দশমীতে শুধু প্রতিমা বিসর্জন নয়, জড়িয়ে আছে অপরাজিতা ও শমী পূজার প্রাচীন ঐতিহ্য

Which Puja Perform Bijoya Dashami: বিজয়া দশমী, বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার সমাপ্তি দিবস। এই দিনটি একদিকে যেমন দেবী দুর্গার কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের কারণে বিষাদের, তেমনই অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির…

Riddhi Datta

 

Which Puja Perform Bijoya Dashami: বিজয়া দশমী, বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার সমাপ্তি দিবস। এই দিনটি একদিকে যেমন দেবী দুর্গার কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের কারণে বিষাদের, তেমনই অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক হিসেবে এক আনন্দের উৎসব। পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিশ্বের সকল বাঙালি এই দিনটি বিশেষভাবে উদযাপন করে থাকেন। তবে বিজয়া দশমী কেবলমাত্র প্রতিমা বিসর্জন এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক পৌরাণিক তাৎপর্যপূর্ণ পূজা এবং আচার-অনুষ্ঠান, যার মধ্যে অন্যতম হল অপরাজিতা পূজা এবং শমী পূজা। এই পূজাগুলি বিজয়া দশমীর প্রকৃত অর্থকে আরও গভীর এবং ব্যঞ্জনাময় করে তোলে। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিভিন্ন প্রকাশনায় বিজয়া দশমীর এই সামগ্রিক তাৎপর্যের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, যা এই দিনটির আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

সাধারণভাবে সকলেই জানেন, দশমী তিথিতে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এই প্রথাটি দুর্গাপূজার পরিসমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরও অনেক শাস্ত্রীয় আচার। বিজয়া দশমীর সকালে কল্পারম্ভের সমাপ্তি এবং ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। এরপর হয় “দর্পণ বিসর্জন”, যেখানে দেবীর প্রতিবিম্বকে আয়নার মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হয়। এই সমস্ত আচারের পরেই মূল প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই দিনেই অনুষ্ঠিত হয় অপরাজিতা পূজা, যা বিজয় এবং শক্তির প্রতীক। অন্যদিকে, শমী পূজা আমাদের মহাভারতের সেই কাহিনীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে পাণ্ডবরা তাঁদের অজ্ঞাতবাসকালে শমী বৃক্ষেই নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং দশমীর দিনেই তা পুনরুদ্ধার করে কৌরবদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। এই পূজাগুলি তাই বিজয়া দশমীর উৎসবকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে।

বিজয়া দশমীর পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য

বিজয়া দশমী কথাটি দুটি প্রধান পৌরাণিক ঘটনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ‘বিজয়া’ শব্দের অর্থ বিজয়িনী এবং ‘দশমী’ হল তিথি। এই দিনে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিজয় লাভ করেছিলেন, তাই তিনি ‘বিজয়া’। শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে, দেবী মহামায়া আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে আবির্ভূতা হন এবং শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে মহিষাসুরকে বধ করেন। এই কারণে এই দিনটিকে বিজয়া দশমী বলা হয়। এটি অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক।

অন্যদিকে, রামায়ণ অনুসারে, এই দিনেই শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কার রাজা দশানন রাবণকে বধ করেছিলেন। রাবণকে বধ করার পূর্বে রামচন্দ্র দেবী দুর্গার অকালবোধন করে তাঁর পূজা করেছিলেন এবং দেবীর আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। রাবণের দশটি মাথার কারণে তাঁর আরেক নাম ছিল দশানন, এবং তাঁকে ‘হর’ বা পরাজিত করার দিনটিই হল ‘দশেরা’ বা ‘দশহরা’। সুতরাং, বিজয়া দশমী একদিকে যেমন মাতৃশক্তির বিজয়গাথা বর্ণনা করে, তেমনই অন্যদিকে তা ধর্ম ও সত্যের জয়কে প্রতিষ্ঠা করে।

অপরাজিতা পূজা: বিজয়ের আরাধনা

বিজয়া দশমীর অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল অপরাজিতা পূজা। দেবী অপরাজিতা হলেন দেবী দুর্গারই এক রূপ, যিনি কখনো পরাজিত হন না। বিশ্বাস করা হয়, যেকোনো কাজে জয়লাভের জন্য এই দেবীর পূজা করা অপরিহার্য।

