সম্পাদকীয়: গান বন্ধ নয়—মব-রাজনীতি বন্ধ হোক: আয়না ভাঙলে রাষ্ট্রের চেহারা সুন্দর হয় না

বাংলাদেশের রাজপথ ও অনলাইন—দুই জায়গাতেই এখন যে ভাষা ঘুরে ফিরে দেখা যাচ্ছে, তা ভয়ংকরভাবে একরৈখিক: “আমরা বনাম তারা।” এই “তারা”-র তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে—মিডিয়া, শিল্পী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, ‘প্রগতিশীল’, এমনকি…

Ishita Ganguly

 

বাংলাদেশের রাজপথ ও অনলাইন—দুই জায়গাতেই এখন যে ভাষা ঘুরে ফিরে দেখা যাচ্ছে, তা ভয়ংকরভাবে একরৈখিক: “আমরা বনাম তারা।” এই “তারা”-র তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে—মিডিয়া, শিল্পী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, ‘প্রগতিশীল’, এমনকি “ভিন্নমত” বললেই যে কেউ। আপনার লেখা ক্ষোভ-উগরে দেওয়া পোস্টটি আসলে এক ধরনের সময়ের দলিল: হতাশা, ক্ষতি, ক্ষোভ—সবই আছে; কিন্তু তার ভেতরেই আছে আরেক বিপদ—অপরাধের বিচার আদালতে নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার গ্যালারিতে; সত্যের মাপকাঠি প্রমাণ নয়, “লাইক-কমেন্ট”; আর সন্দেহের ফলাফল যুক্তি নয়, “দালাল” ট্যাগ।

এই মুহূর্তে “গান গাওয়া বন্ধ” বলা শুধু অতিরঞ্জিত রাগ নয়—এটা এক ধরনের আত্মসমর্পণের ঘোষণা। কারণ গান, সাহিত্য, সংবাদপত্র—এগুলো রাষ্ট্রের সৌন্দর্য-অলংকার নয়; এগুলোই সমাজের স্নায়ুতন্ত্র। স্নায়ু কেটে দিলে শরীর বেঁচে থাকে না—শুধু খিঁচুনি ওঠে। আর সেই খিঁচুনিরই নাম—মব।

সাম্প্রতিক বাস্তবতা: রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর সংবাদমাধ্যমে হামলা

ডিসেম্বর ২০২৫-এ বাংলাদেশে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে একটি উচ্চপ্রোফাইল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং “ইনকিলাব মঞ্চ”–এর মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ মারা যান—এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সহিংস বিক্ষোভ হয়। সেই সহিংসতায় ঢাকার প্রধান দুটি সংবাদমাধ্যম—প্রথম আলোদ্য ডেইলি স্টার–এর অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে; ভেতরে সাংবাদিক-কর্মীরা আটকে পড়েছিলেন—পরে উদ্ধার হন।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টা “কারা করল”—তার চেয়েও বড় “কেন করা সম্ভব হলো”। কারণ সংবাদমাধ্যমে আগুন দেওয়া, সাংবাদিককে মারধর করা, অফিস ভাঙচুর করা—এসব কেবল রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র কায়েম করার চেষ্টা। যে পক্ষই করুক, উদ্দেশ্য একটাই: ভয় দেখিয়ে বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা।

এটা নতুন নয়: ২০২৪ সালেও প্রথম আলোর বিভিন্ন অফিসে হামলা

এই সহিংসতা এক রাতের ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরেও প্রথম আলোর রাজশাহী, বগুড়া সহ একাধিক অফিসে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও কর্মীদের হুমকির খবর এসেছে।
অর্থাৎ “আজ যা ঘটল” তা একটি ধারাবাহিক প্রবণতার সর্বশেষ পর্ব—যেখানে গণমাধ্যমকে “জাতির শত্রু/বিদেশি এজেন্ট/ধর্মবিরোধী” আখ্যা দিয়ে আক্রমণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়।

ব্যক্তির মৃত্যু—রাষ্ট্রের পরীক্ষা

হাদির মৃত্যু নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড—যে কোনো রাষ্ট্রে লাল সংকেত। কিন্তু প্রশ্ন হলো: একটি মৃত্যুর বিচার দাবি করতে গিয়ে কেন সংবাদপত্র পোড়াতে হবে? কেন লাইব্রেরি, অফিস, সংস্কৃতি—টার্গেট হবে? কেন ভিন্নমত মানেই “দেশদ্রোহী/দালাল” হয়ে যাবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটাই: আমরা প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলছি, আর তার জায়গা নিচ্ছে শাস্তির ভাষা। প্রতিবাদ মানে—দায়ীদের গ্রেপ্তার, স্বচ্ছ তদন্ত, বিচার; শাস্তির ভাষা মানে—দোকান-অফিসে আগুন, সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করা, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্নের হুমকি।

‘দালাল’ ট্যাগ ও সংস্কৃতি-বিদ্বেষ: বিপদের শেকড়

আপনার লেখায় শিল্পীদের “ভারতপন্থী”, “দালাল” বলা—এটা শুধু শিল্পীদের অপমান নয়; এটা সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিঃস্ব করার প্রকল্প। কারণ শিল্পী-সাংবাদিক-শিক্ষক—এরা মত তৈরি করেন; মত তৈরি বন্ধ হলে থাকে কেবল নির্দেশ আর আনুগত্য। আর আনুগত্যের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত চায় একটাই: প্রশ্নহীন জনতা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সংস্কৃতির ভূমিকা নতুন কিছু নয়—মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও দলিল তৈরি হয়েছে, যেমন ‘মুক্তির গান’–এর মতো ডকুমেন্টেশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক লেখালেখিও দেখা যায়।
অর্থাৎ “সংস্কৃতি=শত্রু” ধারণা ইতিহাসবিরোধীও বটে। সংস্কৃতি কখনও একদলীয় সম্পত্তি নয়—এটা বহুত্বের জায়গা।

গুজবের রাজনীতি: ‘সাদি’ প্রসঙ্গের মতো ভুল তথ্য কীভাবে আগুনে ঘি ঢালে

আপনার পোস্টে “সাদিকে মারল”—এ ধরনের বাক্য গুজবের স্বাভাবিক উদাহরণ। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সাদি মহম্মদের মৃত্যু নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের মার্চে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ আছে।
এখানে মূল কথা কাউকে খাটো করা নয়—বরং বোঝানো: ভুল তথ্য যখন আবেগের সঙ্গে মিশে যায়, তখন মানুষ শোককে বিচার না বানিয়ে প্রতিশোধ বানিয়ে ফেলে। এই প্রতিশোধের প্রথম শিকার হয়—সত্য, সংলাপ, সহমত-অসম্মতের ভদ্র ভাষা।

ছায়ানটে হামলা: এটা “একটা ভবন” নয়—এটা স্মৃতি, পরিচয়, বহুত্বের ওপর আঘাত

ছায়ানটের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ছায়ানট কেবল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়; বহু দশক ধরে এটি বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীকী মঞ্চ—বিশেষত রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে ঘিরে। দ্য ডেইলি স্টারের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রমনা বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে ১৯৬৭ সাল থেকে এই নববর্ষ আয়োজন জনসম্মুখে দৃশ্যমান এক বড় সাংস্কৃতিক চিহ্ন হয়ে ওঠে—যা বাঙালি পরিচয়ের শক্ত প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
সুতরাং ছায়ানটে আগুন মানে “একটি প্রতিষ্ঠানে ক্ষতি” নয়—এটা সমাজকে বার্তা দেওয়া: বাঙালিয়ানা, বহুত্ব, গান-সাহিত্য-সংলাপ—এসবই শত্রু। আর যখন সংস্কৃতিকে শত্রু বানানো হয়, তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের নাগরিক-নৈতিকতাই হারায়—কারণ সংস্কৃতি মানুষকে মব থেকে নাগরিক বানায়।

এই আঘাতের ভয়াবহতা আরও গভীর হয় ইতিহাস মনে করলে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের আয়োজনকে লক্ষ্য করে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছিল—এ ঘটনাকে তদন্তে “অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত” হিসেবে বর্ণনা করার কথাও সংবাদে এসেছে।
আজ যখন আবার ছায়ানটই টার্গেট হয়, তখন বোঝা যায়—চেহারা বদলালেও লক্ষ্য বদলায়নি: সংস্কৃতিকে ভয় দেখিয়ে কোণঠাসা করা। যে সমাজে গান গাওয়া “পক্ষ-বিপক্ষের প্রমাণ” হয়ে যায়, সেখানে আইন নয়—শেষ কথা বলে “ভিড়”; যুক্তি নয়—শেষ কথা বলে “ট্যাগ”; আর ন্যায়বিচার নয়—শেষ কথা বলে “আগুন”।

ভূ-রাজনীতি: “সব ভারতের/আমেরিকার খেলা”—এই একলাইনের ফাঁদ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সংবেদনশীল, আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থও বাস্তব—এ নিয়ে বিশ্লেষণ হতেই পারে। কিন্তু “সবকিছুই বিদেশি ষড়যন্ত্র”—এমন একলাইনের ব্যাখ্যা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে পচায়। কারণ এতে দায়বদ্ধতা পাল্টে যায়: স্থানীয় অপরাধী হয়ে যায় ‘পিওন’, নায়ক হয়ে যায় ‘অদৃশ্য শক্তি’। ফল? তদন্ত দুর্বল হয়, বিচার থেমে যায়, আর জনতা ক্ষোভ ঢালে কাছের টার্গেটে—সংখ্যালঘু, সাংবাদিক, শিল্পী, ভিন্নমতাবলম্বী।

সাম্প্রতিক অস্থিরতায় দেখা গেছে—হাদির মৃত্যু ঘিরে বিক্ষোভে ভারতবিরোধী স্লোগানও ছিল, এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিতও সংবাদে এসেছে।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রতিটি সংকটে “বাইরের ঘাড়ে” দায় চাপিয়ে নিজের ভেতরের আইন-শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব-সংস্কৃতির দায় এড়িয়ে যায়—তাহলে সংকট কমে না, কেবল দীর্ঘস্থায়ী হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন, এবং ‘ল’ অ্যান্ড অর্ডার’–এর শূন্যতা

সংবাদ অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে আছে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সামনে—এ প্রেক্ষাপট অস্থিরতাকে আরও জটিল করছে।
এমন সময়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত—

  1. রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দ্রুত, স্বচ্ছ তদন্ত,

  2. সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা,

  3. মব সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা,

  4. অনলাইন উসকানি-ঘৃণা ছড়ানোয় আইনি ব্যবস্থা—কিন্তু তা যেন ভিন্নমত দমনের অস্ত্র না হয়।

তাহলে করণীয় কী?

এক. নাগরিকদের জন্য:

  • “দালাল/এজেন্ট” ট্যাগে হাততালি নয়—প্রমাণ চাইতে শিখুন।

  • যে সংবাদমাধ্যম পোড়ায়, সে আপনার পক্ষের হলেও গণতন্ত্রের পক্ষের নয়।

  • অনলাইনে গুজব দেখলে শেয়ার নয়—রিপোর্ট, যাচাই, থামানো।

দুই. রাষ্ট্রের জন্য:

  • মিডিয়া অফিসে হামলা মানে রাষ্ট্রের ওপর হামলা—দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

  • রাজনৈতিক সহিংসতায় ‘নিরপেক্ষ তদন্ত’ শুধু ঘোষণা নয়—পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়া হতে হবে।

  • পুলিশ-প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে “আইন-শৃঙ্খলা” কাগজে থাকবে, রাস্তায় নয়।

তিন. রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের জন্য:

  • নেতা মারা গেলে শোক হবে, প্রতিবাদ হবে—কিন্তু সহিংসতা “প্রতিবাদ” হতে পারে না।

  • সংস্কৃতিকে শত্রু বানালে আপনি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেন না—রাষ্ট্রকে অন্ধকার করেন।

শেষ কথা: স্বাধীনতা মানে কণ্ঠ রোধ নয়, কণ্ঠস্বরের নিরাপত্তা

“বাংলাদেশ ইজ ডেড”—এটা হয়তো ক্ষোভের ভাষা। কিন্তু রাষ্ট্র মরে না একদিনে; রাষ্ট্র মরে ধীরে ধীরে—যখন গানকে অপরাধ বানানো হয়, খবরকে বিশ্বাসঘাতকতা বলা হয়, আর বিচারকে আগুনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের আজ দরকার গান বন্ধ করা নয়—বরং সহিংসতার ‘ভলিউম’ কমিয়ে যুক্তির ‘ভলিউম’ বাড়ানো। দরকার—সংস্কৃতি ও সংবাদকে টার্গেট বানানোর রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করা। কারণ যে দেশ শিল্পীকে দালাল বানায়, সাংবাদিককে শত্রু বানায়—শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেও নিরাপদ রাখতে পারে না।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন