আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বুধবার বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা প্রস্তুত করার সময় এসে গেছে। কারখানা থেকে শুরু করে ছোট দোকান, অফিস থেকে বাড়ি—সর্বত্র দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ঠাকুরের আরাধনার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সঠিক উপকরণ ছাড়া কি আদৌ সফল পূজা সম্ভব? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে জানুন বিশ্বকর্মা পূজার সম্পূর্ণ ফর্দমালা, যাতে আপনার পূজা হয় নিখুঁত এবং মনের মতো।
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার কৃপা পেতে হলে পূজার প্রতিটি উপকরণের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা শুধু একটি তালিকা নয়, এটি আপনার ভক্তিপূর্ণ মনোভাবের প্রকাশ। সনাতন ধর্মে বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বকর্মা হলেন বিশ্বের প্রথম স্থপতি, প্রকৌশলী এবং কারিগর। তিনিই ব্রহ্মাদেবের সপ্তম পুত্র এবং পৃথিবীর সমস্ত নির্মাণকার্যের দেবতা।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক উন্নতি এবং কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এই পূজা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। তাই সঠিক উপকরণ সংগ্রহ করে পূজার আয়োজন করা আবশ্যক।
বিশ্বকর্মা পূজার মূল উপকরণসমূহ
পূজার প্রাথমিক সামগ্রী
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা তৈরি করতে সর্বপ্রথম যেসব উপকরণ প্রয়োজন, সেগুলো হলো:
-
বিশ্বকর্মার মূর্তি বা ছবি: পূজার কেন্দ্রবিন্দু
-
তাজা ফুল: গোলাপ, গাঁদা, জুঁই এবং আমের পাতার মালা
-
হলুদ গুঁড়া: ১০০ গ্রাম পরিমাণ
-
সিঁদুর: লাল ও হলুদ দুই রকম
-
চন্দনের গুঁড়া: ৫০ গ্রাম
-
ধূপকাঠি: ২ প্যাকেট
-
কর্পূর: ২০ গ্রাম
-
তাজা ফল: কলা, আপেল, কমলা, আনার
-
মিষ্টি: সন্দেশ, রসগোল্লা অথবা বাতাসা
-
পান-সুপারি: ২১টি পান পাতা ও ১০০ গ্রাম সুপারি
-
নারকেল: জটাযুক্ত শুকনো ও পানিওয়ালা দুটি
-
চাল: ১ কেজি অক্ষত
পূজার বিশেষ উপকরণ
কলস ও অন্যান্য পাত্র:
-
মাটির কলস: ঢাকনাসহ ১টি বড় কলস
-
পিতলের কলস: ঢাকনাসহ ১টি
-
মাটির প্রদীপ: ৮টি ছোট দিয়া
-
মাটির পিরিচ: ৮টি
বস্ত্র ও সুতা:
-
লাল কাপড়: ১ মিটার (পূজার আসন বিছানোর জন্য)
-
হলুদ কাপড়: ১ মিটার
-
পৈতা (যজ্ঞোপবীত): ৫টি
-
সোনালি ও রূপালি সুতা: মূর্তি সাজানোর জন্য
-
চুনরি: লাল ও হলুদ ১টি করে
যন্ত্রপাতি ও কারিগরি সামগ্রী
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কারিগরি উপকরণ:
হাতিয়ার ও যন্ত্রাংশ:
-
হাতুড়ি: ছোট-বড় ২টি
-
স্ক্রু ড্রাইভার: বিভিন্ন সাইজের ৩-৪টি
-
বাটালি (ছেনি): ২টি
-
মাপার ফিতা: ১টি
-
করাত: ছোট আকারের ১টি
-
প্লায়ার: ১ জোড়া
-
রেঞ্চ: বিভিন্ন সাইজের ২-৩টি
-
পেরেক: ৫০ গ্রাম
-
স্ক্রু: ৫০ গ্রাম
-
বোল্ট ও নাট: ২৫টি করে
-
মোবিল তেল: ৫০০ মিলি
বিশেষ পূজা সামগ্রী
পঞ্চামৃত প্রস্তুতির উপকরণ
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালাতে পঞ্চামৃতের জন্য প্রয়োজন:
-
দুধ: ১ লিটার
-
দই: ৫০০ গ্রাম
-
মধু: ১০০ গ্রাম
-
চিনি: ২০০ গ্রাম
-
ঘি: ২০০ গ্রাম
হবন সামগ্রী
-
হবনকুণ্ড: ১টি মাটির
-
আমের কাঠ: ২ কেজি
-
নবগ্রহ সমিধা: ১ প্যাকেট
-
হবন সামগ্রী: ৫০০ গ্রাম
-
তিল: ১০০ গ্রাম
-
যব: ১০০ গ্রাম
-
গুড়: ১০০ গ্রাম
সুগন্ধি ও প্রসাধন
-
কেশর: ১০ গ্রাম
-
ইত্র: ১ শিশি
-
গোলাপজল: ২৫০ মিলি
-
গঙ্গাজল: ৫০০ মিলি
আধুনিক যুগের বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা
প্রযুক্তিগত উপকরণ
আজকের দিনে কম্পিউটার, মোবাইল এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিও বিশ্বকর্মা পূজায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর জন্য বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালায় যোগ করতে পারেন:
-
ছোট্ট ইলেকট্রনিক গ্যাজেট: যা কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার হয়
