বাংলাদেশ থেকে ক্রমবর্ধমান অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং নকল ভোটার পরিচয়পত্রের ব্যাপক ব্যবহার পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে জনবিন্যাসে আমূল পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভারত সরকার ‘Special Intensive Revision’ বা ‘SIR’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচকমণ্ডলী তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল ২০২৪ সালেই BSF এর দক্ষিণ বঙ্গ ফ্রন্টিয়ারে ১১০২ জন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী গ্রেফতার হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬৯ জন বেশি। তবে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ধরা পড়া অনুপ্রবেশকারীরা কেবল সামগ্রিক সংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ। বৃহত্তর সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী সফলভাবে ভারতে প্রবেশ করে নকল পরিচয়পত্র সংগ্রহের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করাতে সক্ষম হচ্ছেন।
নকল নথিপত্রের এই জালিয়াতি কেবল অর্থনৈতিক লাভের জন্য নয়, বরং এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলি নিশ্চিত করেছে। কলকাতা পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, অনুপ্রবেশকারীরা প্রথমে নকল রেশন কার্ড সংগ্রহ করেন, অতঃপর সেটিকে ভিত্তি করে আধার কার্ড, ভোটার আইডি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তৈরি করান। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি আধার কার্ডের জন্য ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা, জন্ম সনদের জন্য ১২,০০০ টাকা এবং প্যান কার্ডের জন্য ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সংগঠিত জালিয়াতি কার্যক্রমে স্থানীয় দালাল, আইনজীবী এবং কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বরিশাল থেকে আসা ২৮ বছর বয়স্কা মডেল ও অভিনেত্রী শান্তা পল কলকাতায় গ্রেফতার হওয়ার পর পুলিশের হাতে পড়েছে দুটি আধার কার্ড, একটি ভোটার আইডি এবং একটি রেশন কার্ড। অনুরূপভাবে বরাসত থানার আইনজীবী সমীর দাস নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নকল নথিপত্র তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে জনসংখ্যার ভারসাম্যে এই অনুপ্রবেশের প্রভাব ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদ জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ২০১১ সালে ৬৭% ছিল যা ২০২৫ সালের মধ্যে ৭০% ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলস্বরূপ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১২%, কিন্তু বর্তমানে তা ২৭% ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, মালদা ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে স্থানীয় হিন্দু পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতার কারণে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর মুর্শিদাবাদ ও মালদায় হিন্দু সম্পত্তিতে আক্রমণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বহু পরিবার এই এলাকা ত্যাগে বাধ্য হয়েছে। মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলে হিন্দু ব্যবসায়ীদের পণ্য বর্জনের ঘটনাও ঘটছে, যার ফলে তারা তাদের সম্পত্তি বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এই সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মে মাসে সকল রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা সন্দেহভাজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ৩০ দিনের মধ্যে চিহ্নিত করে প্রত্যাবাসনের নির্দেশ জারি করেছে। এর পাশাপাশি রাজ্যগুলিকে প্রত্যাবাসনের পূর্বে আটক রাখার জন্য ডিটেনশন সেন্টার স্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ‘Special Intensive Revision‘ বা SIR প্রক্রিয়া চালু করেছে, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে নকল ও মৃত ভোটারদের নাম অপসারণ করা হচ্ছে। বিহারে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ৭.৯ কোটি ভোটারের মধ্যে থেকে ৬৫ লক্ষ সন্দেহজনক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এখন সারাদেশে এই প্রক্রিয়া সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) ভোটারদের সত্যতা যাচাই করবেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করবেন।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে ভারত সীমান্ত নিরাপত্তায় বিপ্লবী পরিবর্তন আনছে। ‘Comprehensive Integrated Border Management System’ বা CIBMS এর আওতায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে অত্ত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় রয়েছে ‘Pan, Tilt, and Zoom’ (PTZ) ক্যামেরা, রাতের দৃশ্য ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্সর, সিসমিক ডিটেকটর এবং অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম। BSF ইতিমধ্যে প্রথম ড্রোন স্কোয়াড্রন গঠন করেছে যা পাকিস্তান সীমান্তে নজরদারি ও আক্রমণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
বাংলাদেশ সীমান্তের ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকার মধ্যে এখনও প্রায় অর্ধেক এলাকায় বেড়া দেওয়া সম্পূর্ণ হয়নি। BSF এর দক্ষিণ বঙ্গ ফ্রন্টিয়ার ৯১৩ কিলোমিটার সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণ করে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনও বেড়াবিহীন। এই এলাকাগুলিতে নদী ও জলাভূমির কারণে প্রচলিত বেড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ইসরাইলি মডেলের উন্নত বেড়া ও প্রযুক্তিগত সমাধানের দিকে এগিয়ে চলেছে।
আসাম ও মেঘালয়ের মতো রাজ্যেও অনুপ্রবেশের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসামের বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকীয়া কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে নিয়মিত ‘পুশব্যাক’ অপারেশনের পরেও অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে, যা BSF এবং স্থানীয় পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রমাণ করে।
এই অনুপ্রবেশের আর্থ-সামাজিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা স্থানীয় শ্রমিকদের চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি থাকার কারণে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে তাদের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এর ফলে স্থানীয় শ্রমিকরা কর্মহীনতার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং মজুরি হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অতিরিক্ত চাপ, বন উজাড়, ভূমি দখল এবং অবৈধ দখলদারিত্বের মতো সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গোপন তথ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই অনুপ্রবেশের মূল কারণ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং ব্যাপক ছাঁটাই হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে, যা আরও বেশি অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পাকিস্তান ও চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। পাকিস্তান বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় ভারত ইতিমধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সাথে আলোচনা শুরু করেছে। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত BSF-BGB ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে উভয় দেশ অনুপ্রবেশ রোধ এবং আকাশসীমা লঙ্ঘন প্রতিরোধের জন্য রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এতে সীমান্তে নির্মাণ বিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং মিডিয়া প্রচারণার বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা প্রয়োজন। সীমান্ত এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারলে অনুপ্রবেশের প্রবণতা হ্রাস পাবে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে আগামী চার বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইলেকট্রনিক নজরদারির আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে টানেল সনাক্তকরণ ব্যবস্থা, উচ্চ-মাস্ট আলোকসজ্জা এবং ওয়াচটাওয়ার স্থাপনা ত্বরান্বিত করা হবে।











