পর্দা কাঁপানো বিতর্ক! অন্তরঙ্গ দৃশ্যের জন্য সমালোচিত সেই ১০টি সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা

দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা, যা তার বর্ণময় আখ্যান, অসাধারণ অ্যাকশন এবং গভীর আবেগমথিত গল্পের জন্য পরিচিত, তা বরাবরই ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু, এই শিল্পেরও এমন কিছু দিক রয়েছে যা…

Sangita Chowdhury

 

দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা, যা তার বর্ণময় আখ্যান, অসাধারণ অ্যাকশন এবং গভীর আবেগমথিত গল্পের জন্য পরিচিত, তা বরাবরই ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু, এই শিল্পেরও এমন কিছু দিক রয়েছে যা প্রায়শই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বিশেষ করে, যখন কোনও সিনেমা সামাজিক প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে বা ‘অন্তরঙ্গতা’-এর মতো সংবেদনশীল বিষয়কে পর্দায় তুলে ধরে, তখন নির্মাতা, সেন্সর বোর্ড এবং দর্শকদের মধ্যে এক ত্রিমুখী সংঘাত শুরু হয়। এই চলচ্চিত্রগুলি প্রায়শই ‘শিল্পের স্বাধীনতা’ বনাম ‘সাংস্কৃতিক অবক্ষয়’-এর বিতর্কের জন্ম দেয় এবং বক্স অফিসের সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনার ঝড়ও তোলে।

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প—তামিল, তেলেগু, মালায়ালম এবং কন্নড়—সবসময়ই নতুন নতুন বিষয়বস্তু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আগ্রহী। তবে, সমাজের একটি বড় অংশ এখনও পর্দায় যৌনতা বা অন্তরঙ্গতার খোলামেলা প্রদর্শনকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। এর ফলে, সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC) বা সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। CBFC-এর নির্দেশিকাগুলি প্রায়শই নির্মাতাদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাংঘর্ষিক হয়। এই প্রতিবেদনে, আমরা এমন ১০টি দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার গভীরে যাব, যেগুলি তাদের সাহসী বা অন্তরঙ্গ দৃশ্যের জন্য তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল এবং ভারতীয় সিনেমার সীমানাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছিল।

সেন্সরশিপ এবং দক্ষিণি সিনেমার বিবর্তন

ভারতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর বিষয়টি “দ্য সিনেম্যাটোগ্রাফ অ্যাক্ট, ১৯৫২” (The Cinematograph Act, 1952) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই আইনের অধীনেই CBFC গঠিত হয়েছে, যার কাজ হলো চলচ্চিত্রগুলিকে জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত কিনা তা বিচার করা এবং সেগুলিকে ‘U’ (সকলের জন্য), ‘U/A’ (অভিভাবকের নির্দেশনাসহ), বা ‘A’ (শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য) রেটিং দেওয়া।

ঐতিহ্যগতভাবে, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা (বিশেষ করে তামিল ও তেলেগু) পারিবারিক দর্শকদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হতো। কিন্তু গত দুই দশকে, বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের আগমনের সাথে, দর্শকদের রুচি এবং নির্মাতাদের গল্প বলার ধরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দ্য হিন্দু বিজনেসলইন-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ওটিটি-এর উত্থান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আরও বেশি সাহসী এবং বাস্তবসম্মত বিষয়বস্তু অন্বেষণ করতে উৎসাহিত করেছে, যা প্রায়শই সেন্সরশিপের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

তবে, যখনই মূলধারার সিনেমায় এই ‘সাহস’ প্রদর্শিত হয়েছে, তখনই তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্মাতারা একে ‘গল্পের প্রয়োজন’ বা ‘বাস্তবতার প্রতিফলন’ বলে দাবি করলেও, সমালোচকরা একে ‘জনপ্রিয়তা অর্জনের সস্তা কৌশল’ বা ‘যুব সমাজকে বিপথে চালনা’ করার অভিযোগ তুলেছেন। এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের নির্বাচিত ১০টি সিনেমা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ১০টি দক্ষিণি সিনেমা

এখানে এমন ১০টি সিনেমার বিশদ বিশ্লেষণ করা হলো, যেগুলি তাদের অন্তরঙ্গ বা বিতর্কিত বিষয়বস্তুর জন্য খবরের শিরোনামে এসেছিল।

১. অর্জুন রেড্ডি (তেলেগু, ২০১৭)

সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা পরিচালিত এবং বিজয় দেবরকোন্ডা অভিনীত ‘অর্জুন রেড্ডি’ শুধু তেলেগু ইন্ডাস্ট্রিতে নয়, সমগ্র ভারতীয় সিনেমায় এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সিনেমাটি একজন প্রতিভাবান অথচ রাগী সার্জনের আত্ম-ধ্বংসের গল্প বলে, যে তার প্রেমিকার বিয়ের পর মদ্যপান এবং মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ে।

বিতর্কের কারণ:

সিনেমাটি তার কাঁচা এবং আপোষহীন চিত্রায়ণের জন্য প্রশংসিত হলেও, এর বিরুদ্ধে ‘মহিলা বিদ্বেষ’ (misogyny) এবং ‘বিষাক্ত পৌরুষ’-কে (toxic masculinity) মহিমান্বিত করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

  • অন্তরঙ্গ দৃশ্য: সিনেমায় বিজয় দেবরকোন্ডা এবং শালিনী পাণ্ডের মধ্যে একাধিক দীর্ঘ চুম্বন এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য ছিল, যা তেলেগু সিনেমার জন্য বেশ নতুন ছিল।
  • পোস্টার বিতর্ক: মুক্তির আগে, সিনেমার একটি পোস্টার, যেখানে নায়ক-নায়িকা চুম্বনরত, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। তেলেঙ্গানার প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ভি. হনুমন্ত রাও এই পোস্টারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ জানান এবং সেগুলি ছিঁড়ে ফেলার আহ্বান জানান।
  • ভাষা ও আচরণ: সিনেমার প্রধান চরিত্রের আগ্রাসী আচরণ, বিশেষ করে মহিলাদের প্রতি তার মনোভাব এবং গালিগালাজের ব্যবহার সমালোচিত হয়।

বিভিন্ন মহিলা সংগঠন সিনেমাটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তা সত্ত্বেও, ‘অর্জুন রেড্ডি’ বক্স অফিসে ব্লকবাস্টার হিট হয় এবং এটি একটি ‘কাল্ট ক্লাসিক’-এর মর্যাদা পায়, যা প্রমাণ করে যে দর্শকদের একটি বড় অংশ সিনেমাটির বাস্তবসম্মত চিত্রায়ণকে গ্রহণ করেছিল।

২. আড়াই (তামিল, ২০১৯)

অমলা পল অভিনীত ‘আড়াই’ (Aadai) একটি সাহসী এবং পরীক্ষামূলক তামিল চলচ্চিত্র, যা মুক্তির আগেই তার টিজারের জন্য জাতীয় স্তরের বিতর্কের জন্ম দেয়। সিনেমাটি কামিনী নামক এক স্বাধীনচেতা মেয়ের গল্প বলে, যে এক রাতে পার্টি করার পর নিজেকে একটি পরিত্যক্ত বিল্ডিং-এ সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আবিষ্কার করে।

বিতর্কের কারণ:

বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সিনেমার টিজারে অমলা পলের একটি নগ্ন দৃশ্য।

  • নগ্নতার প্রদর্শন: ভারতীয় সিনেমায়, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায়, একজন মূলধারার অভিনেত্রীর এই ধরনের সাহসী পদক্ষেপ ছিল অকল্পনীয়। টিজারটি প্রকাশের সাথে সাথে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড় ওঠে।
  • সেন্সর বোর্ড: সিনেমাটিকে সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। অবশেষে, একাধিক কাট এবং ‘A’ (প্রাপ্তবয়স্ক) শংসাপত্রের সাথে এটি মুক্তি পায়। দ্য নিউজ মিনিট-এর মতে, CBFC দৃশ্যটির উদ্দেশ্যমূলকতা বিচার করেই ছাড়পত্র দেয়।
  • নৈতিক বিতর্ক: একদল দর্শক এবং সমালোচক একে ‘সস্তা প্রচার’ বলে আখ্যা দিলেও, অন্য একটি বড় অংশ অমলা পলের সাহসিকতা এবং পরিচালকের (রত্ন কুমার) বিষয়বস্তুর প্রতি সৎ থাকার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে। সিনেমাটি আদতে নারী স্বাধীনতা এবং সমাজের ভণ্ডামি নিয়ে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।

৩. এস. দুর্গা (মালায়ালম, ২০১৭)

