পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য সরকার। এখন থেকে জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার পর রেজিস্ট্রেশন (Registration) হলেই মিউটেশনের (Mutation) প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হয়ে যাবে। এর ফলে ক্রেতাদের আর আলাদা করে পুরসভা (Municipality) বা ভূমি দফতরে (BLRO Office) গিয়ে মিউটেশনের জন্য আবেদন করার জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে না। রাজ্য সরকারের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর (Land & Land Reforms Department) এবং নগরোন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক দফতর (Urban Development and Municipal Affairs – UDMA) এর যৌথ উদ্যোগে এই নতুন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের হয়রানি কমানো, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ রাখা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা।এই নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি দুটি ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ করে। গ্রামীণ বা পঞ্চায়েত এলাকার জন্য এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় যা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের অধীন। অন্যদিকে, শহরাঞ্চল বা পুরসভা এলাকার জন্য এই কাজটি হয় UDMA ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব সেন্ট্রালাইজড পোর্টালের মাধ্যমে। উভয় ক্ষেত্রেই, মূল ধারণাটি এক: যখনই কোনও নাগরিক ডিরেক্টরেট অফ রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড স্ট্যাম্প রেভিনিউ (https://wbregistration.gov.in/) এর মাধ্যমে তাঁদের দলিলের ই-নথিকরণ (e-Nathikaran) সম্পন্ন করবেন, সেই তথ্য রিয়েল-টাইমে সরাসরি মিউটেশন সার্ভারে চলে যাবে এবং একটি মিউটেশন কেস নম্বর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যাবে।
স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন (Automatic Mutation) ঠিক কী?
মিউটেশন, যা বাংলায় ‘নামপত্তন’ বা ‘রেকর্ড সংশোধন’ নামে পরিচিত, হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনও জমি বা সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন হলে সরকারি রেকর্ডে সেই পরিবর্তন নথিভুক্ত করা হয়। যখন কেউ একটি জমি বা ফ্ল্যাট কেনেন, তখন কেবল রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিল (Deed) রেজিস্ট্রি করলেই কাজ শেষ হয় না। সেই দলিলের ভিত্তিতে সরকারের ভূমি দফতর বা পুরসভার রেকর্ডে পুরনো মালিকের নাম কেটে নতুন মালিকের নাম তোলা अनिवार्य। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন না হলে, সম্পত্তির ওপর নতুন মালিকের আইনি অধিকার সম্পূর্ণ হয় না এবং তিনি সম্পত্তি কর (Property Tax) জমা দিতে বা ভবিষ্যতে সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
‘স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন’ বা অটো-মিউটেশন হলো এই নামপত্তন প্রক্রিয়ার একটি আধুনিকীকরণ। আগেকার দিনে, জমি রেজিস্ট্রি করার পর ক্রেতাকে দলিলের কপি এবং অন্যান্য নথি নিয়ে আলাদাভাবে বিএলআরও (BLRO) অফিস বা মিউনিসিপ্যালিটিতে গিয়ে মিউটেশনের জন্য আবেদন করতে হতো। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায়, এই আবেদনের প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়।
এর অর্থ এই নয় যে আপনার মিউটেশন কোনও তদন্ত ছাড়াই হয়ে যাবে। ‘স্বয়ংক্রিয়’ শব্দটির অর্থ হলো ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদন জমা পড়া’ (Automatic Application Initiation)। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই আপনার আবেদনটি সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা পড়ে যাবে এবং একটি কেস নম্বর তৈরি হবে, যা আপনাকে SMS বা ইমেলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। এর পরবর্তী তদন্ত বা ভেরিফিকেশনের ধাপগুলি সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা করবেন, কিন্তু আপনাকে আর আবেদন করার জন্য আলাদা করে দফতরে যেতে হবে না।
ফ্ল্যাট-জমি কিনছেন? সাবধান! আসছে জমির রেজিস্ট্রেশন নিয়ে নয়া নিয়ম, না জানলেই বড় বিপদ!
কেন এই নতুন সিস্টেম চালু করার প্রয়োজন হলো?
যেকোনও সরকারি ব্যবস্থার পরিবর্তনের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট কারণ থাকে। স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন চালুর পেছনেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কিছু সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে, যা মূলত নাগরিকদের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার সাথে জড়িত।
পুরনো সিস্টেমের জটিলতা ও হয়রানি
ঐতিহ্যবাহী বা ম্যানুয়াল মিউটেশন প্রক্রিয়ায় একাধিক সমস্যা বিদ্যমান ছিল:
১. দীর্ঘ সময়: আবেদন জমা দেওয়ার পর থেকে মিউটেশন সার্টিফিকেট হাতে পাওয়া পর্যন্ত মাস এমনকি বছরও লেগে যেত।
২. একাধিকবার দফতরে যাওয়া: ফর্ম ফিলাপ, নথি জমা, শুনানির তারিখ (Hearing) এবং সবশেষে সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য বারবার সরকারি দফতরে যেতে হতো, যা কর্মব্যস্ত মানুষের পক্ষে সময়সাপেক্ষ ছিল।
৩. দালালচক্রের প্রভাব: এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা ‘দালাল’ (Middlemen) দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার নাম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করত।
৪. তথ্যের অসঙ্গতি: অনেক সময় আবেদনপত্রে লেখা তথ্যের সাথে দলিলের তথ্যের অমিল হলে আবেদন বাতিল হয়ে যেত এবং পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হতো।
৫. স্বচ্ছতার অভাব: আবেদনকারী জানতে পারতেন না তার ফাইলটি বর্তমানে কোন টেবিলে বা কোন অফিসারের কাছে আটকে আছে।
নতুন সিস্টেমের প্রধান লক্ষ্য
এই সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্যই রাজ্য সরকার এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করেছে। এর প্রধান লক্ষ্যগুলি হলো:
- স্বচ্ছতা (Transparency): সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইন হওয়ায় আবেদনকারী তার আবেদনের স্থিতি (Status) ট্র্যাক করতে পারবেন।
- দ্রুত পরিষেবা (Speed): যেহেতু আবেদনটি রেজিস্ট্রেশনের দিনই জমা পড়ে যাচ্ছে, তাই প্রসেসিং টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সরকারের লক্ষ্য এই সময়সীমা ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে নামিয়ে আনা।
- নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য (Ease of Living): মানুষকে আর মিউটেশনের মতো একটি অপরিহার্য কাজের জন্য সরকারি দফতরের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে না।
- ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ (Ease of Doing Business): পশ্চিমবঙ্গে জমি বা সম্পত্তি কেনা-বেচা সহজ হলে তা বিনিয়োগ এবং রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রকে উৎসাহিত করবে।
কীভাবে কাজ করে এই স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন প্রক্রিয়া?
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের মধ্যে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ইন্টিগ্রেশনের (API Integration) ওপর নির্ভরশীল। আসুন, ধাপে ধাপে বুঝি এটি কীভাবে কাজ করে।
ধাপ ১: ই-নথিকরণ (e-Nathikaran) বা দলিল রেজিস্ট্রেশন
প্রক্রিয়া শুরু হয় সাব-রেজিস্ট্রার (Sub-Registrar) অফিসে। যখন আপনি আপনার জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল রেজিস্ট্রি করতে যান, তখন আপনার সমস্ত তথ্য, যেমন ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, আধার নম্বর, সম্পত্তির বিবরণ (খতিয়ান, প্লট নম্বর, মৌজা), দলিলের মূল্য ইত্যাদি WB Registration পোর্টালে নথিভুক্ত করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই ধাপে আপনার মোবাইল নম্বর এবং ইমেল আইডি সঠিকভাবে প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ আপনার মিউটেশন কেস নম্বর এবং পরবর্তী সমস্ত আপডেট এই নম্বরেই আসবে।
ধাপ ২: তথ্যের স্বয়ংক্রিয় স্থানান্তর (Automatic Data Transfer)
যেই মুহূর্তে সাব-রেজিস্ট্রার আপনার দলিলটি রেজিস্ট্রি (e-Nathikaran সম্পন্ন) করবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে রেজিস্ট্রেশন সার্ভার থেকে একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা বা ডেটা প্যাকেট (Data Packet) দুটি ভিন্ন সার্ভারে চলে যাবে:
১. গ্রামীণ এলাকার জন্য: তথ্য সরাসরি [suspicious link removed] পোর্টালের সার্ভারে চলে যায়, যা সংশ্লিষ্ট বিএলআরও (BLRO) এর লগইনে পৌঁছে যায়।
২. পুরসভা এলাকার জন্য: তথ্য সরাসরি আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মিউনিসিপ্যাল অ্যাফেয়ার্স (UDMA) দফতরের সেন্ট্রাল সার্ভারে চলে যায়, যা সংশ্লিষ্ট পুরসভার (Municipality) কাছে পৌঁছে যায়।
