Truecaller-এর দিন কি শেষ? ফোনে এবার সরাসরি আসবে কলারের ভেরিফায়েড নাম! সরকারের নতুন CNAP পরিষেবা চালু হচ্ছে, জানুন শেষ তারিখ

অপরিচিত নম্বর থেকে আসা বারংবার ফোন কল, স্প্যাম এবং জালিয়াতির ভয়ে আমরা অনেকেই জর্জরিত। এই সমস্যার সমাধানে ভারত সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে চলেছে। টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (TRAI)…

Soumya Chatterjee

 

অপরিচিত নম্বর থেকে আসা বারংবার ফোন কল, স্প্যাম এবং জালিয়াতির ভয়ে আমরা অনেকেই জর্জরিত। এই সমস্যার সমাধানে ভারত সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে চলেছে। টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (TRAI) এবং ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশনস (DoT) যৌথভাবে একটি নতুন পরিষেবা চালু করতে চলেছে, যার নাম ‘কলিং নেম প্রেজেন্টেশন’ (Calling Name Presentation) বা CNAP। এই পরিষেবা চালু হলে, কোনো ব্যক্তি কল করলে রিসিভারের ফোনের স্ক্রিনে তার মোবাইল নম্বরের পাশাপাশি তার ভেরিফায়েড নামটিও ভেসে উঠবে। এই নামটি হবে সেই ব্যক্তির নামে, যা তিনি সিম কার্ড কেনার সময় KYC (Know Your Customer) নথি, যেমন আধার কার্ড বা ভোটার কার্ডে জমা দিয়েছিলেন। এর ফলে স্প্যাম এবং জালিয়াতি কল চেনা অনেক সহজ হয়ে যাবে। সম্প্রতি, DoT এই পরিষেবা দেশব্যাপী চালু করার জন্য ৩১ মার্চ, ২০২৬-কে চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

স্প্যাম কলের আতঙ্ক: কেন এই CNAP পরিষেবার প্রয়োজন পড়ল?

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মোবাইল ব্যবহারকারীর দেশ, কিন্তু এই বিশাল ব্যবহারকারীর সংখ্যাই স্প্যাম এবং সাইবার জালিয়াতির এক উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, সাধারণ প্রোমোশনাল কল থেকে শুরু করে মারাত্মক আর্থিক জালিয়াতি, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ এর শিকার হচ্ছেন।

একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্প্যাম কলের নিরিখে ভারত বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। দেশের প্রায় ২৭ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীকে “সফট টার্গেট” হিসেবে গণ্য করা হয়, যারা প্রতিদিন গড়ে ৮টি পর্যন্ত স্প্যাম কল পান। এই কলগুলির মধ্যে ৯০ শতাংশই মার্কেটিং সংক্রান্ত হলেও, বাকি ১০ শতাংশ অত্যন্ত বিপজ্জনক, যার মধ্যে রয়েছে KYC জালিয়াতি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জালিয়াতি এবং সাম্প্রতিকতম আতঙ্ক, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’

এই ধরনের জালিয়াতির ফলে শুধুমাত্র মানসিক শান্তিই বিঘ্নিত হয় না, বিপুল আর্থিক ক্ষতিও হয়। নিউজ৯ (News9)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই ভারতীয়রা সাইবার জালিয়াতির কারণে প্রায় ২২,৮৪৫ কোটি টাকা খুইয়েছেন।

যদিও ট্রুকলারের মতো থার্ড-পার্টি অ্যাপগুলি এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে, তবে তাদের তথ্যের উৎস ব্যবহারকারীদের কনট্যাক্ট লিস্ট (Crowd-sourced), যা প্রায়শই ভুল, পুরনো বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এছাড়াও, এই ধরনের অ্যাপগুলির বিরুদ্ধে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং কনট্যাক্ট লিস্ট নিজেদের সার্ভারে আপলোড করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে, একটি সরকার-অনুমোদিত, নির্ভরযোগ্য এবং নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল। CNAP পরিষেবা সেই অভাবই পূরণ করতে চলেছে, যা সরাসরি টেলিকম অপারেটরের KYC ডেটাবেস থেকে যাচাই করা নাম প্রদর্শন করবে।

CNAP পরিষেবা ঠিক কী? (What Exactly is CNAP Service?)

CNAP বা ‘কলিং নেম প্রেজেন্টেশন’ হল একটি নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক পরিষেবা। সহজ কথায়, যখন কেউ আপনাকে কল করবে, তখন আপনার ফোন নেটওয়ার্ক কেবল কলারের নম্বরটিই নয়, কলারের KYC নথিভুক্ত নামটি অনুসন্ধান করে সেটিও আপনার স্ক্রিনে প্রদর্শন করবে।

CNAP-এর সম্পূর্ণ অর্থ

CNAP-এর সম্পূর্ণ অর্থ হল Calling Name Presentation। এটি একটি অতিরিক্ত পরিষেবা (Supplementary Service) যা টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারীরা (TSPs) তাদের গ্রাহকদের সরবরাহ করবে। এটি ফোনের বেসিক কলিং ফিচারের অংশ নয়, বরং তার সাথে যুক্ত একটি অতিরিক্ত সুবিধা।

এটি কীভাবে কাজ করবে?

CNAP-এর কার্যপ্রণালী ট্রুকলারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি কোনো অ্যাপ বা ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল নয়।

১. ডেটাবেস তৈরি: সমস্ত টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী, যেমন Jio, Airtel, এবং Vodafone Idea (Vi), তাদের সমস্ত গ্রাহকদের একটি করে CNAM (Calling Name) ডেটাবেস তৈরি করবে। এই ডেটাবেসে প্রতিটি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে সেই গ্রাহকের KYC করার সময় দেওয়া নামটি (যা আধার কার্ড বা অন্যান্য পরিচয়পত্রে আছে) সংরক্ষিত থাকবে।

২. কল করার প্রক্রিয়া: যখন কোনো ব্যক্তি (কলার) অন্য ব্যক্তিকে (রিসিভার) কল করেন, তখন কলারের নেটওয়ার্ক (Originating Network) রিসিভারের নেটওয়ার্ককে (Terminating Network) কলটি সংযোগ করার অনুরোধ পাঠায়।

৩. নাম অনুসন্ধান: CNAP পরিষেবা সক্রিয় থাকলে, রিসিভারের নেটওয়ার্ক কলারের নম্বরটি ব্যবহার করে তার নিজস্ব বা একটি কেন্দ্রীয় CNAM ডেটাবেস থেকে কলারের যাচাই করা নামটি অনুসন্ধান করবে।

৪. নাম প্রদর্শন: এরপর রিসিভারের ফোনে রিং হওয়ার সাথে সাথেই কলারের নম্বরের সাথে সেই যাচাই করা নামটি প্রদর্শিত হবে।

এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নেটওয়ার্ক স্তরে ঘটবে, তাই এর জন্য স্মার্টফোনে ইন্টারনেট সংযোগ বা কোনো বিশেষ অ্যাপ ইনস্টল করার প্রয়োজন হবে না।

কারা এই পরিষেবা পাবেন?

প্রাথমিকভাবে, CNAP পরিষেবাটি শুধুমাত্র 4G এবং 5G নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের জন্য চালু করা হবে। এর প্রধান কারণ হল, ভারতের বিশাল সংখ্যক 2G ব্যবহারকারী (প্রায় ২০০ মিলিয়ন) যে পুরনো প্রযুক্তির (Circuit-switched networks) উপর নির্ভরশীল, তাতে এই ফিচার যুক্ত করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় অসম্ভব। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, পুরনো 2G নেটওয়ার্কে প্রয়োজনীয় সফ্টওয়্যার প্যাচ এবং আপগ্রেডের অভাব রয়েছে।

সরকার এবং TRAI টেলিকম সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে যে, এই পরিষেবা চালু হওয়ার পর ভারতে বিক্রি হওয়া সমস্ত নতুন মোবাইল হ্যান্ডসেটকে অবশ্যই CNAP-সমর্থক (CNAP-compatible) হতে হবে।

Truecaller-এর থেকে এটি কতটা আলাদা?

বহু বছর ধরে ভারতীয় ব্যবহারকারীরা কলার আইডি পরিষেবার জন্য মূলত Truecaller-এর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু CNAP চালু হলে এই চিত্রটি আমূল বদলে যেতে পারে। দুটির মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

CNAP বনাম Truecaller: একটি বিস্তারিত তুলনা

নিচের টেবিলটি এই দুটি পরিষেবার মধ্যে মূল পার্থক্যগুলিকে তুলে ধরে:

বৈশিষ্ট্য (Feature) CNAP (সিএনএপি) Truecaller (ট্রুকলার)
তথ্যের উৎস (Data Source) KYC ভেরিফায়েড (সরকার অনুমোদিত নথি) Crowd-sourced (ব্যবহারকারীদের কনট্যাক্ট লিস্ট)
নির্ভুলতা (Accuracy) অত্যন্ত নির্ভুল (আইনি নামের উপর ভিত্তি করে) অনেক সময়ই ভুল, পুরনো বা ব্যবহারকারীর দেওয়া নাম দেখায়
ইন্টারনেট প্রয়োজন? (Internet Needed?) না (নেটওয়ার্ক স্তরের পরিষেবা) হ্যাঁ (অ্যাপটি ইন্টারনেট ছাড়া নাম দেখাতে পারে না)
অ্যাপ প্রয়োজন? (App Needed?) না (ফোনের ডিফল্ট কলিং ফিচারের অংশ হবে) হ্যাঁ (প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে ইনস্টল করতে হয়)
গোপনীয়তা (Privacy) ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডেটা (যেমন কনট্যাক্ট লিস্ট) আপলোড করে না ব্যবহারকারীর সম্পূর্ণ কনট্যাক্ট লিস্ট তার সার্ভারে আপলোড করে
প্রাপ্যতা (Availability) শুধুমাত্র 4G/5G নেটওয়ার্কে (আপাতত) সব স্মার্টফোনে (2G/3G/4G/5G) যেখানে অ্যাপ চলে
বাধ্যতামূলক? (Mandatory?) ডিফল্টরূপে চালু (Default On) থাকবে, তবে ব্যবহারকারী চাইলে বন্ধ (Opt-out) করতে পারবেন ব্যবহারকারীর ইচ্ছাধীন (Opt-in)

কেন CNAP অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য?

ট্রুকলারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এর তথ্যের উৎস। এটি আপনার, আমার এবং কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ফোন থেকে তাদের কনট্যাক্ট লিস্ট সিঙ্ক (Sync) করে একটি বিশাল ডেটাবেস তৈরি করে। এর মানে হল, আপনি যদি আপনার কোনো বন্ধুর নাম আপনার ফোনে “Raju Electrician” নামে সেভ করেন, তবে ট্রুকলার অন্য ব্যবহারকারীদের কাছেও রাজুর নম্বরটি “Raju Electrician” নামেই দেখাতে পারে, যদিও তার আসল নাম হয়তো রাজু বর্মন।

অন্যদিকে, CNAP সরাসরি সিম কার্ড রেজিস্ট্রেশনের সময় জমা দেওয়া সরকারী পরিচয়পত্র থেকে নামটি নেবে। ফলে, জালিয়াতি করার জন্য কেনা সিম কার্ডে যে ব্যক্তির নামে সেটি রেজিস্টার করা, সেই নামটিই ভেসে উঠবে, যা তদন্তের ক্ষেত্রেও পুলিশকে সাহায্য করবে।

CNAP কবে থেকে চালু হচ্ছে? (When is CNAP Launching?)

এই বহু প্রতীক্ষিত পরিষেবাটি চালু করার জন্য সরকার একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছে। এটি রাতারাতি চালু না হয়ে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।

সরকারের চূড়ান্ত সময়সীমা (Government’s Final Deadline)

কেন্দ্রীয় টেলিকম দপ্তর (DoT) সমস্ত টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারীদের (Jio, Airtel, Vi, BSNL) দেশব্যাপী CNAP পরিষেবা চালু করার জন্য ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখটিকে চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই তারিখের মধ্যে সমস্ত সার্কেলে এই পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে কার্যকরী করে তুলতে হবে। যদিও কিছু সূত্র মারফত জানা গেছে, সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালু করার একটি অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যমাত্রা রেখেছিল।

