Srijita Chattopadhay
৩ এপ্রিল ২০২৫, ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

আকাশের দরজা খুলে দেয় চিলি: বিশ্বের টেলিস্কোপের স্বর্গরাজ্য

চিলি বর্তমানে বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটি ধীরে ধীরে বিশ্বের অধিকাংশ টেলিস্কোপের আবাসস্থল হয়ে উঠেছে এবং ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বের মোট টেলিস্কোপ অবকাঠামোর ৭০% চিলিতেই স্থাপিত হবে। আটাকামা মরুভূমির স্ফটিক সদৃশ আকাশ এবং শুষ্ক বায়ুমণ্ডল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে, যা মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে অতুলনীয় সুযোগ প্রদান করে।

চিলির আকাশ: জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের স্বর্গরাজ্য

আদর্শ আবহাওয়ার অনন্য সমন্বয়

চিলির উত্তরাঞ্চলের আটাকামা মরুভূমি বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে বছরে প্রায় ৩০০-৩৩০ রাত পরিষ্কার আকাশ দেখা যায়, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় অনেক বেশি। আটাকামা মরুভূমির কিছু অংশে কখনও বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়নি, যা এই অঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অমেরু মরুভূমি করে তুলেছে। আর্দ্রতা কম থাকায় আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

জার্মান জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাথিয়াস শ্রাইবার, যিনি ইউনিভার্সিডাড টেকনিকা ফেডেরিকো সান্তা মারিয়ার অধ্যাপক এবং মিলেনিয়াম নিউক্লিয়াস ফর প্ল্যানেট ফর্মেশন (NPF) এর বিকল্প পরিচালক, তিনি বলেন: “অনুরূপ পরিস্থিতি সহ অন্য কোনও দেশ নেই। জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিক থেকে এটাই স্বর্গরাজ্য। আটাকামা মরুভূমি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি অপরিহার্য দিক পূরণ করে: মেঘমুক্ত আকাশ এবং টেলিস্কোপ এবং তারাদের মধ্যে খুব কম বায়ুমণ্ডল। এগুলি তারা এবং গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ অবস্থা।”

উচ্চতা সুবিধা

আটাকামা মরুভূমির আরেকটি বড় সুবিধা হল এর উচ্চতা। চিলির আন্দিজ পর্বতমালায় ৩,০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতার অনেক পাহাড় রয়েছে, যেখানে টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, লাস ক্যাম্পানাস অবজারভেটরি ২,৫১৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। উচ্চতায় অবস্থান করায় টেলিস্কোপগুলি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প থেকে উপরে থাকতে পারে, যা মহাকাশ থেকে আসা সিগন্যালগুলিকে বিকৃত করে।

রেডিও টেলিস্কোপগুলির জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলি বাহ্যিক মহাকাশ থেকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংগ্রহ করে, কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প দ্বারা সিগন্যালগুলি প্রায়ই বিকৃত হয়। উচ্চতায় নির্মাণ করে, শুষ্ক বাতাসে, প্রকৌশলীরা সেই আর্দ্রতার কিছু অংশের উপরে যেতে পারেন।

আলোক দূষণমুক্ত পরিবেশ

চিলির উত্তর অঞ্চলের মরুভূমিতে জনবসতি খুবই কম। প্রধান শহরগুলি থেকে দূরে অবস্থান করায় টেলিস্কোপগুলি আলোক দূষণ থেকে মুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, লাস ক্যাম্পানাস অবজারভেটরি নিকটবর্তী শহর লা সেরেনা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এই দূরত্ব নিশ্চিত করে যে রাতের আকাশে কৃত্রিম আলোর প্রভাব নগণ্য, যা নিখুঁত জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

দক্ষিণ গোলার্ধের অনন্য সুবিধা

অনন্য আকাশ দৃশ্য

চিলি দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত, যা উত্তর গোলার্ধের টেলিস্কোপগুলির থেকে ভিন্ন আকাশকে দেখতে সুযোগ দেয়। এই অবস্থান বিশেষ করে ছায়াপথের কেন্দ্র এবং দক্ষিণ আকাশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যানরি বোফিন মতে, “যদি আপনি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান করতে চান এবং আপনি দক্ষিণ গোলার্ধে তা করতে চান, তাহলে আপনাকে চিলিতে তা করতে হবে।”

স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল

আটাকামা মরুভূমির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল। এই স্থিতিশীলতা টেলিস্কোপগুলিকে নিখুঁত ছবি তুলতে সাহায্য করে, কারণ অস্থির বায়ুমণ্ডল ছবি বিকৃত করতে পারে। স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থাগুলি আকাশের “দেখার” মান উন্নত করে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

চিলির অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অবজারভেটরিগুলির সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেই, যেগুলি ভিন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই সম্পূরকতা বিশ্বব্যাপী জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাকে সমর্থন করে এবং নিশ্চিত করে যে গ্রহের বিভিন্ন অংশে অবস্থিত টেলিস্কোপগুলি একসাথে মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ চিত্র সৃষ্টি করতে পারে।

চিলির খরচ-কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা

টেলিস্কোপ স্থাপনের কম খরচ

একটি গবেষণা অনুসারে, চিলিতে ইউরোপ-মালিকানাধীন E-ELT টেলিস্কোপ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের আনুমানিক খরচ প্রতি রাতে প্রায় ৫০০,০০০ মার্কিন ডলার, যেখানে হাওয়াইতে এটি ৭২৫,০০০ মার্কিন ডলার এবং স্পেনে ৮৩০,০০০ মার্কিন ডলার। এই খরচের সুবিধা চিলিকে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রকল্পগুলির জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তোলে।

সুবিধাজনক নীতি এবং চুক্তি

চিলি সরকার বিদেশী জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কনসোর্টিয়ামগুলিকে উদার চুক্তির শর্ত প্রদান করে। এসব চুক্তির অংশ হিসেবে, চিলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপগুলির মোট পর্যবেক্ষণ সময়ের ১০% ব্যবহার করার সুযোগ পান। যদিও কিছু চিলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন এই বরাদ্দ বাড়ানো উচিত, অন্যরা লক্ষ্য করেন যে যেহেতু চিলির জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্প্রদায় তুলনামূলকভাবে ছোট, তাই এই বরাদ্দ যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের চেয়ে বেশি উদার।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

১৯৯০ সালে গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর থেকে চিলি অঞ্চলের অন্যতম স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেলিস্কোপের মতো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ প্রকল্পগুলির জন্য অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আত্মবিশ্বাসী যে তাদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে এবং তাদের বিজ্ঞান কর্মসূচি দীর্ঘকাল ধরে চলতে পারবে।

চিলিতে বড় টেলিস্কোপ প্রকল্পসমূহ

অ্যাটাকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারে (ALMA)

ALMA বিশ্বের বৃহত্তম জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রকল্পগুলির একটি এবং এটি ২০১১ সালের অক্টোবরে বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য দরজা খুলে দেয়। ALMA ৬০টিরও বেশি বিশাল রেডিও ডিশের একটি নেটওয়ার্ক, যা চাজনানটর মালভূমিতে ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে। এই উন্নত রেডিও টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের গভীরে তাকাতে এবং গ্রহ গঠন, গ্যালাক্সি জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া গভীর করতে সক্ষম।

ইউরোপীয় এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ (E-ELT)

ইউরোপীয় দক্ষিণী অবজারভেটরি (ESO) চেরো আর্মাজোনাসকে ভবিষ্যতের ইউরোপীয় এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপের (E-ELT) স্থান হিসেবে নির্বাচন করেছে। এই বিশাল যন্ত্রটি – যা এখন পর্যন্ত নির্মিত বৃহত্তম অপটিক্যাল/নিয়ার-ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ হবে – একটি ৩৯-মিটার (১২৮ ফুট) আয়না থাকবে যা শত শত পৃথক ষড়ভুজাকার খণ্ড নিয়ে গঠিত হবে। এটি ২০২৩ সালে চালু হওয়ার আশা করা হচ্ছে এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বিপ্লব করবে, এবং এটি কাছাকাছি তারাদের চারপাশে ঘুরতে থাকা পৃথিবীর মতো গ্রহগুলির বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন এবং মিথেন – সম্ভাব্য জীবনের লক্ষণগুলি – সনাক্ত করতে সক্ষম হতে পারে।

