বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমরা ইউপিআই (UPI), নেট ব্যাঙ্কিং, আরটিজিএস (RTGS) এবং মোবাইল ওয়ালেটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক পেমেন্ট, প্রপার্টি কেনাবেচা বা লোন ইএমআই-এর ক্ষেত্রে আজও চেকের কোনো বিকল্প নেই। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে এক বড় বিপদ। আপনার ড্রয়ারে রাখা, অফিসে ফেলে আসা বা ব্যাগে থাকা চেক বইটি যদি হঠাৎ হারিয়ে যায়, তবে তা আপনার জীবনের অন্যতম বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপনার একটি ছোট ভুলের সুযোগ নিয়ে জালিয়াতরা নিমিষেই আপনার সারাজীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় গায়েব করে দিতে পারে। এই ধরনের ভয়ংকর জালিয়াতিকে ব্যাংকিং পরিভাষায় Cheque Book Fraud বলা হয়।
প্রতি বছর ভারত ও বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ এই চেক বই জালিয়াতির শিকার হন। হারানো চেক বই হাতে পেলে প্রতারকরা নকল স্বাক্ষর বা রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে টাকার অঙ্ক পরিবর্তন করে ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা তুলে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বুঝতেই পারেন না যে তার অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ লাখ টাকা উধাও হয়ে গেছে, যতক্ষণ না তিনি পাসবই আপডেট করেন বা মেসেজ চেক করেন। তাই চেক বই হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে আতঙ্কিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে দ্রুত সঠিক আইনি ও ব্যাংকিং পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে এই জালিয়াতি হয়, চেক হারালে আপনার প্রথম করণীয় কী, আইনি পদক্ষেপগুলো কী কী এবং ভবিষ্যতে এমন বিপদ এড়াতে আপনার কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
Cheque Book Fraud কী এবং কীভাবে এটি সংঘটিত হয়?
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় Cheque Book Fraud হলো এমন একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ যেখানে কোনো ব্যক্তির চেক বই চুরি করে, হারিয়ে যাওয়া চেক ব্যবহার করে বা আসল চেকের তথ্য নকল করে বেআইনিভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়। প্রতারকরা আজকাল অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি এবং সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন ব্যবহার করে এই কাজ করে থাকে। অনেক সময় আপনার সই করা ব্ল্যাঙ্ক চেক চুরি হয়ে গেলে প্রতারকদের কাজ সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। তবে সই না করা চেক হারিয়ে গেলেও আপনি সুরক্ষিত নন, কারণ পেশাদার জালিয়াতরা আপনার ব্যাংকের সই হুবহু নকল করতেও সিদ্ধহস্ত।
এই ধরনের জালিয়াতির ক্ষেত্রে অপরাধীরা সাধারণত ব্যাংকের চেকের পাতাগুলো এমনভাবে পরিবর্তন করে যা খালি চোখে বা সাধারণ আলোতে ধরা পড়ে না। তারা বিশেষ ধরনের কালি মুছে ফেলার কেমিক্যাল ব্যবহার করে আপনার লেখা টাকার পরিমাণ ও নাম মুছে ফেলে নতুন তথ্য বসিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যস্ত ব্যাংক কর্মীরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে চেকটি জাল এবং তারা পেমেন্ট ক্লিয়ার করে দেন।