বর্তমান স্থিতি: পাইলট টেস্টিং (Current Status: Pilot Testing)

এই পরিষেবাটি দেশব্যাপী চালু করার আগে এর প্রযুক্তিগত দিকগুলি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। এই মুহূর্তে, টেলিকম সংস্থাগুলি বিভিন্ন সার্কেলে এর ‘পাইলট টেস্টিং’ শুরু করেছে।

প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ভোডাফোন আইডিয়া (Vi) ইতিমধ্যেই হরিয়ানা সার্কেলে CNAP-এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করেছে। রিলায়েন্স জিও (Jio)-ও শীঘ্রই একই সার্কেলে তাদের টেস্টিং শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই টেস্টিং-এর মাধ্যমে দেখা হচ্ছে যে, পরিষেবাটি মসৃণভাবে চলছে কিনা, কল সংযোগ হতে অতিরিক্ত সময় লাগছে কিনা, এবং বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন (Phased Implementation)

এই পাইলট টেস্টিং সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, পরিষেবাটি ধাপে ধাপে সারা দেশে চালু করা হবে। যেমনটা আগে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে 4G এবং 5G গ্রাহকরা এই সুবিধা পাবেন। 2G নেটওয়ার্কে এই সুবিধা আনার জন্য টেলিকম সংস্থাগুলিকে তাদের পরিকাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তন আনতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

CNAP-এর সুবিধা ও অসুবিধা (Advantages and Disadvantages of CNAP)

যেকোনো নতুন প্রযুক্তির মতোই, CNAP-এরও একাধিক ভালো দিক এবং কিছু সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সুবিধা (Pros)

১. স্প্যাম এবং জালিয়াতি হ্রাস: এটিই এর প্রধান এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা। কলারের আসল নাম জানা থাকলে, ব্যবহারকারীরা সহজেই অবাঞ্ছিত বা সন্দেহজনক কলগুলিকে এড়িয়ে চলতে পারবেন।

২. ব্যবহারকারীর সুরক্ষা বৃদ্ধি: যাচাই করা নাম দেখে ব্যবহারকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে তারা কলটি রিসিভ করবেন কিনা। বিশেষ করে মহিলা এবং প্রবীণ নাগরিকরা এর দ্বারা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।

৩. থার্ড-পার্টি অ্যাপের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস: ব্যবহারকারীদের আর ট্রুকলারের মতো অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে না, যা তাদের ফোনের রিসোর্স (ব্যাটারি, ইন্টারনেট) বাঁচাবে এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে।

৪. স্বচ্ছতা: এটি টেলিকম ইকোসিস্টেমে একটি স্বচ্ছতা আনবে, কারণ প্রতিটি নম্বরের সাথে একটি যাচাই করা পরিচয় যুক্ত থাকবে।

৫. সাইবার ক্রাইম তদন্তে সাহায্য: যেহেতু নামটি KYC-ভিত্তিক, তাই কোনো জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে অপরাধীকে ট্র্যাক করা সাইবার সুরক্ষা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির পক্ষে সহজ হবে।

অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জ (Cons and Challenges)

১. গোপনীয়তার উদ্বেগ (Privacy Concerns): এটি CNAP-এর সবচেয়ে বিতর্কিত দিক। অনেক ব্যবহারকারী, বিশেষত মহিলারা, চান না যে তাদের আসল নাম প্রতিটি অচেনা কলারের কাছে প্রদর্শিত হোক। এছাড়াও, কিছু পেশার মানুষ (যেমন সাংবাদিক, ডাক্তার, বা হুইসেলব্লোয়ার) আছেন যারা তাদের পরিচয় গোপন রাখতে চান।

২. 2G ব্যবহারকারীদের বাদ পড়া: ভারতের প্রায় ২০০ মিলিয়ন 2G ব্যবহারকারী, যারা মূলত গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে এলাকায় বাস করেন এবং স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না, তারা প্রাথমিকভাবে এই সুরক্ষার আওতার বাইরে থাকবেন। অথচ এই শ্রেণীর মানুষরাই প্রায়শই জালিয়াতির শিকার হন বেশি।