ধাপ ৩: স্বয়ংক্রিয় কেস নম্বর তৈরি
ডেটা সফলভাবে স্থানান্তরিত হওয়ার সাথে সাথেই মিউটেশন সিস্টেমে একটি নতুন কেস (Mutation Case) স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যায়। এই পর্যায়ে, আবেদনকারী অর্থাৎ ক্রেতার রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরে একটি SMS আসে। এই SMS-এ সাধারণত মিউটেশন কেস নম্বর/আবেদন নম্বর উল্লেখ থাকে।
ধাপ ৪: প্রসেসিং এবং ভেরিফিকেশন (স্বয়ংক্রিয় নয়)
এখানেই বুঝতে হবে যে ‘স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন’-এর অর্থ ‘স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন’ নয়। আবেদনটি জমা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট আধিকারিক (মিউনিসিপ্যালিটির অ্যাসেসর বা বিএলআরও) সেই আবেদনটি খতিয়ে দেখেন।
- তারা দলিলের তথ্যের সাথে সরকারি রেকর্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখেন।
- যদি সব তথ্য সঠিক থাকে এবং কোনও অসঙ্গতি (Discrepancy) বা আপত্তি (Objection) না থাকে, তবে তারা মিউটেশন ফি (Mutation Fee) প্রদানের জন্য একটি নোটিশ জারি করেন।
- ফি জমা দেওয়ার পর, আধিকারিক আবেদনটি অনুমোদন করেন।
ধাপ ৫: মিউটেশন সার্টিফিকেট ডাউনলোড
অনুমোদন হয়ে গেলে, আবেদনকারী পুনরায় SMS বা ইমেল পান। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট পোর্টাল (বাংলারভূমি বা UDMA) থেকে ডিজিটালভাবে স্বাক্ষরিত (Digitally Signed) মিউটেশন সার্টিফিকেট বা সংশোধিত পর্চা (ROR) ডাউনলোড করতে পারেন।
পুরসভা এলাকার জন্য স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন (UDMA Portal)
শহরাঞ্চলের নাগরিকদের জন্য এই পরিষেবাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতা (KMC) এবং হাওড়া (HMC) বাদে রাজ্যের বাকি সমস্ত পুরসভাগুলিকে (Municipalities) এবং মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনগুলিকে (Municipal Corporations) একটি একক, সেন্ট্রালাইজড অনলাইন প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনেছে, যা wburbanservices.gov.in নামে পরিচিত।
UDMA ইন্টিগ্রেশন কীভাবে কাজ করে?
ধরুন, আপনি শিলিগুড়ি, আসানসোল, দুর্গাপুর বা উত্তরপাড়ার মতো কোনও পুরসভা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনলেন।
১. রেজিস্ট্রেশনের সময় আপনার ফ্ল্যাটের সম্পূর্ণ ঠিকানা (হোল্ডিং নম্বর সহ) দলিলের মধ্যে সঠিকভাবে উল্লেখ করা থাকে।
২. রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ামাত্র সেই তথ্য UDMA সার্ভারে চলে আসে।
৩. সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে যে এই সম্পত্তিটি কোন পুরসভার অন্তর্গত।
৪. সেই নির্দিষ্ট পুরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের কাছে আপনার মিউটেশন আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যায়।
৫. অফিসার আপনার দলিলের তথ্য এবং পুরসভার রেকর্ডে থাকা হোল্ডিং নম্বরের তথ্য যাচাই করেন।
কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (KMC) এর ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা
কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (KMC) এর নিজস্ব মিউটেশন সিস্টেম অত্যন্ত উন্নত। KMC-এর সিস্টেমও রাজ্য রেজিস্ট্রেশন দফতরের সাথে আংশিকভাবে সংযুক্ত। যদিও KMC-এর ক্ষেত্রে আপনাকে অনেক সময় KMC-এর নিজস্ব পোর্টালের মাধ্যমে কিছু অতিরিক্ত তথ্য বা আবেদন করতে হতে পারে, তবে রেজিস্ট্রেশনের তথ্য সরাসরি KMC সার্ভারে পাঠানোর প্রক্রিয়াও চালু করা হয়েছে। KMC মিউটেশনের জন্য, আপনাকে তাদের অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে ‘Assessment Collection’ বিভাগে নজর রাখতে হবে। KMC-এর ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইন এবং দ্রুত করা। আপনি যদি KMC এলাকায় সম্পত্তি কেনেন, তাহলে কিভাবে KMC প্রপার্টি ট্যাক্স গণনা করবেন সে সম্পর্কে জেনে রাখাও আপনার জন্য উপকারী হতে পারে।
গ্রামীণ বা পঞ্চায়েত এলাকার মিউটেশন (BanglarBhumi Portal)
গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে জমি মূলত কৃষি বা বাস্তু (Homestead) প্রকৃতির, সেখানে মিউটেশনের দায়িত্ব থাকে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের (L&LR Dept.) অধীনস্থ বিএলআরও অফিসগুলির ওপর। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি [suspicious link removed] পোর্টালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বাংলারভূমি ইন্টিগ্রেশন কীভাবে কাজ করে?
১. আপনি যখন গ্রামীণ এলাকায় জমি কেনেন, আপনার দলিলে খতিয়ান নম্বর, প্লট নম্বর (দাগ নম্বর) এবং মৌজার নাম (JL No.) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
২. রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে, এই খতিয়ান ও দাগ নম্বরের ভিত্তিতে তথ্য সরাসরি বাংলারভূমি সার্ভারে চলে যায়।
৩. বাংলারভূমি সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ‘e-Mutation’ কেস তৈরি করে এবং সেটি আপনার এলাকার সংশ্লিষ্ট বিএলআরও (BLRO) কে অ্যাসাইন করে দেয়।
৪. বিএলআরও অফিসের আধিকারিক বা রেভিনিউ ইন্সপেক্টর (RI) সেই দলিলের তথ্য এবং বিদ্যমান রেকর্ডের (ROR – Record of Rights) তথ্য মিলিয়ে দেখেন।
৫. যদি কোনও আপত্তি না থাকে (যেমন, বিক্রেতার নামে জমিটি সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত আছে), তবে তারা শুনানির (Hearing) জন্য একটি তারিখ ধার্য করতে পারেন বা সরাসরি অনুমোদনের দিকে এগোতে পারেন।
এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য, আপনি বাংলারভূমি পোর্টালে কীভাবে জমির তথ্য বা পর্চা দেখবেন সেই নিবন্ধটিও পড়তে পারেন, যা আপনাকে রেকর্ডের স্থিতি পরীক্ষা করতে সাহায্য করবে।
টেবিল: পুরনো বনাম নতুন মিউটেশন সিস্টেম (এক নজরে তুলনা)
এই টেবিলটি আপনাকে দুটি সিস্টেমের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করবে:
| বৈশিষ্ট্য (Feature) | পুরনো ম্যানুয়াল সিস্টেম | নতুন স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম (Automatic System) |
| আবেদন প্রক্রিয়া | ক্রেতাকে দলিলের কপি নিয়ে BLRO/পুরসভায় গিয়ে ফর্ম ফিলাপ করতে হতো। | রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাথেই আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা পড়ে যায়। |
| সময় | অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ (কয়েক মাস থেকে বছর)। | অনেক দ্রুত (লক্ষ্যমাত্রা ৭-৩০ দিন)। |
| স্বচ্ছতা | কম। ফাইলের স্থিতি জানা কঠিন ছিল। | সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। অনলাইন স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং সম্ভব। |
| হয়রানি/দুর্নীতি | বেশি ছিল, দালালচক্রের প্রভাব ছিল। | নগণ্য, কারণ মানবিক হস্তক্ষেপ (Human Intervention) কমে গেছে। |
| নথি জমা | একাধিকবার ফিজিক্যাল কপি জমা দিতে হতো। | বেশিরভাগ তথ্য রেজিস্ট্রেশন থেকেই চলে আসে। প্রয়োজন হলে অনলাইনে আপলোড করা যায়। |
| সরকারি দফতরে যাওয়া | বাধ্যতামূলক ছিল (একাধিকবার)। | বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রয়োজন নেই (শুধুমাত্র জটিল কেসে শুনানির জন্য ডাক পড়তে পারে)। |
Banglarbhumi: বাংলারভূমি পোর্টালে এখন ঘরে বসেই জমির সকল তথ্য খতিয়ান, রেকর্ড নকশা দেখুন এক ক্লিকে
নতুন সিস্টেমে আবেদনকারী হিসেবে আপনার কী কী করণীয়?
যদিও সিস্টেমটি ‘স্বয়ংক্রিয়’, তবুও ক্রেতা হিসেবে আপনার কিছু দায়িত্ব রয়েছে যাতে প্রক্রিয়াটি মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়।
১. রেজিস্ট্রেশনের সময় সতর্কতা
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় নিশ্চিত করুন যে:
- আপনার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা এবং বিশেষ করে মোবাইল নম্বর ও ইমেল আইডি যেন ১০০% নির্ভুলভাবে লেখা হয়।
- সম্পত্তির বিবরণে (খতিয়ান, দাগ, হোল্ডিং নম্বর, মৌজা) যেন কোনও বানান বা সংখ্যার ভুল না থাকে।
- যদি আপনি পশ্চিমবঙ্গের জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগে থেকে জেনে রাখেন, তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
২. SMS এবং ইমেল ট্র্যাক করা
রেজিস্ট্রেশনের পর ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আপনার কাছে মিউটেশন কেস নম্বর সহ একটি SMS আসা উচিত। যদি না আসে, তবে আপনার দলিলের কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট (BLRO বা পুরসভা) দফতরে যোগাযোগ করতে হতে পারে। তবে সাধারণত এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আসে।
৩. অনলাইন ফি প্রদান (Fee Payment)
আপনার আবেদনটি প্রাথমিক যাচাইয়ের পর অনুমোদিত হলে, মিউটেশন ফি জমা দেওয়ার জন্য আপনার কাছে একটি লিঙ্ক বা নোটিফিকেশন আসবে। এই ফি আপনাকে অনলাইনে (GRIPS বা সংশ্লিষ্ট পোর্টালের পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে) জমা দিতে হবে। ফি জমা না দিলে প্রক্রিয়াটি এগোবে না।
৪. শুনানির (Hearing) জন্য প্রস্তুতি
সব ক্ষেত্রে শুনানির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যদি কোনও জটিলতা থাকে, যেমন:
- রেকর্ডে বিক্রেতার নামের সাথে দলিলের নামে অমিল।
- জমির পরিমাণে গরমিল (Deed vs Record)।
- উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে অন্যান্য শরিকদের আপত্তি।
এইসব ক্ষেত্রে আপনাকে নির্দিষ্ট তারিখে অরিজিনাল নথি নিয়ে শুনানির জন্য দফতরে যেতে হতে পারে। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম আপনাকে শুনানির তারিখটিও SMS বা অনলাইনেই জানিয়ে দেবে।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সহজ হল জমি পরিমাপ
এই সিস্টেমের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
কোনও নতুন প্রযুক্তিগত সিস্টেমই প্রথম দিনে নিখুঁত হয় না। এই স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন সিস্টেমেরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
- পুরনো রেকর্ডের ডিজিটাইজেশন: অনেক পুরনো জমির রেকর্ড (CS, RS খতিয়ান) এখনও সম্পূর্ণ ডিজিটাইজড হয়নি বা তাতে অনেক ভুলত্রুটি আছে। এর ফলে দলিলের তথ্যের সাথে রেকর্ডের তথ্য মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
- ডেটা এন্ট্রি ভুল: রেজিস্ট্রেশনের সময় অপারেটরের সামান্য ভুলে (যেমন নামের বানান বা খতিয়ান নম্বর) সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আটকে যেতে পারে।
- জটিল কেস (Complex Cases): উত্তরাধিকার (Inheritance), পার্টিশন ডিড (Partition Deed) বা আদালতের রায়ের (Court Decree) ভিত্তিতে মিউটেশনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া অনেক সময় যথেষ্ট নয়, সেখানে ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন অপরিহার্য।
- নাগরিক সচেতনতা: অনেক মানুষ এখনও এই নতুন সিস্টেম সম্পর্কে অবগত নন। তারা রেজিস্ট্রেশনের পর SMS পেলেও বুঝতে পারেন না যে তাদের মিউটেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
দাগ নাম্বার দিয়ে জমির মালিকানা যাচাই: ঘরে বসে জানুন প্রকৃত মালিকের নাম
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সরকারের লক্ষ্য এই সিস্টেমকে আরও উন্নত করা। ভবিষ্যতে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে দলিলের তথ্য এবং রেকর্ডের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত করবে। লক্ষ্য হলো, একদিন হয়তো রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিউটেশন সার্টিফিকেট হাতে পাওয়া সম্ভব হবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী এবং নাগরিক-বান্ধব পদক্ষেপ। এটি শুধুমাত্র হয়রানি এবং দুর্নীতিই কমাবে না, বরং রাজ্যের সামগ্রিক ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করে তুলবে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, আপনার দায়িত্ব হলো রেজিস্ট্রেশনের সময় সঠিক তথ্য প্রদান করা এবং অনলাইন নোটিফিকেশনগুলির ওপর নজর রাখা। এই নতুন সিস্টেমের হাত ধরে জমি-বাড়ির মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও সহজ এবং সুরক্ষিত হবে, তা বলাই বাহুল্য। আপনার যদি নিজের সম্পত্তির বিবরণ অনলাইনে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়, তবে বাংলারভূমি পোর্টালটি সর্বদা আপনার জন্য উপলব্ধ।











