বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে ভোটার উপস্থিতির গতিপ্রকৃতি
|
নির্বাচন
|
বছর
|
ভোটদানের হার (%)
|
নির্বাচনকালীন সরকার
|
মূল প্রেক্ষাপট
|
|
প্রথম
|
১৯৭৩
|
৫৪.৯৫%
|
দলীয়
|
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন
|
|
দ্বিতীয়
|
১৯৭৯
|
৪৯.৬৭%
|
সামরিক শাসন পরবর্তী
|
বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা
|
|
তৃতীয়
|
১৯৮৬
|
৬১.১১%
|
সামরিক শাসন (এরশাদ)
|
প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন
|
|
চতুর্থ
|
১৯৮৮
|
৫২.৪৮%
|
সামরিক শাসন (এরশাদ)
|
প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন
|
|
পঞ্চম
|
১৯৯১
|
৫৫.৪৫%
|
তত্ত্বাবধায়ক (নিরপেক্ষ)
|
এরশাদের পতনের পর প্রথম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
|
|
ষষ্ঠ
|
ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬
|
২৬.৫৪%
|
দলীয় (বিএনপি)
|
সর্বনিম্ন উপস্থিতি, প্রধান দলগুলোর বর্জন
|
|
সপ্তম
|
জুন ১৯৯৬
|
৭৫.৪৯%
|
তত্ত্বাবধায়ক
|
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন
|
|
অষ্টম
|
২০০১
|
৭৫.৫৯%
|
তত্ত্বাবধায়ক
|
তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
|
|
নবম
|
২০০৮
|
৮৭.১৩%
|
তত্ত্বাবধায়ক (সেনা-সমর্থিত)
|
সর্বোচ্চ উপস্থিতি, সর্বশেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন
|
|
দশম
|
২০১৪
|
৪০.০৪%
|
দলীয় (আওয়ামী লীগ)
|
প্রধান বিরোধী জোটের বর্জন, ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা
|
|
একাদশ
|
২০১৮
|
৮০.২০%
|
দলীয় (আওয়ামী লীগ)
|
বিতর্কিত নির্বাচন, ‘রাতের ভোট’ অভিযোগ
|
|
দ্বাদশ
|
২০২৪
|
৪১.৮০%
|
দলীয় (আওয়ামী লীগ)
|
প্রধান বিরোধী জোটের বর্জন, ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচন
|
সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির নির্বাচন: ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬)
বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির রেকর্ডটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল মাত্র ২৬.৫৪ শতাংশ। এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও স্বল্পস্থায়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
প্রেক্ষাপট ও বর্জন
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ১৮২ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ২৬.৫৪ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন । এই স্বল্প উপস্থিতি মূলত বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং জনগণের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সৃষ্ট সন্দেহের ফল। অনেক ভোটকেন্দ্র ছিল ভোটারশূন্য, যা নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ফলাফল ও স্বল্পস্থায়ী সংসদ
বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে এই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। তবে এই সংসদ মাত্র ১২ দিন স্থায়ী হয়েছিল। তীব্র গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে বাধ্য হয় এবং সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এই নির্বাচনের স্বল্পস্থায়িত্ব এবং নিম্ন ভোটার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচনই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির নির্বাচন: নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০৮)
সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির ঠিক বিপরীতে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০৮-এ ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ, যা বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ । ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এটি ছিল দীর্ঘ দুই বছরের জরুরি অবস্থার পর অনুষ্ঠিত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা
২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য ব্যাপক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়। ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ফলে জনগণের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি এক নতুন আস্থা তৈরি হয়।
জনগণের আস্থা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ নিবন্ধিত ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির মূল কারণ ছিল:
1.নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার: সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় জনগণের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।
2.লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড: সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে।
3.নতুন ভোটার তালিকা: ছবিসহ নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন জাল ভোট বা কারচুপির সুযোগ কমিয়ে দেয়।
এই নির্বাচনটি প্রমাণ করে যে, যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে জনগণের মনে কোনো সংশয় থাকে না এবং তারা বিশ্বাস করে যে তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে, তখন তারা বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সর্বশেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয় ।
বিতর্কিত নির্বাচনসমূহ ও ভোটার উপস্থিতির ভিন্ন চিত্র
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন কিছু নির্বাচন রয়েছে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বা রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার হয় অস্বাভাবিকভাবে কম ছিল, অথবা উচ্চ উপস্থিতি সত্ত্বেও তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪)
বাকি ১৪৭টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও, নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ভোট পড়েছিল মাত্র ৪০.০৪ শতাংশ। তবে বিরোধী দল ও কিছু মানবাধিকার সংস্থা এই হারকে আরও কম বলে দাবি করেছিল। এই নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনগুলোর মধ্যে একটি, যা দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮)
নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা, বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া এবং ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে এই নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়া মানেই এটা না যে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য। আমাদের দেখতে হবে যে উপস্থিতি স্বতঃস্ফূর্ত কি না। যেমন, ২০১৮ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক। কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন আছে” । এই নির্বাচনটি প্রমাণ করে যে, কেবল উচ্চ ভোটার উপস্থিতিই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে না, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪)
এই নির্বাচনকে ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়, যেখানে অংশগ্রহণমূলক দেখানোর জন্য একই দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীমের মতে, যখন নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয় না এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা থাকে না, তখন তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না । এই নির্বাচনটিও দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে কম ভোটার উপস্থিতির একটি উদাহরণ হিসেবে থেকে গেল।
ভোটার উপস্থিতির তাৎপর্য ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব
1.নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা: যখনই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে (যেমন ১৯৯১, ১৯৯৬ জুন, ২০০১, ২০০৮), তখনই ভোটার উপস্থিতি ছিল উচ্চ। এর কারণ হলো, জনগণ বিশ্বাস করে যে এই সরকারগুলোর অধীনে তাদের ভোট সুরক্ষিত থাকবে।
2.প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ: প্রধান দলগুলোর বর্জন বা অনুপস্থিতি সরাসরি ভোটার উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো এর স্পষ্ট উদাহরণ।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটার উপস্থিতির তাৎপর্য অপরিসীম। এটি কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব পালনেরও একটি মাধ্যম। যখন ভোটাররা বিপুল সংখ্যায় ভোট দেন, তখন সরকার জনগণের প্রতি আরও বেশি দায়বদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে, কম ভোটার উপস্থিতি সরকারকে জনগণের প্রতি কম সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। তাই, একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।











