যে রহস্যময় কারণে বেগম রোকেয়ার শেষ শয্যা হলো পানিহাটি—কলকাতা নয়!

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, যাঁর কর্মজীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা, তাঁর মরদেহ কেন সেই শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পানিহাটির এক অখ্যাত কোণে সমাধিস্থ…

Ishita Ganguly

 

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, যাঁর কর্মজীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা, তাঁর মরদেহ কেন সেই শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পানিহাটির এক অখ্যাত কোণে সমাধিস্থ করা হয়েছিল? এই প্রশ্নটি ঐতিহাসিক এবং সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘ ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কৌতূহল জাগিয়ে রেখেছে। তিনি ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর কলকাতার সোদপুর রোডের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর শেষশয্যা রচিত হয় উত্তর ২৪ পরগণার পানিহাটিতে, এমন একটি জায়গায়, যার সাথে তাঁর জীবিতকালে কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এই সিদ্ধান্তের পেছনের মূল কারণগুলি অনুসন্ধান করলে তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিক জটিলতা এবং কিছু বাস্তবসম্মত বাধার চিত্র ফুটে ওঠে।

এই নিবন্ধে, আমরা বেগম রোকেয়ার জীবনের শেষ দিনগুলি, তাঁর মৃত্যুর পরিবেশ এবং সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবো। আমরা অনুসন্ধান করবো কেন কলকাতা, যেখানে তিনি তাঁর স্বপ্নের ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নারীমুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন, সেখানে তাঁর সমাধির জন্য দু’গজ জমিও বরাদ্দ হয়নি

বেগম রোকেয়া: এক যুগান্তকারী জীবনের পরিচয়

বেগম রোকেয়ার সমাধির রহস্য বোঝার আগে, তাঁর জীবন ও কর্মের বিশালতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তিনি শুধু একজন শিক্ষাবিদ বা সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের দিকনির্দেশক, যিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘অবরোধ’ প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম সার্থক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।

শৈশব ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগ

১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে রোকেয়ার জন্ম। তাঁর পিতা জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। সেই যুগে অভিজাত মুসলিম পরিবারে কঠোর পর্দা প্রথা বা ‘অবরোধ’ মানা হতো। মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রোকেয়ার দুই ভাই, ইব্রাহীম সাবের ও খলিলুর রহমান সাবের, ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। বড় ভাই ইব্রাহীম সাবেরের কাছেই রোকেয়া গভীর রাতে সবার অলক্ষ্যে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় জ্ঞানার্জন শুরু করেন। এই গোপন শিক্ষাই তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

বিবাহ ও নতুন দিগন্তের সূচনা

১৮৯৮ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে, তাঁর বিবাহ হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে। সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন একজন বিপত্নীক, উর্দুভাষী কিন্তু অত্যন্ত প্রগতিশীল ও মুক্তমনা মানুষ। তিনি রোকেয়ার অসামান্য প্রতিভা ও শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। স্বামীর অনুপ্রেরণায় রোকেয়ার জ্ঞানচর্চা নতুন মাত্রা পায়। সাখাওয়াত হোসেন তাঁকে কেবল ইংরেজি ভাষাতেই পারদর্শী করে তোলেননি, বরং দেশ-বিদেশের সাহিত্য ও সমকালীন ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রাখেন। এই সময়কালেই তিনি সাহিত্য রচনার জন্য কলম ধরেন। ১৯০৫ সালে তাঁর যুগান্তকারী ব্যঙ্গ রচনা ‘Sultana’s Dream’ (সুলতানার স্বপ্ন) মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত হয়, যা বিশ্ব নারীবাদের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইউটোপিয়ান (Utopian) সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত।

কলকাতায় কর্মজীবন: এক নারীর একক সংগ্রাম

১৯০৯ সালে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের অকাল মৃত্যু বেগম রোকেয়ার জীবনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। কিন্তু স্বামীর রেখে যাওয়া দশ হাজার টাকা পুঁজি করে তিনি স্বামীর স্বপ্ন—মুসলিম নারীদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা—বাস্তবায়িত করতে বদ্ধপরিকর হন।

সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের জন্ম

প্রথমে ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে তিনি ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ শুরু করেন। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক বাধার কারণে তিনি ভাগলপুর ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ১৯১১ সালে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার ইতিহাস (History of Kolkata) তখন ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু মুসলিম সমাজের একটা বড় অংশ তখনও ছিল রক্ষণশীলতার অন্ধকারে নিমজ্জিত।

কলকাতার ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি ছোট ভাড়াবাড়িতে মাত্র ৮ জন ছাত্রী নিয়ে নতুন করে স্কুলের সূচনা হয়। এই ৮ জন ছাত্রী জোগাড় করতে রোকেয়াকে ঘরে ঘরে ঘুরতে হয়েছে, অভিভাবকদের বোঝাতে হয়েছে, এমনকি পর্দা প্রথা মেনে চলার প্রতিশ্রুতিও দিতে হয়েছে। তিনি বোরকা পরিহিত ছাত্রীদের জন্য পর্দা-ঘেরা গাড়ির ব্যবস্থা করেন, যাতে অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত থাকুন মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারেন। এটি ছিল তাঁর বাস্তবসম্মত কৌশল—সরাসরি প্রথার সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে, প্রথার আড়ালেই প্রথা ভাঙার বীজ বপন করা।

সাহিত্য ও সামাজিক সংস্কার

স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক সংগঠনও পুরোদমে চলতে থাকে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, নারীদের মানসিক মুক্তি না ঘটলে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রকৃত মুক্তি আসবে না।

  • সাহিত্যকর্ম: তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘মতিচূর’ (দুই খণ্ড), ‘পদ্মরাগ’ (উপন্যাস), এবং ‘অবরোধ-বাসিনী’। ‘অবরোধ-বাসিনী’-তে তিনি পর্দা প্রথার নামে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক ও হাস্যকর সব বিধিনিষেধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন, যা তৎকালীন সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
  • আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম: ১৯১৬ সালে তিনি ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ (মুসলিম মহিলা সমিতি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতির মাধ্যমে তিনি দরিদ্র, বিধবা ও অসহায় নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আইনি সহায়তা প্রদানের কাজ শুরু করেন।

বেগম রোকেয়া একাই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সংগঠক, লেখক এবং সমাজ সংস্কারক। তাঁর সমস্ত কর্মজীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই কলকাতা শহর।

৯ই ডিসেম্বর ১৯৩২: এক নক্ষত্রের পতন

বেগম রোকেয়ার মৃত্যু ছিল অত্যন্ত আকস্মিক। ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর, যখন তাঁর বয়স মাত্র ৫২ বছর, তিনি কলকাতার সোদপুর রোডের (বর্তমান অচ্যুত জগদীশ চন্দ্র বসু রোড) বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। জানা যায়, তিনি সেই রাতে ‘নারীর অধিকার’ (Narir Odhikar) নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন, যা অসমাপ্ত রেখেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস (Cerebral Thrombosis) বা আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া (Sudden Cardiac Arrest)। তাঁর কোনো দীর্ঘ অসুস্থতার ইতিহাস ছিল না, তাই এই আকস্মিক প্রয়াণ তাঁর অনুগামী, ছাত্রী এবং সমাজের জন্য এক বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ছিল।

মৃত্যুর পর সেই সঙ্কটময় মুহূর্ত

একথা ভাবা স্বাভাবিক যে, যাঁর কর্মভূমি কলকাতা, যিনি কলকাতার বুকেই নারীশিক্ষার প্রদীপ জ্বেলেছেন, তাঁর মরদেহ সেই শহরের মাটিতেই সমাহিত হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বেগম রোকেয়ার মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দাফনের জন্য উপযুক্ত স্থান খোঁজা শুরু হয়। কিন্তু তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এবং কিছু বাস্তবসম্মত বাধার কারণে কলকাতায় তাঁর জন্য স্থান সংকুলান হয়নি। বিশেষ করে কলকাতার প্রধান কবরস্থানগুলিতে (যেমন গোবরা বা বাগমারি) স্থান পাওয়া সে সময় সহজ ছিল না। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, কিছু সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠী, যারা রোকেয়ার নারীশিক্ষার প্রচেষ্টাকে ভালো চোখে দেখত না, তারা তাঁর দাফনে অসহযোগিতা করেছিল বলেও জল্পনা রয়েছে।

মূল রহস্য: কেন কলকাতা নয়, পানিহাটি?

বেগম রোকেয়ার মতো এক জন ব্যক্তিত্বের দাফন নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা তৎকালীন সমাজের এক অন্ধকার দিককে তুলে ধরে। তাঁর সমাধি পানিহাটিতে হওয়ার পেছনে একাধিক সম্ভাব্য কারণ ও তত্ত্ব প্রচলিত আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণগুলি নিচে তুলে ধরা হলো।

 কলকাতার কবরস্থানে স্থানের অভাব ও জটিলতা

১৯৩২ সালের কলকাতা আজকের থেকেও ঘনবসতিপূর্ণ না হলেও, শহরের প্রধান কবরস্থানগুলি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা ‘জমাৎ’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। বেগম রোকেয়া নিজে জমিদার পরিবারের সন্তান এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, কলকাতার সামাজিক পরিমণ্ডলে তিনি ছিলেন একজন ‘বহিরাগত’ (কারণ তাঁর আদি বাড়ি রংপুর এবং স্বামীর বাড়ি ভাগলপুর)।

তদুপরি, তিনি ছিলেন নারীমুক্তির প্রবক্তা, যা রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশকে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। বাংলাপিডিয়া (Banglapedia), যা এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ দ্বারা পরিচালিত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র, তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করেছে যে তিনি সমাজের নানা বাধা সত্ত্বেও স্কুল পরিচালনা করেছেন। এই বাধা তাঁর মৃত্যুর পরেও অব্যাহত ছিল। উপযুক্ত স্থান না পাওয়ার কারণে তাঁর মরদেহ দীর্ঘ সময় ধরে অমিমাংসিত অবস্থায় পড়ে থাকে।

পানিহাটির সংযোগ: একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত

যখন কলকাতায় কোনোভাবেই স্থান সংকুলান হচ্ছিল না, তখন তাঁর পরিবারের সদস্যরা এবং ঘনিষ্ঠ অনুগামীরা বিকল্প স্থানের সন্ধান শুরু করেন। এখানেই পানিহাটির প্রসঙ্গ আসে।

পানিহাটি, যা বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগণা (North 24 Parganas) জেলার অন্তর্গত, তখন ছিল কলকাতার এক শান্ত উপশহর। বিভিন্ন গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে, পানিহাটিতে বেগম রোকেয়ার স্বামীর পরিবারের (সাখাওয়াত হোসেনের) দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয়ের কিছু জমি বা একটি পারিবারিক কবরস্থান ছিল। অন্য একটি মতানুসারে, তাঁর স্কুলের কোনো শুভানুধ্যায়ী বা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত জমিতে তাঁকে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

সবচেয়ে প্রচলিত এবং নির্ভরযোগ্য তত্ত্বটি হলো, সাখাওয়াত হোসেনের ভাগলপুরের পরিবারের সাথে সম্পর্কিত এক জমিদার বা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পারিবারিক গোরস্থান ছিল পানিহাটিতে। যেহেতু কলকাতায় সম্মানজনকভাবে ও দ্রুত দাফনকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই এই পারিবারিক সংযোগটিকেই শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এটি কোনোভাবেই বেগম রোকেয়ার প্রতি অবমাননা ছিল না, বরং সেই মুহূর্তের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক সমাধান ছিল।

কেন এই স্থানটি সম্পর্কে রোকেয়ার উল্লেখ নেই?

বেগম রোকেয়ার জীবিতকালে পানিহাটির সাথে তাঁর কোনো যোগাযোগের উল্লেখ না থাকার কারণ হলো, এই স্থানটি তাঁর কর্মজীবনের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। এটি ছিল নিছকই একটি পারিবারিক বা পরিচিত সূত্রে প্রাপ্ত স্থান, যা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। তিনি হয়তো নিজেও জানতেন না যে তাঁর শেষশয্যা এই স্থানে রচিত হবে।

তৎকালীন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, পরিবারের কাছে প্রধান লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব মরদেহ সম্মানজনকভাবে দাফন করা। তাই কলকাতা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই শান্ত স্থানটিকেই বেছে নেওয়া হয়।

বিস্মৃতির আড়ালে রোকেয়ার সমাধি

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেগম রোকেয়ার সমাধি তাঁর মৃত্যুর পর কয়েক দশক ধরে সম্পূর্ণ বিস্মৃতি ও অবহেলার অন্ধকারে ডুবে ছিল। পানিহাটির মতো একটি অখ্যাত স্থানে হওয়ায় এবং সম্ভবত প্রথমদিকে কোনো উপযুক্ত স্মৃতিফলক না থাকায়, তাঁর কবরটি স্থানীয় ঝোপজঙ্গল ও আগাছার মধ্যে হারিয়ে যায়।

সমাধি আবিষ্কার ও বর্তমান অবস্থা

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় কেটে যায়। সত্তর ও আশির দশকে কিছু প্রগতিশীল গবেষক, লেখক এবং স্থানীয় মানুষজনের উদ্যোগে বেগম রোকেয়ার হারিয়ে যাওয়া সমাধিটি খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে সহ আরও অনেক গবেষক এই প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে পানিহাটির সোদপুর অঞ্চলে (বর্তমানে সোদপুর স্টেশন রোডের কাছে) তাঁর সমাধিটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

পরবর্তীকালে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং পানিহাটি পৌরসভার উদ্যোগে সমাধিটি সংস্কার করা হয় এবং একটি উপযুক্ত স্মারক নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে স্থানটি সংরক্ষিত এবং প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর, ‘রোকেয়া দিবস’-এ, বহু মানুষ, বিশেষ করে নারী অধিকার কর্মী এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যান।

পানিহাটি পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, এই সমাধিটি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনও (West Bengal Heritage Commission) এই স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করেছে।

সমাধিস্থলের বর্তমান অবস্থান

বৈশিষ্ট্য বিবরণ
স্থান পানিহাটি, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগণা (সোদপুর স্টেশন থেকে সামান্য দূরে)
বর্তমান অবস্থা সংরক্ষিত, স্মারক স্তম্ভ সহ
পরিচালনা পানিহাটি পৌরসভা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তত্ত্বাবধানে
গুরুত্ব বেগম রোকেয়ার একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন (সমাধি)

বেগম রোকেয়ার উত্তরাধিকার: সীমানা পেরিয়ে

সমাধি যেখানেই হোক না কেন, বেগম রোকেয়ার প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর লেখনী এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই বেঁচে আছে।

  • সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল: তাঁর হাতে গড়া সেই স্কুল আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে অন্যতম সেরা সরকারি বালিকা বিদ্যালয় (Sakhawat Memorial Govt. Girls’ High School) হিসেবে পরিচিত, যা লর্ড সিনহা রোডে অবস্থিত।
  • রোকেয়া দিবস: প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর, তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিনকে সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ‘রোকেয়া দিবস’ পালিত হয়। বাংলাদেশ সরকার নারী জাগরণে অসামান্য অবদানের জন্য নারীদের “বেগম রোকেয়া পদক” প্রদান করে।
  • ** প্রাসঙ্গিকতা:** একবিংশ শতকেও, যখন নারী অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন বেগম রোকেয়ার একশো বছরেরও বেশি আগে লেখা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বা ‘অবরোধ-বাসিনী’র প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি। তিনি বাঙালি নারী মুক্তি সংগ্রামীদের (Bengali female freedom fighters) মধ্যে অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ।

বেগম রোকেয়ার মরদেহ কলকাতা ছেড়ে পানিহাটিতে সমাধিস্থ করার ঘটনাটি ছিল কিছু দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি এবং বাস্তবসম্মত বাধার ফল। এটি কোনো রাজনৈতিক বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা ছিল না, বরং তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের অসহযোগিতা এবং কলকাতায় উপযুক্ত স্থানের অভাবই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। তাঁর পরিবারের সদস্যরা সেই মুহূর্তে যা সবচেয়ে সম্মানজনক বলে মনে করেছিলেন, তাই করেছেন।

আজ, পানিহাটির সেই সমাধিটি কেবল এক নারীর শেষশয্যা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যে নারী সারাজীবন সমাজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, মৃত্যুর পরেও সেই সমাজ তাঁকে সহজে স্থান দেয়নি। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও কর্মের শিখা এতটাই প্রজ্জ্বলিত যে, মাটির নিচের সেই সমাধি আজ লক্ষ লক্ষ নারীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন