বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মধ্যে বামপন্থী দলগুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী দুর্গ ধরে রেখেছে, যদিও এনডিএ-র বিশাল জয়ের ছায়ায় মহাগঠবন্ধনের সামগ্রিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিপিআই(এমএল) লিবারেশন পাঁচটি আসনে এগিয়ে থাকলেও, ২০২০-এর তুলনায় বামেরা সামান্য পিছিয়ে, কংগ্রেসের সমান্তরাল পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, এনডিএ ২০০-এরও বেশি আসনে এগিয়ে, যখন আরজেডি-নেতৃত্বাধীন মহাগঠবন্ধন মাত্র ৩০-এর কাছাকাছি। এই ফলাফল বামপন্থীদের মজবুত ভোটব্যাঙ্কের শক্তি প্রমাণ করলেও, রাজ্যের রাজনৈতিক ভূ-পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিহারের ২৪৩ আসনের নির্বাচন ৬ এবং ১১ নভেম্বর দুই পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং জাতিগত সমীকরণ ছিল মূল ইস্যু। বামপন্থী দলগুলো, বিশেষ করে লিবারেশন, শ্রমিক-কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের প্রভাব বজায় রেখেছে। নির্বাচন কমিশনের আপডেট অনুসারে, লিবারেশন ফুলওয়ারি, আররাহ, সুপৌল, ঘোসি এবং তারারি আসনে এগিয়ে আছে, যা তাদের ঐতিহ্যবাহী শক্তিকেন্দ্র। এই অগ্রগতি মহাগঠবন্ধনের মধ্যে বামের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, যদিও কংগ্রেসের দুর্বল পারফরম্যান্স গঠবন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
২০২০-এর নির্বাচনে বামপন্থীদের সাফল্য ছিল অসাধারণ—সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ১৯টি আসন থেকে ১২টি জিতেছিল, সিপিআই এবং সিপিআই(এম) প্রত্যেকে দুটি করে। কিন্তু ২০২৫-এর ফলাফলে এই সংখ্যা কমলেও, বামেরা তাদের মূল ভোটারদের ধরে রেখেছে। থিওয়েক ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, “উচ্চ ভোটার টার্নআউট অসন্তোষের সূচক, মহাগঠবন্ধন ১৪০-১৫০ আসন জিতবে।” কিন্তু বাস্তবে এনডিএ-র নিতীশ কুমারের নেতৃত্বে জাতিগত সমন্বয় এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের আকর্ষণ করেছে।
এই নির্বাচনে লিবারেশনের প্রার্থীদের মধ্যে ফুলওয়ারি থেকে গোপাল রবি দাস ৩৯,৩১৭ ভোটে এগিয়ে আছেন, যা তাদের শ্রমিক-প্রধান এলাকায় শক্তিশালী উপস্থিতি দেখায়। আররাহ আসনে কিয়ামউদ্দিন আনসারি মুসলিম ভোটের সমর্থনে এগিয়ে, যা লিবারেশনের বৈচিত্র্যময় কৌশলের ফল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, সিপিআই(এম)-এর একটি আসনে এগিয়ে থাকায় বামের মোট এগিয়ে থাকা আসন ছয়টি। এই অগ্রগতি সত্ত্বেও, মহাগঠবন্ধনের নেতা তেজস্বী যাদব বলেছেন, “আমরা ফলাফল মেনে নেব, কিন্তু গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।” তাঁর এই বক্তব্য পাটনায় এক সংবাদ সম্মেলনে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের সঙ্গে বলা হয়।
বামপন্থীদের এই পারফরম্যান্স রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০-এর পর থেকে লিবারেশন কৃষি আন্দোলন এবং শ্রমিক অধিকারের ইস্যুতে সক্রিয় ছিল, যা তাদের ভোটব্যাঙ্ককে একত্রিত করেছে। ইন্ডিয়া টুডে-র একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের দুর্বলতা সত্ত্বেও বামেরা মহাগঠবন্ধনের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, সুপৌল আসনে লিবারেশনের প্রার্থী স্থানীয় কৃষক সমস্যার উপর জোর দিয়ে এগিয়ে আছেন। এছাড়া, ঘোসি এবং তারারিতে তাদের ঐতিহ্যবাহী সমর্থন অটুট রয়েছে, যা এনডিএ-র জাতিগত কৌশলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
ফলাফলের প্রভাব রাজ্যের বিরোধী দলের কাঠামোতে পড়বে। নিউজ১৮-এর প্রতিবেদন অনুসারে, লিবারেশনের এই সাফল্য তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে পারে, যদিও আরজেডি মাত্র ২৭ আসনে এগিয়ে। দীপঙ্কর ভট্টাচার্য শুক্রবার বলেছেন, “ফলাফল মাটির বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না, কিন্তু আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।” এই বক্তব্য তাঁর পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে প্রকাশিত হয়েছে, যা হাজারো শেয়ার পেয়েছে। বামেরা বিহারে গড় ধরে রাখলেও, এনডিএ-র বিজয় নিতীশ কুমারের পঞ্চম মেয়াদ নিশ্চিত করেছে।
Left Side Belly Pain: পেটের বাম পাশে নিচের দিকে ব্যথা হয় কেন? কারণ জানলে সতর্ক হবেন আপনিও
নির্বাচনের পটভূমিতে জনসুরাজের মতো নতুন দলগুলো ব্যর্থ হলেও, বামপন্থীদের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্য। ইকোনমিক টাইমসের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, এনডিএ-র ২১০-এর বেশি আসনের এগিয়ে থাকা ২০১০-এর রেকর্ড ভাঙবে। কিন্তু লিবারেশনের পাঁচ আসনের অগ্রগতি বামেরা বিহারে গড় ধরে রাখলের প্রমাণ। স্থানীয় নেতা রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ফলাফল মহাগঠবন্ধনকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে, যেখানে বামের ভূমিকা কেন্দ্রীয় হবে।
বামপন্থীদের এই প্রতিরোধ রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন তুলেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের মতে, কংগ্রেসের ৫-৬ আসনের তুলনায় বামের ছয় আসনের এগিয়ে থাকা গঠবন্ধনের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা প্রকাশ করছে। লিবারেশনের প্রার্থীরা স্থানীয় ইস্যু যেমন বন্যা প্রতিরোধ এবং শিক্ষা সংস্কারের উপর জোর দিয়ে জিতছেন। উদাহরণস্বরূপ, ঘোসিতে তাদের প্রার্থী কৃষকদের অধিকারের প্রতিশ্রুতিতে এগিয়ে। এই সাফল্য বামেরা বিহারে গড় ধরে রাখলের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলাফলের পর বিজেপির নেতা অমিত শাহ বলেছেন, “বিহারের ভোটাররা উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে।” কিন্তু বিরোধীরা এটিকে “জাতিগত বিভাজনের ফল” বলে অভিহিত করছেন। সিপিআই(এম)-এর নেতা বলেছেন, তাদের এক আসনের এগিয়ে থাকা শ্রমিক শক্তির বিজয়। এই নির্বাচন বিহারের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে বামেরা তাদের স্থান ধরে রেখেছে। সামাজিক মাধ্যমে লিবারেশনের সমর্থকরা #LeftStrongInBihar ট্যাগ দিয়ে উদযাপন করছেন।
এই ফলাফলের তাৎপর্য বিশাল—এনডিএ-র জয় রাজ্য সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করলেও, বামেরা বিহারে গড় ধরে রাখল মহাগঠবন্ধনের ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো। লিবারেশনের পাঁচ আসনের অগ্রগতি তাদের আসন্ন বিধানসভায় প্রভাবশালী ভূমিকা নির্দেশ করে। আগামী দিনগুলোতে গঠবন্ধনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা তীব্র হবে, যেখানে বামের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হতে পারে। বিহারের রাজনীতি এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে বিকল্প শক্তির উত্থান অনিবার্য।











