বাংলাদেশ ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রজেক্ট ১০ মার্চ: নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নতুন দিগন্ত ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আগামী ১০ মার্চ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’…

Avatar

 

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আগামী ১০ মার্চ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (Family Card) পাইলট প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নিম্নবিত্ত ও অতি-দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত পরিবারগুলো প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ১৪টি উপজেলার নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোতে এই কর্মসূচি শুরু হচ্ছে, যেখানে ৬,৫০০ পরিবারকে কিউআর কোড (QR Code) সম্বলিত স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। সরকারের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হলো, ধাপে ধাপে এই কার্ড সারা দেশের ২ কোটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের পটভূমি, সুবিধাভোগী নির্বাচনের মানদণ্ড, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করব।

ফ্যামিলি কার্ড কী এবং এর পটভূমি: একটি কাঠামোগত সংস্কার

ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি সাধারণ পরিচয়পত্র নয়; এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্র (Universal Social Identity Card) বা ডিজিটাল কার্ড, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। পূর্বে বাংলাদেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিক্ষিপ্তভাবে ভাতা প্রদান করা হতো, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বাদ পড়তেন এবং অর্থের অপচয় হতো। এই সমস্যা সমাধানে এবং একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে সকল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে নিয়ে আসার লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি প্রবর্তন করা হয়েছে।

টিসিবি কার্ড থেকে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডে রূপান্তর

পূর্বে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) হাতে লেখা বা সাধারণ কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিতরণ করত। কিন্তু নতুন এই ফ্যামিলি কার্ড হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল। টিসিবির বিদ্যমান ডাটাবেসকে এই স্মার্ট কার্ডের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (Dynamic Social Registry – DSR)’-এর সাথে একীভূত করা হচ্ছে। এর ফলে একটি মাত্র কার্ড ব্যবহার করে সুবিধাভোগীরা নগদ অর্থ পাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি, চিকিৎসা সহায়তা এবং কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাও এই কার্ডের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে পারবেন। কিউআর কোড এবং ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও নিরাপদ করা হয়েছে।

পাইলট প্রকল্পের আওতা ও বিস্তৃতি: ১৪টি নির্বাচিত উপজেলা

যেকোনো বৃহৎ সরকারি কর্মসূচি সারা দেশে একযোগে শুরু করলে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও পদ্ধতিগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তাই ঝুঁকি এড়াতে এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে সরকার পাইলট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু করছে।

প্রথম পর্যায়ের নির্বাচিত এলাকা

প্রাথমিকভাবে দেশের বিভিন্ন বিভাগ থেকে ১৪টি উপজেলা নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলার একটি নির্দিষ্ট ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে সর্বজনীনভাবে এই কার্ড বিতরণ করা হবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্যমতে, প্রথম পর্যায়ে যে এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • ঢাকা বিভাগ: ঢাকার কড়াইল বস্তি এলাকা এবং রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ৪ বা ৫ নং ওয়ার্ড।

  • চট্টগ্রাম বিভাগ: চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ৪ নং ওয়ার্ড এবং বান্দরবানের লামা উপজেলার ২ বা ৩ নং ওয়ার্ড।

  • খুলনা বিভাগ: খুলনার খালিশপুর উপজেলার ১০ নং ওয়ার্ড।

  • চট্টগ্রাম/সিলেট সংলগ্ন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১ বা ২ নং ওয়ার্ড।

চার মাসের পরীক্ষামূলক সময়কাল

এই পরীক্ষামূলক পর্যায়টি আগামী চার মাস ধরে চলবে। এই সময়ে ডাটা সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি (যেমন: সার্ভার ডাউন হওয়া, ওটিপি না আসা) চিহ্নিতকরণ এবং অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। চার মাস পর থেকে ধীরে ধীরে এটি অন্যান্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে পুরো উপজেলায় সম্প্রসারিত করে পুরো দেশকে এর আওতায় আনা হবে।

অর্থনৈতিক সহায়তা ও তহবিল ব্যবস্থাপনা

ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান (Direct Cash Transfer) ব্যবস্থা। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এটি নিম্নআয়ের মানুষের নিত্যদিনের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

