মেয়েরা কি পিণ্ডদান করতে পারে? শাস্ত্র ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়

হিন্দু ধর্মে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য পিণ্ডদান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচার। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে কেবলমাত্র পুত্র সন্তানই এই পবিত্র কর্ম সম্পাদন করতে…

Ishita Ganguly

 

হিন্দু ধর্মে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য পিণ্ডদান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচার। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে কেবলমাত্র পুত্র সন্তানই এই পবিত্র কর্ম সম্পাদন করতে পারে। কিন্তু প্রাচীন শাস্ত্র এবং পুরাণে এমন অসংখ্য উল্লেখ রয়েছে যা প্রমাণ করে যে মহিলারা, বিশেষত কন্যা এবং পুত্রবধূরাও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধকর্ম সম্পন্ন করতে পারেন।

পিণ্ডদান কী এবং এর তাৎপর্য

পিণ্ডদান হলো হিন্দু ধর্মের একটি প্রাচীন আচার যেখানে মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি ও মুক্তির জন্য চাল, যব বা খাদ্যদ্রব্যের পিণ্ড তৈরি করে তর্পণ করা হয়। এই কর্ম পিতৃপক্ষে বা নির্দিষ্ট তিথিতে সম্পাদন করা হয়। গরুড় পুরাণে উল্লেখ রয়েছে যে যাঁদের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করা হয় না, তাঁদের আত্মা পরলোকে কষ্ট ভোগ করে এবং শান্তি পায় না।

পিতৃপক্ষ ২০২৫ সালে শুরু হয়েছে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এবং চলবে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যখন সর্বপিতৃ অমাবস্যায় সকল পূর্বপুরুষদের একসঙ্গে শ্রাদ্ধ করার বিধান রয়েছে। এই ১৫ দিনে হিন্দু পরিবারগুলি তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে এবং তাঁদের আত্মার মুক্তির জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করে।

শাস্ত্রে মহিলাদের পিণ্ডদানের অধিকার

গরুড় পুরাণের নির্দেশনা

গরুড় পুরাণ, যা সনাতন ধর্মের ১৮টি মহাপুরাণের মধ্যে অন্যতম, স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে মহিলারা শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করতে পারেন। পুরাণ অনুসারে, যদি কোনও ব্যক্তির পুত্র সন্তান না থাকে এবং শুধুমাত্র কন্যা সন্তান থাকে, তাহলে সেই কন্যা নিজের মা বা বাবার শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করতে পারেন। যদি মেয়েরা শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে পিতৃপুরুষদের পিণ্ডদান করেন, তাহলে পিতৃদেবতারা তা স্বীকার করেন এবং আশীর্বাদও দেন।

গরুড় পুরাণে আরও বলা হয়েছে যে পুত্রবধূ বা স্ত্রীও শ্রাদ্ধ এবং পিণ্ডদান করতে পারেন। এই বিধান প্রমাণ করে যে হিন্দু ধর্মে লিঙ্গ নয়, বরং শ্রদ্ধা এবং ভক্তিই মুখ্য বিষয়।

বাল্মীকি রামায়ণে সীতার পিণ্ডদান

বাল্মীকি রামায়ণে পুত্রবধূর পিণ্ডদানের অধিকারের এক অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায়। রামায়ণ অনুসারে, বনবাসের সময় শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং মাতা সীতা পিতৃপক্ষে রাজা দশরথের আত্মার শান্তি কামনার উদ্দেশ্যে গয়ায় পৌঁছান। শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণ পিণ্ডদানের সামগ্রী সংগ্রহের জন্য শহরে গেলে, রাজা দশরথের আত্মা মাতা সীতার সামনে আবির্ভূত হন এবং তাঁর কাছ থেকে পিণ্ডদান প্রার্থনা করেন।

মাতা সীতা ফল্গু নদী, বটবৃক্ষ, কেতকী ফুল এবং গাভীকে সাক্ষী রেখে বালুকা পিণ্ডের মাধ্যমে দশরথের পিণ্ডদান সম্পন্ন করেন। দশরথ সীতার এই পিণ্ডদানে প্রসন্ন হন এবং জানকীকে আশীর্বাদ দেন। এই ঘটনা শাস্ত্রীয় প্রমাণ যে পুত্রবধূর পিণ্ডদানের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

