মুখের ভেতরে ছোট্ট একটি ঘা বা দাঁতের সামান্য ভাঙা অংশ—বিষয়টি আমাদের কাছে এতটাই তুচ্ছ যে আমরা প্রায়শই একে গুরুত্ব দিই না। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই সামান্য অবহেলাই ডেকে আনতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়? চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, মুখের ভেতরে ক্রমাগত ঘর্ষণ বা Chronic Mechanical Irritation (CMI) থেকে হতে পারে ওরাল ক্যান্সার বা মুখগহ্বরর কর্কট রোগ। একটি ভাঙা দাঁত বা ঠিকমতো না বসা বাঁধানো দাঁতের (Denture) ধারালো অংশ যদি দীর্ঘ দিন ধরে আপনার গালের নরম অংশে, জিভে বা মাড়িতে আঘাত করতে থাকে এবং সেখানে ক্ষত সৃষ্টি করে, তবে সেই ক্ষত একসময় ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং টাটা মেমোরিয়াল সেন্টারের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সতর্ক করছে যে, তামাক সেবন না করেও শুধুমাত্র এই যান্ত্রিক ঘর্ষণের কারণে মানুষ ওরাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।
কেন ভাঙা দাঁত থেকে ক্যান্সার হয়? বিস্তারিত বিশ্লেষণ
অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, শুধুমাত্র বিড়ি, সিগারেট, গুটখা বা তামাকজাত দ্রব্য সেবনের ফলেই মুখের ক্যান্সার হয়। এটি একটি বড় ভুল ধারণা। যদিও তামাক প্রধান কারণ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। যখন একটি ভাঙা দাঁতের ধারালো অংশ বা শার্প এজ (Sharp Edge) ক্রমাগত জিভ বা গালের ভেতরের মিউকোসা (Mucosa) বা নরম চামড়ায় ঘষা খেতে থাকে, তখন সেখানে একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলা হয় ‘Traumatic Ulcer’। শরীরের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো ক্ষত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সেরে যাওয়ার কথা। কিন্তু দাঁতের খোঁচা যদি সেই ক্ষতস্থানে প্রতিদিন লাগতে থাকে, তবে ক্ষতটি শুকানোর সুযোগ পায় না। দীর্ঘদিনের এই প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কোষের ডিএনএ (DNA) কাঠামো পরিবর্তন করে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত Squamous Cell Carcinoma (SCC) বা ওরাল ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়।
Gallbladder Disease: অপারেশন ছাড়া গলব্লাডার পাথর অপসারণ: মিথ না বাস্তবতা?
প্রধান ঝুঁকির কারণসমূহ (Risk Factors)
বিশেষজ্ঞরা মুখের ক্যান্সারের জন্য ভাঙা দাঁত ছাড়াও আরও কিছু বিষয়কে দায়ী করেছেন যা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে:
-
ধারালো বা ভাঙা দাঁত: দুর্ঘটনার ফলে বা ক্যাভিটির কারণে দাঁত ভেঙে ধারালো হয়ে গেলে।
-
ত্রুটিপূর্ণ ডেনচার (Ill-fitting Dentures): বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাঁধানো দাঁত যদি মাড়ির সাথে ঠিকমতো না বসে এবং আলগা হয়ে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে।
-
ওরাল হাইজিনের অভাব: মুখ ঠিকমতো পরিষ্কার না রাখলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, যা ভাঙা দাঁতের ক্ষতকে আরও জটিল করে তোলে।
-
পুষ্টির অভাব: শরীরে ভিটামিন এবং মিনারেলের ঘাটতি থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ক্যান্সার কোষ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
পরিসংখ্যান কী বলছে? (Real-Time Data & Statistics)
ভারতের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ওরাল ক্যান্সারের প্রকোপ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। একে অনেক সময় “বিশ্বের ওরাল ক্যান্সার ক্যাপিটাল” বলা হয়। পরিসংখ্যান দেখলে এই ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।
-
গ্লোবোকান (GLOBOCAN) ২০২০-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১,৩৫,০০০-এর বেশি মানুষ নতুন করে মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৭৫,০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।
-
গবেষণায় দেখা গেছে, ওরাল ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের কোনো তামাক সেবনের ইতিহাস নেই। তাদের ক্যান্সারের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে Chronic Mechanical Irritation বা দীর্ঘস্থায়ী যান্ত্রিক ঘর্ষণকে।
-
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (ICMR)-এর তথ্য মতে, পুরুষদের মধ্যে সবধরণের ক্যান্সারের মধ্যে মুখের ক্যান্সার শীর্ষস্থানে রয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার মুখে যদি কোনো ভাঙা দাঁত থাকে এবং সেটি জিভ বা গালে খোঁচা দেয়, তবে আজই ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিয়ে সেটি মসৃণ (Grinding/Polishing) করিয়ে নিন অথবা প্রয়োজনে চিকিৎসা করান।
সাধারণ আলসার বনাম ক্যান্সারের লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন?
অনেকের মুখে মাঝেমধ্যেই সাধারণ ঘা বা অ্যাপথাস আলসার (Aphthous Ulcer) হয়, যা ভিটামিনের অভাবে বা পেট গরম হলে হতে পারে। কিন্তু সাধারণ ঘা এবং ক্যান্সারের পূর্বলক্ষণযুক্ত ঘায়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | সাধারণ মুখের ঘা (Normal Ulcer) | ক্যান্সারযুক্ত বা বিপজ্জনক ঘা (Cancerous Ulcer) |
| ব্যথা | শুরুতে খুব ব্যথা ও জ্বালা থাকে। | প্রাথমিক অবস্থায় অনেক সময় ব্যথা থাকে না (Painless), যা রোগীকে বিভ্রান্ত করে। |
| স্থায়িত্ব | ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এমনিতেই সেরে যায়। | ২ থেকে ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থাকে এবং ওষুধেও সারে না। |
| স্পর্শ অনুভূতি | নরম থাকে। | ঘা-এর চারপাশ শক্ত (Indurated) এবং উঁচু হয়ে যায়। |
| রক্তপাত | সাধারণত রক্তপাত হয় না। | সামান্য স্পর্শেই রক্তপাত হতে পারে। |
| রঙ | মাঝখানে হলুদ বা সাদাটে এবং চারপাশে লাল বর্ডার থাকে। | লাল ও সাদার মিশ্রণ (Erythroleukoplakia) বা ধূসর রঙের হতে পারে। |
মুখের ক্যান্সারের ৫টি সতর্কতামূলক লক্ষণ: জীবন বাঁচাতে সময়মতো সচেতন হোন
রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ (Diagnosis & Expert Opinion)
যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে মুখের কোনো ক্ষত ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হচ্ছে, তবে দেরি না করে একজন ওরাল প্যাথলজিস্ট বা ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ওরাল ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা:
১. ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন: চিকিৎসক আঙুল দিয়ে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে দেখবেন সেটি শক্ত হয়ে গেছে কি না।
২. বায়োপসি (Biopsy): এটি নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায়। ক্ষতস্থান থেকে সামান্য টিস্যু নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় যে সেখানে ম্যালিগন্যান্ট কোষ আছে কি না।
৩. ইমেজিং টেস্ট: ক্যান্সারের বিস্তার দেখার জন্য সিটি স্ক্যান (CT Scan) বা এমআরআই (MRI) করা হতে পারে।
National Institute of Health (NIH) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রাথমিক স্টেজে ধরা পড়লে ৫ বছরের বেঁচে থাকার হার (Survival Rate) ৮০% এর বেশি। কিন্তু স্টেজ ৩ বা ৪-এ চলে গেলে তা ৫০%-এর নিচে নেমে আসে।
চিকিৎসা পদ্ধতি (Treatment Options)
ওরাল ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের স্টেজ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর সফল চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
১. সার্জারি (Surgery)
প্রাথমিক অবস্থায় টিউমার এবং আশেপাশের কিছু সুস্থ টিস্যু অপারেশন করে বাদ দেওয়া হয়। যদি ক্যান্সার লিম্ফ নোড বা গ্ল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তবে গলার কিছু অংশও অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে (Neck Dissection)।
২. রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy)
উচ্চ শক্তির রশ্মি (X-rays) ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। সার্জারির পরে অবশিষ্ট কোষ মারতে বা এডভান্সড স্টেজে এটি ব্যবহার করা হয়।
৩. কেমোথেরাপি (Chemotherapy)
শক্তিশালী ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ করা হয়। অনেক সময় রেডিয়েশনের সাথে একযোগে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।
প্রতিরোধই সেরা উপায়: কী করবেন, কী করবেন না
ক্যান্সার হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে ক্যান্সার যাতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ভাঙা দাঁত বা ওরাল সমস্যা থেকে বাঁচতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:
-
দাঁতের ধার মসৃণ করা: যদি কোনো দাঁত ভেঙে গিয়ে জিভে বা গালে খোঁচা দেয়, তবে অবিলম্বে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে সেটি ‘স্মুদ’ বা মসৃণ করিয়ে নিন। এই ছোট পদক্ষেপটি আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।
-
ডেনচার চেকআপ: যারা বাঁধানো দাঁত ব্যবহার করেন, তারা প্রতি ৬ মাস অন্তর ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে চেক করান যে সেটি ঠিকমতো ফিট করছে কি না।
-
সেলফ এক্সামিনেশন: মাসে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের ভেতরটা ভালো করে দেখুন। কোনো লাল বা সাদা দাগ, ফোলা অংশ বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত আছে কি না লক্ষ্য করুন।
-
নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ: বছরে অন্তত দুবার ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।
-
মশলাদার খাবার বর্জন: মুখে ঘা থাকলে ঝাল ও গরম খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি জ্বালা ও প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়।
ভুল ধারণা এবং সঠিক তথ্য (Myths vs Facts)
সমাজ ওরাল ক্যান্সার নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। সঠিক তথ্য জানা থাকলে ভয় ও বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব।
-
মিথ: শুধুমাত্র বয়স্কদেরই মুখের ক্যান্সার হয়।
-
ফ্যাক্ট: যদিও বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি, কিন্তু বর্তমানে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে কম বয়সীদের মধ্যেও ওরাল ক্যান্সার দেখা দিচ্ছে।
-
-
মিথ: ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ।
-
ফ্যাক্ট: ক্যান্সার কোনো সংক্রামক রোগ নয়, এটি একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায় না।
-
-
মিথ: বায়োপসি করলে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে।
-
ফ্যাক্ট: এটি সম্পূর্ণ ভুল। বায়োপসি হলো রোগ নির্ণয়ের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড এবং এটি ক্যান্সার ছড়ায় না বরং সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে সাহায্য করে।
-
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
শুধুমাত্র দাঁতের যত্ন নিলেই হবে না, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার যেমন—গাজর, টমেটো, সবুজ শাকসবজি, গ্রিন টি এবং সিজোনাল ফল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখুন। ভিটামিন সি এবং ই মুখের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া পর্যাপ্ত জল পান করা মুখের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং লালা নিঃসরণ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, যা প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে।
পরিশেষে বলা যায়, মুখের স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দর্পণ। একটি ছোট ভাঙা দাঁতকে অবহেলা করা মানে নিজের অজান্তেই বড় বিপদকে আমন্ত্রণ জানানো। ভয়ের কিছু নেই, প্রয়োজন শুধু সচেতনতার। যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারোর মুখে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা ভাঙা দাঁতের সমস্যা থাকে, তবে আজই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়; প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা নিলে সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। আপনার একটু সতর্কতাই পারে আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে এই মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করতে।











