আপনি কি কখনো ভেবেছেন যে হঠাৎ করে শরীরে চুলকানি, ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা আপনার রক্তে এলার্জির লক্ষণ হতে পারে? আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা আমরা সাধারণ অসুস্থতা ভেবে উপেক্ষা করি, অথচ এগুলো আসলে রক্তে এলার্জির গুরুতর সংকেত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০-৩০% মানুষ বিভিন্ন ধরনের এলার্জিতে ভুগছেন এবং এই সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশে এবং ভারতের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০.৯০% মানুষের মধ্যে অ্যাজমা ও এলার্জি সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানব রক্তে এলার্জির লক্ষণগুলো কী কী, কেন হয় এবং কীভাবে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
রক্তে এলার্জি আসলে কী এবং কেন হয়?
রক্তে এলার্জি মানে হলো আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো নিরীহ পদার্থকে বিপজ্জনক ভেবে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো। এটি মূলত শরীরের একটি ভুল সিগন্যাল, যার ফলে হিস্টামিন নামক রাসায়নিক নিঃসৃত হয় এবং বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়।
বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং শহুরে জীবনধারা এলার্জির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণ এর ফলে বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমাদের শ্বাসনালী ও রক্তে প্রবেশ করে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
রক্তে এলার্জির লক্ষণ – যেগুলো আপনার জানা দরকার
ত্বকের লক্ষণসমূহ
রক্তে এলার্জির সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো ত্বকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া। এর মধ্যে রয়েছে:
-
আমবাত বা হাইভস: ত্বকে ফুলে ওঠা লাল বা সাদা দাগ যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে
-
তীব্র চুলকানি: যা রাতের বেলা আরও বেড়ে যায় এবং আরাম পাওয়া কঠিন হয়
-
একজিমা: ত্বকে শুষ্ক, লাল ও খসখসে অংশ
-
ফোলাভাব: বিশেষ করে ঠোঁট, চোখের পাতা ও মুখমণ্ডলে
শ্বাসযন্ত্রের লক্ষণ
রক্তে এলার্জির ফলে শ্বাসনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যার লক্ষণগুলো হলো:
-
ক্রমাগত হাঁচি: বিশেষ করে সকালবেলা বা নির্দিষ্ট পরিবেশে
-
নাক দিয়ে পানি পড়া: স্বচ্ছ তরল নিঃসরণ
-
নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া: যা দীর্ঘসময় স্থায়ী থাকে
-
শ্বাসকষ্ট: বুকে চাপ অনুভব ও নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা
-
কাশি: শুকনো বা কফযুক্ত যা রাতে বেড়ে যায়
চোখের লক্ষণ
-
চোখ চুলকানো ও জ্বালাপোড়া
-
চোখ থেকে পানি পড়া
-
চোখের নিচে কালো দাগ (ডার্ক সার্কেল)
-
চোখ ফুলে যাওয়া ও লালচে হওয়া
পেট ও পরিপাকতন্ত্রের লক্ষণ
খাদ্যজনিত এলার্জির ক্ষেত্রে যে রক্তে এলার্জির লক্ষণ দেখা যায়:
-
বমি বমি ভাব বা বমি
-
ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
-
পেটে ব্যথা ও কাঁপুনি
-
গ্যাসের সমস্যা
অ্যানাফাইল্যাক্সিস – সবচেয়ে ভয়ানক লক্ষণ
অ্যানাফাইল্যাক্সিস হলো রক্তে এলার্জির সবচেয়ে মারাত্মক রূপ, যা জীবনহানিকর হতে পারে। বিশ্ব এলার্জি সংস্থার ২০২০ সালের গাইডলাইন অনুযায়ী এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
-
গলা ও জিহ্বা ফুলে যাওয়া
-
শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা
-
রক্তচাপ দ্রুত কমে যাওয়া
-
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
-
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
-
সারা শরীরে তীব্র চুলকানি ও ফুসকুড়ি
এই অবস্থায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন এবং এপিনেফ্রিন ইনজেকশন দিতে হয়।
রক্তে এলার্জির প্রধান কারণসমূহ
খাদ্যজনিত এলার্জি
বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে সাধারণ খাদ্য এলার্জেনগুলো হলো:
-
গরুর দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
-
ডিম (বিশেষ করে সাদা অংশ)
-
সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি ও ঝিনুক
-
বিভিন্ন বাদাম (চিনাবাদাম, কাজুবাদাম)
-
গম ও গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার
-
মশলাজাতীয় খাবার
ওষুধজনিত এলার্জি
-
পেনিসিলিন ও অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক
-
ব্যথানাশক (আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন)
-
স্যালফা জাতীয় ওষুধ
পরিবেশগত কারণ
