বিহারে NDA-এর ঝড়ো অগ্রগতি: জোটের জাদুতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারপ্রান্তে!

 বিহার বিধানসভা নির্বাচন ২০২৫-এর ফলাফল গণনায় ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (NDA) সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। ২৪৩টি আসনের মধ্যে NDA ২০৪টিতে এগিয়ে থাকায় এটি একটি ঐতিহাসিক জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মহাগঠবন্ধনের…

Chanchal Sen

 

 বিহার বিধানসভা নির্বাচন ২০২৫-এর ফলাফল গণনায় ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (NDA) সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। ২৪৩টি আসনের মধ্যে NDA ২০৪টিতে এগিয়ে থাকায় এটি একটি ঐতিহাসিক জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মহাগঠবন্ধনের (MGB) প্রত্যাশাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে। নির্বাচন ৬ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, এবং আজকের গণনায় NDA-এর এই অগ্রগতি জোটের ঐক্যবদ্ধতা এবং ভোটের বিভাজনের ফলস্বরূপ ঘটেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই জয়ের পিছনে কী ‘জাদু মন্ত্র’ কাজ করেছে—তা জানতে হলে NDA-এর কৌশলগত পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।

বিহারের রাজনীতিতে NDA-এর এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ২০২০ সালের নির্বাচনে NDA ১২৫ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল, কিন্তু এবারের ফলাফল তা ছাপিয়ে যাচ্ছে। বিজেপি (BJP) ৯০টি আসনে, জনতা দল ইউনাইটেড (JD(U)) ৮১টিতে, লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) (LJP(RV)) ২১টিতে এবং হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা (HAM) ৪টিতে এগিয়ে আছে। এই জোটের ভোট শেয়ার ৪৭.২ শতাংশ, যা MGB-এর ৩৭.৩ শতাংশের চেয়ে ১০ শতাংশশত বেশি। এই পার্থক্য প্রথম-প্রথম-পোস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) ব্যবস্থায় আসনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিতরণ ঘটিয়েছে।

৩৬ বছর পর ভারতে টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ল নিউজিল্যান্ড, ৮ উইকেটে হারল ভারত

নির্বাচনের পটভূমি ছিল জটিল। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে NDA বিহারে ৩০টির মধ্যে ২৬টি আসন জিতেছিল, কিন্তু বিধানসভা পর্যায়ে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির ছায়া পড়েছিল। নিতীশ কুমারের নেতৃত্বাধীন JD(U) এবং বিজেপির মধ্যে জোটের ঐক্যবদ্ধতা এবারের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। LJP(RV)-এর পুনরায় যোগদান ৫.৫ শতাংশ ভোট যোগ করেছে, যা JD(U)-এর মহাদলিত এবং নন-ইয়াদব OBC ভোটারদের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জোটের সমন্বয় বিহারের ঐতিহ্যবাহী ভোট বিভাজনকে দ্বিপক্ষীয় প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত করেছে।

জোটের এই ‘জাদু মন্ত্র’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভোটের বিভাজন। প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি (JSP) ৩.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে MGB-এর অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি ভোটকে বিভক্ত করেছে। এছাড়া, অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM)-এর মতো ছোট দলগুলো মুসলিম ভোটকে ছিন্নভিন্ন করেছে। ফলে MGB-এর ভোট শেয়ার ২০২৪ লোকসভার ৪০.১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৩৭.৩ শতাংশে। এই বিভাজন NDA-কে লাভবান করেছে, বিশেষ করে যেসব আসনে ভোটের মার্জিন কম ছিল। ইফেক্টিভ নম্বর অফ পার্টিজ (ENOP) সূচক ২.৬৫-এ নেমে আসায় দ্বিপক্ষীয় লড়াইয়ে NDA-এর কেন্দ্রীভূত ভোট সুবিধা দিয়েছে।

মহিলা ভোটারদের ভূমিকা এবারের নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়েছে। JD(U)-এর কল্যাণমূলক কর্মসূচি, যেমন মহিলাদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্যোগ, তাদের সমর্থন আকর্ষণ করেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, ভোটার টার্নআউট ৬৮ শতাংশের উপরে, যার মধ্যে মহিলাদের অংশগ্রহণ বিপুল। বিজেপি সাংসদ রবি কিশন বলেছেন, “লোকেরা মোদি এবং নিতীশ কুমারের উপর বিশ্বাস রেখে ভোট দিয়েছে। মহিলা এবং নতুন ভোটাররা ঐতিহাসিক ভাবে ভোট করেছে। এটি জঙ্গলরাজের অবসান এবং ভবিষ্যতের জন্য ভোট।” এই বক্তব্য NDA-এর জয়ের মানসিকতা তুলে ধরে।