-
USB ক্যাবল ও চার্জার: প্রতীকী হিসেবে
-
ছোট টুলস বক্স: সম্পূর্ণ সরঞ্জামসহ
কারখানা ও অফিসের জন্য বিশেষ আয়োজন
বড় কারখানা বা অফিসে বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা আরও বিস্তৃত হয়:
-
বড় আকারের মূর্তি বা পট: ৩-৪ ফুট উচ্চতার
-
ব্যাপক সাজসজ্জার সামগ্রী: রঙিন কাগজ, ফেস্টুন, বাল্ব
-
শব্দ যন্ত্র: মাইক্রোফোন ও স্পিকার
-
পান্ডেল সামগ্রী: বাঁশ, কাপড়, দড়ি
বিশ্বকর্মা পূজার পদ্ধতি ও নিয়মকানুন
পূজার প্রস্তুতিপর্ব
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা সংগ্রহের পর পূজার প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোর ৫টার মধ্যে স্নান সেরে কর্মক্ষেত্র পরিষ্কার করতে হয়। সমস্ত যন্ত্রপাতি, মেশিন ও হাতিয়ার ভালো করে ধুয়ে মুছে নিতে হয়।
পূজার মূল বিধি
পূজা শুরু করতে হয় বিষ্ণু ধ্যানের মাধ্যমে। এরপর ক্রমানুসারে:
-
কলস স্থাপন: পবিত্র জলে ভর্তি করে
-
মূর্তি প্রতিষ্ঠা: যথাযোগ্য আসনে
-
ষোড়শোপচার পূজা: ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে
-
যন্ত্রপূজা: সব হাতিয়ার ও মেশিনে চন্দন, ফুল ও প্রণাম
-
আরতি ও প্রসাদ বিতরণ: পূজার সমাপনী
মন্ত্র উচ্চারণ
পূজার সময় বিশ্বকর্মার বিশেষ মন্ত্র পাঠ করতে হয়:
“দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো বিশ্বকর্মা॥”
অঞ্চলভেদে বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালার পার্থক্য
পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য
পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালায় অতিরিক্ত যোগ হয়:
-
খিচুড়ি রান্নার উপকরণ: চাল, ডাল, সবজি
-
ঘুড়ি ওড়ানোর সামগ্রী: রঙিন ঘুড়ি ও মাঞ্জা
-
ঢাক-ঢোল: উৎসবের আমেজ তৈরিতে
ঝাড়খণ্ড ও বিহারের রীতি
এই অঞ্চলে কারখানাভিত্তিক পূজায় বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা আরও ব্যাপক:
-
ভারী যন্ত্রাংশের মডেল: ক্রেন, খনন যন্ত্র
-
শ্রমিক সুরক্ষা সামগ্রী: হেলমেট, গ্লাভস
-
কয়লা ও ইস্পাত: প্রতীকী উপস্থাপনায়
বিশ্বকর্মা পূজার ব্যয় ও বাজেট পরিকল্পনা
ছোট পরিসরে পূজার খরচ
পারিবারিক বা ছোট দোকানের বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা প্রস্তুত করতে খরচ পড়বে প্রায় ১,৫০০-২,৫০০ টাকা। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
-
মূর্তি/ছবি: ২০০-৫০০ টাকা
-
ফুল ও মালা: ৩০০-৫০০ টাকা
-
পূজার সামগ্রী: ৫০০-৮০০ টাকা
-
প্রসাদ ও মিষ্টি: ৪০০-৬০০ টাকা
-
অন্যান্য: ১০০-১০০ টাকা
বড় প্রতিষ্ঠানের বাজেট
কারখানা বা বড় অফিসে বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা সংগ্রহে ব্যয় হতে পারে ২৫,০০০-১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
পূজা-পরবর্তী কর্তব্য
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা ব্যবহারের পর কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
-
ব্যবহৃত ফুল-পাতা: পবিত্র স্থানে বিসর্জন
-
প্রসাদ বিতরণ: সবার মাঝে সমানভাবে
-
পূজার জল: গাছে বা পবিত্র স্থানে ঢালা
-
মূর্তি সংরক্ষণ: যত্নসহকারে পরের বছরের জন্য
সতর্কতা ও পরামর্শ
বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা প্রস্তুত করার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখবেন:
-
পূজার সামগ্রী: বিশ্বস্ত দোকান থেকে কিনুন
-
যন্ত্রপাতি: নিরাপত্তার সাথে রাখুন
-
অগ্নি নিরাপত্তা: ধূপ-দীপ জ্বালানোর সময় সচেতন থাকুন
-
পরিবেশ সচেতনতা: প্লাস্টিক সামগ্রী এড়িয়ে চলুন
দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আশীর্বাদে আপনার কর্মজীবন হোক সফল ও নিরাপদ। বিশ্বকর্মা পূজার ফর্দমালা সঠিকভাবে প্রস্তুত করে, উপযুক্ত বিধি মেনে পূজা করুন। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বুধবার কন্যা সংক্রান্তির এই শুভদিনে বিশ্বকর্মা ঠাকুরের কৃপা আপনার উপর বর্ষিত হোক। আপনার পূজা হোক মনের মতো, কর্মক্ষেত্রে আসুক সমৃদ্ধি ও শান্তি।