জালিয়াতদের সাধারণ কৌশল ও জালিয়াতির পদ্ধতি
প্রতারকরা সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চেক জালিয়াতি করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘চেক ওয়াশিং’ বা রাসায়নিক ব্যবহার করে কালি মুছে ফেলা। এছাড়া, অত্যাধুনিক স্ক্যানার ও প্রিন্টার ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি নকল চেক তৈরি করাও (যাকে ক্লোনিং বলা হয়) আজকালকার দিনে খুবই সাধারণ একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
| জালিয়াতির ধরন (Types of Fraud) | কাজের পদ্ধতি (How it Works) | ঝুঁকির মাত্রা (Risk Level) |
| Forged Signature (নকল স্বাক্ষর) | হারিয়ে যাওয়া চেকে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের সই জাল করে টাকা তোলার চেষ্টা। | অত্যন্ত উচ্চ (Very High) |
| Cheque Washing (কালি মুছে ফেলা) | কেমিক্যাল ব্যবহার করে প্রাপকের নাম ও টাকার অঙ্ক মুছে নতুন তথ্য ও বড় অঙ্ক লেখা। | উচ্চ (High) |
| Counterfeit Cheques (ক্লোন চেক তৈরি) | আসল চেকের এমআইসিআর (MICR) কোড ও ডিজাইন স্ক্যান করে হুবহু নকল চেক ছাপানো। | মাঝারি থেকে উচ্চ (Med-High) |
| Altered Amount (অঙ্ক পরিবর্তন) | চেকের ফাঁকা জায়গায় অতিরিক্ত শূন্য বা সংখ্যা বসিয়ে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া (যেমন ১,০০০ কে ১০,০০০ করা)। | উচ্চ (High) |
ব্যাংকিং নিয়মে বিভিন্ন প্রকার চেকের ব্যবহার ও জালিয়াতির ঝুঁকি
সব চেকের জালিয়াতির ঝুঁকি এক রকম হয় না। আপনি ব্যাংকে বা কাউকে পেমেন্ট করার জন্য কী ধরনের চেক ব্যবহার করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে আপনার অ্যাকাউন্ট কতটা সুরক্ষিত তা নির্ভর করে। ব্যাংকিং নিয়মে মূলত তিন ধরনের চেকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে কিছু চেক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, আবার কিছু চেক বেশ নিরাপদ।
যারা নিয়মিত চেকের মাধ্যমে লেনদেন করেন, তাদের অবশ্যই বিয়ারার (Bearer), অর্ডার (Order) এবং ক্রসড (Crossed) চেকের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। সঠিক চেকের ব্যবহার না জানলে জালিয়াতদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই চেক কাটার আগে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কাকে, কীভাবে পেমেন্ট করতে চাইছেন।
বিয়ারার (Bearer), অর্ডার (Order) এবং ক্রসড (Crossed) চেকের পার্থক্য
বিয়ারার চেক হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি যার হাতে থাকে, ব্যাংক তাকেই টাকা দিয়ে দেয়। অন্যদিকে ক্রসড চেক হলো সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ এর টাকা কোনোভাবেই নগদে তোলা যায় না, সরাসরি অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়।
| চেকের ধরন (Cheque Type) | ব্যাংকের নিয়ম ও জালিয়াতির সুযোগ | সুরক্ষার স্তর (Security Level) |
| Bearer Cheque (বিয়ারার চেক) | চেকের বাহককে ব্যাংক নগদে টাকা দেয়। এটি হারিয়ে গেলে যে কেউ টাকা তুলে নিতে পারে। | সবচেয়ে কম (Lowest) |
| Order Cheque (অর্ডার চেক) | চেকে যার নাম লেখা আছে, ব্যাংক তার পরিচয়পত্র (ID) দেখে তবেই টাকা দেয়। | মাঝারি (Medium) |
| Crossed / A/C Payee Cheque | চেকের বাঁ দিকে কোণায় দুটি দাগ কাটা থাকে। টাকা শুধু নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। | সবচেয়ে বেশি (Highest) |
| Post-Dated Cheque (PDC) | ভবিষ্যতের কোনো তারিখ দেওয়া থাকে। নির্দিষ্ট তারিখের আগে ব্যাংক টাকা ক্লিয়ার করে না। | মাঝারি (Medium) |
চেক বই হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে প্রথম করণীয়
আপনার চেক বই হারিয়ে গেছে—এই বিষয়টি বুঝতে পারার সাথে সাথেই আপনাকে তৎপর হতে হবে। এখানে সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনাকে আপনার ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আপনি যত দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন, আপনার Cheque Book Fraud এর শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ততটাই কমে যাবে।
অনেকেই চেক বই না পেলে ভাবেন হয়তো ঘরের বা অফিসের কোথাও পড়ে আছে, পরে খুঁজে বের করবেন। এই অবহেলাই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আপনাকে ধরে নিতে হবে যে চেক বইটি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকা মানুষের হাতে পড়েছে এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত আপনার অ্যাকাউন্টের চারদিকে একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে।
ব্যাংক ও পুলিশকে জানানোর সঠিক পদ্ধতি
চেক হারানোর পর আপনার প্রথম কাজ হলো নির্দিষ্ট চেকের পাতা বা সম্পূর্ণ চেক বইটির পেমেন্ট ‘স্টপ’ (Stop Payment) করা। ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আজকাল ঘরে বসেই এই কাজ করা যায়। এরপর আইনি সুরক্ষার জন্য পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন।
| পদক্ষেপ (Action Step) | কীভাবে করবেন (Method) | জরুরি বিষয় (Key Note) |
| ১. Stop Payment নির্দেশিকা | নেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ (YONO, iMobile ইত্যাদি) বা কাস্টমার কেয়ারে কল করে। | যে চেকের পাতাগুলো হারিয়েছে তার সঠিক নম্বর উল্লেখ করুন। |
| ২. পুলিশে অভিযোগ (Police GD/FIR) | স্থানীয় থানায় গিয়ে বা রাজ্য পুলিশের অনলাইন পোর্টালে (e-FIR) মিসিং ডায়েরি করুন। | জিডি (GD) বা এফআইআর (FIR) এর কপি সযত্নে নিজের কাছে রাখুন। |
| ৩. ব্যাংক ব্রাঞ্চে লিখিত আবেদন | নিজের হোম ব্রাঞ্চে গিয়ে সরাসরি ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের কাছে একটি অ্যাপ্লিকেশন জমা দিন। | সাথে পুলিশের অভিযোগের কপি এবং আপনার আইডি প্রুফ অবশ্যই যুক্ত করুন। |
| ৪. অ্যাকাউন্ট মনিটরিং | পরবর্তী কয়েকদিন ব্যাংকের ট্রানজ্যাকশন হিস্ট্রি ও এসএমএস (SMS) খেয়াল রাখুন। | কোনো সন্দেহজনক লেনদেন দেখলে এক মুহূর্ত দেরি না করে ব্যাংককে জানান। |
চেক জালিয়াতির শিকার হলে ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী আইনি প্রতিকার
যদি দুর্ভাগ্যবশত আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে চেকের মাধ্যমে জালিয়াতি করে টাকা তুলেও নেওয়া হয়, তবুও হাল ছেড়ে দেওয়ার কিছু নেই। আমাদের দেশের আইনি ব্যবস্থায় এর কড়া প্রতিকার রয়েছে। চেক জালিয়াতি একটি জামিন অযোগ্য ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এর জন্য দোষী ব্যক্তির কড়া শাস্তির বিধান রয়েছে আইনে।
