আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন । ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রপ্রধান । তবে তার এই ক্ষমতাশালী জীবনের শুরুটা মোটেও রাজকীয় বা আভিজাত্যে ঘেরা ছিল না। অভাব-অনটন এবং সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে তার শৈশব কেটেছে। দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তা কেবল একজন ব্যক্তির উত্থানের সাধারণ গল্প নয়, বরং এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পালাবদলের জীবন্ত ইতিহাস । এই প্রতিবেদনে আমরা তার জীবনের প্রতিটি বাঁক, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, আদর্শিক বিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের গভীরে প্রবেশ করে তার উত্থানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরব।
জন্ম এবং শৈশবের কঠিন সংগ্রাম
ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে আরোহণের আগে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। তার শৈশব কেটেছে এমন এক পরিবেশে যেখানে প্রতিদিন দুবেলা খাবার জোগাড় করাটাই ছিল এক বিশাল যুদ্ধ। ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তার পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন যতটা কঠোর ছিল, অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ঠিক ততটাই করুণ। এই চরম দারিদ্র্য তার পরবর্তী জীবনের রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা তাকে সাধারণ মানুষের বা ‘মোস্তাজাফিন’ (নিপীড়িত) এর প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে । এই কঠিন শৈশবই তাকে ভবিষ্যতের একজন অটল এবং আপসহীন নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার রসদ জুগিয়েছিল।
পারিবারিক পটভূমি এবং পিতা-মাতার প্রভাব
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পিতা সাইয়্যেদ জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সাদাসিধে ও মিতব্যয়ী আলেম, যার শিকড় ছিল ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহরে । অন্যদিকে, তার মা খাদিজাহ মিরদামাদি ছিলেন একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ নারী, যিনি পবিত্র কোরআনের হাফেজা ছিলেন এবং বিখ্যাত সাফাভি যুগের পণ্ডিত মীর দামাদের বংশধর ছিলেন । আট ভাইবোনের মধ্যে খামেনি ছিলেন দ্বিতীয় । তার পিতার আয় এতই সামান্য ছিল যে, পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। সাইয়্যেদ জাওয়াদ খামেনি তার সন্তানদের একটি অতি সাধারণ এবং আধ্যাত্মিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করেছিলেন ।
পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস মানুষ: হিটলার থেকে স্টালিন, কারা এই তালিকায় শীর্ষে?
দারিদ্র্যের কষাঘাত এবং জীবনযাপনের কঠিন বাস্তবতা
খামেনি তার স্মৃতিকথায় শৈশবের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেছেন যে, তাদের পুরো পরিবার মাত্র একটি ছোট ঘরে বসবাস করত। ঘরটির আয়তন ছিল মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ বর্গমিটার, যার সাথে যুক্ত ছিল একটি অন্ধকার এবং স্যাঁতসেঁতে বেসমেন্ট । রাতের বেলায় অনেক সময় বাড়িতে খাওয়ার মতো কিছুই থাকত না। এমন পরিস্থিতিতে তার মা কেবল শুকনো রুটি এবং সামান্য কিশমিশ দিয়ে কোনোমতে তাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতেন । যখনই তার পিতার কাছে কোনো অতিথি বা স্থানীয় মানুষ ধর্মীয় পরামর্শের জন্য আসতেন, তখন পরিবারের বাকি সদস্যদের সেই অন্ধকার বেসমেন্টে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো । নতুন পোশাক কেনা তাদের কাছে ছিল এক বিলাসী স্বপ্ন। তার মা প্রায়শই পিতার পুরনো ও জীর্ণ জামাকাপড় কেটে সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক সেলাই করে দিতেন ।
| শৈশবের মূল দিক | বিস্তারিত তথ্যাবলী |
| জন্মতারিখ ও স্থান |
১৯ এপ্রিল ১৯৩৯, মাশহাদ, ইরান |
| পিতা ও মাতা |
সাইয়্যেদ জাওয়াদ খামেনি এবং খাদিজাহ মিরদামাদি |
| বাসস্থানের অবস্থা |
৬৫-৭০ বর্গমিটারের একটিমাত্র ঘর ও একটি অন্ধকার বেসমেন্ট |
| অর্থনৈতিক অবস্থা |
চরম দারিদ্র্য; রাতের খাবারে প্রায়শই কেবল রুটি ও কিশমিশ জুটত |
| পরিবারের সদস্য |
আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় |
শিক্ষাজীবন, সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ
মাত্র চার বছর বয়সে আলী খামেনি তার বড় ভাই সাইয়্যেদ মোহাম্মদের সাথে ঐতিহ্যবাহী মক্তবে বর্ণমালা এবং পবিত্র কোরআন শিখতে শুরু করেন । এরপর তিনি ‘দারুল তালিম দিয়ানাত’ নামক একটি নবগঠিত ইসলামী স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন । শৈশব থেকেই জ্ঞানের প্রতি তার তৃষ্ণা ছিল অপরিসীম। পরিবারের চরম আর্থিক অস্বচ্ছলতা তার এই শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য, কবিতা ও দর্শনের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তাকে সমসাময়িক অন্যান্য আলেমদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছিল।
ধর্মীয় শিক্ষার হাতেখড়ি এবং নাজাফ ও কোম নগরীতে যাত্রা
মাশহাদের ‘সুলাইমান খান’ এবং ‘নাওয়াব’ মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক স্তর শেষ করে ১৯৫৭ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ইরাকের নাজাফে যান । তবে সেখানে বেশিদিন না থেকে পিতার নির্দেশে তিনি ইরানে ফিরে আসেন এবং ১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সালের দিকে শিয়া শিক্ষার মূল কেন্দ্র কোম নগরীতে স্থায়ী হন । কোম নগরীতেই তিনি সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন। সেখানে তিনি গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দি এবং পরবর্তীতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করেন । খোমেনির বৈপ্লবিক চিন্তাধারা এবং ‘বিলায়েত-ই-ফকিহ’ (ইসলামী আইনজ্ঞের শাসন) তত্ত্ব তরুণ খামেনিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করে ।
বিশ্বসাহিত্য পড়া এবং ‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতা লেখা
অবাক করার মতো বিষয় হলো, কঠোর ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের প্রতি খামেনির ছিল প্রবল ঝোঁক। তরুণ বয়সে তিনি ভিক্টর হুগো, লিও টলস্টয়, অনরে ডি বালজাক এবং জঁ-পল সার্ত্রের মতো বিখ্যাত লেখকদের প্রায় এক হাজারেরও বেশি উপন্যাস পড়ে ফেলেছিলেন । ফরাসি লেখক মিশেল জেভাকো এবং আলেকজান্ডার ডুমাসের রোমাঞ্চকর উপন্যাসগুলোও তার প্রিয় তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল । ভিক্টর হুগোর ‘লে মিজারেবলস’ উপন্যাসটিকে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাহিত্যকর্ম বলে আখ্যায়িত করেছিলেন । এই সাহিত্যবোধ তাকে মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং একজন বাগ্মী নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। তরুণ বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় যোগ দিতেন এবং ‘আমিন’ (Amin) ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন । ক্ষমতায় আসার পরও তিনি প্রতি বছর রমজান মাসে কবিদের নিয়ে বিশেষ সভার আয়োজন করতেন, যেখানে কবিরা তাদের নতুন লেখা পাঠ করতেন এবং তিনি সেগুলোর সাহিত্যিক সমালোচনা করতেন ।
| শিক্ষাজীবন ও সাহিত্যবোধ | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী ও তথ্যাবলী |
| প্রাথমিক শিক্ষা |
মক্তব এবং ‘দারুল তালিম দিয়ানাত’ বিদ্যালয় |
| উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা |
মাশহাদ, নাজাফ এবং কোম নগরীর স্বনামধন্য মাদ্রাসা |
| প্রধান মেন্টর |
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দি |
| সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ |
হুগো, টলস্টয়, বালজাক এবং জঁ-পল সার্ত্রের ১০০০+ উপন্যাস অধ্যয়ন |
| কাব্যচর্চা ও ছদ্মনাম |
‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতা রচনা এবং সাহিত্য আড্ডায় নিয়মিত অংশগ্রহণ |
দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: রাজনৈতিক উন্মেষ
খামেনির রাজনৈতিক জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল ১৯৬০-এর দশকে, যখন ইরানের তৎকালীন শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরাচারী শাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বিরুদ্ধে জনরোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তার পেছনে ছিল দীর্ঘ কারাবরণ, অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন এবং নিরলস সাংগঠনিক তৎপরতা । তিনি কেবল একজন তাত্ত্বিক বা ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং রাজপথের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, যিনি সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
শাহ বিরোধী আন্দোলন এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রভাব
তরুণ খামেনির রাজনৈতিক চিন্তাধারায় প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে ফাদাইয়ান-ই-ইসলাম গোষ্ঠীর নেতা সাইয়্যেদ মোজতবা নাওয়াব সাফাভির সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে, যিনি ইরানে একটি ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন । পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে তিনি তার গুরু আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহ বিরোধী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলনে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন । শাহের পশ্চিমা-ঘেঁষা নীতি এবং ইসরায়েলের সাথে সুসম্পর্কের কঠোর সমালোচনা করার কারণে খামেনি দ্রুতই রাজতন্ত্রের রোষানলে পড়েন । তিনি ধীরে ধীরে খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী ও বিশ্বস্ত সেনাপতি হয়ে ওঠেন।
সাভাকের (SAVAK) নির্যাতন এবং ইভিন কারাগারে বন্দিজীবন
আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে শাহের কুখ্যাত গুপ্তচর বাহিনী ‘সাভাক’ (SAVAK) তাকে টার্গেট করে। ১৯৬৩ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত তাকে মোট ছয়বার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল । এই সময়গুলোতে তাকে তেহরানের কুখ্যাত ইভিন (Evin) কারাগারে বন্দি রাখা হয়, যা রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত ছিল । সেখানে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে খামেনি ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের দুর্গম শহর ইরানশাহরে নির্বাসিত হন । কিন্তু নির্বাসন তার বিপ্লবী চেতনাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি।
| বিপ্লবী সংগ্রাম ও কারাবরণ | ঐতিহাসিক তথ্যাবলী |
| আন্দোলনে যোগদান |
১৯৬২ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহ বিরোধী আন্দোলনে প্রবেশ |
| সাভাক (SAVAK) এর নজরদারি |
শাহের গুপ্তচর বাহিনীর হাতে বারবার গ্রেপ্তার ও হয়রানি |
| কারাজীবন |
কুখ্যাত ইভিন কারাগারে বন্দিজীবন এবং অমানুষিক নির্যাতন ভোগ |
| নির্বাসন |
১৯৭৭ সালে সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের ইরানশহরে নির্বাসন |
| রাজনৈতিক প্রেরণা |
নাওয়াব সাফাভি এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির আদর্শিক প্রভাব |
ইসলামী বিপ্লব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ
১৯৭৮ সালের শেষ দিকে ইরানে গণবিক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ নিলে খামেনি নির্বাসন থেকে মাশহাদ ও অন্যান্য শহরে ফিরে আসেন এবং বিক্ষোভকারীদের সংগঠিত করতে শুরু করেন । ১৯৭৯ সালে শাহের পতনের পর তিনি তেহরানে ফিরে আসেন এবং নতুন ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠায় একেবারে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। একটি চরম অভাবগ্রস্ত পরিবার থেকে উঠে এসে এবং রাষ্ট্রীয় নির্যাতন উপেক্ষা করে তিনি নিজেকে নতুন প্রজাতন্ত্রের একজন অপরিহার্য স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন ।
বিপ্লবী পরিষদের সদস্য এবং সামরিক দায়িত্ব
ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরপরই খামেনি নবগঠিত রেভল্যুশনারি কাউন্সিল বা বিপ্লবী পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন । রাজনীতি ও প্রশাসনের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও তার গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি ১৯৮০ সালে অল্প সময়ের জন্য উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নবগঠিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এর তত্ত্বাবধায়ক বা সুপারভাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন । একজন চমৎকার বাগ্মী হিসেবে তিনি তেহরানের জুমার নামাজের ইমামের মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী ধর্মীয় পদেও নিযুক্ত হন, যা তার জনসমর্থন বাড়াতে সাহায্য করে ।
আবুজর মসজিদে গুপ্তহত্যার চেষ্টা এবং ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া
নতুন সরকার গঠনের পর বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সংঘাত চরমে পৌঁছায়। ১৯৮১ সালের ২৭ জুন তেহরানের আবুজর মসজিদে একটি ভাষণ দেওয়ার সময় খামেনি এক ভয়াবহ গুপ্তহত্যার শিকার হন । তিনি যখন যুদ্ধফেরত তরুণদের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করছিলেন, তখন তার সামনে রাখা একটি টেপ রেকর্ডারে লুকানো বোমা বিস্ফোরিত হয় । বোমাটির গায়ে লেখা ছিল “ফোরকান গ্রুপের পক্ষ থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য উপহার” (তবে কোনো কোনো সূত্র মোজাহেদিন-ই-খালক বা MEK-কে দায়ী করে) । এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে তার ডান হাত স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায় এবং তার ভোকাল কর্ড ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । এই ঘটনা তাকে দেশের মানুষের কাছে একজন ‘জীবন্ত শহীদ’ এর মর্যাদা এনে দেয়। এরপর থেকে জনসমক্ষে তিনি সবসময় তার বিকল ডান হাতটি আলখাল্লার নিচে লুকিয়ে রাখতেন, যা তার ইমেজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল ।
| বিপ্লব ও ক্ষমতা গ্রহণ | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও দায়িত্ব |
| প্রাথমিক দায়িত্ব |
বিপ্লবী পরিষদের সদস্য এবং তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম |
| সামরিক ভূমিকা |
উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং IRGC এর সুপারভাইজার |
| হত্যার চেষ্টা |
২৭ জুন ১৯৮১, তেহরানের আবুজর মসজিদে বোমা হামলা |
| শারীরিক ক্ষতি |
ডান হাত চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ভোকাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্ত |
| রাজনৈতিক প্রভাব |
গুপ্তহত্যার শিকার হয়ে জনসমর্থন বৃদ্ধি এবং ‘জীবন্ত শহীদ’ মর্যাদা লাভ |
যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাত
১৯৮১ সালের বোমা হামলার মাত্র দুই মাস পর আগস্ট মাসে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলী রাজাই গুপ্তহত্যার শিকার হন । এই শূন্যতা পূরণের জন্য ১৯৮১ সালের অক্টোবরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এক বিপুল জনসমর্থন নিয়ে (৯৭% ভোট) খামেনি ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন । প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দুই মেয়াদের শাসনকাল (১৯৮১-১৯৮৯) মূলত নির্ধারিত হয়েছিল দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধের মাধ্যমে। এই যুদ্ধ তার কৌশলগত চিন্তাধারাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ পরিচালনা
সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ ছিল তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ । এই সময়ে তিনি নিয়মিত রণাঙ্গন পরিদর্শন করতেন এবং সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় সাধন করতেন । ফ্রন্টলাইনে তার নিয়মিত উপস্থিতি সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়েছিল এবং IRGC এর সাথে তার এমন এক সুসম্পর্ক তৈরি করেছিল যা সারাজীবন অটুট ছিল । আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের প্রতি সমর্থনের কারণে খামেনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভর না করে ইরানকে সামরিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে । প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সফর করে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিস্তারেরও চেষ্টা করেন। জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় ভোজে মদ পরিবেশন এবং নারীদের উপস্থিতি থাকায় তিনি সেই ভোজসভা বর্জন করেছিলেন, যা তার কঠোর ধর্মীয় নীতির পরিচয় দেয় ।
প্রধানমন্ত্রী মীর হোসেইন মুসাভির সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
যুদ্ধের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। তৎকালীন সংবিধানে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী উভয় পদেরই অস্তিত্ব ছিল। খামেনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মিত্র আলী আকবর বেলায়েতিকে চেয়েছিলেন, কিন্তু বামপন্থী-প্রভাবিত পার্লামেন্টের চাপে এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির হস্তক্ষেপে তাকে মীর হোসেইন মুসাভিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হয় । মুসাভির অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি এবং বামপন্থী ঝোঁকের কারণে খামেনির সাথে তার তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় । এই দ্বন্দ্ব ১৯৮৫ সালের পর থেকে আরও চরম আকার ধারণ করে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করেছিল । পরবর্তীতে ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও এই মুসাভিই খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বা সবুজ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ।
| প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনকাল | গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক |
| প্রেসিডেন্ট নির্বাচন |
১৯৮১ সালের অক্টোবরে ৯৭% ভোটে বিপুল জয়লাভ |
| ইরান-ইরাক যুদ্ধ |
রণাঙ্গন পরিদর্শন এবং সামরিক কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা |
| কূটনৈতিক সফর |
সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং আফ্রিকা সফর করে মিত্রতা স্থাপন |
| রাজনৈতিক সংকট |
প্রধানমন্ত্রী মীর হোসেইন মুসাভির সাথে দীর্ঘস্থায়ী মতবিরোধ |
| সামরিক স্বনির্ভরতা |
পশ্চিমা অবরোধের কারণে অভ্যন্তরীণ সামরিক শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ |
১৯৮৯ সালের সংবিধান সংশোধন এবং সুপ্রিম লিডার হিসেবে উত্থান
১৯৮৯ সালের জুন মাসে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বেসর্বা এবং স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু হলে ইরানের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয় । এই সংকটময় মুহূর্তে বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ (Assembly of Experts) আলী খামেনিকে নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত করে । তবে এই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া মোটেও স্বাভাবিক বা মসৃণ ছিল না। এটি ছিল ইরানের সংবিধান এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।
আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার সংকট
খোমেনির মৃত্যুর আগে তার নির্ধারিত উত্তরসূরি ছিলেন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলী মোনতাজেরি। কিন্তু ১৯৮৮ সালে রাজনৈতিক বন্দীদের গণফাঁসির তীব্র সমালোচনা করায় খোমেনি তাকে উত্তরসূরির পদ থেকে বরখাস্ত করেন । এর ফলে খোমেনির মৃত্যুর পর কে ক্ষমতায় আসবেন তা নিয়ে এক তীব্র সংকট তৈরি হয়। তৎকালীন স্পিকার হাশেমি রাফসানজানি এই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং খামেনির নাম প্রস্তাব করেন । কিন্তু প্রধান বাধা ছিল ইরানের সংবিধান, যেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে সুপ্রিম লিডারকে অবশ্যই একজন ‘মারজা’ বা সর্বোচ্চ ধর্মীয় পণ্ডিত হতে হবে । খামেনি তখন ছিলেন কেবল একজন ‘হোজ্জাতোলেসলাম’, যা ধর্মীয় পদমর্যাদায় মারজার চেয়ে বেশ নিচে ।
হোজ্জাতোলেসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে পদোন্নতি
খামেনিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ১৯৮৯ সালে তড়িঘড়ি করে সংবিধানে একটি ঐতিহাসিক সংশোধনী আনা হয়। সংবিধানের ১০৯ নম্বর অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে বলা হয় যে, সর্বোচ্চ নেতার জন্য ‘মারজা’ হওয়া আর বাধ্যতামূলক নয়; বরং ইসলামী বিচারব্যবস্থায় পারদর্শিতা এবং রাজনৈতিক ও ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতাই হবে প্রধান মাপকাঠি । এই সংশোধনীর পর ১৯৮৯ সালের ৪ জুন বিশেষজ্ঞ পরিষদের ৭৪ জন সদস্যের মধ্যে ৬০ জনের ভোটে তিনি সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত হন । রাতারাতি তাকে হোজ্জাতোলেসলাম থেকে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় । এভাবেই অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন।
| ক্ষমতার পালাবদল (১৯৮৯) | সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন |
| খোমেনির মৃত্যু |
১৯৮৯ সালের জুন মাসে রুহুল্লাহ খোমেনির প্রয়াণ |
| উত্তরাধিকার বাতিল |
আয়াতুল্লাহ মোনতাজেরিকে উত্তরসূরির পদ থেকে অপসারণ |
| সংবিধান সংশোধন |
অনুচ্ছেদ ১০৯ পরিবর্তন করে ‘মারজা’ হওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল |
| সুপ্রিম লিডার নির্বাচন |
৪ জুন ১৯৮৯, বিশেষজ্ঞ পরিষদ কর্তৃক ৬০/৭৪ ভোটে নির্বাচিত |
| পদমর্যাদা বৃদ্ধি |
‘হোজ্জাতোলেসলাম’ থেকে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদে রাতারাতি পদোন্নতি |
একচ্ছত্র আধিপত্য, ‘অ্যাক্সিস অফ রেসিস্ট্যান্স’ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