জায়ান্ট ম্যাগেলান টেলিস্কোপ (GMT)

লাস ক্যাম্পানাস পাহাড়ে, জায়ান্ট ম্যাগেলান টেলিস্কোপ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে একটি মাউন্টে ছয়টি ৮.৪-মিটার (৩৩০ ইঞ্চি) আয়না থাকবে। এই টেলিস্কোপ ২০২০ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল এবং দক্ষিণ আকাশে ছায়াপথের কেন্দ্র এবং এর বাইরে মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অনন্য দৃষ্টি প্রদান করবে।

লার্জ সিনোপটিক সার্ভে টেলিস্কোপ (LSST)

লার্জ সিনোপটিক সার্ভে টেলিস্কোপ সেরো পাচনে অবস্থিত এবং ২০১৯ সাল থেকে কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হয়েছিল। এই টেলিস্কোপ দক্ষিণ আকাশের বিশাল ভলিউমে অসাধারণ সার্ভে করতে ডিজাইন করা হয়েছে, যা মহাবিশ্বের বিবর্তন এবং গতি সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া বাড়াবে।

পারানাল অবজারভেটরি

পারানাল অবজারভেটরিতে ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (VLT) রয়েছে, যা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীদের কিছু অসাধারণ আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে। উদাহরণস্বরূপ, তারা আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের বাইরে একটি গ্রহের প্রথম ছবি ক্যাপচার করেছে এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ছায়াপথের সবচেয়ে পুরানো জানা তারার বয়স নির্ধারণ করতে সাহায্য করেছে – এটি ১৩.২ বিলিয়ন বছর পুরানো।

অবজারভেটরির অন্যতম বড় কৃতিত্ব ছিল প্রমাণ করা যে ছায়াপথের কেন্দ্রে একটি বিশাল ব্ল্যাক হোল রয়েছে। বিজ্ঞানীরা গণনা করেছেন যে এই রহস্যময় শূন্যতার ভর সূর্যের চেয়ে তিন মিলিয়ন গুণ বড়।

চিলি: বিশ্বের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল পাওয়ারহাউস

বর্তমান এবং ভবিষ্যতের পরিসংখ্যান

২০১১ সালে, চিলি বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান অবকাঠামোর ৪২% এর আবাসস্থল ছিল, যা প্রধানত টেলিস্কোপ নিয়ে গঠিত। ২০১৫ সালে, অনুমান করা হয়েছিল যে ২০৩০ সালের মধ্যে চিলি বিশ্বের ৫০% এরও বেশি জ্যোতির্বিজ্ঞান অবকাঠামো ধারণ করবে। আরো সাম্প্রতিক অনুমান দেখায় যে ২০২০-২০২৫ সালের মধ্যে, চিলি বিশ্বের টেলিস্কোপ অবকাঠামোর ৭০% ধারণ করবে।

চিলি দেশটিকে “বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান রাজধানী” হিসেবে পরিচিত, কারণ গ্রহের জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি এখানে কেন্দ্রীভূত। এটি প্রায়শই বলা হয় যে চিলি “মহাবিশ্বের প্রতি বিশ্বের চোখ,” কারণ এর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত অবিশ্বাস্য টেলিস্কোপগুলি বিখ্যাত গবেষকদের দ্বারা ব্যবহৃত হয় যারা পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভবিষ্যতের প্রশ্নগুলির উত্তর দেন।

অর্থনৈতিক প্রভাব এবং বিনিয়োগ

চিলির চারটি বৃহত্তম টেলিস্কোপে বিনিয়োগ ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এইসব প্রকল্প চিলির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, প্রযুক্তিগত বিকাশ উৎসাহিত করে এবং দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতি বাড়ায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান ইতিমধ্যেই স্থানীয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সম্মান বাড়িয়েছে এবং উদ্ভাবনী অর্থনৈতিক বুমে অবদান রেখেছে।

শিক্ষা এবং গবেষণা সুযোগ

শিক্ষার্থীদের জন্য স্বর্গরাজ্য

উভয় স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, এমনকি বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও চিলিতে আকাশ পর্যবেক্ষণ এবং অধ্যয়ন করতে অনুপ্রাণিত হন। ইউনিভার্সিডাড ক্যাটলিকার জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক থমাস পুজিয়া, যিনি জার্মানি থেকে এসেছেন, তিনি জোর দিয়ে বলেন যে চিলির তুলনায় পৃথিবীর খুব কম জায়গা মাত্র আছে যেখানে এমন পর্যবেক্ষণের অবস্থা আছে।

তিনি আরও যোগ করেন, “অনেক পেশাদার অবজারভেটরি উত্তর চিলিতে অবস্থিত এবং অপটিক্যাল, ইনফ্রারেড, সাব-মিমি এবং রেডিও ওয়েভলেংথে মহাবিশ্ব অনুসন্ধান করে। চিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাদের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেট সংগ্রহ করার অনন্য সুযোগ পায়।”

ম্যাথিয়াস শ্রাইবার যোগ করেন যে চিলির কাছে বিশ্বের সেরা টেলিস্কোপের অর্ধেকেরও বেশি আছে এবং তাদের ব্যবহার করার বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত অ্যাক্সেস আছে। “চিলির ১০% ব্যবহারের অধিকার আছে এবং এটি একটি বিশাল সুবিধা, বিবেচনা করে যে বাকি বিশ্বকে অবশিষ্ট ৯০% ভাগ করতে হয়। এর অর্থ হল স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ছাত্ররা এসে বিশ্বের সেরা টেলিস্কোপগুলির সাথে অধ্যয়ন করতে পারে। আমি যখন জার্মানিতে ছিলাম, এটা সম্ভব ছিল না। এটি একটি বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত অ্যাক্সেস এবং এটি মরুভূমির মাঝখানে, প্রায় ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এটি আকর্ষণীয়ও বটে।”

কর্মসংস্থানের সুযোগ

চাকরির ক্ষেত্রে, শ্রাইবার বলেন যে তার অধীনে অধ্যয়নরত বেশিরভাগ ডক্টরেট ছাত্র স্থায়ী গবেষণা পদে কাজ করতে যান। “যদি আপনি চিলিতে অধ্যয়ন করেন, স্তরটি এতটাই ভাল যে আপনি সহজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের ছাত্রদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। কর্মক্ষেত্র বাড়ছে।”

চিলিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্প্রদায়

পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞান

চিলির একটি বৈচিত্র্যময় এবং সক্রিয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্প্রদায় রয়েছে, যার মধ্যে চিলিয়ান এবং আন্তর্জাতিক পেশাদাররা রয়েছেন, যার মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ছাত্র ও শিক্ষক, পাশাপাশি শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও রয়েছেন। দেশটিতে বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন:

  1. সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ইন অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড টেকনোলজিস (CATA) – এটি চিলির বৃহত্তম R&D সুবিধা যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য উপযোগী প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য বিদ্যমান
  2. মিলেনিয়াম সেন্টার ফর সুপারনোভা সায়েন্স – এই কেন্দ্রটি প্রধানত সুপারনোভা গবেষণায় নিবেদিত
  3. চিলিয়ান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি (SOCHIAS) – চিলির জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের একটি প্রধান সংগঠন

শখের জ্যোতির্বিজ্ঞান

শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্যও চিলিতে বেশ কয়েকটি অবজারভেটরি রয়েছে:

  1. সেরো লস কন্ডোরেস অবজারভেটরি (আতাকামা অঞ্চল)
  2. সেরো মায়ু অবজারভেটরি (কোকুইম্বো অঞ্চল)
  3. সেরো মামাল্লুকা অবজারভেটরি (কোকুইম্বো অঞ্চল)
  4. সেরো কোল্লোওয়ারা অবজারভেটরি (কোকুইম্বো অঞ্চল)

চিলিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস

চিলিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের প্রথম নথিভুক্ত রিপোর্ট ছিল জুন ১৫৮২ সালে সৈনিক পেদ্রো কুয়াদ্রাদো চাভিনো দ্বারা একটি চন্দ্রগ্রহণের পর্যবেক্ষণ। তিনি গ্রহণের সময় পরিমাপের উপর ভিত্তি করে ভালদিভিয়া শহরের অক্ষাংশ নির্ধারণ করতে একটি ক্লাসিক গ্রীক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন।

তিন শতাব্দী পরে, ১৮৪৯ সালে মানুয়েল বুলনেসের সরকারের অধীনে, জেমস মেলভিল গিলিসের নেতৃত্বে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বৈজ্ঞানিক মিশন চিলিতে এসেছিল পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যে দূরত্ব নির্ধারণ করতে শুক্র এবং মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করতে। গিলিসের মিশন সেরো সান্তা লুসিয়া (সান্তিয়াগো) তে প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছিল। তিন বছর পরে, ১৮৫২ সালে, সেই অবজারভেটরির সুবিধাগুলি চিলিতে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং জাতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণাগার জন্ম নিয়েছিল

২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সংগঠনগুলির মালিকানাধীন এবং পরিচালিত অবজারভেটরিগুলি দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয়েছিল: লা সিলা, সেরো টোলোলো, লাস ক্যাম্পানাস এবং পরবর্তীতে সেরো পারানাল, সেরো পাচন এবং চাজনানটর।

চিলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা

লাভ-ক্ষতির বিতর্ক

স্থানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের মতে, বিশ্বের সেরা আকাশ এবং আন্তর্জাতিক অবজারভেটরি স্থাপনের জন্য বিভিন্ন ভর্তুকি থাকা সত্ত্বেও, চিলি জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে যথেষ্ট উপকৃত হচ্ছে না।

চিলির জাতীয় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণা কমিশনের (CONICYT) জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মসূচির সাবেক পরিচালক এবং চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মোনিকা রুবিও অনুসারে, বিদেশী জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কনসোর্টিয়ামকে চিলি যে চুক্তির শর্ত দেয় তা উদার।

প্রকৌশল এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন

এখন চিলিয়ান শিক্ষাবিদরা মন্ত্রীদের আইনি পরিবর্তন করতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন যা টেলিস্কোপ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় দক্ষতা বাড়াবে।

“চিলি তার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রকৌশলীরা জ্যোতির্বিজ্ঞান যন্ত্রপাতি বিকাশ এবং উৎপাদনে অংশ নেয়, যা অবজারভেটরিগুলিকে নিয়মিত আপগ্রেড করতে হয়,” রুবিও বলেন। এটি গবেষণার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও অবদান বাড়াতে সাহায্য করবে।

বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা

আন্তর্জাতিক যোগসূত্র

বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান রাজধানী হিসেবে, চিলি বিদ্যমান টেলিস্কোপ, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সার্জিস্টিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সবচেয়ে উন্নত টেলিস্কোপ তৈরি, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাকে সমর্থন করে। জায়ান্ট ম্যাগেলান টেলিস্কোপের মতো বড় বৈজ্ঞানিক প্রকল্পগুলি চিলির মানুষ যে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে গ্রহণ করেছে তার উপর নির্ভর করে।

জায়ান্ট ম্যাগেলান টেলিস্কোপ বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কাজ করে এমন মাটি-ভিত্তিক এবং মহাকাশ-ভিত্তিক টেলিস্কোপগুলির সাথে বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা সমন্বয় করতে সক্ষম হবে, যা চিলিকে সার্জিস্টিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চ-প্রভাব আবিষ্কারের জন্য আদর্শ অবস্থান করে তোলে।

উপসংহার

চিলি আজ বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান রাজধানী হিসেবে তার উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করেছে কারণ এটি বিশেষ প্রাকৃতিক সুবিধা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি অসাধারণ সংমিশ্রণ প্রদান করে। আটাকামা মরুভূমির নির্মল আকাশ, শুষ্ক বাতাস এবং উঁচু পাহাড়গুলি একত্রিত হয়ে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের জন্য একটি অতুলনীয় পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

সারমর্মে, চিলিতে বিশ্বের অধিকাংশ টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয়েছে এই কারণে:

  1. বছরে ৩০০+ রাত স্পষ্ট আকাশ সহ আদর্শ জ্যোতির্বিজ্ঞান পরিবেশ
  2. আটাকামা মরুভূমির চরম শুষ্কতা, যা মহাকাশ থেকে সিগন্যাল বিকৃতকারী জলীয় বাষ্প থেকে মুক্ত
  3. উচ্চ অ্যালটিটিউড লোকেশন, যা বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব কমাতে সাহায্য করে
  4. আলোক দূষণের অনুপস্থিতি
  5. দক্ষিণ গোলার্ধীয় অবস্থানের কারণে ছায়াপথের কেন্দ্র দেখার সুবিধা
  6. অন্যান্য দেশের তুলনায় টেলিস্কোপ নির্মাণের কম খরচ
  7. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
  8. বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল চুক্তি এবং শর্তাবলী

চিলি আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু। এই দেশের টেলিস্কোপগুলি ইতিমধ্যে আমাদের সৌরজগতের বাইরে গ্রহ আবিষ্কার, ছায়াপথের কেন্দ্রে ব্ল্যাক হোল প্রমাণ করা, এবং মহাবিশ্বের বয়স সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া গভীর করার মতো উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টেলিস্কোপ যেমন E-ELT, GMT এবং অন্যান্যগুলি বিজ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং নিশ্চিত করবে যে চিলি আগামী দশকগুলিতে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের প্রচেষ্টায় দেশটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

xinc syrup এর কাজ কি?

bexidal কিসের ওষুধ?

alice 12 mg এর কাজ কি?

বাসন্তী পুজো ২০২৫: পঞ্জিকা অনুযায়ী ষষ্ঠী থেকে দশমীর সম্পূর্ণ নির্ঘণ্ট

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা ৫টি দল: স্বাধীনতা থেকে বর্তমান পর্যন্ত

ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রীদের গৌরবময় অধ্যায়

ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রীদের গৌরবময় অধ্যায়

২০২৫ সালের সর্বাধিক ভিজিট করা ১০টি ওয়েবসাইট: ডিজিটাল বিশ্বের জায়ান্টদের সাথে পরিচিতি

xfin cream এর কাজ কি? জানুন বিস্তারিত

পেনিটোন ক্রিম এর উপকারিতা?

১০

Motorola Edge 60 Fusion বনাম Motorola Edge 50 Fusion: কোন ফোনে এসেছে দারুণ আপগ্রেড?

১১

Windows 10 বনাম Windows 11, কোনটা আপনার জন্য সেরা?

১২

দেশের সঙ্গে সংযোগ পাচ্ছে কাশ্মীর: ১৯ এপ্রিল উদ্বোধন হবে প্রথম বন্দে ভারত এক্সপ্রেস

১৩

২০২৫ সালের সর্বাধিক ভিজিট করা ১০টি ওয়েবসাইট: ডিজিটাল বিশ্বের জায়ান্টদের সাথে পরিচিতি

১৪

চালের দানার চেয়েও ছোট পেসমেকার: চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কার

১৫

ক্যামেরা যুদ্ধে: Infinix Note 50x বনাম Vivo T4x – কোনটি কেনার যোগ্য?

১৬

রাশিচক্র অনুযায়ী নামের প্রথম অক্ষর: আপনার ভাগ্যের চাবিকাঠি

১৭

২০২৫ সালে বাংলাদেশে স্টারলিংক: ইন্টারনেট প্যাকেজ দাম কত হবে?

১৮

রাজনৈতিক বরফ গলানোর সূচনা? থাইল্যান্ডের বিমস্টেক সম্মেলনে পাশাপাশি বসলেন ইউনূস-মোদি

১৯

কলকাতা মেট্রোর ‘মেট্রো রাইড’ অ্যাপে যুগান্তকারী পরিবর্তন – একসাথে ৪টি টিকিট, পিন লগইন-সহ নতুন ফিচার্স

২০
close