৩. বাস্তবায়নের জটিলতা: কোটি কোটি গ্রাহকের KYC তথ্য নিয়ে একটি অভিন্ন, সুরক্ষিত এবং দ্রুত ডেটাবেস তৈরি করা এবং তা সমস্ত অপারেটরের মধ্যে সিঙ্ক করা একটি বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

৪. কল সেটআপে দেরি (Call Setup Delay): TRAI তাদের আলোচনাপত্রে উল্লেখ করেছিল যে, কল সংযোগের আগে প্রতিবার নাম অনুসন্ধান করার ফলে কল সেটআপ টাইমে (কল লাগতে যে সময় লাগে) সামান্য দেরি হতে পারে, যদিও সংস্থাগুলি এই সময় ন্যূনতম রাখার চেষ্টা করছে।

৫. ব্যবসায়িক নম্বর: যে সমস্ত সংস্থা বাল্ক সিম বা টেলিমার্কেটিং-এর জন্য নম্বর ব্যবহার করে, তাদের ক্ষেত্রে কী নাম দেখানো হবে? সম্ভবত, সেক্ষেত্রে সংস্থার রেজিস্টার্ড নামটি দেখানো হবে, যা এখনও একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ।

ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Important Information for Users)

একজন সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে, CNAP পরিষেবা সম্পর্কে আপনার কিছু বিষয় পরিষ্কারভাবে জেনে রাখা দরকার।

CNAP কি বাধ্যতামূলক? (Is CNAP Mandatory?)

প্রাথমিকভাবে, TRAI সুপারিশ করেছিল যে এই পরিষেবাটি ‘Opt-in’ (অর্থাৎ, গ্রাহক অনুরোধ করলে তবেই চালু হবে) ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কিন্তু, ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশনস (DoT) এর সাথে একমত হয়নি।

দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, TRAI এবং DoT উভয়ই একমত হয়েছে যে CNAP পরিষেবাটি সমস্ত গ্রাহকের জন্য “ডিফল্টরূপে চালু” (Default On) থাকবে। এর অর্থ হল, পরিষেবাটি চালু হলে আপনাকে আলাদা করে কিছু করতে হবে না, আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সুবিধা পেতে শুরু করবেন।

আপনি কি এই পরিষেবা বন্ধ করতে পারবেন? (Can you turn this service off?

হ্যাঁ, পারবেন। সরকার ব্যবহারকারীর গোপনীয়তাকে সম্মান জানিয়ে এই সুবিধাটি রেখেছে। যদিও পরিষেবাটি ‘ডিফল্ট অন’ থাকবে, তবে যেকোনো গ্রাহক যদি চান যে তার নাম অন্যদের ফোনে প্রদর্শিত না হোক, তিনি তার টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারীর (Jio/Airtel/Vi) কাছে অনুরোধ করে এই পরিষেবাটি বন্ধ বা ‘Opt-out’ করতে পারবেন।

এই ‘Opt-out’ প্রক্রিয়াটি কেমন হবে (অ্যাপের মাধ্যমে, এসএমএস করে, বা কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে) তা টেলিকম সংস্থাগুলি পরবর্তীকালে বিস্তারিতভাবে জানাবে।

CLIR ব্যবহারকারীদের কী হবে?

ইতিমধ্যেই টেলিকম নেটওয়ার্কে ‘কলিং লাইন আইডেন্টিফিকেশন রেস্ট্রিকশন’ (CLIR) নামে একটি পরিষেবা বিদ্যমান। যে গ্রাহকরা এই CLIR পরিষেবাটি (সাধারণত চার্জের বিনিময়ে) ব্যবহার করেন, তারা কল করলে রিসিভারের ফোনে তাদের নম্বর ‘প্রাইভেট নম্বর’ বা ‘রেস্ট্রিক্টেড’ হিসেবে দেখায়। CNAP চালু হলেও, যে সমস্ত গ্রাহকের CLIR পরিষেবা সক্রিয় থাকবে, তাদের নাম প্রদর্শন করা হবে না।

টেলিকম সংস্থাগুলি (Jio, Airtel, Vi) কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে?

এই বিশাল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে রয়েছে টেলিকম সংস্থাগুলি। DoT-এর নির্দেশিকা পাওয়ার পর থেকেই সংস্থাগুলি তাদের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।

রিলায়েন্স জিও (Jio), যারা সম্পূর্ণ 4G/5G নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল, তারা এই প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। জানা গেছে, জিও তাদের নিজস্ব ইন-হাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করেই CNAP সিস্টেম তৈরি করছে।

অন্যদিকে, এয়ারটেল (Airtel) এবং ভোডাফোন আইডিয়া (Vi), যাদের নেটওয়ার্কে এখনও 2G গ্রাহক রয়েছে, তাদের পরিকাঠামো আপগ্রেড করতে হচ্ছে। উভয় সংস্থাই তাদের নেটওয়ার্কে CNAP এবং অন্যান্য আধুনিক পরিষেবা (যেমন স্প্যাম ফিল্টারিং) প্রয়োগ করার জন্য নোকিয়ার (Nokia) মতো প্রযুক্তি সহযোগীদের সাথে কাজ করছে।

সমস্ত সংস্থাকেই তাদের গ্রাহক ডেটাবেস (CNAM Database) তৈরি, সুরক্ষিত এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য বিপুল বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এই ডেটাবেসগুলিকে একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে এক নেটওয়ার্ক (যেমন জিও) থেকে অন্য নেটওয়ার্কে (যেমন এয়ারটেল) কল করা হলেও নামটি সঠিকভাবে প্রদর্শিত হয়।

এই পদক্ষেপের বৃহত্তর প্রভাব (The Broader Impact of this Step)

CNAP কেবল একটি কলার আইডি ফিচার নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামোকে সুরক্ষিত করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এর ফলে, টেলিমার্কেটিং শিল্পকে আরও স্বচ্ছ হতে বাধ্য করা হবে। রেজিস্টার্ড ব্যবসায়িক নাম ব্যবহার করা হলে গ্রাহকদের পক্ষে আসল এবং জালিয়াতিমূলক মার্কেটিং কলের মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হবে। সাইবার অপরাধীরা, যারা এতদিন ভুয়ো পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়েছে, তারা একটি বড় বাধার সম্মুখীন হবে।

তবে, এর সাথে সাথে ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট (DPDP Act) -এর অধীনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকেও সুরক্ষিত রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ‘ডিফল্ট অন’ ফিচারটি সুরক্ষার জন্য ভালো হলেও, ‘অপ্ট-আউট’-এর প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সহজ এবং অ্যাক্সেসযোগ্য করে তুলতে হবে, যাতে যেকোনো সাধারণ ব্যবহারকারী সহজেই তার গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারেন।

শেষ কথা

CNAP পরিষেবা ভারতের কোটি কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর জন্য একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস আনতে চলেছে। স্প্যাম এবং জালিয়াতি কলের যে নিরন্তর উপদ্রব আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়। যদিও গোপনীয়তা এবং 2G ব্যবহারকারীদের বাদ পড়ার মতো কিছু বৈধ উদ্বেগ রয়েছে, তবে যাচাই করা নামের স্বচ্ছতা নিঃসন্দেহে ডিজিটাল লেনদেন এবং যোগাযোগকে অনেক বেশি সুরক্ষিত করে তুলবে। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে এই পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে চালু হলে, তা ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-এর যাত্রাপথে একটি অন্যতম মাইলফলক হয়ে থাকবে।

About Author
Soumya Chatterjee

সৌম্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং প্রযুক্তি বিষয়ক লেখালিখিতে বিশেষ আগ্রহী। তিনি একজন উদ্যমী লেখক, যিনি প্রযুক্তির জটিল ধারণাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে দক্ষ। তার লেখার মূল ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, গ্যাজেট রিভিউ, সফটওয়্যার গাইড, এবং উদীয়মান টেক প্রবণতা। সৌম্যর প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান এবং অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তাকে পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। টেক জগতে চলমান পরিবর্তনগুলির সাথে তাল মিলিয়ে সৌম্য সর্বদা নতুন ও তথ্যসমৃদ্ধ বিষয়বস্তু নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আরও পড়ুন