ব্যাংককের রাজপথে স্বাদের মেলা: সেরা ১০টি স্ট্রিট ফুড যা আপনার মন জয় করবেই

ব্যাংকক, থাইল্যান্ডের এই প্রাণবন্ত রাজধানী শুধুমাত্র তার মন্দির বা জাঁকজমকপূর্ণ শপিং মলের জন্য পরিচিত নয়; এর আসল আত্মা লুকিয়ে আছে তার রাস্তার প্রতিটি কোণায়, যেখানে খাবারের গন্ধ আর মানুষের কোলাহল…

Manoshi Das

 

ব্যাংকক, থাইল্যান্ডের এই প্রাণবন্ত রাজধানী শুধুমাত্র তার মন্দির বা জাঁকজমকপূর্ণ শপিং মলের জন্য পরিচিত নয়; এর আসল আত্মা লুকিয়ে আছে তার রাস্তার প্রতিটি কোণায়, যেখানে খাবারের গন্ধ আর মানুষের কোলাহল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ব্যাংককের স্ট্রিট ফুড শুধুমাত্র ক্ষুধা মেটানোর একটি উপায় নয়, এটি শহরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার রাস্তার খাবার এতটাই বিখ্যাত যে, CNN তাদের জরিপে ব্যাংকককে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রিট ফুড শহরের খেতাব দিয়েছে। এমনকি সম্মানজনক Michelin Guide-ও শহরের অনেক সাধারণ স্ট্রিট ফুড স্টলকে তাদের Bib Gourmand সম্মাননা প্রদান করেছে, যা সাশ্রয়ী মূল্যে অসাধারণ খাবারের স্বীকৃতি। এই খাবারগুলি কেবল স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অংশই নয়, সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছেও এক প্রধান আকর্ষণ।

ব্যাংককের স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি: শুধু খাবার নয়, এক জীবন্ত ঐতিহ্য

থাইল্যান্ডের স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতির ইতিহাস বেশ গভীর। মূলত, ১৯ শতকের শেষের দিকে রাজা পঞ্চম রামের সময়কালে শহুরে জীবনযাত্রার প্রসারের সাথে সাথে এই সংস্কৃতির জন্ম হয়। গ্রামের মানুষ যখন কাজের সন্ধানে ব্যাংককে আসতে শুরু করে, তখন তাদের দ্রুত এবং সাশ্রয়ী খাবারের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজন থেকেই রাস্তার পাশে ছোট ছোট খাবারের দোকান গড়ে উঠতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে এই সংস্কৃতি আরও বিকশিত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি শহরের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ (Tourism Authority of Thailand)-এর তথ্যমতে, পর্যটকদের ব্যাংকক ভ্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো এখানকার বৈচিত্র্যময় খাবার উপভোগ করা। এখানকার রাস্তার খাবার বিক্রেতারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই রেসিপি অনুসরণ করে আসছেন, যা খাবারের স্বাদ ও মানকে অপরিবর্তিত রেখেছে। এটি শুধু ব্যবসা নয়, এটি একটি শিল্প যা থাই জনগণের আতিথেয়তার প্রতিফলন ঘটায়।

গুণমান এবং নিরাপত্তা: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

অনেকেই রাস্তার খাবারের স্বাস্থ্যকর দিক নিয়ে চিন্তিত থাকেন, কিন্তু ব্যাংকক এই বিষয়ে অনেক উন্নতি করেছে। ব্যাংকক মেট্রোপলিটন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (BMA) “Clean Food Good Taste” নামক একটি প্রকল্প পরিচালনা করে, যার অধীনে স্বাস্থ্যকর এবং পরিষ্কার স্টলগুলোকে একটি বিশেষ সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। তাই খাবারের দোকান বেছে নেওয়ার সময় এই লোগোটি আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

ব্যাংককের সেরা ১০টি স্ট্রিট ফুড: যা না খেলে ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে

ব্যাংককের খাবারের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে তার মধ্য থেকে সেরা ১০টি বেছে নেওয়া বেশ কঠিন। তবুও, কিছু খাবার রয়েছে যা তাদের স্বাদ, জনপ্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। চলুন, সেই সব খাবারের জগতে ডুব দেওয়া যাক।

১. প্যাড থাই (Pad Thai – ผัดไทย)

বিবরণ: প্যাড থাই হলো থাইল্যান্ডের জাতীয় খাবার এবং নিঃসন্দেহে ব্যাংককের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। এটি মূলত চালের নুডলস, যা চিংড়ি বা মুরগির মাংস, টোফু, ডিম, শিমের বীচি এবং পেঁয়াজ পাতার সাথে টক-মিষ্টি-নোনতা স্বাদের তেঁতুলের সস দিয়ে ভাজা হয়। সবশেষে উপরে বাদাম গুঁড়ো, চিলি ফ্লেক্স এবং লেবুর রস ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়।

স্বাদের অনুভূতি: প্যাড থাই-এর স্বাদ এককথায় অসাধারণ। তেঁতুলের টক স্বাদ, পাম সুগারের মিষ্টি ভাব, ফিশ সসের নোনতা স্বাদ এবং মরিচের ঝাল একসাথে মিশে এক জটিল কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ ফ্লেভার তৈরি করে। প্রতিটি বাইটে আপনি বিভিন্ন টেক্সচারের অনুভূতি পাবেন – নুডলসের নরম ভাব, বাদামের কুড়মুড়ে অনুভূতি এবং শিমের বীচির সতেজতা।

ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অর্থনৈতিক মন্দা এবং চালের ঘাটতির কারণে থাই সরকার চালের ব্যবহার কমাতে নুডলস খাওয়ার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী প্লেক ফিবুনসংগ্রামের উদ্যোগে প্যাড থাই-এর জন্ম হয়, যা আজ থাইল্যান্ডের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

কোথায় পাবেন: ব্যাংককের প্রায় সব জায়গাতেই প্যাড থাই পাওয়া যায়। তবে কিংবদন্তিতুল্য স্বাদের জন্য “থিপ সামাই” (Thipsamai) নামক রেস্তোরাঁটি খুবই বিখ্যাত, যাকে প্রায়ই “ব্যাংককের সেরা প্যাড থাই” বলা হয়।

২. টম ইয়াম গুং (Tom Yum Goong – ต้มยำกุ้ง)

বিবরণ: টম ইয়াম গুং হলো একটি গরম এবং টক স্বাদের স্যুপ, যা থাই খাবারের এক রত্ন হিসেবে পরিচিত। ‘টম’ শব্দের অর্থ ফোটানো, ‘ইয়াম’ মানে মিশ্রণ এবং ‘গুং’ মানে চিংড়ি। এই স্যুপে লেমনগ্রাস, কাফির লাইম পাতা, গালাঙ্গাল, লেবুর রস, ফিশ সস এবং মরিচের মতো সুগন্ধি মশলা ব্যবহার করা হয়, যা এটিকে এক অনন্য স্বাদ প্রদান করে।

স্বাদের অনুভূতি: প্রথম চুমুকেই আপনার স্বাদকোরকে এক বিস্ফোরণ ঘটবে। লেমনগ্রাসের সতেজ গন্ধ, লেবুর তীব্র টক ভাব এবং মরিচের ঝাল মিলেমিশে এক দারুণ অনুভূতি তৈরি করে। মাশরুম এবং চিংড়ির কোমল স্বাদ স্যুপটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। এটি ঠান্ডা বা বৃষ্টির দিনে খাওয়ার জন্য উপযুক্ত।

সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: এই স্যুপটি থাই পরিবারের একটি সাধারণ খাবার এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। BBC Good Food-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মেও এর রেসিপি বেশ জনপ্রিয়, যা এর বিশ্বব্যাপী আবেদন প্রমাণ করে।

কোথায় পাবেন: চিয়াং মাই থেকে ফুকেট পর্যন্ত সবখানেই এটি পাওয়া যায়। ব্যাংককে, বিশেষ করে “পি’অর টম ইয়াম” (P’Aor Tom Yum) এর মতো জায়গায় আপনি ঘন এবং ক্রিমি সংস্করণের টম ইয়াম উপভোগ করতে পারেন।

৩. সোম তাম (Som Tam – ส้มตำ)

বিবরণ: সোম তাম হলো একটি ঝাল সবুজ পেঁপের সালাদ, যা উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের (ইসান) একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। কাঁচা পেঁপে কুচিয়ে তার সাথে শুকনো চিংড়ি, টমেটো, সবুজ বিনস, বাদাম, রসুন এবং মরিচ মেশানো হয়। এর ড্রেসিং তৈরি হয় ফিশ সস, লেবুর রস এবং পাম সুগার দিয়ে।

স্বাদের অনুভূতি: এটি একটি বহুমুখী স্বাদের খাবার। একই সাথে ঝাল, টক, মিষ্টি এবং নোনতা—এই চারটি মূল স্বাদের পারফেক্ট ব্যালেন্স খুঁজে পাওয়া যায় সোম তামে। কাঁচা পেঁপের কুড়মুড়ে ভাব সালাদটিকে এক দারুণ টেক্সচার দেয়। আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী ঝালের পরিমাণ বাড়াতে বা কমাতে পারেন।

প্রকারভেদ: সোম তাম-এর বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে, যেমন “সোম তাম থাই” (মিষ্টি ও টক), “সোম তাম পু” (লবণাক্ত কাঁকড়া সহ) এবং “সোম তাম প্লা রা” (গাঁজানো মাছের সস সহ), যা বেশ তীব্র গন্ধযুক্ত।

কোথায় পাবেন: ইসান অঞ্চলের খাবারের জন্য বিখ্যাত রেস্তোরাঁ, যেমন “সোম তাম নưa” (Som Tam Nua)-তে আপনি সেরা মানের সোম তাম খুঁজে পাবেন।

৪. মু পিং (Moo Ping – หมูปิ้ง)

বিবরণ: মু পিং হলো কাঠকয়লার আগুনে ঝলসানো মিষ্টি এবং নোনতা স্বাদের শুকরের মাংসের কাবাব। মাংসের টুকরোগুলোকে নারকেলের দুধ, ফিশ সস এবং রসুনের মিশ্রণে সারারাত মেরিনেট করা হয়। তারপর সেগুলোকে কাঠিতে গেঁথে কয়লার আগুনে ঝলসে নেওয়া হয়।

স্বাদের অনুভূতি: আগুনে ঝলসানোর কারণে মাংসের বাইরের অংশে একটি ক্যারামেলাইজড আস্তরণ তৈরি হয় এবং ভিতরে মাংস থাকে নরম ও রসালো। নারকেলের দুধের মিষ্টি ভাব এবং ফিশ সসের নোনতা স্বাদ একে এক অসাধারণ ফ্লেভার দেয়। এটি সাধারণত স্টিকি রাইস বা আঠালো ভাতের সাথে পরিবেশন করা হয়, যা একটি নিখুঁত কম্বিনেশন।

কেন জনপ্রিয়: এটি একটি দ্রুত, সহজলভ্য এবং অত্যন্ত সুস্বাদু স্ন্যাক। সকালে অফিসের পথে বা বিকেলে হালকা ক্ষুধা মেটানোর জন্য এটি ব্যাংককের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এর দামও খুব কম, যা একে সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলে।

কোথায় পাবেন: ব্যাংককের রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বিশেষ করে সকালে এবং সন্ধ্যায় আপনি মু পিং-এর স্টল দেখতে পাবেন। সিলম এলাকার স্টলগুলো বিশেষভাবে বিখ্যাত।

৫. খাও নিয়াও মামুয়াং (Khao Niao Mamuang – ข้าวเหนียวมะม่วง)

বিবরণ: এটি ব্যাংককের সবচেয়ে বিখ্যাত ডেজার্ট, যা ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস নামেও পরিচিত। মিষ্টি নারকেলের দুধে রান্না করা আঠালো ভাতের উপর তাজা পাকা আমের টুকরো দিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়। উপরে সামান্য লবণাক্ত নারকেলের ক্রিম এবং ভাজা মুগ ডাল ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্বাদের অনুভূতি: এটি স্বাদে-গন্ধে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। মিষ্টি পাকা আমের স্বাদ, নারকেলের দুধের ক্রিমি ভাব এবং আঠালো ভাতের নরম টেক্সচার একসাথে মিশে মুখে গলে যায়। লবণাক্ত ক্রিমটি মিষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ভাজা ডাল একটি কুড়মুড়ে ভাব যোগ করে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: এই ডেজার্টটি এতটাই জনপ্রিয় যে এটি থাইল্যান্ডের বাইরেও বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁর মেন্যুতে জায়গা করে নিয়েছে। Forbes-এর মতো ম্যাগাজিনও বিশ্বের সেরা ডেজার্টগুলির তালিকায় এটিকে স্থান দিয়েছে।

কোথায় পাবেন: আমের মৌসুমে (এপ্রিল-জুন) এটি সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়। সুখুমভিট সোই ৩৮ বা টং লর এলাকার বিখ্যাত স্টলগুলোতে আপনি সেরা ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস খুঁজে পাবেন।

ব্যাংককের স্ট্রিট ফুডের মূল্য ও প্রাপ্যতা (একটি সংক্ষিপ্ত সারণী)

খাবারের নাম (Bengali) খাবারের নাম (English) গড় মূল্য (THB) মূল উপকরণ স্বাদের ধরণ
প্যাড থাই Pad Thai ฿50 – ฿100 নুডলস, চিংড়ি, টোফু, তেঁতুল টক-মিষ্টি-নোনতা
টম ইয়াম গুং Tom Yum Goong ฿80 – ฿150 চিংড়ি, লেমনগ্রাস, গালাঙ্গাল টক ও ঝাল
সোম তাম Som Tam ฿40 – ฿80 কাঁচা পেঁপে, শুকনো চিংড়ি, মরিচ ঝাল-টক-মিষ্টি
মু পিং Moo Ping ฿10 – ฿20 (প্রতি কাঠি) শুকরের মাংস, নারকেলের দুধ মিষ্টি ও নোনতা
খাও নিয়াও মামুয়াং Mango Sticky Rice ฿60 – ฿120 আম, আঠালো ভাত, নারকেলের দুধ মিষ্টি ও ক্রিমি

দ্রষ্টব্য: মূল্য স্থান এবং দোকানের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ฿1 ≈ ৳3.15, অক্টোবর ২০২৫)

৬. গুয়ে টিও রুয়া (Guay Teow Reua – ก๋วยเตี๋ยวเรือ)

বিবরণ: “বোট নুডলস” নামে পরিচিত এই খাবারটির একটি আকর্ষণীয় ইতিহাস রয়েছে। অতীতে ব্যাংককের খালগুলোতে নৌকায় করে এই নুডলস বিক্রি করা হতো, তাই এর এমন নামকরণ। এটি একটি ঘন এবং সুগন্ধি ব্রথ সহ একটি নুডলস স্যুপ, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো ব্রথকে ঘন এবং সমৃদ্ধ করার জন্য এতে শূকর বা গরুর রক্ত মেশানো হয় (যদিও বর্তমানে রক্ত ছাড়াও সংস্করণ পাওয়া যায়)।

স্বাদের অনুভূতি: এর স্বাদ বেশ তীব্র এবং জটিল। দারুচিনি, স্টার অ্যানিস এবং অন্যান্য মশলার ব্যবহারে ব্রথটি খুব সুগন্ধি হয়। রক্ত মেশানোর কারণে এটি একটি独特 গাঢ় রঙ এবং সামান্য মেটালিক স্বাদ পায়, যা অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়। ছোট বাটিতে পরিবেশন করা হয় বলে একবারে বেশ কয়েকটি বাটি খাওয়া একটি সাধারণ দৃশ্য।

কোথায় পাবেন: ভিক্টরি মনুমেন্টের কাছে বোট নুডলস অ্যালি এই খাবারের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা। সেখানে আপনি সারিবদ্ধভাবে অনেকগুলো দোকান পাবেন।

৭. গাই টড (Gai Tod – ไก่ทอด)

বিবরণ: গাই টড হলো থাই স্টাইলের ফ্রাইড চিকেন। এটি সাধারণ ফ্রাইড চিকেনের থেকে আলাদা কারণ এর মেরিনেশনে ফিশ সস, রসুন এবং বিভিন্ন থাই মশলা ব্যবহার করা হয়, যা এটিকে এক অনন্য স্বাদ দেয়। এর বাইরের আবরণটি হয় অত্যন্ত কুড়মুড়ে এবং সোনালী।

স্বাদের অনুভূতি: বাইরে কুড়মুড়ে এবং ভিতরে রসালো—এটাই গাই টডের আসল বৈশিষ্ট্য। ফিশ সসের নোনতা স্বাদ এবং রসুনের গন্ধ মাংসের গভীরে প্রবেশ করে, যা প্রতিটি কামড়ে এক দারুণ ফ্লেভার দেয়। এটি সাধারণত মিষ্টি চিলি সস এবং স্টিকি রাইসের সাথে খাওয়া হয়।

কোথায় পাবেন: ব্যাংককের প্রায় প্রতিটি বাজারে এবং রাস্তার কোণায় আপনি গাই টডের স্টল দেখতে পাবেন। বিশেষ করে “সোই পোলো ফ্রাইড চিকেন” (Soi Polo Fried Chicken) তাদের রসুনে ভাজা চিকেনের জন্য খুব বিখ্যাত।

৮. সাই ক্রোক ইসান (Sai Krok Isan – ไส้กรอกอีสาน)

বিবরণ: এটি উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের একটি গাঁজানো সসেজ, যা শুকরের মাংস এবং ভাতের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করা হয়। এই মিশ্রণটিকে কয়েকদিন ধরে গাঁজানো হয়, যা এটিকে একটি টক স্বাদ প্রদান করে। এরপর এটিকে কয়লার আগুনে গ্রিল করা হয়।

স্বাদের অনুভূতি: এর স্বাদ মূলত টক এবং কিছুটা নোনতা। গ্রিল করার ফলে বাইরের অংশটা সামান্য কুড়মুড়ে হয় এবং ভিতরটা নরম থাকে। এটি সাধারণত কাঁচা বাঁধাকপি, আদা এবং তাজা মরিচের সাথে পরিবেশন করা হয়, যা এর টক স্বাদের সাথে একটি দারুণ কনট্রাস্ট তৈরি করে।

কোথায় পাবেন: এটি ইসান খাবারের স্টলগুলোতে সহজেই পাওয়া যায়। সেন্ট্রালওয়ার্ল্ডের বাইরের ফুড মার্কেট বা বিভিন্ন নাইট মার্কেটে এর দেখা মিলবে।

৯. খাও প্যাড (Khao Pad – ข้าวผัด)

বিবরণ: খাও প্যাড হলো থাই স্টাইলের ফ্রাইড রাইস। এটি একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার। সুগন্ধি জেসমিন রাইসের সাথে ডিম, পেঁয়াজ, রসুন এবং আপনার পছন্দের মাংস (চিংড়ি, চিকেন বা শুকরের মাংস) মিশিয়ে উচ্চ তাপে ভাজা হয়। সয়া সস, ফিশ সস এবং সামান্য চিনি দিয়ে এর স্বাদ তৈরি করা হয়।

স্বাদের অনুভূতি: এটি একটি আরামদায়ক খাবার। এর স্বাদ খুব তীব্র নয়, বরং মৃদু এবং ভারসাম্যপূর্ণ। পাশে শসার টুকরো, লেবু এবং ‘প্রিক নাম প্লা’ (মরিচ এবং ফিশ সসের মিশ্রণ) দিয়ে পরিবেশন করা হয়, যা আপনাকে নিজের স্বাদ অনুযায়ী খাবারটি কাস্টমাইজ করার সুযোগ দেয়।

কেন খাবেন: যখন আপনি খুব বেশি ঝাল বা মশলাদার কিছু খেতে চাইছেন না, তখন খাও প্যাড একটি চমৎকার বিকল্প। এটি দ্রুত তৈরি করা যায় এবং পেট ভরানোর জন্য দারুণ।

কোথায় পাবেন: যেকোনো স্ট্রিট ফুড স্টল বা স্থানীয় রেস্তোরাঁয় আপনি খাও প্যাড পাবেন। এটি একটি মৌলিক থাই খাবার।

১০. খানম বুয়াং (Khanom Bueang – ขนมเบื้อง)

বিবরণ: এটি একটি ঐতিহ্যবাহী থাই ক্রিস্পি ক্রেপ বা প্যানকেক। চালের গুঁড়ো এবং মুগ ডালের মিশ্রণ দিয়ে একটি পাতলা প্যানকেক তৈরি করে তার উপর নারকেলের ক্রিম দেওয়া হয়। এরপর এর উপর দুই ধরনের পুর দেওয়া হয়—একটি মিষ্টি (ফোই থং বা সোনার ডিমের সুতো এবং নারকেল) এবং অন্যটি নোনতা (চিংড়ি এবং ধনে পাতা)।

স্বাদের অনুভূতি: এটি একই সাথে মিষ্টি এবং কুড়মুড়ে। ক্রেপটি খুবই পাতলা এবং মুচমুচে হয়। ক্রিমের মিষ্টি ভাব এবং পুরের বিভিন্ন স্বাদ (মিষ্টি বা নোনতা) একসাথে এক দারুণ কম্বিনেশন তৈরি করে। এর ছোট আকার এটিকে একটি পারফেক্ট স্ন্যাক বানিয়েছে।

কোথায় পাবেন: ওয়াং লাং মার্কেট বা পুরানো ব্যাংককের রাস্তার ধারের স্টলগুলোতে এটি বেশি দেখা যায়।

 স্বাদের এক অবিরাম যাত্রা

ব্যাংককের স্ট্রিট ফুড শুধুমাত্র খাবারের একটি তালিকা নয়, এটি একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা যা শহরের স্পন্দনকে ধারণ করে। প্রতিটি খাবার তার নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বহন করে। এখানকার রাস্তায় হাঁটার সময় খাবারের সুগন্ধ, রান্নার শব্দ এবং মানুষের ভিড় আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর রাস্তার খাবার শহুরে জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, এবং ব্যাংকক সেই পথেই এগিয়ে চলেছে। তাই পরেরবার যখন আপনি ব্যাংকক ভ্রমণের পরিকল্পনা করবেন, তখন শুধুমাত্র দর্শনীয় স্থানগুলোই নয়, এই অসাধারণ খাবারের স্বাদ নিতেও ভুলবেন না। কারণ ব্যাংকককে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে তার রাস্তার খাবারকে জানতেই হবে।

About Author
Manoshi Das

মানসী দাস একজন মার্কেটিং এর ছাত্রী এবং আমাদের বাংলাদেশ প্রতিনিধি। তিনি তাঁর অধ্যয়ন ও কর্মজীবনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন। একজন উদীয়মান লেখিকা হিসেবে, মানসী বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, স্থানীয় বাজারের প্রবণতা এবং ব্র্যান্ডিং কৌশল নিয়ে লিখে থাকেন। তাঁর লেখনীতে বাংলাদেশের যুব সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়।