কারা পিণ্ডদান করতে পারেন: সম্পূর্ণ তালিকা

সম্পর্ক পিণ্ডদানের যোগ্যতা শর্ত
পুত্র প্রথম অধিকারী সর্বদা করতে পারেন
পৌত্র (নাতি) পুত্রের অনুপস্থিতিতে পারিবারিক পরম্পরা অনুসরণ করে
কন্যা পুত্র না থাকলে শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে
পুত্রবধূ পুত্রের অনুপস্থিতিতে শাস্ত্র অনুমোদিত
স্ত্রী স্বামীর জন্য পুত্র না থাকলে
ভাগ্নে পুত্র ও কন্যা না থাকলে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে
দৌহিত্র (কন্যার পুত্র) বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত প্রশংসিত কর্ম

মহিলাদের পিণ্ডদানের নিয়মাবলী

পোশাক এবং প্রস্তুতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রাদ্ধ বা তর্পন করার সময় মহিলাদের সাদা বা হলুদ-সাদা পোশাক পরা উচিত, কারণ সাদা শান্তির প্রতীক এবং হলুদ রঙ শুভতার প্রতীক। শ্রাদ্ধকর্ম সম্পাদনের সময় মহিলাদের মাথা ঢাকা রাখা এবং পবিত্র মনোভাব নিয়ে কর্ম সম্পাদন করা উচিত।

সময় এবং দিক

সূর্যোদয়ের সময় পিণ্ড দান করা সর্বোত্তম বলে বিবেচিত হয়। সকালবেলা বা অন্ধকারে পিণ্ডদান করা উচিত নয়। তর্পনের সময় মুখ দক্ষিণ দিকে রাখতে হবে এবং পিণ্ড দান ব্রোঞ্জ, তামা বা রৌপ্য পাত্রে করা উচিত।

মন্ত্র উচ্চারণ

ঐতিহ্যগতভাবে, কিছু শাস্ত্র অনুসারে মহিলারা বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ না করে নীরবে (অমন্ত্রক) পিণ্ডদান করতে পারেন, তবে ব্রাহ্মণের নির্দেশনায়। তবে আধুনিক ধর্মীয় পণ্ডিতরা মনে করেন যে শ্রদ্ধা এবং ভক্তিই মুখ্য, মন্ত্র উচ্চারণ নয়। যদি কোনও মহিলা সঠিক উচ্চারণে মন্ত্র জানেন, তাহলে তিনি তা উচ্চারণ করতে পারেন।

আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক পরিবর্তন

২০২৫ সালের মহাকুম্ভে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখা গেছে, যেখানে প্রায় ২৫০ জন মহিলা নাগা সাধ্বী হয়েছেন এবং তাঁরা নিজেরাই নিজেদের পিণ্ডদান সম্পাদন করেছেন—একটি আচার যা ঐতিহ্যগতভাবে মৃতদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এটি প্রমাণ করে যে হিন্দু ধর্মে নারীদের ধর্মীয় অধিকার ক্রমশ স্বীকৃত হচ্ছে।

২০১৬ সালে কানপুরে, ৩৬ জন মহিলা সারসাইয়া ঘাটে অজন্মা কন্যা সন্তানদের জন্য পিণ্ডদান ও তর্পণ সম্পন্ন করেছিলেন—যারা গর্ভে হত্যা হয়েছিল। এই আয়োজনের সংগঠক মনোজ সেনগার উল্লেখ করেন যে বৈদিক যুগে মহিলারা কর্মকাণ্ডের আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদন করতেন, এবং এই কর্মসূচি সমাজে একটি নতুন ঐতিহ্যের সূচনা করেছে।

প্রয়াগরাজ ও গয়ায় মহিলাদের পিণ্ডদান

প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সংগমে এবং গয়ায় মহিলারা পিণ্ডদান করতে পারেন বলে পণ্ডিতরা নিশ্চিত করেছেন। হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে, বিশেষত যদি তাঁরা পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হন বা কোনও পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকেন, তাহলে মহিলারা পিণ্ডদান সম্পাদন করতে পারেন। বিধবা, কন্যা এবং বোনরাও তাঁদের পূর্বপুরুষদের জন্য প্রার্থনা এবং তর্পণ করতে পারেন।

তবে, কিছু ঐতিহ্যবাদী পণ্ডিত মনে করেন যে পুত্র বা নিকটবর্তী পুরুষ আত্মীয়ের দ্বারা সম্পাদিত আচার অধিক কার্যকর। তবে এই ধারণা ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং শ্রদ্ধা ও ভক্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

