হিন্দু সংস্কৃতিতে বিবাহের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো সিঁদুর দান। বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র শুধু একটি আচার নয়, এটি দুটি আত্মার চিরকালের বন্ধনের প্রতীক। হাজার বছরের ঐতিহ্য অনুসারে, বর যখন কনের সিঁথিতে সিঁদুর দান করেন, তখন উচ্চারিত হয় এক বিশেষ বৈদিক মন্ত্র যা এই বিবাহকে সম্পূর্ণতা দান করে। আজকের এই লেখায় জানুন বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র এবং এর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।
বিয়েতে সিঁদুর দানের প্রধান মন্ত্র
হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে, বিবাহের সময় সিঁদুর দানের জন্য যে পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়, সেটি হলো:
“ওঁ শিরোভূষণ সিন্দুরং ভর্তারায়ু বিবর্ধনং।
সর্বারত্নাকরং দিব্যং সিন্দুরং পতিগৃহ্যতাম্।।”
এই মন্ত্রটি বর উচ্চারণ করেন যখন তিনি কনের সিঁথিতে সিঁদুর দান করেন। এই মন্ত্রের মাধ্যমে বর কনের দীর্ঘায়ু ও সুখী দাম্পত্য জীবনের প্রার্থনা করেন।
মন্ত্রের বাংলা অর্থ
এই পবিত্র মন্ত্রের অর্থ হলো: “হে প্রিয়া, এই সিঁদুর তোমার মাথার শোভা বর্ধক হোক এবং আমার আয়ু বৃদ্ধি করুক। এই দিব্য সিঁদুর যা সর্ব রত্নের আধার, তুমি গ্রহণ কর।” এই মন্ত্রে স্বামী তার স্ত্রীর কল্যাণ ও নিজের দীর্ঘ জীবনের কামনা করেন।
বিবাহের মূল মন্ত্র ও সিঁদুর দানের সংযোগ
বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র এর আগে উচ্চারিত হয় হিন্দু বিবাহের মূল মন্ত্র:
“যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।।”
এর অর্থ: “তোমার এই হৃদয় আমার হোক, আমার এই হৃদয় তোমার হোক।” এই মন্ত্র উচ্চারণের পর সিঁদুর দানের মাধ্যমে বিবাহ সম্পূর্ণ হয়।
সিঁদুর দানের ধর্মীয় গুরুত্ব ও তাৎপর্য
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে গুরুত্ব
হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে, সিঁদুর দানের পরেই বিবাহ সম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এটি শুধুমাত্র একটি আচার নয়, বরং একটি পবিত্র প্রতিশ্রুতি যেখানে স্বামী তার স্ত্রীকে আজীবন রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করেন। সিঁদুর সৌভাগ্যের প্রতীক এবং এর লাল রং জীবনশক্তি ও প্রেমের প্রতিনিধিত্ব করে।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র উচ্চারণের সময় বিশ্বাস করা হয় যে দেবতারা এই বিবাহকে আশীর্বাদ করেন। সিঁদুরের লাল রং রক্তের প্রতীক, যা স্বামীর জীবনদানের প্রতিশ্রুতি বহন করে। এই মুহূর্তে স্বামী প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও স্ত্রীকে রক্ষা করবেন।
প্রাত্যহিক জীবনে সিঁদুর পরার মন্ত্র
বিবাহিত নারীরা প্রতিদিন সিঁদুর পরার সময় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মন্ত্র উচ্চারণ করেন:
শরীরের বিভিন্ন অংশে সিঁদুর দানের মন্ত্র
-
সিঁথিতে: “ওঁ কৃষ্ণায় নমঃ” – এই মন্ত্র স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য উচ্চারিত হয়
-
কপালে: “ওঁ কেশবায় নমঃ” – জীবনে শান্তি ও সুখের জন্য
-
কণ্ঠে: “ওঁ গোবিন্দায় নমঃ” – কথায় শুদ্ধতা ও গৌরব বৃদ্ধির জন্য
-
শঙ্খে: “ওঁ মধুসুদনায় নমঃ” – জীবনে সুরক্ষা ও শক্তি লাভের জন্য
এই মন্ত্রগুলি নারীর জীবনে আধ্যাত্মিক শক্তি ও শান্তি নিয়ে আসে এবং দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বজায় রাখে।
সিঁদুর দানের সঠিক পদ্ধতি ও নিয়মকানুন
বিবাহের সময় সিঁদুর দানের আচার
বিবাহের অনুষ্ঠানে সপ্তপদী ও অঞ্জলি (খই পোড়ানো) সম্পন্ন হওয়ার পর সিঁদুর দানের পর্ব আরম্ভ হয়। বর একটি রৌপ্য মুদ্রা, দর্পণ বা কুশ ঘাস দিয়ে কনের সিঁথিতে সিঁদুর দান করেন। এই সময় বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র উচ্চারণ করা হয় এবং অগ্নি সাক্ষী থাকে এই পবিত্র মুহূর্তে।
সিঁদুর পরার বিধিনিষেধ
শাস্ত্র অনুসারে সিঁদুর পরার কিছু নিয়ম রয়েছে:
-
ঋতুস্রাবের সময় সিঁদুর না পরা
-
অসৌচকালে (পরিবারে মৃত্যু হলে) সিঁদুর না পরা
-
সন্ধ্যার পরে সিঁদুর পরা থেকে বিরত থাকা
-
সিঁদুর মাটিতে ফেলা একেবারেই উচিত নয়
-
পুরুষদের সিঁদুর কেনা শাস্ত্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ
সিঁদুর দানের বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক তাৎপর্য
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ
সিঁদুরে রয়েছে পারদ ও প্রাকৃতিক উপাদান যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সিঁথিতে সিঁদুর লাগালে এটি শরীরে তাপ উৎপন্ন করে এবং হরমোনের সঠিক ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
সামাজিক পরিচয়
বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র এর মাধ্যমে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা সমাজে বিবাহিত নারীর মর্যাদার প্রতীক। এটি দাম্পত্য সম্পর্কের দৃঢ়তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চিহ্ন। শাঁখা-সিঁদুর পরা নারী সমাজে সৌভাগ্যবতী হিসেবে সম্মানিত হন।
আধুনিক যুগে সিঁদুর দানের প্রাসঙ্গিকতা
আধুনিক সময়েও বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র এর গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এটি শুধু একটি প্রথা নয়, বরং দুটি হৃদয়ের মধ্যে আবেগময় সংযোগের প্রতীক। আজকের প্রজন্মের কাছেও এই মন্ত্র ও আচার গভীর অর্থ বহন করে, যা বৈবাহিক জীবনে স্থিরতা ও ভালোবাসা নিয়ে আসে।
আধুনিক বিবাহগুলিতে এই ঐতিহ্যবাহী আচার পালনের মাধ্যমে নতুন দম্পতিরা তাদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সাথে যুক্ত থাকেন এবং পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ লাভ করেন।
বিয়েতে সিঁদুর দানের মন্ত্র আমাদের সনাতন ধর্মের এক অমূল্য সম্পদ। এই পবিত্র মন্ত্র শুধু বৈবাহিক বন্ধনকে সম্পূর্ণতা দান করে না, বরং দম্পতির জীবনে আধ্যাত্মিক শক্তি ও আশীর্বাদ নিয়ে আসে। প্রতিটি হিন্দু পরিবারের উচিত এই মন্ত্রের যথার্থ অর্থ বুঝে সন্মানের সাথে এই আচার পালন করা, যা আমাদের সংস্কৃতির ঐশ্বর্য ও গভীরতার পরিচয় বহন করে।