সুপ্রিম লিডার হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর খামেনি অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের সামরিক, বিচারবিভাগীয় এবং গণমাধ্যমের ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত নিয়ন্তা। তার প্রায় চার দশকের শাসনামলে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে যেমন বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রেভল্যুশনারি গার্ড (IRGC) শক্তিশালীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
খামেনির ক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। তিনি এই বাহিনীকে কেবল সামরিক দিক থেকেই নয়, বরং দেশের অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক বিশাল নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত করেন । অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমনে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ থেকে শুরু করে ২০২২ সালের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ—সবকিছুই তিনি কঠোর হাতে দমন করেছেন। এই সময়গুলোতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে ইভিন কারাগারে পাঠানো হয় এবং অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় । ভিন্নমত দমনে তার এই আপসহীন মনোভাব তাকে পশ্চিমাদের কাছে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সংঘাত
বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন, যা তার রাজনৈতিক দর্শনের মূলভিত্তি ছিল। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ‘অ্যাক্সিস অফ রেসিস্ট্যান্স’ (Axis of Resistance) বা প্রতিরোধ বলয় গড়ে তোলেন । লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি এই বলয়টি তৈরি করেন । এর ফলে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে ইয়েমেন এবং গাজার সংঘাতে ইরান একটি প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়। একইসাথে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেশের অর্থনীতিকে চরম খাদের কিনারে ঠেলে দেয় । তবুও তিনি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আপস করার পক্ষপাতী ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতের জের ধরেই ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তিনি নিহত হন ।
| ভূ-রাজনৈতিক নীতি ও প্রভাব | প্রধান পদক্ষেপসমূহ |
| অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ |
IRGC, বিচারব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের ওপর চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা |
| ভিন্নমত দমন |
২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট এবং পরবর্তী বিক্ষোভগুলো কঠোরভাবে দমন |
| প্রতিরোধ বলয় গঠন |
হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি এবং শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ে জোট গঠন |
| পারমাণবিক কর্মসূচি |
পশ্চিমা অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ |
| চূড়ান্ত পরিণতি |
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় নিহত |
ব্যক্তিগত জীবন, স্ত্রী-সন্তান এবং উত্তরাধিকারের প্রশ্ন
পর্দার আড়ালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তার সেই সাধারণ জীবনের ছাপ তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও রয়ে গিয়েছিল বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা দাবি করেন। তার জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবারের সদস্যদের সাধারণ জীবনযাপন নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে ।
স্ত্রী মনসুরেহ এবং সন্তানদের অনাড়ম্বর জীবন
১৯৬৪ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সী মনসুরেহ খোজাসতেহ বাকেরজাদেহের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন খামেনি । মনসুরেহ ছিলেন মাশহাদের একজন সুপরিচিত ব্যবসায়ীর কন্যা। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের বিবাহিত জীবনে মনসুরেহ কখনোই প্রকাশ্যে আসেননি বা কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি, যা অন্যান্য বিশ্বনেতাদের স্ত্রীদের তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম ছিল । এই দম্পতির ছয় সন্তান—চার ছেলে (মোস্তফা, মোজতবা, মাসুদ এবং মেসাম) এবং দুই মেয়ে (বোশরা এবং হোদা) । খামেনির ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তার সন্তানরা সাধারণ ভাড়াবাড়িতে বসবাস করেন এবং সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক পদে অধিষ্ঠিত নন । বড় ছেলে মোস্তফা রাজনীতি থেকে দূরে থেকে কোম নগরীতে ধর্মীয় শিক্ষাদানে যুক্ত ছিলেন । ছেলে মাসুদ খামেনি তার পিতার প্রকাশনা ও আর্কাইভের দায়িত্ব পালন করতেন । তবে খামেনির পরিবারের সবাই যে তার সমর্থক ছিলেন তা নয়। তার একমাত্র জীবিত বোন বদরি খামেনি প্রকাশ্যে তার ভাইয়ের শাসনকে “স্বৈরাচারী খেলাফত” বলে সমালোচনা করেছিলেন এবং তার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা প্যারিসে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন ।
মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সংকট এবং মোজতবা খামেনির প্রভাব
ছেলেদের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান মোজতবা খামেনি রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এবং তাকে দীর্ঘদিন ধরে ভবিষ্যৎ সুপ্রিম লিডার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল । মোজতবা পর্দার আড়ালে থেকে IRGC এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে মনে করা হয় । তবে ইরানের সংবিধানে বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ নেই এবং খামেনি নিজেও নাকি এর বিরোধী ছিলেন বলে কিছু সূত্র দাবি করে । ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার মৃত্যুর পর ইরানের সংবিধানে উল্লেখিত ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠিত হয়, যেখানে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচারবিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন । এরপর নতুন নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদের ওপর ।
| পরিবার ও উত্তরাধিকার | ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক তথ্য |
| স্ত্রী |
মনসুরেহ খোজাসতেহ বাকেরজাদেহ (বিবাহ ১৯৬৪) |
| সন্তানসন্ততি |
৪ ছেলে (মোস্তফা, মোজতবা, মাসুদ, মেসাম) ও ২ মেয়ে (বোশরা, হোদা) |
| মোজতবা খামেনির প্রভাব |
IRGC এবং গোয়েন্দা সংস্থায় পর্দার আড়ালে শক্তিশালী অবস্থান |
| পারিবারিক ভিন্নমত |
বোন বদরি খামেনি কর্তৃক প্রকাশ্য সমালোচনা এবং আত্মীয়দের নির্বাসন |
| অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব |
মৃত্যুর পর সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউন্সিল গঠন |
উপসংহার বা শেষ কথা
আধুনিক ইতিহাসের পাতায় এমন খুব কম নেতাই আছেন যারা একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে একটি দেশের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হতে পেরেছেন। দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তা রাজনৈতিক অধ্যবসায়, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য উদাহরণ। মাশহাদের একটি অন্ধকার ও জীর্ণ বেসমেন্টে যার শৈশব কেটেছে, তিনিই একদিন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন । তার শাসনামলে ইরান যেমন একদিকে ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হয়েছে, তেমনি সামরিক দিক থেকে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে ।
সমালোচকদের চোখে তিনি ছিলেন একজন কঠোর স্বৈরশাসক যিনি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নির্মমভাবে ভিন্নমত দমন করেছেন, আবার সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ইসলামী মূল্যবোধ এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অটল প্রতীক । সাহিত্যপ্রেমী একজন মানুষ যিনি ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন, তিনিই আবার রাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর সামরিক সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হননি । ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তার আকস্মিক মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করলেও, তার রেখে যাওয়া মতাদর্শ এবং তার প্রতিষ্ঠিত ‘প্রতিরোধ বলয়’ আগামী বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে । দরিদ্র পরিবার থেকে যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সেই দীর্ঘ যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটলেও বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবের রেশ রয়ে যাবে যুগ যুগ ধরে।