পুত্র না থাকলে কী হবে: শাস্ত্রীয় সমাধান

বহুকাল ধরে একটি প্রশ্ন শোনা যায়: “যে ব্যক্তির কোনও পুত্র সন্তান নেই, তাঁর শ্রাদ্ধ কে করবে?” গরুড় পুরাণ এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়েছে। পুরাণ অনুসারে, এমন পরিস্থিতিতে মহিলারা শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করতে পারেন। শাস্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে:

  • পুত্র না থাকলে স্ত্রী পিণ্ডদান করবেন

  • স্ত্রী না থাকলে ভাই পিণ্ডদান করবেন

  • তাও না হলে ব্রাহ্মণ শিষ্য বা যথাযথ আত্মীয় পিণ্ডদান করতে পারেন

  • কন্যা শ্রদ্ধাপূর্বক পিতা-মাতার শ্রাদ্ধ সম্পাদন করতে পারেন

এই বিধান প্রমাণ করে যে হিন্দু ধর্ম ব্যবহারিক এবং যুক্তিসংগত, এবং পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়।

কেন কন্যারা পিণ্ডদান করতে পারেন: যুক্তি এবং আবেগ

শাস্ত্রীয় সমর্থন

গরুড় পুরাণ এবং স্কন্দ পুরাণের মতো প্রাচীন গ্রন্থে কন্যার পিণ্ডদানের যোগ্যতা নিয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। পিতৃ ঋণ—যা প্রত্যেক সন্তানের উপর বর্তায়—লিঙ্গ নিরপেক্ষ। যদি এই ঋণ সকল সন্তানের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য, তাহলে তা পরিশোধের অধিকারও সমান হওয়া উচিত।

আবেগময় সংযোগ

মাতা-পিতার প্রতি কন্যার ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা কোনও অংশে কম নয়। প্রকৃতপক্ষে, আধুনিক সমাজে দেখা যায় যে কন্যারা প্রায়ই পিতা-মাতার সেবায় পুত্রদের চেয়ে অধিক নিবেদিত থাকেন। তাই তাঁদের পিণ্ডদানের অধিকার অস্বীকার করা অযৌক্তিক।

ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা

ভারতে লক্ষ লক্ষ পরিবার রয়েছে যেখানে শুধুমাত্র কন্যা সন্তান আছে, বা যেখানে পুত্ররা অক্ষম বা অনিচ্ছুক। এমন পরিবারে কন্যার অধিকার অস্বীকার করা মানে পূর্বপুরুষরা কোনও ধর্মীয় সেবা পাবেন না—যা অত্যন্ত অন্যায়।

পিতৃপক্ষ ২০২৫: তারিখ ও তিথি

২০২৫ সালে পিতৃপক্ষ ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। নিচে প্রতিটি তিথি এবং সংশ্লিষ্ট শ্রাদ্ধের তালিকা দেওয়া হলো:

তিথি তারিখ (২০২৫) কার শ্রাদ্ধ
পূর্ণিমা শ্রাদ্ধ ৭ সেপ্টেম্বর পূর্ণিমা তিথিতে মৃত ব্যক্তি
প্রতিপদ শ্রাদ্ধ ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিপদ তিথিতে মৃত ব্যক্তি
দ্বিতীয়া শ্রাদ্ধ ৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়া তিথিতে মৃত ব্যক্তি
তৃতীয়া শ্রাদ্ধ ১০ সেপ্টেম্বর তৃতীয়া তিথিতে মৃত ব্যক্তি
চতুর্থী শ্রাদ্ধ ১১ সেপ্টেম্বর চতুর্থী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
পঞ্চমী ও মহাভরণী ১২ সেপ্টেম্বর পঞ্চমী তিথি ও ভরণী নক্ষত্র
ষষ্ঠী শ্রাদ্ধ ১২ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
সপ্তমী শ্রাদ্ধ ১৩ সেপ্টেম্বর সপ্তমী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
অষ্টমী শ্রাদ্ধ ১৪ সেপ্টেম্বর অষ্টমী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
নবমী শ্রাদ্ধ ১৫ সেপ্টেম্বর নবমী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
দশমী শ্রাদ্ধ ১৬ সেপ্টেম্বর দশমী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
একাদশী শ্রাদ্ধ ১৭ সেপ্টেম্বর একাদশী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
দ্বাদশী শ্রাদ্ধ ১৮ সেপ্টেম্বর দ্বাদশী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
ত্রয়োদশী শ্রাদ্ধ ১৯ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
চতুর্দশী শ্রাদ্ধ ২০ সেপ্টেম্বর চতুর্দশী তিথিতে মৃত ব্যক্তি
সর্বপিতৃ অমাবস্যা ২১ সেপ্টেম্বর সকল পূর্বপুরুষ

সর্বপিতৃ অমাবস্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন, যখন যাঁরা তাঁদের পূর্বপুরুষের নির্দিষ্ট তিথি জানেন না বা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে পারেন না, তাঁরা এই দিন সকল পূর্বপুরুষের জন্য একসঙ্গে শ্রাদ্ধ সম্পাদন করতে পারেন।

শ্রদ্ধা এবং ভক্তিই প্রধান

আধুনিক ধর্মীয় নেতা এবং সংস্কারবাদী চিন্তাবিদরা জোর দিয়ে বলেন যে শ্রদ্ধা (বিশ্বাস, ভালোবাসা, ভক্তি) হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একজন কন্যা, নাতনি বা স্ত্রী যদি সত্যিকারের শ্রদ্ধাসহকারে পিণ্ডদান করেন, বিশেষত যখন পুরুষ উত্তরাধিকারী অনুপস্থিত বা অক্ষম, তাহলে সেই কর্ম আচার সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ বলে বিবেচিত হয়।

বহু বিদ্বান পণ্ডিত, শাস্ত্রীয় ইঙ্গিত এবং ব্যবহারিক বাস্তবতা উভয়কে স্বীকৃতি দিয়ে, কন্যার পিতা-মাতার জন্য পিণ্ডদান করার অধিকারকে নিশ্চিত করেছেন, বিশেষত যদি কোনও উপযুক্ত পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকে। তাঁর ভালোবাসা এবং আন্তরিকতা উৎসর্গকে বৈধ এবং শক্তিশালী করে তোলে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. অবিবাহিত কন্যা কি পিণ্ডদান করতে পারে?
হ্যাঁ, অবিবাহিত কন্যারা তাঁদের পিতা-মাতা এবং ভাইবোনের জন্য পিণ্ডদান এবং তর্পণ করতে পারেন।

২. পুত্র থাকলেও কি কন্যা পিণ্ডদান করতে পারে?
হ্যাঁ, আধুনিক ব্যাখ্যা অনুসারে পুত্র থাকলেও কন্যা পিণ্ডদান ও তর্পণ করার অধিকার রাখেন। নির্ধারক বিষয় হলো মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক এবং তাঁকে সম্মান জানানোর আন্তরিক ইচ্ছা—লিঙ্গ বা বৈবাহিক অবস্থা নয়।

৩. পিণ্ডদানের জন্য কোন স্থান সবচেয়ে পবিত্র?
গয়া, প্রয়াগরাজ (ত্রিবেণী সংগম), বারাণসী এবং হরিদ্বার পিণ্ডদানের জন্য সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। তবে নিজের গৃহেও শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে পিণ্ডদান সম্পাদন করা যায়।

৪. মাসিকের সময় কি মহিলারা পিণ্ডদান করতে পারেন?
ঐতিহ্যগতভাবে, মাসিকের সময় মহিলাদের ধর্মীয় আচার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি তাঁদের নিজস্ব স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে করা হয়, কোনও অসম্মান নয়।

৫. কন্যার পুত্র (দৌহিত্র) কি পিণ্ডদান করতে পারে?
হ্যাঁ, দৌহিত্র (কন্যার পুত্র) পিণ্ডদান করতে পারে এবং শাস্ত্রে এটি অত্যন্ত প্রশংসিত কর্ম হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমন্বয়

হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের গভীর অধ্যয়ন প্রমাণ করে যে মহিলারা, বিশেষত কন্যা এবং পুত্রবধূরা, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এবং এমনকি সাধারণ পরিস্থিতিতেও পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধকর্ম সম্পাদন করার পূর্ণ শাস্ত্রীয় অধিকার রাখেন। গরুড় পুরাণ, বাল্মীকি রামায়ণ এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থ এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আধুনিক যুগে, যখন সমাজ লিঙ্গ সমতার দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন এই শাস্ত্রীয় সত্যকে আরও ব্যাপকভাবে গ্রহণ এবং প্রচার করা প্রয়োজন। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করার দায়িত্ব সকল সন্তানের—লিঙ্গ নির্বিশেষে। শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং আন্তরিকতাই হলো পিণ্ডদানের মূল ভিত্তি, এবং যে কোনও সন্তান যিনি এই গুণাবলী নিয়ে পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষদের সেবা করেন, তিনি পূর্ণ আশীর্বাদের অধিকারী হন। এই প্রাচীন জ্ঞান এবং আধুনিক বোধের সমন্বয় আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আরও অর্থবহ, প্রাসঙ্গিক এবং সর্বজনীন করে তোলে।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন