২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) বিপুল ভোটের সঙ্গে ২০৫টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। বিজেপি একাই ৮৯টি আসন জিতেছে, যখন মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড) ৮৫টি আসন পেয়েছে। এই বিজয়ের পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন যে, এটি পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনকেও প্রভাবিত করবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিহারের এই সাফল্য বাংলায় পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়, কারণ দুই রাজ্যের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) নেতারা জোর দিয়ে বলছেন, বাংলার মানুষের আত্মসম্মান ও উন্নয়নের মডেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে অটুট।
বিহারের নির্বাচন ফলাফল ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে, যখন ভোটারের অংশগ্রহণ ৬৭.১৩ শতাংশ ছিল—১৯৫১ সালের পর সর্বোচ্চ। এনডিএর এই জয়ের পিছনে কাজ করেছে কল্যাণমূলক যোজনা যেমন ‘বিহার মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’, যা মহিলা ভোটারদের আকর্ষণ করেছে। বিপক্ষের মহাগঠবন্ধন (আরজেডি-কংগ্রেস) মাত্র ৩৮টি আসন পেয়েছে, যদিও তাদের ভোটশতাংশ বিজেপির চেয়ে বেশি ছিল। এই ফলাফল বিজেপির জন্য একটি বড় বুস্ট, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব কম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কারণ, বাংলার রাজনীতি সাংস্কৃতিক পরিচয়, আঞ্চলিক দলের প্রভাব এবং মুসলিম-হিন্দু ঐক্যের উপর নির্ভরশীল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে টিএমসি ২১৩টি আসন জিতে বিজেপিকে ৭৭টিতে সীমাবদ্ধ রেখেছিল, এবং ২০২৪ লোকসভায়ও বিজেপির আসন ১৮ থেকে ১২-এ নেমে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বিহারের জয় বাংলায় সম্ভব নয়—কেন, সাতটি বড় কারণ নিয়ে আলোচনা করা যাক।
প্রথম কারণ হলো সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ভুল। বিজেপি বাংলায় প্রায়ই স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সূক্ষ্মতা বুঝতে ব্যর্থ হয়। বাঙালিরা তাদের পরিচয়, ভাষা ও মর্যাদা নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। উদাহরণস্বরূপ, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নির্দেশে কংগ্রেস নেতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যা বাংলায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সিপিআই(এম) এমনকি এর প্রতিবাদে র্যালি করে গানটি গেয়েছে। বিজেপির এই অসংবেদনশীলতা হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককেও বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, “বিজেপির একক দুর্বলতা হলো বাংলার সাংস্কৃতিক বিবরণ না বোঝা”। এটি বিহারের মতো সরল জাতিগত সমীকরণে কাজ করে না, যেখানে এনডিএর জোট সহজেই অতি পশ্চাদপদ শ্রেণি ও দলিতদের একত্রিত করেছে।
দ্বিতীয় কারণ, বাংলা ভাষা ও পরিচয়ের প্রতি অসম্মান। বিজেপি অবৈধ অভিবাসীদের (প্রধানত মুসলিমদের ‘ঘুসপৈঠিয়া’ বলে) বিরুদ্ধে প্রচার চালালেও, বাস্তবে হিন্দু অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি, যার মধ্যে মাতুয়া হিন্দুরাও রয়েছে। এটি হিন্দু ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, বাংলাদেশী ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব অস্বীকার করা বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাইরের লোকের দল’ বলে অভিযোগকে শক্তিশালী করেছে। টিএমসি এই সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে মাতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে নারায়ণী বাহিনী গঠন করেছে। বিহারে এমন ভাষাগত বিভাজন নেই, যেখানে হিন্দি-প্রধান রাজনীতি সহজ। ফলে, বিহারের জয় বাংলায় সম্ভব নয়, কারণ এখানে ভাষা একটি শক্তিশালী অস্ত্র।