ব্যাংক যদি আপনার জালিয়াতির অভিযোগ নিতে অস্বীকার করে বা গাফিলতি করে, তবে আপনি আইনি নোটিশ পাঠাতে পারেন। সাধারণত, চেকের মাধ্যমে জালিয়াতি হলে তা প্রমাণের জন্য চেকের ফরেনসিক পরীক্ষা (Forensic Handwriting Analysis) করা হয়, যা আদালতে বড় প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
Negotiable Instruments Act এবং সাইবার ক্রাইম সেলের ভূমিকা
চেক সংক্রান্ত যেকোনো জালিয়াতি মূলতঃ ‘নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট’ (NI Act) এবং ‘ইন্ডিয়ান পেনাল কোড’ (IPC)-এর অধীনে বিচার করা হয়। জালিয়াতির ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা যায়।
| আইনি ধারা / সংস্থা | অপরাধের ধরন ও শাস্তির বিধান | আপনার করণীয় |
| IPC Section 467 & 468 | মূল্যবান সিকিউরিটি বা চেকের সই জালিয়াতি এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি। | থানায় গিয়ে নির্দিষ্ট ধারায় FIR দায়ের করা। এতে যাবজ্জীবন বা ১০ বছরের জেলের বিধান আছে। |
| IPC Section 471 | জাল চেককে আসল বলে ব্যাংকে জমা দেওয়া এবং তা ব্যবহার করা। | পুলিশকে জাল চেকের কপি (ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করে) প্রমাণ হিসেবে দেওয়া। |
| Cyber Crime Cell | যদি চেকের ছবি বা নেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে ডিজিটাল ক্লোনিং করা হয়। | National Cyber Crime Portal (1930) বা স্থানীয় সাইবার থানায় অভিযোগ জানানো। |
Cheque Book Fraud থেকে বাঁচার উপায় ও সতর্কতা
প্রতিরোধই হলো সুরক্ষার সেরা এবং একমাত্র কার্যকরী উপায়। আপনি যদি চেক লেখার সময় এবং চেক বই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলেন, তবে Cheque Book Fraud এর মতো বড় বিপদ থেকে সহজেই নিজেকে ১০০% সুরক্ষিত রাখতে পারবেন। অনেকেই খুব তাড়াহুড়ো করে চেক লেখেন এবং শব্দের মাঝে অনেক ফাঁকা জায়গা রেখে দেন, যা প্রতারকদের সুযোগ করে দেয়।
চেক বইয়ের হিসাব রাখা অত্যন্ত জরুরি। আপনার চেক বইয়ের প্রথম দিকে থাকা রেকর্ড স্লিপে (Record Slip) বা ইনডেক্স পেজে প্রতিটি ইস্যু করা চেকের নম্বর, তারিখ, কাকে দেওয়া হলো এবং কত টাকার চেক দেওয়া হলো, তার বিস্তারিত তথ্য লিখে রাখা উচিত। এতে কোনো চেকের পাতা মাঝখান থেকে ছিঁড়ে নিলে বা মিসিং হলে আপনি সহজেই তা ধরতে পারবেন।
চেক লেখার সঠিক ও নিরাপদ নিয়ম
একটি চেককে কীভাবে নিশ্ছিদ্র করা যায়, তার কিছু নির্দিষ্ট ব্যাংকিং নিয়ম রয়েছে। সঠিক কালি নির্বাচন থেকে শুরু করে দাগ টানা—সবকিছুতেই সতর্কতা প্রয়োজন।
| সুরক্ষার নিয়ম (Safety Rules) | বিস্তারিত বিবরণ (Description) | কী করা উচিত নয় (Don’ts) |
| Account Payee ক্রস করা | চেকের বাঁ দিকের ওপরের কোণায় দুটি সমান্তরাল দাগ টেনে ‘A/C Payee’ লিখুন। | নগদ (Cash) টাকা তোলার জন্য পরিচিত ছাড়া কাউকে বিয়ারার (Bearer) চেক দেবেন না। |
| “Only” বা “মাত্র” শব্দের ব্যবহার | টাকার অঙ্ক কথায় লেখার পর শেষে ‘Only’ এবং সংখ্যায় লেখার পর শেষে ‘/-‘ চিহ্ন দিন। | শব্দের মাঝে বা শেষে অকারণে ফাঁকা জায়গা ছাড়বেন না। |
| স্থায়ী কালির ব্যবহার | লেখার জন্য নিজের পার্সোনাল কালো বা নীল কালির ডট পেন ব্যবহার করুন। | পেন্সিল, জেল পেন বা অন্যের দেওয়া কলম (যেটিতে ম্যাজিক কালি থাকতে পারে) ব্যবহার করবেন না। |
| স্বাক্ষরের সুরক্ষা | ব্যাংকে যে সই দেওয়া আছে ঠিক সেই সই করুন। | চেকের নিচে থাকা এমআইসিআর (MICR) ব্যান্ডের ওপর কখনো সই বা দাগ দেবেন না। |
বড় ব্যবসার ক্ষেত্রে চেক জালিয়াতি কীভাবে হয় এবং তা প্রতিরোধের উপায়
সাধারণ মানুষের তুলনায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা বড় ব্যবসায়ীদের চেক জালিয়াতির ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ, তাদের ক্ষেত্রে লেনদেনের পরিমাণ অনেক বড় হয় এবং প্রতিদিন প্রচুর চেক ইস্যু করতে হয়। অনেক সময় কোম্পানির ভেতরের অসাধু কর্মী বা অ্যাকাউন্ট্যান্টরাই এই ধরনের জালিয়াতির সাথে যুক্ত থাকেন।
ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্ল্যাঙ্ক চেকে সই করে অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছে রেখে যাওয়ার প্রবণতা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এছাড়া, কোম্পানির ভেন্ডরদের পেমেন্ট করার সময় ভুয়া ইনভয়েস তৈরি করে চেকের মাধ্যমে টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও কর্পোরেট দুনিয়ায় অহরহ ঘটছে।
একাধিক সিগনেটরি (Joint Signatories) এবং অডিট কন্ট্রোল
কোম্পানির ফান্ড সুরক্ষিত রাখতে ব্যবসায়িক কারেন্ট অ্যাকাউন্টের (Current Account) ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ ব্যাংকিং প্রোটোকল মেনে চলা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
| জালিয়াতির ঝুঁকি (Corporate Risk) | প্রতিরোধের উপায় (Prevention Strategy) |
| ভেতরের কর্মীর চুরি (Insider Threat) | চেক বই সবসময় লকার বা ভল্টে রাখুন এবং নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে চাবি রাখুন। |
| বড় অঙ্কের পেমেন্ট জালিয়াতি | অ্যাকাউন্টে জয়েন্ট সিগনেটরি (Joint Signatories) সিস্টেম চালু রাখুন। অর্থাৎ বড় পেমেন্টে অন্তত দুজনের সই লাগবে। |
| ভুয়া ভেন্ডর পেমেন্ট | প্রতি মাসে ব্যাংক রিকনসিলিয়েশন (Bank Reconciliation) এবং নিয়মিত ইন্টারনাল অডিট করুন। |
| বুক কিপিং জালিয়াতি | ইস্যু করা বাতিল (Cancelled) চেকগুলো ছিঁড়ে না ফেলে ফাইলের সাথে আটকে রাখুন প্রমাণের জন্য। |
আরবিআই (RBI) গাইডলাইন এবং পজিটিভ পে সিস্টেম
গ্রাহকদের Cheque Book Fraud থেকে বাঁচাতে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো ‘পজিটিভ পে সিস্টেম’ (Positive Pay System – PPS)। এই সিস্টেমের মাধ্যমে বড় অঙ্কের চেকের ক্ষেত্রে জালিয়াতির সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
এই নিয়মের আওতায়, আপনি যখন কাউকে একটি বড় অঙ্কের চেক ইস্যু করেন, তখন সেই চেকের মূল তথ্যগুলো আপনাকে আপনার ব্যাংককে আগে থেকে জানিয়ে রাখতে হয়। যখন প্রাপক চেকটি ব্যাংকে জমা দেন, তখন ক্লিয়ারিং হাউসে ব্যাংক আপনার দেওয়া তথ্যের সাথে চেকের তথ্য মিলিয়ে দেখে। যদি সব তথ্য হুবহু মিলে যায়, তবেই চেকের টাকা ক্লিয়ার করা হয়। অন্যথায় চেকটি সন্দেহজনক হিসেবে বাতিল হয়ে যায় এবং আপনাকে অ্যালার্ট করা হয়।
পজিটিভ পে সিস্টেম কীভাবে কাজ করে
আপনি ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং, মোবাইল ব্যাঙ্কিং অ্যাপ, এটিএম (ATM) বা সরাসরি ব্রাঞ্চে গিয়ে পজিটিভ পে সিস্টেমের জন্য চেকের তথ্য জমা দিতে পারেন। বর্তমানে স্টেট ব্যাংক (SBI), এইচডিএফসি (HDFC), আইসিআইসিআই (ICICI) সহ সব বড় ব্যাংক এই সুবিধা দিচ্ছে।
| পজিটিভ পে সিস্টেমের বিষয় | ব্যাংকিং নিয়ম ও সুবিধা |
| প্রয়োজনীয় তথ্য (Required Info) | চেকের নম্বর, ইস্যু করার তারিখ, প্রাপকের নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং টাকার সঠিক পরিমাণ। |
| টাকার সীমা (Amount Limit) | সাধারণত ₹৫০,০০০ এর বেশি অর্থের লেনদেনে এই নিয়ম প্রযোজ্য। ₹৫ লক্ষের বেশি হলে অনেক ব্যাংক এটি বাধ্যতামূলক করেছে। |
| ক্লিয়ারিং প্রসেস (Clearing Process) | CTS (Cheque Truncation System) এর মাধ্যমে সেন্ট্রালি তথ্য ভেরিফাই করা হয়। |
| গ্রাহকের সুবিধা (Benefits) | চেক ক্লোন বা টেম্পার করে কেউ জমা দিলেও সিস্টেম তা আটকে দেবে, আপনার টাকা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। |
ডিজিটাল যুগে Cheque Book Fraud-এর নতুন রূপ
প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে যেমন আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত হয়েছে, তেমনি অপরাধীরাও Cheque Book Fraud এর নিত্যনতুন ডিজিটাল পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। আগে শুধুমাত্র চুরি হওয়া ফিজিক্যাল চেকের মাধ্যমেই জালিয়াতি হতো, কিন্তু এখন চেক ট্রাঙ্কেশন সিস্টেমের (CTS) ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়েও প্রতারণা হচ্ছে।
হাই-রেজোলিউশন স্ক্যানার এবং উন্নত গ্রাফিক ডিজাইনিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসল চেকের ছবি থেকে অবিকল নকল চেক তৈরি করা হচ্ছে। অনেক সময় আমরা বিশ্বাস করে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে কাউকে চেকের ছবি পাঠাই। প্রতারকরা যদি সেই ফোন বা ইমেইল হ্যাক করতে পারে, তবে সেই ছবি চুরি করে তারা নকল চেক ছাপিয়ে ফেলে। তাই ডিজিটাল মাধ্যমে চেকের ছবি আদান-প্রদান করার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ক্লোন চেক এবং অনলাইন ক্লিয়ারিং জালিয়াতি
আজকাল ফিজিক্যাল চেক এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ফিজিক্যালি যায় না, যায় তার ডিজিটাল ইমেজ। এটিকেই CTS বা Cheque Truncation System বলা হয়। প্রতারকরা এই ডিজিটাল ইমেজ ক্লিয়ারিংয়ের সুযোগটিই নেয়।
| জালিয়াতির মাধ্যম | ডিজিটাল যুগের ঝুঁকি | প্রতিরোধের উপায় |
| অনলাইনে চেকের ছবি শেয়ার | হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইল হ্যাক হলে চেকের ছবি লিক হতে পারে এবং ক্লোন হতে পারে। | কখনোই সোশ্যাল মিডিয়া বা আনসিকিওরড মেসেজিং অ্যাপে চেকের স্পষ্ট ছবি পাঠাবেন না। পাঠালেও ‘A/C Payee’ করে দিন। |
| CTS ক্লোনিং জালিয়াতি | হাই-কোয়ালিটি প্রিন্টারে নকল চেক তৈরি করে অন্য শহরের ব্যাংকের ড্রপ বক্সে ফেলা হয়। | সবসময় পজিটিভ পে সিস্টেম (PPS) ব্যবহার করুন এবং ব্যাংকের SMS ও ইমেইল অ্যালার্ট চালু রাখুন। |
| ভুয়া কাস্টমার কেয়ার (Phishing) | চেক স্টপ করার জন্য গুগল থেকে ফেক কাস্টমার কেয়ার নম্বর নিয়ে কল করলে ডেটা চুরি হতে পারে। | শুধুমাত্র ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা পাসবইয়ের পেছনে থাকা টোল-ফ্রি নম্বরেই কল করুন। |
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা গায়েব হয়ে গেলে তা উদ্ধারের উপায়
যদি দুর্ভাগ্যবশত আপনি জালিয়াতির শিকার হয়েই যান এবং আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়, তবে প্রথমেই ভেঙে পড়বেন না। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (RBI) নিয়ম অনুযায়ী, জালিয়াতির ক্ষেত্রে গ্রাহকের যদি কোনো গাফিলতি না থাকে, তবে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে।
টাকা কাটার মেসেজ পাওয়ার ৩ দিনের (Working Days) মধ্যে ব্যাংককে লিখিতভাবে জানালে আপনার দায়বদ্ধতা (Zero Liability) শূন্য হয়ে যায় এবং ব্যাংক সেই টাকা ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। এর জন্য ব্যাংকের ডিসপিউট রেজোলিউশন (Dispute Resolution) ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে হয়।
ব্যাংকিং ওমবাডসম্যান (Banking Ombudsman) এর কাছে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি
আপনি যদি ব্যাংকে অভিযোগ জানানোর পর ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক কোনো সমাধান না দেয় বা আপনার দাবি প্রত্যাখ্যান করে, তবে আপনি সরাসরি আরবিআই-এর ব্যাংকিং ওমবাডসম্যানের কাছে অনলাইনে অভিযোগ করতে পারেন।
| টাকা উদ্ধারের ধাপ (Recovery Steps) | কোথায় এবং কীভাবে করবেন | সময়সীমা (Timeline) |
| প্রথম ধাপ: ব্যাংককে রিপোর্ট করা | কাস্টমার কেয়ারে কল করে কার্ড/চেক ব্লক এবং লিখিত অভিযোগ (Dispute Form)। | ফ্রড হওয়ার ৩ দিনের মধ্যে। |
| দ্বিতীয় ধাপ: সাইবার সেলে অভিযোগ | National Cyber Crime Portal-এ গিয়ে লেনদেনের বিবরণ দিয়ে অভিযোগ দায়ের। | যত দ্রুত সম্ভব (২৪ ঘণ্টার মধ্যে)। |
| তৃতীয় ধাপ: Banking Ombudsman | RBI এর ইন্টিগ্রেটেড ওমবাডসম্যান পোর্টালে (cms.rbi.org.in) গিয়ে অনলাইনে কমপ্লেন করা। | ব্যাংকের উত্তরের জন্য ৩০ দিন অপেক্ষা করার পর। |
অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটু অসতর্কতা আপনার সারাজীবনের কঠোর পরিশ্রমের সঞ্চয়কে মুহূর্তের মধ্যে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। Cheque Book Fraud কোনো সাধারণ চুরি বা ছিনতাই নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং প্রযুক্তি-নির্ভর আর্থিক অপরাধ। এই বিপদ থেকে বাঁচতে আপনার ব্যক্তিগত সচেতনতাই হলো প্রধান ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। চেক বই সবসময় নিরাপদ স্থানে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখুন। হারানো গেলে বা চুরি হলে এক মুহূর্তও দেরি না করে ব্যাংক এবং পুলিশকে জানান। চেক লেখার সময় সঠিক নিয়মগুলো মেনে চলা এবং বড় অঙ্কের লেনদেনে আরবিআই-এর পজিটিভ পে সিস্টেম (PPS) বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করা আপনার অর্থকে ১০০% সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, ব্যাংকিং সুরক্ষার প্রথম ধাপ শুরু হয় আপনার নিজের হাত ধরেই। নিয়ম জানুন, সতর্ক থাকুন, এবং আপনার কষ্টার্জিত টাকাকে নিরাপদ রাখুন।