ভোটের আগে বড় চমক! বিহারের সব পরিবারকে ১০ হাজার টাকা দিচ্ছেন নীতীশ, চালু হল নতুন প্রকল্প

জাতিগত সমীকরণও NDA-এর সাফল্যের পিছনে কাজ করেছে। বিজেপি উচ্চবর্ণীয় ভোটারদের একীভূত করেছে, JD(U) EBC, মহাদলিত এবং নন-ইয়াদব OBC-কে লক্ষ্য করেছে, LJP(RV) পাসি এবং অন্যান্য দলিত সম্প্রদায়কে। বিপরীতে, MGB-এর রাজদ (RJD)-নেতৃত্বাধীন যাদব-মুসলিম জোট কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলোর সমর্থন পেলেও বিস্তার করতে পারেনি। RJD নেতা তেজস্বী যাদব রাঘোপুর আসনে পিছিয়ে পড়ায় তাদের পরাজয় আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, “NDA-এর জাতিগত জোট MGB-এর চেয়ে বৈচিত্র্যময়, যা ভোটের স্থানান্তর ঘটিয়েছে।”

NDA নেতাদের মধ্যে উল্লাসের সঞ্চার ঘটেছে। বিহার বিজেপির দায়িত্বশীল বিনোদ তাওড়ে বলেছেন, “আজ বিহারের লোকেরা NDA-কে আশীর্বাদ দিয়েছে। প্রধানমंत्री মোদির নির্দেশে গরিব, যুবক, কৃষক এবং নারীদের (GYAN) উন্নয়নের উপর জোর দিয়ে আমরা কাজ করেছি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছে সুবিধা পৌঁছে দিয়েছে NDA সরকার, এবং আজ তার ফল।” এই বক্তব্য NDA-এর কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সাফল্য তুলে ধরে। পাটনায় JD(U) অফিসে সমর্থকরা উদযাপন করছেন, যা জয়ের পরিবেশ ফুটিয়ে তুলছে।

সামাজিক মাধ্যমে এই ফলাফল নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একজন ব্যবহারকারী টুইট করেছেন, “NDA-এর বিহার জয় সত্ত্বেও, ২০ বছরের শাসনকালে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের হার এখনও দুর্বল। এই নির্বাচন থেকে লোকেরা কী শিক্ষা নেবে?” এটি জয়ের পিছনে উন্নয়নের প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে, একটি পোস্টে বলা হয়েছে, “প্রধানমंत्री মোদির ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছে—NDA-এর রেকর্ড ভারী ম্যান্ডেট। নির্বাচন কোনো ষড়যন্ত্র নয়, লোকের স্পষ্ট পছন্দ।” এই প্রতিক্রিয়াগুলো বিহারের রাজনৈতিক মনোভাবকে প্রতিফলিত করছে।

বিপক্ষের দিক থেকে পরাজয় স্বীকার করতে হচ্ছে। RJD-এর ২৯ আসন এবং কংগ্রেসের ৪টি আসনে সীমাবদ্ধতা তাদের কৌশলের ব্যর্থতা দেখাচ্ছে। তেজস্বী যাদবের স্বপ্ন ভেঙেছে, যিনি আগে বলেছিলেন বিহারে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু JSP-এর উত্থান এবং ছোট দলগুলোর ভোট বিভাজন তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বিশ্লেষক বলেছেন, “MGB ছোট দলগুলোকে যোগ করে জাতিগত মোবিলাইজেশন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।”

এই নির্বাচনের ফলাফল বিহারের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। NDA-এর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিতীশ কুমারের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করবে, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে। ভবিষ্যতে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো ত্বরান্বিত হতে পারে, কিন্তু অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির চাপ থাকবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জয় NDA-এর জাতীয় কৌশলের পরীক্ষা-বাছাই, যা অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। বিহারের লোকেরা এখন আশা করছে, এই ম্যান্ডেট উন্নয়নের গতি বাড়াবে।

About Author
Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।