তৃতীয় কারণ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতা। বিজেপির নেতারা প্রায়ই বাংলার আইকনদের উপর হামলা চালান, যেমন ‘জন গণ মন’ গানটিকে জর্জ পঞ্চমের প্রশংসায় লেখা বলা বা রাজা রামমোহন রায়কে ‘মুসলিমের চাটুকার’ বলা। এগুলো বাঙালির গর্বাঘাত করে। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বন্ধের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন, এবং ঠাকুর ও তাগোরের মধ্যে পার্থক্য বোঝা বিজেপির অজ্ঞতা প্রকাশ করে। বিহারে এমন সাংস্কৃতিক আক্রমণের প্রয়োজন পড়েনি, কারণ সেখানে মোদির বিকাশমূলক ভিশন কাজ করেছে। বাংলায় এই ভুলগুলো টিএমসির জন্য সুবিধা তৈরি করছে, যারা স্থানীয় জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তোলে।
চতুর্থ কারণ, আঞ্চলিক দক্ষতার অভাব। বিহারে বিজেপি জেডিইউ ও এলজেপির মতো স্থানীয় মিত্রদের সাহায্যে জিতেছে, যারা অতি পশ্চাদপদ ও নন-ইয়াদব ওবিসি-দের একত্রিত করেছে। বাংলায় বিজেপি একা লড়ছে, টিএমসির মতো সাংস্কৃতিকভাবে দক্ষ দলের বিরুদ্ধে। টিএমসি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেয়, যা বিজেপির কেন্দ্রীয় প্রচারকে দুর্বল করে। টিএমসি স্পোকসম্যান কুনাল ঘোষ বলেছেন, “বাংলায় উন্নয়ন, ঐক্য, সম্প্রীতি, অধিকার ও আত্মসম্মানই মূল, বিহারের সমীকরণ এখানে প্রযোজ্য নয়”। বিহারের জয় বাংলায় সম্ভব নয়, কারণ এখানে কোনো শক্তিশালী মিত্র নেই।
পঞ্চম কারণ, একাধিক প্রতিপক্ষের উপস্থিতি। বাংলায় বিজেপি শুধু টিএমসির মুখোমুখি নয়, পুনরুজ্জীবিত সিপিআই(এম) ও নতুন নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসেরও। ২০২৪ লোকসভায় সিপিআই(এম) কয়েকটি আসনে ভালো করেছে, যা বিজেপির ভোট বিভক্ত করেছে। বিহারে মহাগঠবন্ধন দুর্বল ছিল, কিন্তু বাংলায় বিরোধীদের মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা রয়েছে। ঘোষ বলেছেন, “কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৫০-এর বেশি আসনে জিতবেন”। এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিহারের মতো তরঙ্গ সৃষ্টি করতে বাধা দেয়।
ষষ্ঠ কারণ, ক্ষমতাসীনতার অভাব। বিহারে নীতিশ কুমারের সরকার কল্যাণ যোজনা বিতরণ করে ভোট কিনেছে, কিন্তু বাংলায় বিজেপির কোনো স্থানীয় ভিত্তি নেই। টিএমসি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যোজনায় সাধারণের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা এবং দলিত-আদিবাসীদের জন্য ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা বাড়িয়েছে, যা বিজেপির ফ্রি-বিসি কৌশলকে প্রতিহত করেছে। ২০২৪-এ উত্তরবঙ্গের আসনগুলোতে বিজেপির মার্জিন কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, টিএমসি এই যোজনাগুলো আরও বাড়াতে পারে, যা বিহারের মহিলা রোজগার যোজনার মতো কাজ করবে। ফলে, বিহারের জয় বাংলায় সম্ভব নয়, কারণ এখানে টিএমসির ক্রেডিবিলিটি বেশি।
সপ্তম কারণ, প্রতিবাদী কল্যাণমূলক পদক্ষেপ। টিএমসি ২০১৯-এর পর বিজেপির সামাজিক জোট গড়ার চেষ্টাকে প্রতিহত করেছে। মাতুয়া, রাজবংশী ও আদিবাসীদের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাড়ানো এবং নারায়ণী বাহিনী গঠন বিজেপির মুসলিম-বিরোধী ধ্রুবীকরণকে নিরুত্তর করেছে। জারখণ্ডে বিজেপির পরাজয় দেখিয়েছে যে, প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে বিজেপির সংগ্রাম কঠিন। ঘোষ বলেছেন, “বাংলার মানুষের ভালোবাসা আহত করে অন্য রাজ্য দেখিয়ে জিততে পারবেন না”। বিহারে এমন প্রতিরোধ ছিল না, যেখানে এনডিএর সামাজিক জোট (অতি পশ্চাদপদ, নন-ইয়াদব ওবিসি, দলিত, উচ্চবর্ণ) সফল হয়েছে।
বিহারের জয় বিজেপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য, যা হিন্দি বেল্টে তাদের আধিপত্য শক্ত করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব সীমিত থাকবে, কারণ বাংলার রাজনীতি স্থানীয় পরিচয় ও কল্যাণের উপর ভিত্তি করে। আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে টিএমসি এই সাতটি কারণকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির অগ্রগতি রোধ করতে পারে। বিজেপির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝা এবং নতুন জোট গড়া, অন্যথায় বিহারের মতো সাফল্য বাংলায় অসম্ভব। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যাবে, কিন্তু এখনই বলা যায় যে, বাংলার মানুষ তাদের আত্মসম্মানকে অগ্রাধিকার দেয়।











