২০১৬ সালের জুন মাসে যখন দক্ষিণ কোরিয়ার পিংকফং কোম্পানির সিইও কিম মিন-সেওক একটি ৯০ সেকেন্ডের শিশুদের গান আপলোড করার অনুমতি দেন, তখন তিনি কল্পনাও করেননি যে এই ছোট্ট ভিডিওটি ইতিহাস সৃষ্টি করবে। আজ সেই ‘বেবি শার্ক ড্যান্স’ ভিডিওটি ১৬ বিলিয়নের বেশি ভিউ পেয়ে ইউটিউবের সর্বকালের সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও হয়ে উঠেছে এবং একটি ৪০ কোটি ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পিংকফং কোম্পানি দক্ষিণ কোরিয়ার কসডাক স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত হয়ে ৫৩ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা প্রমাণ করে যে একটি সাধারণ শিশুতোষ গান কীভাবে একটি বৈশ্বিক মিডিয়া ব্যবসায় রূপান্তরিত হতে পারে।
ভাইরাল সাফল্যের শুরু
ক্যাম্পফায়ার গান থেকে গ্লোবাল ফেনোমেনন
‘বেবি শার্ক’ আসলে ১৯৭০-এর দশকের একটি আমেরিকান ক্যাম্পফায়ার গান ছিল। পিংকফং এটিকে নতুন করে সাজিয়ে একটি দ্রুত গতির, কে-পপ শৈলীতে রূপান্তরিত করে এবং একটি সহজ নাচের রুটিন যোগ করে। ২০১৬ সালের জুনে ইউটিউবে আপলোড করার পর থেকেই এই ভিডিওটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিশুদের অনুষ্ঠানগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পরিবার এবং শিশুরা এই গানে নাচের ভিডিও তৈরি করতে শুরু করলে এটি ভাইরাল হয়ে যায়।
লেন্সকার্ট আইপিও-তে টাকার বৃষ্টি! প্রথম দিনেই সম্পূর্ণ সাবস্ক্রাইবড, GMP ₹৭০! আপনি কিনবেন?
রেকর্ড ভাঙা ভিউ সংখ্যা
২০২০ সালের নভেম্বরে ‘বেবি শার্ক ড্যান্স’ আনুষ্ঠানিকভাবে ইউটিউবের সর্বাধিক দেখা ভিডিও হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের জুনে এটি ১৬ বিলিয়ন ভিউ অতিক্রম করে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। তুলনামূলকভাবে, দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘ডেসপাসিটো’ গানটি প্রায় ৩ বিলিয়ন ভিউ পিছিয়ে আছে, যা ২৮ শতাংশের ব্যবধান। এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে ‘বেবি শার্ক’ কতটা জনপ্রিয়।
ব্যবসায়িক সাফল্যের বিশ্লেষণ
রাজস্ব এবং মুনাফার পরিসংখ্যান
পিংকফং কোম্পানির আর্থিক বিবৃতি অনুসারে, ২০২৪ সালে কোম্পানিটি মোট ৬৭ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করেছে, যার মধ্যে অপারেটিং প্রফিট ছিল প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ইউটিউবের শিশু-বান্ধব কন্টেন্টের জন্য বিজ্ঞাপন সীমাবদ্ধতা এবং কপা (COPPA) আইনের কারণে এই আয় প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে কম। যদি এই নিষেধাজ্ঞা না থাকত, তাহলে পিংকফং দুই থেকে তিন গুণ বেশি আয় করতে পারত।
মাসিক ভিত্তিতে, ‘বেবি শার্ক ড্যান্স’ ভিডিওটি প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ভিউ পাচ্ছে এবং এর থেকে মাসিক আনুমানিক ২৮৩,০০০ ডলার আয় হচ্ছে, যা দৈনিক প্রায় ৯,৪০০ ডলার। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি তখন পর্যন্ত প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
আইপিও এবং স্টক মার্কেট অভিষেক
২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর পিংকফং কোম্পানি দক্ষিণ কোরিয়ার কসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। আইপিও মূল্য নির্ধারণ করা হয় শেয়ার প্রতি ৩৮,০০০ কোরিয়ান ওয়ান, যা টার্গেট রেঞ্জের সর্বোচ্চ সীমা। এই আইপিও থেকে কোম্পানি ৭৬ বিলিয়ন কোরিয়ান ওয়ন (প্রায় ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সংগ্রহ করে।