পূজার পদ্ধতি ও মন্ত্র

সাধারণত দুর্গাপূজার বিসর্জনের পর একটি অপরাজিতা গাছের নিচে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির ঈশান কোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে সেখানে অপরাজিতা লতা রেখে পূজা করা হয়।

  • সংকল্প: পূজার শুরুতে পূজারী সংকল্প মন্ত্র পাঠ করেন।
  • ধ্যান: এরপর দেবীর ধ্যান করা হয়। দেবীর রূপ শ্বেতবর্ণা, এবং তিনি চতুর্ভুজা।
  • আবাহন: মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে দেবীকে পূজার জন্য আবাহন করা হয়।
  • পূজা: পঞ্চোপচারে বা দশোপচারে দেবীর পূজা করা হয়। পূজায় সাদা এবং নীল অপরাজিতা ফুল উৎসর্গ করা হয়।
  • মন্ত্র: পূজার সময় এই মন্ত্রটি পাঠ করা হয়:অর্থাৎ, “হে দেবী, আমি আমার সাধ্যমত আপনার পূজা নিবেদন করলাম। আমাদের রক্ষা করে আপনি আপনার উত্তম স্থানে গমন করুন।”

পূজা শেষে অপরাজিতা লতা হাতে ধারণ করার প্রথা রয়েছে, যা ব্যক্তিকে সমস্ত কাজে জয়ী হতে এবং বিপদ থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

শমী পূজা: শৌর্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক

বিজয়া দশমীর দিনে শমী বৃক্ষের পূজা এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। এই পূজার শিকড় মহাভারতের গভীরে প্রোথিত।

পৌরাণিক কাহিনী

মহাভারত অনুসারে, পাণ্ডবরা যখন দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাসে যান, তখন তাঁরা তাঁদের সমস্ত দিব্যাস্ত্র একটি শমী বৃক্ষের কোটরে লুকিয়ে রাখেন। অজ্ঞাতবাসের শেষে, বিরাট রাজার রাজ্যে থাকাকালীন কৌরবরা সেই রাজ্য আক্রমণ করলে, পাণ্ডবরা শমী বৃক্ষ থেকে তাঁদের অস্ত্র পুনরুদ্ধার করেন এবং যুদ্ধে জয়লাভ করেন। সেই দিনটি ছিল আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী। সেই থেকেই এই দিনে শমী বৃক্ষের পূজার প্রচলন হয়।

পূজার নিয়মাবলী

  • গ্রামের বাইরে বা বাড়ির বাইরে ঈশান কোণে অবস্থিত শমী বৃক্ষের কাছে গিয়ে এই পূজা করা হয়।
  • পূজার পূর্বে শমী বৃক্ষকে পরিষ্কার করে তার গোড়ায় জল দেওয়া হয়।
  • এরপর ধূপ, দীপ, এবং নৈবেদ্য দিয়ে বৃক্ষের পূজা করা হয়।
  • পূজার সময় এই প্রার্থনা করা হয়:অর্থাৎ, “শমী বৃক্ষ পাপ ও শত্রু নাশ করে। এই বৃক্ষ অর্জুনের ধনু ধারণ করেছিল এবং এটি রামের প্রিয়।”

বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিনে শমী পূজা করলে তা গৃহে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি নিয়ে আসে এবং শনিদেবের প্রকোপ থেকেও রক্ষা করে।

দেবী দুর্গার বিসর্জন: বিষাদময় বিদায়

বিজয়া দশমীর সবচেয়ে পরিচিত এবং আবেগঘন পর্বটি হল দেবী দুর্গার প্রতিমা নিরঞ্জন। এই আচারের মধ্যে দিয়ে মা দুর্গাকে সপরিবারে কৈলাসে তাঁর স্বামীগৃহে ফেরত পাঠানো হয়।

দর্পণ বিসর্জন

মূল প্রতিমা বিসর্জনের আগে ‘দর্পণ বিসর্জন’ নামে একটি বিশেষ রীতি পালিত হয়। একটি পাত্রে জল নিয়ে তাতে আয়না রাখা হয় এবং সেই আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব দেখে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হয়। এটিই প্রতিমার শাস্ত্রীয় বিসর্জন। এর মাধ্যমে মৃন্ময়ী প্রতিমা থেকে চিন্ময়ী সত্তাকে বিদায় জানানো হয়।