মাসিক ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা

নির্বাচিত প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এই অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি থেকে সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট (যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট) অথবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জিটুপি (G2P – Government to Person) পদ্ধতিতে ট্রান্সফার করা হবে। এর ফলে সুবিধাভোগীদের কোনো সরকারি অফিসে ধরনা দিতে হবে না এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের কমিশন খাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন সাব-কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই প্রকল্পের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শেষ ভাগে হওয়ায় আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয়ের থোক বরাদ্দ থেকে এই প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হচ্ছে। প্রথম মাসের অর্থ প্রদান এবং পাইলট বাস্তবায়ন খরচের জন্য সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ২.১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে এটি জাতীয় বাজেটের নিয়মিত অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হলো, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক সুরক্ষা বাজেটকে মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) ৩ শতাংশে উন্নীত করা। এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ অর্থ গেলে বাজারে চাহিদা বাড়ে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সচল রাখে।

সুবিধাভোগী নির্বাচনের মানদণ্ড ও কঠোর নীতিমালা

সরকারি ভাতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অভিযোগ থাকে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির। কারা এই কার্ড পাবেন এবং কীভাবে তাদের নির্বাচন করা হবে, সে বিষয়ে সরকার এবার অত্যন্ত কঠোর, স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি গ্রহণ করেছে।

কারা পাবেন এই ফ্যামিলি কার্ড?

মাসিক আয়, সম্পদ এবং জমির মালিকানার ওপর ভিত্তি করে অতি দরিদ্র (Ultra-poor) ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

  • জমির মালিকানা: গ্রামাঞ্চলে যেসব পরিবারের বসতভিটা ও আবাদি জমি মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ ০.৫০ একর (অর্ধ একর) বা তার কম, কেবল তারাই এই কার্ডের আওতায় আসবেন।

  • বিশেষ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত জনগোষ্ঠী: ভূমিহীন, গৃহহীন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যেমন হিজড়া, বেদে সম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবারগুলোকে এই কর্মসূচিতে সবার আগে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

কারা সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়বেন?

এই কর্মসূচির স্বচ্ছতা রক্ষার্থে কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যা থাকলে কোনো পরিবার এই কার্ড পাবে না। যদি পরিবারের কোনো সদস্য:

  • নিয়মিত সরকারি চাকরিজীবী বা সরকারি পেনশনার হন।

  • কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা কমার্শিয়াল লাইসেন্সধারী বড় ব্যবসায়ী হন।

  • ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার/মাইক্রোবাস) বা এয়ার কন্ডিশনার (AC) ব্যবহার করেন।

    এই শর্তগুলোর কোনো একটি পূরণ হলে সেই পরিবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়বে।

নারীর ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ডের যুগান্তকারী ভূমিকা

এই প্রকল্পের একটি অনন্য এবং প্রশংসনীয় দিক হলো নারীর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ। ফ্যামিলি কার্ডটি পরিবারের প্রধান পুরুষ সদস্যের বদলে মা অথবা পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে।

আর্থিক সহায়তার ২,৫০০ টাকা সরাসরি ওই নারীর মোবাইল অ্যাকাউন্টে জমা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে প্রমাণিত যে, পরিবারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ যখন নারীর হাতে থাকে, তখন সেই অর্থের বেশিরভাগ ব্যয় হয় সন্তানের শিক্ষা, পুষ্টি এবং পরিবারের স্বাস্থ্যখাতে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রীও এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, একজন নারী যখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন, তখন পুরো পরিবার স্বনির্ভর হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুফল ভোগ করবে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-5) বা জেন্ডার সমতা অর্জনে বাংলাদেশের একটি বড় পদক্ষেপ।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: বহু-স্তরীয় মনিটরিং

ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা যাতে প্রকৃত হকদারদের কাছে পৌঁছায় এবং কোনো ধরনের দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব না খাটে, সেজন্য সরকার সম্পূর্ণ নতুন একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ (Door-to-door Data Collection)

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ইউনিয়ন পরিষদ অফিস বা রাজনৈতিক নেতার বাসা থেকে তালিকা তৈরি করা হবে না। মাঠ পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তারা সরাসরি ঘরে ঘরে গিয়ে (Door-to-door) তথ্য সংগ্রহ করছেন। মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় কোনো দলীয় কর্মী বা গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা থাকবে না। কোনো ধরনের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বৈষম্য ছাড়া এটি একটি ‘সর্বজনীন’ (Universal) কার্ড হিসেবে কাজ করবে।

প্রশাসনিক তদারকি ও দুই স্তরের যাচাই

উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (UNO) নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিটি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটি মাঠ পর্যায়ের কাজ পরিচালনা করবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি ওয়ার্ডের তথ্য তদারকির জন্য একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভুল এড়াতে বা ভুয়া নাম ঠেকাতে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য দুই স্তরের (Two-tier checking and rechecking) সিস্টেম রাখা হয়েছে। ন্যাশনাল আইডি (NID) কার্ডের সার্ভারের সাথে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি যুক্ত থাকায় একই ব্যক্তি একাধিকবার সুবিধা নিতে পারবেন না।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্ভাব্য আর্থ-সামাজিক প্রভাব

১০ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া এই কর্মসূচি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বহুমুখী প্রভাব ফেলবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

১. মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা: বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন মাসে ২,৫০০ টাকার এই নিশ্চিত আয় নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

২. পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ: প্রান্তিক পরিবারগুলো নগদ অর্থ পেলে তাদের খাদ্য তালিকায় প্রোটিন ও ভিটামিন জাতীয় খাবারের পরিমাণ বাড়বে, যা শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর পাশাপাশি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে।

৩. স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ: অনেক দরিদ্র পরিবার অর্থের অভাবে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারে না বা শিশুশ্রমে বাধ্য করে। ফ্যামিলি কার্ডের এই আর্থিক নিশ্চয়তা শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

৪. ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার: মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছানোর ফলে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Digital Financial Inclusion) আরও ত্বরান্বিত হবে।

সতর্কতা ও প্রতারণা রোধে সাধারণ মানুষের করণীয়

যেহেতু এটি একটি বড়মাপের সরকারি উদ্যোগ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ এর সাথে জড়িত, তাই কিছু অসাধু চক্র বা প্রতারক সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। এই কার্ড পাওয়া বা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কোনো ধরনের তদবির, সুপারিশ বা কাউকে এক টাকাও অর্থ প্রদানের প্রয়োজন নেই। কেউ যদি মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের সময় বা কার্ড দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করে, তবে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে (পুলিশ বা উপজেলা প্রশাসন) জানাতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিং এবং ডিজিটাল প্রচারণার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

একনজরে ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রকল্প

বিষয় বিস্তারিত তথ্য
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের তারিখ ১০ মার্চ, ২০২৬ (ঈদুল ফিতরের আগে)
উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
মাসিক সহায়তার পরিমাণ ২,৫০০ টাকা
প্রাথমিক আওতা (পাইলট) ১৪টি উপজেলার নির্বাচিত ওয়ার্ড (যেমন: কড়াইল বস্তি, পাংশা, পটিয়া ইত্যাদি)
প্রাথমিক সুবিধাভোগী ৬,৫০০ পরিবার (লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি পরিবার)
কার নামে কার্ড ইস্যু হবে? পরিবারের মা বা নারী প্রধানের নামে
অর্থ বিতরণের মাধ্যম সরাসরি মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (G2P পদ্ধতি)
প্রাথমিক বাজেট বরাদ্দ ২.১১ কোটি টাকা
ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্র প্রণয়ন এবং ২০২৮ সালের মধ্যে সুরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩% এ উন্নীতকরণ।

পরিশেষে বলা যায়, আগামী ১০ মার্চ শুরু হতে যাওয়া ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রকল্পটি বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। নারীর নামে সরাসরি মোবাইল অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ প্রেরণের এই ডিজিটাল ব্যবস্থা কেবল প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে। দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে, ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের যে স্বচ্ছ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রদানের একটি অনন্য মডেল হয়ে উঠবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্রে রূপান্তর করার যে দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প সরকার হাতে নিয়েছে, তা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে একটি বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

About Author
Avatar

বাংলাদেশ প্রতিনিধি থেকে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য খবর পেতে আমাদের সংবাদ ওয়েবসাইট দেখুন। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বিস্তারিত জানুন।

আরও পড়ুন