আইপিওর প্রথম দিনে পিংকফংয়ের শেয়ারের দাম ৫৮,০০০ কোরিয়ান ওয়নে খোলে, যা আইপিও মূল্যের চেয়ে ৫২.৬ শতাংশ বেশি। কিছু সময়ে শেয়ারের দাম ৬২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার হার ছিল ৬১৫.৯:১ এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৮৪৬.৯:১। মোট সাবস্ক্রিপশন আমানত পৌঁছেছিল প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ওয়ন।
আইপিওর পর পিংকফংয়ের বাজার মূলধন দাঁড়ায় প্রায় ৫৪৫.৩ বিলিয়ন কোরিয়ান ওয়ন, যা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ কৌশল
মার্চেন্ডাইজিং এবং পণ্য বৈচিত্র্য
‘বেবি শার্ক’ শুধুমাত্র একটি ভিডিও নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। পিংকফং বিভিন্ন ধরনের মার্চেন্ডাইজিং পণ্য বাজারে এনেছে, যার মধ্যে রয়েছে পোশাক, খেলনা, বই এবং অন্যান্য শিশু পণ্য। কোম্পানি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতার সাথে অংশীদারিত্ব করেছে। ‘বেবি শার্ক’ ভিডিও প্রকাশের প্রথম কয়েক বছরে, এটি পিংকফংয়ের মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক অবদান রেখেছিল।
লোকেশন-বেসড এন্টারটেইনমেন্ট
পিংকফং কোম্পানি লোকেশন-বেসড এন্টারটেইনমেন্ট (LBE) ব্যবসায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে থিম পার্ক, ইন্টারঅ্যাক্টিভ অভিজ্ঞতা এবং লাইভ শো। আইপিও থেকে প্রাপ্ত তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই খাতে বিনিয়োগ করা হবে।
নতুন কন্টেন্ট উন্নয়ন
কোম্পানি আইপিও থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজ এবং কন্টেন্ট উন্নয়নে ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। পিংকফং ২০২৮ সালের মধ্যে অন্তত তিনটি বড় কন্টেন্ট টাইটেল তৈরি করার লক্ষ্য রেখেছে, যাতে তারা আরেকটি গ্লোবাল হিট তৈরি করতে পারে। কোম্পানি বর্তমানে ৩৪০-এরও বেশি কর্মচারী নিয়োগ করেছে এবং টোকিও, সাংহাই এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে অফিস রয়েছে।
প্রযুক্তি এবং এআই ইন্টিগ্রেশন
এন্টার-টেক মডেল
পিংকফং নিজেকে একটি ঐতিহ্যবাহী কন্টেন্ট কোম্পানি হিসেবে নয়, বরং একটি “এন্টার-টেক” এন্টারপ্রাইজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এটি বিনোদন এবং প্রযুক্তির একটি সংমিশ্রণ। কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করে আইপি সাফল্যের পূর্বাভাস দিতে এবং স্থানীয়করণ উন্নত করতে।
ডেটা-চালিত কন্টেন্ট তৈরি
সিইও কিম মিন-সেওক বলেছেন, “পিংকফং কোম্পানি একটি ‘এন্টার-টেক’ এন্টারপ্রাইজে পরিণত হয়েছে যা ডেটা, এআই এবং স্থানীয়করণের মাধ্যমে কন্টেন্ট সাফল্য বৃদ্ধি করে। এআই ক্ষমতা এবং ডেটা সম্পদ ব্যবহার করে, আমরা আইপি লঞ্চ চক্র সংক্ষিপ্ত করতে এবং পরিবার কন্টেন্ট শিল্পে একটি নতুন গ্লোবাল মানদণ্ড স্থাপন করতে চাই।”
চ্যালেঞ্জ এবং সীমাবদ্ধতা
বিজ্ঞাপন রাজস্বের সীমাবদ্ধতা
ইউটিউবে শিশুদের কন্টেন্টের জন্য কঠোর নিয়ম রয়েছে। কপা (Children’s Online Privacy Protection Act) এবং ইউটিউব কিডস-এর বিধিনিষেধ শিশু-বান্ধব বিজ্ঞাপন এবং পণ্য লাইনের সম্ভাবনা সীমিত করে। এই কারণে, ১৬ বিলিয়নেরও বেশি ভিউ থাকা সত্ত্বেও, পিংকফং অপেক্ষাকৃত কম আয় করছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করেন যে এই সীমাবদ্ধতা না থাকলে কোম্পানি দুই থেকে তিন গুণ বেশি আয় করতে পারত।
একক আইপির উপর নির্ভরতা
যদিও ‘বেবি শার্ক’ পিংকফংয়ের জন্য একটি বিশাল সাফল্য, কোম্পানির ক্যাটালগে অন্য কোনো কন্টেন্ট এই ফেনোমেনার সাথে মিলতে পারেনি। এটি একটি ঝুঁকি তৈরি করে কারণ কোম্পানি একটি একক আইপির উপর অত্যধিক নির্ভরশীল। এই কারণেই পিংকফং নতুন কন্টেন্ট উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে।
প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ
শিশু কন্টেন্টের বাজার
ইউটিউবে শিশু কন্টেন্ট অত্যন্ত জনপ্রিয়। শীর্ষ দশটি সর্বাধিক দেখা ভিডিওর মধ্যে পাঁচটিই শিশুদের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে লুলু কিডস-এর “জনি জনি ইয়েস পাপা” যা ৬.৫ বিলিয়ন ভিউ পেয়েছে এবং কোকোমেলনের “এবিসি সং” যা ৫.৭১ বিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে পিংকফংকে তার অবস্থান বজায় রাখতে ক্রমাগত উদ্ভাবন করতে হবে।
কোরিয়ান থ্রিলার মুভির টপ ৫: নেটফ্লিক্স ও প্রাইমে দেখার জন্য সেরা ভয়ঙ্কর ছবি
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গ্লোবাল সম্প্রসারণ
পিংকফং আইপিও থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা করছে। কোম্পানি ৩ডি কন্টেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ করবে। এছাড়াও, কোম্পানি লোকেশন-বেসড এন্টারটেইনমেন্ট ব্যবসায় আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারণ করতে চায়।
এনএফটি এবং ডিজিটাল সম্পদ
পিংকফং টোকেনজ কালেকটিবলস-এর সাথে সহযোগিতা ঘোষণা করেছে। এই অংশীদারিত্ব ‘বেবি শার্ক’ সংগ্রহ এবং এনএফটি-ভিত্তিক গেম চালু করবে, যেখানে খেলোয়াড়রা ভার্চুয়াল পরিবেশে তাদের ‘বেবি শার্ক’ চরিত্র সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগতকৃত করতে পারবে।
প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
কোরিয়ান কন্টেন্টের বৈশ্বিক প্রভাব
‘বেবি শার্ক’-এর সাফল্য প্রমাণ করে যে কোরিয়ান কন্টেন্ট আইপি একটি প্রযুক্তি-সক্ষম সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে, শুধুমাত্র একটি সৃজনশীল পণ্য নয়। এটি অন্যান্য কোরিয়ান কন্টেন্ট কোম্পানিদের জন্য একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভাইরাল মার্কেটিং
‘বেবি শার্ক’ ভাইরাল মার্কেটিংয়ের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। এটি দেখায় যে কীভাবে ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি গ্লোবাল কমিউনিটি এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক টাচস্টোন তৈরি করা যায়। পরিবার এবং শিশুরা তাদের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করে এই গানটিকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
পরিসংখ্যান সারাংশ
| বিবরণ | পরিমাণ |
|---|---|
| মোট ইউটিউব ভিউ | ১৬+ বিলিয়ন |
| ২০২৪ সালের বার্ষিক রাজস্ব | ৬৭ মিলিয়ন ডলার |
| অপারেটিং মুনাফা (২০২৪) | ১৩ মিলিয়ন ডলার |
| আইপিও সংগ্রহ | ৫৩ মিলিয়ন ডলার |
| কোম্পানির মূল্যায়ন | ৪০০ মিলিয়ন ডলার |
| প্রথম দিন শেয়ার বৃদ্ধি | ৫২.৬-৬২% |
| মাসিক ইউটিউব আয় | ২৮৩,০০০ ডলার |
| কর্মচারী সংখ্যা | ৩৪০+ |
‘বেবি শার্ক’-এর গল্প একটি সাধারণ শিশুতোষ গানের ভাইরাল সাফল্য থেকে বহু-মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে রূপান্তরের অসাধারণ যাত্রা। মাত্র ৯০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও যা ১৬ বিলিয়নেরও বেশি বার দেখা হয়েছে এবং ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি কোম্পানি তৈরি করেছে, তা ডিজিটাল যুগে কন্টেন্ট সৃষ্টির শক্তি প্রমাণ করে। পিংকফংয়ের সাম্প্রতিক আইপিও এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখায় যে কোম্পানি শুধুমাত্র একটি ভাইরাল হিটের উপর নির্ভর না করে একটি টেকসই, প্রযুক্তি-চালিত বিনোদন ব্যবসা তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও শিশু কন্টেন্টের জন্য নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, পিংকফং মার্চেন্ডাইজিং, লোকেশন-বেসড এন্টারটেইনমেন্ট এবং নতুন আইপি উন্নয়নের মাধ্যমে বৈচিত্র্যকরণ করছে। এই সাফল্যের গল্প অন্যান্য কন্টেন্ট নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করার সম্ভাবনা তুলে ধরে।











