বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অসংখ্য গাথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। এই মহাকাব্যের অন্যতম এক বিস্ময়কর নায়কের নাম সিপাহী হামিদুর রহমান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অকুতোভয় যোদ্ধা, যিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি বাংলাদেশের সাতজন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর, মৌলভীবাজারের ধলই সীমান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দুর্ভেদ্য মেশিনগান পোস্ট একাই ধ্বংস করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। তাঁর এই অকল্পনীয় আত্মত্যাগ সেদিন ধলই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল এবং সহযোদ্ধাদের বিজয়ী হতে সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় (Ministry of Liberation War Affairs) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক ইতিহাস এই বীরত্বের সাক্ষ্য বহন করে।
কে ছিলেন বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান?
বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জীবনকাল ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর কীর্তি অমর। তিনি ছিলেন সেই অগণিত তরুণের প্রতিচ্ছবি, যারা নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে একটি স্বাধীন পতাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
প্রারম্ভিক জীবন ও শৈশব
হামিদুর রহমানের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান ঝিনাইদহ জেলা) মহেশপুর উপজেলার খোর্দ খালিশপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম আক্কাস আলী মন্ডল এবং মাতার নাম কায়সুন নেসা। দারিদ্র্যের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন বেশিদূর এগোতে পারেনি; তিনি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তবে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল অদম্য সাহস আর দেশপ্রেমের এক সহজাত বোধ। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা হামিদুর রহমান খুব কাছ থেকে দেখেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান
১৯৭০ সালের শেষের দিকে, যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল, হামিদুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, তাঁর ১৮তম জন্মদিনে, তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে (EBR) সিপাহী হিসেবে যোগদান করেন। তাঁকে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে (EBRC) প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। সেখানেই তিনি মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ১নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হন।
মুজিবরের মূর্তি ভাঙলেই কি আন্দোলনকারীরা মুছে ফেলতে পারবে কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে থেকে?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং হামিদুর রহমানের ভূমিকা
হামিদুর রহমানের সামরিক জীবন শুরু হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে যায়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাঙালি নিধনের এক নৃশংস অভিযান শুরু করে।
২৫শে মার্চের কালরাত ও বিদ্রোহ
২৫শে মার্চের সেই কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় অবস্থানরত বাঙালি সৈন্যদের ওপর আক্রমণ চালায়। ১নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক সদস্য এই আক্রমণে শহীদ হন। সৌভাগ্যক্রমে, সিপাহী হামিদুর রহমান বেঁচে যান এবং অন্যান্য বাঙালি সৈন্যদের সাথে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
তিনি তাঁর ইউনিটের সাথে যোগ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে, মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করার জন্য যখন বিভিন্ন সেক্টর গঠন করা হয়, তখন ১নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ‘জেড ফোর্স’-এর অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এই ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন মেজর (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) জিয়াউর রহমান। হামিদুর রহমান ‘জেড ফোর্স’-এর অধীনে ৪নং সেক্টরে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরিত হন। এই সেক্টরের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র ছিল সিলেট অঞ্চলের বিস্তীর্ণ চা বাগান এবং সীমান্ত এলাকা।
ধলই সীমান্তের সম্মুখযুদ্ধ: প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাস। মুক্তিযুদ্ধ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করছিল। ৪নং সেক্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল সিলেটের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ এলাকার ধলই বর্ডার আউটপোস্ট (BOP) দখল করা।
বাংলাপিডিয়া (Banglapedia) অনুসারে, এই ধলই বিওপি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ঘাঁটি। এখানে অবস্থান করছিল পাকিস্তানি ৩০এ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের একটি শক্তিশালী দল। এই ঘাঁটি থেকে পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলে বাধা দিত এবং আশেপাশের এলাকায় নির্যাতন চালাত। ধলই ঘাঁটি দখল করা ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দখল করতে পারলে কমলগঞ্জ হয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে অগ্রসর হওয়া সহজ হতো।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ১নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ (চার্লি) কোম্পানিকে ধলই বিওপি দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল, ২৮শে অক্টোবর ভোরে তিন দিক থেকে একযোগে আক্রমণ করা হবে।
সেই কালজয়ী যুদ্ধ: ২৮শে অক্টোবর, ১৯৭১
২৮শে অক্টোবরের সেই রাত ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বৃষ্টিস্নাত। কনকনে শীত আর মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই ‘সি’ কোম্পানির ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ধলই ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হন। এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম।