নিরঞ্জন যাত্রা ও সিঁদুর খেলা

দর্পণ বিসর্জনের পর বিবাহিত মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। তাঁরা প্রথমে দেবীর পায়ে এবং সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে তাঁকে বরণ করেন এবং মিষ্টিমুখ করান। এরপর একে অপরের মুখে সিঁদুর মাখিয়ে দেন, যা স্বামী ও সন্তানের মঙ্গল কামনার প্রতীক। এই প্রথাটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো বলে মনে করা হয় এবং এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এরপর ঢাকের বাদ্যি, গান এবং নাচের সঙ্গে প্রতিমাকে শোভাযাত্রা করে নিকটবর্তী নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মন্ত্র পাঠ করে প্রতিমা নিরঞ্জন দেওয়া হয়। এই দৃশ্য একদিকে যেমন বিষাদের, তেমনই আবার পরবর্তী বছর মায়ের ফিরে আসার প্রতীক্ষার। বিসর্জনের পর একে অপরকে “শুভ বিজয়া” জানিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়।

আচার-অনুষ্ঠান তাৎপর্য প্রধান উপকরণ
অপরাজিতা পূজা সর্বকার্যে জয়লাভ ও বাধা-বিপত্তি নাশ। অপরাজিতা ফুল ও লতা, চন্দন, ধূপ, দীপ।
শমী পূজা শৌর্য, বিজয় এবং পাপমুক্তি। শমী বৃক্ষের পাতা, জল, সিঁদুর, অক্ষত।
দর্পণ বিসর্জন প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা থেকে মুক্তি ও শাস্ত্রীয় বিদায়। জলপূর্ণ পাত্র, আয়না, ফুল।
সিঁদুর খেলা স্বামী ও পরিবারের মঙ্গল কামনা, সামাজিক মিলন। সিঁদুর, মিষ্টি, পান পাতা, ধান, দূর্বা।
প্রতিমা নিরঞ্জন দেবীর পার্থিব রূপের অবসান ও কৈলাসে প্রত্যাবর্তন। দুর্গা প্রতিমা, ঢাকের বাদ্যি, আরতির সরঞ্জাম।

বিজয়া দশমীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

বিজয়া দশমী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সামাজিক মিলনের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের বাড়িতে যান, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং মিষ্টিমুখ করেন। ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। সমবয়সীরা একে অপরকে আলিঙ্গন করে। এই প্রথাটি সামাজিক সম্প্রীতি এবং ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্গাপূজাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম দুর্গাপূজার সময় বিশেষ ট্যুর প্যাকেজের আয়োজন করে। এছাড়াও, দশমীর পর কলকাতার রেড রোডে এক বর্ণাঢ্য কার্নিভালের আয়োজন করা হয়, যেখানে শহরের সেরা পূজা কমিটিগুলি তাদের প্রতিমা এবং শিল্পকর্ম প্রদর্শন করে। ইউনেস্কো (UNESCO) কলকাতার দুর্গাপূজাকে “Intangible Cultural Heritage of Humanity” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই উৎসবের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

পরিবেশগত উদ্বেগ ও সমাধান

ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিমা নিরঞ্জনের ফলে নদী ও জলাশয়ের দূষণ একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিমায় ব্যবহৃত রাসায়নিক রং এবং অন্যান্য অপচনশীল পদার্থ জলের বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে। এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থা এবং সরকারি দপ্তর এগিয়ে এসেছে। বর্তমানে অনেক পূজা কমিটি পরিবেশবান্ধব রং ব্যবহার করছে এবং নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিছু পৌরসভা, যেমন কোন্নগর পৌরসভা, গঙ্গার ঘাটে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে পাম্পের সাহায্যে প্রতিমা গলিয়ে ফেলার মতো উদ্ভাবনী পদ্ধতির সূচনা করেছে, যা সরাসরি গঙ্গাদূষণ রোধে সহায়ক।

বিজয়া দশমী হল আনন্দ ও বিষাদের এক মিশ্র অনুভূতি। এটি আমাদের শেখায় যে প্রত্যেক সমাপ্তিই এক নতুন সূচনার ইঙ্গিত দেয়। দেবী দুর্গার বিদায় যেমন আমাদের মনে কষ্ট দেয়, তেমনই তাঁর অশুভ শক্তির বিনাশের কাহিনী আমাদের জীবনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা জোগায়। অপরাজিতা ও শমী পূজার মতো ঐতিহ্যবাহী আচারগুলি এই দিনটিকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে একাত্ম করে।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।