বাংলাদেশ, তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বরিশাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই শহরের বুকে পালিত হয় এমন এক দীপাবলি উৎসব, যা তার স্বাতন্ত্র্য, বিশালতা এবং ভাবগাম্ভীর্যের জন্য শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা এশিয়া মহাদেশেই অদ্বিতীয়। এটি গৃহস্থের আঙ্গিনার আনন্দময় দীপাবলি নয়, বরং এটি অনুষ্ঠিত হয় বরিশালের প্রাচীন মহাশ্মশানে। প্রতি বছর ভূত চতুর্দশীর রাতে, লক্ষ লক্ষ প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে এই মহাশ্মশান, পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায়। ধারণা করা হয়, এটিই উপমহাদেশের, এমনকি এশিয়ার বৃহত্তম শ্মশান দীপাবলি প্রাঙ্গন। এই আয়োজনটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বরিশালের শতবর্ষী ঐতিহ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং হাজারো মানুষের আবেগের এক মেলবন্ধন। দ্য ডেইলি স্টার বা প্রথম আলো-এর মতো গণমাধ্যমগুলো প্রতি বছরই এই অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী থাকে এবং এর বিশালতা তুলে ধরে।
এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় অবস্থিত প্রায় ৫.৬ একর (কিছু সূত্রমতে আরও বেশি) জমির উপর বিস্তৃত সুবিশাল মহাশ্মশান। এই শ্মশানটি নিজেই এক ইতিহাস। এটি কেবল একটি শ্মশান নয়, এটি ‘আদি শ্মশান’, ‘নব শ্মশান’ এবং ‘মহাশ্মশান’—এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত এক সুবিশাল প্রাঙ্গণ। ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায়, যখন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করেন, তখন এই মহাশ্মশানের প্রতিটি সমাধি, প্রতিটি কোণ প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক রাতে লক্ষ লক্ষ মোমবাতি ও মাটির প্রদীপ জ্বলে ওঠার দৃশ্য এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই আয়োজন দেখতে এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুধু বরিশাল বা দক্ষিণবঙ্গ নয়, সমগ্র বাংলাদেশ এবং এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন। এই জনসমাগম প্রায়শই লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যায়, যা এই উৎসবকে এক ভিন্ন মাত্রা প্রদান করে।
ইতিহাসের পাতা থেকে: বরিশালের মহাশ্মশানের জন্ম
বরিশালের এই মহাশ্মশানের ইতিহাস তার দীপাবলি উৎসবের মতোই প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে, আজ থেকে প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় আগে।
আদি শ্মশানের গোড়াপত্তন
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, বরিশাল শহর যখন ধীরে ধীরে লাভ করছিল, তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃতদেহ সৎকারের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানের প্রয়োজন অনুভূত হয়। সেই সময়ে, শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষের উদ্যোগে কাউনিয়া এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে একটি শ্মশান ঘাট প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রাচীন অংশটিই পরবর্তীকালে ‘আদি শ্মশান’ নামে পরিচিতি পায়। প্রথমদিকে এটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে এর গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
আনুমানিক ১৮৫০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে এই শ্মশানের কার্যক্রম শুরু হয় বলে ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়। তৎকালীন জমিদার ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা এই শ্মশানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই আদি শ্মশানেই প্রথম পূর্বপুরুষদের স্মরণে বাৎসরিক প্রদীপ প্রজ্জ্বালনের প্রথা শুরু হয়, যদিও তা ছিল খুবই সীমিত আকারে এবং মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
মহাশ্মশানে রূপান্তর: সময়ের দাবি
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শহরের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে আদি শ্মশানটি তার ধারণক্ষমতা হারাতে শুরু করে। এই সময়ে, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা, বিশেষ করে অশ্বিনীকুমার দত্তের মতো ব্যক্তিত্বদের অনুপ্রেরণায়, শ্মশানটিকে একটি বৃহৎ এবং সুসংগঠিত রূপ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। আদি শ্মশানের পাশেই আরও জমি অধিগ্রহণ করে ‘নব শ্মশান’ এবং পরবর্তীকালে ‘মহাশ্মশান’ অংশটি গড়ে তোলা হয়।
এই সম্প্রসারণের ফলে বরিশাল মহাশ্মশানটি শুধুমাত্র দক্ষিণবঙ্গেই নয়, সমগ্র বাংলার অন্যতম বৃহৎ শ্মশানে পরিণত হয়। এর স্থাপত্যশৈলী এবং পরিকল্পনাতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাধি মন্দির (মঠ) এখানে নির্মিত হতে থাকে, যা শ্মশান প্রাঙ্গণকে এক ভিন্ন নান্দনিক রূপ দেয়।
শ্মশান রক্ষা কমিটির ভূমিকা
বরিশাল মহাশ্মশানের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা এবং এই বাৎসরিক দীপাবলি উৎসব আয়োজনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে ‘বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি’। এই কমিটি শ্মশানের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা এবং উৎসবের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে। প্রতি বছর এই বিশাল আয়োজনকে সফল করতে কমিটিকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে সমাধি পরিষ্কার করা, আলোর ব্যবস্থা করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং লক্ষাধিক দর্শনার্থীর ভিড় সামলানো। বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় প্রশাসনও এই কমিটিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।
শ্মশান দীপাবলি: আত্মিক সংযোগের উৎসব
গৃহস্থের বাড়ির দীপাবলি আর শ্মশানের দীপাবলির মধ্যে মূলগত পার্থক্য রয়েছে। বাড়ির দীপাবলি যেখানে অশুভ শক্তিকে দূর করে শুভ শক্তির আবাহন এবং মা কালী বা লক্ষ্মীর পূজা কেন্দ্রিক, সেখানে শ্মশান দীপাবলি সম্পূর্ণরূপেই পিতৃপুরুষ বা প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
ভূত চতুর্দশী এবং পিতৃপুরুষের স্মরণ
হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী, কালীপূজার ঠিক আগের দিনটি হলো ভূত চতুর্দশী। এই তিথিতে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মা তাদের উত্তরসূরিদের দেখতে মর্ত্যে নেমে আসেন। এই বিশ্বাস থেকেই দিনটিতে তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে, তাদের পথ আলোকিত করার জন্য প্রদীপ জ্বালানো হয়। বরিশালের মহাশ্মশানের এই আয়োজনটি মূলত এই ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যাতেই অনুষ্ঠিত হয়।
এটি এমন একটি সময়, যখন শোক এবং উৎসব এক অদ্ভুত মায়াবী আবহে মিশে যায়। একদিকে যেমন থাকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে থাকে তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক পবিত্র অনুভূতি।
আয়োজনের আদ্যোপান্ত: এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা
বরিশালের মহাশ্মশানের দীপাবলি উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় ভূত চতুর্দশীর কয়েক দিন আগে থেকেই।
প্রস্তুতি পর্ব: পরিচ্ছন্নতা ও সজ্জা
উৎসবের কয়েক দিন আগে থেকেই শুরু হয় সমাধি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ। যাদের প্রিয়জনের সমাধি এই মহাশ্মশানে রয়েছে, তারা দূর-দূরান্ত থেকে এসে নিজ উদ্যোগে নিজেদের পারিবারিক সমাধিগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করেন। অনেকে সমাধিস্থলগুলোতে নতুন করে চুনকাম করান বা রঙ করেন। সমাধিগুলো ফুল দিয়ে সাজানো হয়, যা শ্মশানের গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশেও এক স্নিগ্ধতার ছোঁয়া এনে দেয়। মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি সমগ্র প্রাঙ্গণটি পরিষ্কার রাখে এবং আলোর ব্যবস্থা করে।
মূল উৎসব: লক্ষ প্রদীপের মহাযজ্ঞ
ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই উৎসবের মূল পর্ব শুরু হয়। সূর্যাস্তের পর, একযোগে লক্ষ লক্ষ মোমবাতি, আগরবাতি এবং মাটির প্রদীপ জ্বলে ওঠে। প্রতিটি সমাধির উপর, শ্মশানের প্রতিটি পথে, এমনকি গাছের নিচেও প্রদীপের সারি দেখা যায়।
- শ্রদ্ধা নিবেদন: পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রয়াত স্বজনদের সমাধির সামনে এসে দাঁড়ান। তারা প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপকাঠি জ্বেলে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
- ভোগ ও প্রার্থনা: অনেকে সমাধির সামনে প্রয়াত ব্যক্তির পছন্দের খাবার, মিষ্টান্ন, ফলমূল এবং জল উৎসর্গ করেন। পুরোহিতরা মন্ত্র পাঠ করেন, শঙ্খধ্বনি এবং কাঁসরের শব্দে সমগ্র পরিবেশ এক আধ্যাত্মিক রূপ পরিগ্রহ করে।
- আলোকসজ্জা: এই রাতে বরিশাল মহাশ্মশান এক আলোকোজ্জ্বল নগরীতে পরিণত হয়। ড্রোন থেকে তোলা ছবিতে (অনেক ইউটিউব চ্যানেলে এই দৃশ্য দেখা যায়) দেখা যায়, বিশাল এলাকা জুড়ে যেন তারার মেলা বসেছে। এই দৃশ্য এক কথায় অবিস্মরণীয়।
কেন এটি এশিয়ার বৃহত্তম?
“এশিয়ার বৃহত্তম” বা “উপমহাদেশের বৃহত্তম” শ্মশান দীপাবলি—এই তকমাটি বরিশাল মহাশ্মশানের নামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই দাবির পেছনে একাধিক জোরালো কারণ বিদ্যমান।
১. আয়তন এবং সমাধির সংখ্যা
বরিশাল মহাশ্মশানের মোট আয়তন প্রায় ৫.৬ একর বা তারও বেশি। এই সুবিশাল প্রাঙ্গণে কয়েক হাজার স্থায়ী সমাধি (মঠ) রয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য সাধারণ সমাধিস্থল রয়েছে। ভূত চতুর্দশীর রাতে এই বিশাল এলাকার প্রতিটি সমাধি এবং ফাঁকা স্থান প্রদীপের আলোয় ভরে ওঠে। আয়তনের দিক থেকে একযোগে এত বড় শ্মশান প্রাঙ্গণে দীপাবলি পালনের ঘটনা এশিয়ায় সত্যিই বিরল।
২. জনসমাগম ও অংশগ্রহণ
প্রতি বছর এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যায়। কিছু কিছু প্রতিবেদনে এই সংখ্যা দুই থেকে তিন লক্ষ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। এই জনস্রোত সামলানো বরিশাল শহরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ শুধু শ্রদ্ধা জানাতেই আসে না, এই অভূতপূর্ব আলোকসজ্জা এবং ভাবগম্ভীর পরিবেশের সাক্ষী হতেও আসে।
৩. প্রদীপের সংখ্যা
যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক গণনা নেই, তবে ধারণা করা হয়, এই রাতে বরিশাল মহাশ্মশানে জ্বলে ওঠা মোমবাতি ও প্রদীপের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। প্রতিটি পরিবার তাদের সমাধিতে একশোরও বেশি প্রদীপ জ্বালায়। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে বলেও অনেকে ধারণা করেন। এক রাতে এক জায়গায় এত বিপুল সংখ্যক প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার নজির আর কোথাও সেভাবে দেখা যায় না।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ভারতের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে বারাণসীর মতো প্রাচীন শহরগুলোতেও গঙ্গার ঘাটে দীপাবলি এবং দেব দীপাবলি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। বারাণসীর দেব দীপাবলি নিঃসন্দেহে এক বিশাল আয়োজন, যেখানে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ গঙ্গার ঘাটে জ্বালানো হয়। কিন্তু বরিশালের আয়োজনের স্বাতন্ত্র্য হলো এটি সম্পূর্ণভাবে শ্মশান বা সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে। একটি নির্দিষ্ট মহাশ্মশান প্রাঙ্গণে, শুধুমাত্র পূর্বপুরুষদের স্মরণে এত বড় পরিসরে, এত লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণে এমন দীপাবলি উৎসব সত্যিই অদ্বিতীয়।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক তাৎপর্য
বরিশাল মহাশ্মশানের দীপাবলি উৎসবটি এখন আর শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বরিশালের একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন
এই উৎসবের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। যদিও আচারটি হিন্দু ধর্মীয়, কিন্তু এই রাতে মহাশ্মশানের আলোকসজ্জা দেখতে এবং উৎসবে সামিল হতে মুসলিম, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষ ভিড় জমান। এই উৎসব বরিশালের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এই আধ্যাত্মিক পরিবেশে একাত্মতা বোধ করে। শ্মশানের বাইরে মেলা বসে, যেখানে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ কেনাকাটা করে, যা এক সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
পারিবারিক পুনর্মিলন
এই উৎসবটি অনেক বিভক্ত পরিবারের জন্য এক পুনর্মিলনের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। জীবিকার তাগিদে বা অন্য কোনো কারণে যারা বরিশাল ছেড়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, তারা অনেকেই চেষ্টা করেন ভূত চতুর্দশীর এই রাতে বরিশালে ফিরে আসতে। পূর্বপুরুষদের সমাধিস্থলে পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যা পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
পর্যটন ও অর্থনৈতিক প্রভাব
গত এক দশকে বরিশালের এই শ্মশান দীপাবলি উৎসবটি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এই উৎসবটিকে ঘিরে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নিতে পারে।
- পর্যটকের আগমন: প্রতি বছর ভারত (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ) থেকে বহু পর্যটক ও পূণ্যার্থী শুধুমাত্র এই উৎসব দেখতে বরিশালে আসেন। এছাড়া দেশি পর্যটকদের ভিড় তো আছেই।
- স্থানীয় অর্থনীতি: এই উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক ধরনের গতি সঞ্চার হয়। মোমবাতি, প্রদীপ, ফুল, ধূপকাঠি, মিষ্টান্ন ইত্যাদির ব্যবসা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতও এই সময় বেশ লাভবান হয়।
আধুনিক সময়ের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ
এত বড় একটি আয়োজন প্রতি বছর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রতি বছরই নতুন নতুন বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
ভিড় ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা
লক্ষাধিক মানুষের ভিড় সামলানো এই আয়োজনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শ্মশানের ভেতরের সরু পথগুলোতে ভিড়ের চাপ প্রচণ্ড থাকে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধ করতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব এবং স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমেও সমগ্র এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরিবেশগত সচেতনতা
লক্ষ লক্ষ মোমবাতি ও প্লাস্টিকের মোড়ক শ্মশান প্রাঙ্গণে পরিবেশগত ঝুঁকির সৃষ্টি করে। উৎসবের পরদিন শ্মশান প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করা একটি বড় কাজ। বর্তমানে মাটির প্রদীপ (দিয়া) ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব। আয়োজকরা পরিবেশগত দিকটি নিয়েও zunehmend সচেতন হচ্ছেন।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ
মহাশ্মশানের অনেক প্রাচীন সমাধি বা মঠগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা একটি বড় দায়িত্ব। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বরিশালের মহাশ্মশানের দীপাবলি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। এটি শোক, শ্রদ্ধা, উৎসব এবং লক্ষ লক্ষ প্রদীপের আলোর এক অপার্থিব মিশ্রণ। শতবর্ষ ধরে এই প্রথা চলে আসছে এবং সময়ের সাথে সাথে এর বিশালতা বেড়েই চলেছে। কীর্তনখোলার তীরে অবস্থিত এই মহাশ্মশান ভূত চতুর্দশীর রাতে যে রূপ ধারণ করে, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। এটি কেবল এশিয়ার বৃহত্তম শ্মশান দীপাবলিই নয়, এটি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক মূর্ত প্রতীক। যতদিন কীর্তনখোলা বয়ে চলবে, ততদিন বরিশালের এই মহাশ্মশানে পূর্বপুরুষদের স্মরণে লক্ষ প্রদীপ জ্বলতে থাকবে, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে সমুজ্জ্বল করে রাখবে।