-
ঘরের ধুলা ও ধূলিকণা
-
ফুলের রেণু (পোলেন)
-
পোষা প্রাণীর লোম ও খুশকি
-
ছত্রাক ও ফাঙ্গাস
রক্তে এলার্জির আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ
প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে চিকিৎসকরা যে ওষুধগুলো দেন:
-
সেটিরিজিন (Cetirizine)
-
লরাটাডিন (Loratadine)
-
ফেক্সোফেনাডিন (Fexofenadine)
ইমিউনোথেরাপি
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে এলার্জেন শরীরে দিয়ে সহনশীলতা বৃদ্ধি করা হয়।
জরুরি চিকিৎসা
গুরুতর ক্ষেত্রে এপিপেন (EpiPen) ব্যবহার করা হয়, যা এপিনেফ্রিন হরমোন সমৃদ্ধ।
প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া উপায়ে রক্তে এলার্জির লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ
হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ
হলুদে থাকা কারকিউমিন প্রাকৃতিক অ্যান্টিহিস্টামিনের কাজ করে। প্রতিদিন রাতে ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়া গরম দুধে মিশিয়ে খান।
মধুর প্রাকৃতিক শক্তি
খাঁটি মধুতে প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান রয়েছে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১ চা চামচ মধু খেলে রক্তের টক্সিন দূর হয়।
আদার প্রদাহবিরোধী গুণ
আদা চা হিস্টামিনের প্রভাব কমায় এবং রক্ত পরিষ্কার রাখে। প্রতিদিন ২ বার আদা চা পান করুন।
রসুনের ডিটক্স ক্ষমতা
রসুনে থাকা অ্যালিসিন শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়। প্রতিদিন সকালে ২টি কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খান।
কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি?
যদি নিম্নোক্ত রক্তে এলার্জির লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
-
শ্বাস নিতে কষ্ট বা বুকে ব্যথা
-
মুখ, ঠোঁট বা গলা ফুলে যাওয়া
-
সারা শরীরে তীব্র চুলকানি ও ফুসকুড়ি
-
মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম
-
রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া
-
বারবার বমি বা ডায়রিয়া
এলার্জি পরীক্ষার আধুনিক পদ্ধতি
স্কিন প্রিক টেস্ট এবং রক্তে IgE এর মাত্রা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলার্জেন চিহ্নিত করা সম্ভব। সেরাম IgE টেস্টে স্বাভাবিক মাত্রা ১০০০ U/mL এর নিচে থাকে।
এলার্জি প্রতিরোধের কার্যকর উপায়
পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ
-
ঘরে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
-
এয়ার ফিল্টার ব্যবহার করুন
-
আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখুন (৪০-৫০%)
-
কার্পেট ও পুরানো কুশন এড়িয়ে চলুন
খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা
প্রক্রিয়াজাত খাবার, কৃত্রিম রং ও প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে তাজা ফলমূল, শাকসবজি ও প্রাকৃতিক খাবার খান।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
-
নিয়মিত ব্যায়াম করুন যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
-
পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘন্টা) নিশ্চিত করুন
-
মানসিক চাপ কমানোর অভ্যাস করুন
-
ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এলার্জির বর্তমান অবস্থা
বৈশ্বিক গবেষণা অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এলার্জিজনিত রোগ ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এলার্জির প্রকোপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে কারণ এটি পোলেনের মৌসুম দীর্ঘ করে এবং বায়ু দূষণ বৃদ্ধি করে।
কলকাতা ও মুম্বাই শহরে আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে হাউস ডাস্ট মাইট এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, যার ফলে এই অঞ্চলে এলার্জির হার অন্যান্য এলাকার তুলনায় ৯০% বেশি।
কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষ এলার্জির লক্ষণগুলো সম্পর্কে আরও সচেতন হয়েছে এবং তথ্য অনুসন্ধানে আগ্রহী হচ্ছে।
রক্তে এলার্জির লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া আপনার জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। মনে রাখবেন, এলার্জি একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ এবং সঠিক জ্ঞান ও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। যেকোনো সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। আপনার সচেতনতাই পারে এলার্জির জটিলতা থেকে আপনাকে রক্ষা করতে।