আক্রমণের পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক বাধা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধারা ভোর ৪টার দিকে আক্রমণ শুরু করেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে বসেছিল। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন টের পেয়েই ভারি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে। বিশেষ করে ঘাঁটির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি লাইট মেশিনগান (LMG) পোস্ট মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে আবির্ভূত হয়। এই এলএমজি পোস্ট থেকে আসা অবিরাম গুলিবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সম্পূর্ণ থেমে যায়। বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, এলএমজি পোস্টটি ধ্বংস করতে না পারলে আক্রমণ ব্যর্থ হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল।
এই সংকটময় মুহূর্তে, ‘সি’ কোম্পানির কমান্ডার একটি বিশেষ সুইসাইডাল স্কোয়াড বা ডেল্টা প্লাটুনের ওপর এই এলএমজি পোস্ট ধ্বংস করার দায়িত্ব দেন। এই প্লাটুনের একজন সদস্য হিসেবে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন সিপাহী হামিদুর রহমান।
হামিদুর রহমানের অকল্পনীয় বীরত্ব
হামিদুর রহমানের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল যেকোনো মূল্যে সেই এলএমজি পোস্টকে স্তব্ধ করে দেওয়ার। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একাই সেই অসাধ্য সাধনে ব্রতী হন।
তখনও বৃষ্টি হচ্ছিল। হামিদুর রহমান সহযোদ্ধাদের কভারিং ফায়ারের আড়ালে ক্রল করে (বুকে হেঁটে) এলএমজি পোস্টের দিকে এগোতে শুরু করেন। মাঝের পথ ছিল সম্পূর্ণ খোলা এবং কাদাময়। তিনি পাহাড়ি ছড়া (খাল) বেয়ে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে শত্রুর চোখ এড়িয়ে এগোতে থাকেন। পাকিস্তানি স্নাইপাররা তখন চারদিকে গুলি চালাচ্ছিল। যেকোনো মুহূর্তে একটি গুলি তাঁর জীবন কেড়ে নিতে পারতো।
কিন্তু অদম্য সাহসী হামিদুর রহমান সকল ভয়কে জয় করে এলএমজি পোস্টের খুব কাছে পৌঁছে যান। তিনি তাঁর কাছে থাকা দুটি হ্যান্ড গ্রেনেড প্রস্তুত করেন। একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছে তিনি প্রথম গ্রেনেডটি চার্জ করেন। সেটি এলএমজি পোস্টের কাছে বিস্ফোরিত হলেও পোস্টটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। পাকিস্তানি সৈন্যরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গুলি চালাতে থাকে।
হামিদুর রহমান বুঝতে পারলেন, গ্রেনেডে কাজ হবে না। তিনি দ্বিতীয় গ্রেনেডটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথেই “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়ে নিজের রাইফেল হাতে এলএমজি পোস্টের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক ইতিহাস অনুযায়ী, তিনি পোস্টের ভেতরে থাকা দুই পাকিস্তানি সৈন্যের সাথে সরাসরি হাতাহাতি ও বেয়নেট যুদ্ধে লিপ্ত হন।
তাঁর এই অভাবনীয় ও বিদ্যুতগতির আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যরা হতভম্ব হয়ে যায়। হামিদুর রহমান একাই দুই পাকিস্তানি সৈন্যকে খতম করে এলএমজি পোস্টটি স্তব্ধ করে দেন।
আত্মত্যাগ ও যুদ্ধের ফলাফল
এলএমজি পোস্টটি স্তব্ধ করে দিলেও হামিদুর রহমান শত্রুর অন্য প্রান্ত থেকে আসা একটি গুলির আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। পোস্টটি ধ্বংস করার মুহূর্তেই শত্রুর আরেকটি ব্রাশফায়ার তাঁর মাথা ও বুক ভেদ করে বেরিয়ে যায়। মাটির ওপর লুটিয়ে পড়েন ১৮ বছরের এই টগবগে তরুণ। সিপাহী হামিদুর রহমান শহীদ হন, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য পূরণ করে।
তাঁর এই আত্মত্যাগের ফলাফল ছিল তাতক্ষণিক। পাকিস্তানি বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহটি ভেঙে পড়ে। এলএমজি’র গোলাবর্ষণ বন্ধ হওয়ায় হতভম্ব পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবলে চিড় ধরে। এই সুযোগে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে বাকি মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র বেগে আক্রমণ চালান এবং ধলই বিওপি দখল করে নেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের মৃতদেহ ফেলেই ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। ধলই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে, যার মূল নায়ক ছিলেন সিপাহী হামিদুর রহমান।
বীর শ্রেষ্ঠ: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। সিপাহী হামিদুর রহমান তাঁদের মধ্যে একজন এবং বয়সের দিক থেকে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।
‘বীর শ্রেষ্ঠ’ পদক এবং সাত বীর
বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য চারটি স্তরের খেতাব প্রবর্তন করে:
১. বীর শ্রেষ্ঠ (সর্বোচ্চ)
২. বীর উত্তম
৩. বীর বিক্রম
৪. বীর প্রতীক
‘বীর শ্রেষ্ঠ’ খেতাব কেবল তাঁদেরই দেওয়া হয়েছে, যাঁরা চরম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়েছেন। হামিদুর রহমানের এই অসামান্য বীরত্ব—যিনি একাই একটি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন—তাঁকে এই বিরল সম্মানের অধিকারী করে।
বাংলাদেশের সাত বীর শ্রেষ্ঠ
| নাম | পদবী | সেক্টর/বাহিনী | শাহাদাত বরণের তারিখ |
| ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর | ক্যাপ্টেন | ৭ নং সেক্টর | ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ |
| ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান | ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট | (পাকিস্তান বিমান বাহিনী) | ২০ আগস্ট, ১৯৭১ |
| সিপাহী হামিদুর রহমান | সিপাহী | ৪ নং সেক্টর | ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ |
| ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ | ল্যান্স নায়েক | ৮ নং সেক্টর | ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ |
| সিপাহী মোস্তফা কামাল | সিপাহী | ২ নং সেক্টর | ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ |
| ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার রুহুল আমিন | আর্টিফিসার | নৌবাহিনী (১০ নং সেক্টর) | ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ |
| ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ | ল্যান্স নায়েক | ১ নং সেক্টর | ৮ এপ্রিল, ১৯৭১ |
সর্বকনিষ্ঠ বীর শ্রেষ্ঠ হিসেবে তাৎপর্য
মাত্র ১৮ বছর বয়সে হামিদুর রহমানের এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার এক জ্বলন্ত প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধ কেবল পেশাদার সৈন্যদের যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক এবং হামিদুর রহমানের মতো তরুণদের গণযুদ্ধ। তাঁর এই বীরত্ব প্রমাণ করে যে, দেশপ্রেম, সাহস এবং কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।
দেহাবশেষের প্রত্যাবর্তন: নিজ ভূমিতে ফেরা
বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শাহাদাতের পর তাঁর জীবনের মতোই তাঁর সমাধিস্থল নিয়েও তৈরি হয় এক আবেগঘন ইতিহাস। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কাহিনী তাঁর বীরত্বের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ।
ত্রিপুরার আমবাসায় প্রাথমিক সমাধি
২৮শে অক্টোবর ধলই যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর, তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সহযোদ্ধারা হামিদুর রহমানের মরদেহ দ্রুত উদ্ধার করতে পারেননি। যুদ্ধের পর তাঁর মরদেহ পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে সামান্য দূরে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকায় হাতিমারা ছড়া গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে দাফন করেন।
দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে, এই মহান বীরের সমাধি ভারতেই রয়ে গিয়েছিল। ত্রিপুরার স্থানীয় জনগণ অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাঁর কবরস্থানটি দেখভাল করতেন।
৩৬ বছর পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রত্যাবর্তন
২০০৫-২০০৬ সালের দিকে বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধি ভারতে থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে।
২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই প্রচেষ্টা চূড়ান্ত রূপ পায়। বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ – BGB) এবং ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF)-এর সমন্বয়ে একটি যৌথ দল ত্রিপুরার সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ শনাক্ত ও উত্তোলন করে।
২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর, ত্রিপুরার বিবিরবাজার সীমান্ত দিয়ে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের সেসময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ছিল এক অভূতপূর্ব আবেগঘন মুহূর্ত। সীমান্তের দুই পারের মানুষ এই বীরকে শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছিলেন।
জাতির পিতার জন্মদিন: ১৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে বাংলাদেশ
পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
দেহাবশেষ ঢাকায় আনার পর ১১ ডিসেম্বর, ২০০৭ তারিখে, ঢাকা সেনানিবাসে পূর্ণ সামরিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এই বীর সন্তানকে শ্রদ্ধা জানান।
পরে, একই দিনে, বাংলাদেশের এই সূর্যসন্তানকে ঢাকার মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে (Mirpur Martyred Intellectuals’ Graveyard) পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করা হয়। ৩৬ বছর পর, বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান অবশেষে তাঁর নিজের স্বাধীন দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।
হামিদুর রহমানের উত্তরাধিকার ও স্মৃতি
বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের আত্মত্যাগ ও বীরত্বকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শকে পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
স্মৃতিস্তম্ভ ও নামকরণ
- বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর: তাঁর নিজ গ্রাম ঝিনাইদহের খোর্দ খালিশপুরে তাঁর নামে একটি গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।
- হামিদুর রহমান ডিগ্রি কলেজ: তাঁর নিজ উপজেলায় (মহেশপুর) তাঁর নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
- ধলই বিওপি স্মৃতিস্তম্ভ: যে স্থানে তিনি শহীদ হয়েছিলেন, সেই ধলই বিওপিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। এই স্থানটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান পल्ली’। এটি এখন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান।
- ঝিনাইদহ স্টেডিয়াম: ঝিনাইদহ জেলা স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে ‘বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্টেডিয়াম’।
- সেনানিবাস: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সেনানিবাসে তাঁর নামে স্থাপনা ও ভবনের নামকরণ করা হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা
বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জীবনী বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর গল্প শিশুদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর অকল্পনীয় সাহস, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমর তারকায় পরিণত করেছে।
যে আগুন নেভেনি
সিপাহী হামিদুর রহমান মাত্র ১৮ বছরের এক তরুণ ছিলেন, কিন্তু তাঁর কাঁধে ছিল একটি দেশ স্বাধীন করার বিশাল দায়িত্ব। তিনি সেই দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। ধলইয়ের সেই বৃষ্টিস্নাত রাতে তিনি যে আগুন জ্বেলেছিলেন, তা নিছক একটি এলএমজি পোস্ট ধ্বংস করেনি, তা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পতনের পথকেও প্রশস্ত করেছিল। হামিদুর রহমান প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের বীরত্ব মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন এই দেশের আকাশে লাল-সবুজ পতাকা উড়বে, ততদিন বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নাম বাঙালি জাতির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।











