষ্টার সংকেত গুলিয়ে ফেলে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন
মেডলাইনপ্লাস জানাচ্ছে, দিনে ৪.৭৫ লিটারের বেশি প্রস্রাব হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। এনএইচএস বলছে, কারণ ছাড়া সব সময় তেষ্টা পেলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
নিচের যেকোনও একটি লক্ষণ থাকলে অপেক্ষা করা ঠিক হবে না — অস্পষ্ট বা ঝাপসা দৃষ্টি, কারণ ছাড়া ক্লান্তি, সপ্তাহ কয়েক ধরে অব্যাহত তেষ্টা, রাতের ঘুম ভেঙে প্রস্রাব, অথবা শুধু জল খেয়েও তেষ্টা না কমা।
এনআইডিডিকে সতর্ক করেছে, জলশূন্যতা অনেক বাড়লে খিঁচুনি, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা বা অসাড় ভাব দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে।
ঘরে বসে কী দেখবেন
প্রথমে তিনটি বিষয় লিখে রাখুন এক সপ্তাহ। দিনে কতবার প্রস্রাব হচ্ছে, প্রতিবারের পরিমাণ কেমন, এবং প্রস্রাবের রং কেমন। এনসিআইবি পরামর্শ দেয়, ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাবণের হিসাব রাখলে ধারণা অনেক পরিষ্কার হয়।
প্রস্রাব হালকা রং? তাহলে জলশূন্যতা কম। গাঢ় হলুদ? শরীরে জল কম। আর যদি প্রস্রাব প্রায় জলের মতো পরিষ্কার এবং দিনে বহুবার হয়, তাহলে বিপরীত সমস্যা — অর্থাৎ ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বা পলিডিপসিয়া।
রক্তের শর্করা খালি পেটে ১২৬ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার বা তার বেশি এলে বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন। এন্ডোটেক্সটের পরামর্শ অনুযায়ী, রক্তে সোডিয়াম ১৩৫ মিলিমোল প্রতি লিটারের নিচে নামলে সেটা পলিডিপসিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে, আর ১৪৬-এর উপরে গেলে সেটা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাসের দিকে।
শেষে একটা কথা
তেষ্টা শরীরের স্বাভাবিক সংকেত। কারণ ছাড়া টানা তেষ্টা পেলে সেটা ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সংকেত। আর নিজে নিজে জল খাওয়া কমানো বা ওষুধ বন্ধ করা দুটোই বিপজ্জনক। এই লেখাটি শিক্ষামূলক তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের কাছে যান।