স্যানাল কুমার শশীধরনের ‘এস. দুর্গা’ (S. Durga) একটি স্বাধীন মালায়ালম চলচ্চিত্র, যা কোনও প্রথাগত অন্তরঙ্গ দৃশ্যের জন্য নয়, বরং তার শিরোনাম এবং থিমের জন্য সেন্সর বোর্ডের রোষানলে পড়ে। সিনেমাটি এক রাতে কেরালা থেকে আসা এক দম্পতি, দুর্গা এবং কবিরের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বলে, যারা কিছু স্থানীয় গুন্ডার পাল্লায় পড়ে।

বিতর্কের কারণ:

  • শিরোনাম বিতর্ক: সিনেমাটির আসল নাম ছিল ‘সেক্সি দুর্গা’ (Sexy Durga)। CBFC এই শিরোনামে তীব্র আপত্তি জানায়। তাদের মতে, ‘সেক্সি’ শব্দটি ‘দুর্গা’ নামের (যা একজন হিন্দু দেবীর নাম) সাথে ব্যবহার করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে।
  • সেন্সরশিপ: নির্মাতাকে বাধ্য হয়ে নাম পরিবর্তন করে ‘এস. দুর্গা’ রাখতে হয় এবং ‘সেক্সি’ শব্দটি বিপ (Bleep) করে দিতে হয়।
  • আন্তর্জাতিক সম্মান ও দেশীয় বঞ্চনা: আশ্চর্যের বিষয় হলো, সিনেমাটি রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ (IFFR) সর্বোচ্চ সম্মান ‘টাইগার অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছিল। কিন্তু ভারতে, এটি ব্যাপক সেন্সরশিপের শিকার হয়। হিন্দুস্তান টাইমস-এর মতো একাধিক গণমাধ্যমে এই দ্বিচারিতা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হয়। সিনেমাটিকে গোয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (IFFI) থেকে বাদ দেওয়া নিয়েও তীব্র বিতর্ক হয়। এই চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF) মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়শই এই ধরনের শৈল্পিক স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ায়।

ভারতের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ১০ সিনেমা কোনগুলো?

৪. আভালুদে রাভুকাল (মালায়ালম, ১৯৭৮)

তালিকার সবচেয়ে পুরোনো সিনেমা, আই. ভি. শশী পরিচালিত ‘আভালুদে রাভুকাল’ (Avalude Raavukal – Her Nights), মালায়ালম সিনেমার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এটি ছিল প্রথম মালায়ালম সিনেমা যা ‘A’ শংসাপত্র পায়।

বিতর্কের কারণ:

সেই সময়ের তুলনায় সিনেমাটি অত্যন্ত সাহসী ছিল। এটি রাজি নামক এক অল্পবয়সী যৌনকর্মীর জীবন এবং তার তিন পুরুষের সাথে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

  • বিষয়বস্তু: ১৯৭০-এর দশকে দাঁড়িয়ে একজন যৌনকর্মীকে সহানুভূতিশীল এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা এক বিপ্লবী পদক্ষেপ ছিল।
  • সীমা-র অভিনয়: অভিনেত্রী সীমা এই চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে মালায়ালম সিনেমায় ‘নায়িকা’-র প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে দেন। তার চরিত্রটি ছিল স্পষ্টবাদী এবং নিজের যৌনতা সম্পর্কে সচেতন।
  • সামাজিক প্রতিক্রিয়া: মুক্তির পর সিনেমাটি রক্ষণশীল দর্শকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। একে ‘অশ্লীল’ এবং ‘সাংস্কৃতিক অবক্ষয়’-এর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, ‘আভালুদে রাভুকাল’ একটি কাল্ট ক্লাসিকে পরিণত হয়েছে এবং মালায়ালম সিনেমায় বাস্তববাদী চিত্রায়ণের পথ প্রশস্ত করেছে।

৫. আরএক্স ১০০ (তেলেগু, ২০১৮)

অজয় ভূপতি পরিচালিত ‘আরএক্স ১০০’ (RX 100) একটি লো-বাজেট তেলেগু সিনেমা, যা তার কাঁচা (raw) এবং তীব্র বিষয়বস্তুর জন্য বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল। এটি এক গ্রামীণ যুবকের (কার্তিকেয়) তীব্র ভালোবাসার গল্প, যে তার প্রেমিকা (পায়েল রাজপুত) দ্বারা প্রতারিত হয়।

বিতর্কের কারণ:

  • তীব্র অন্তরঙ্গতা: ‘অর্জুন রেড্ডি’-র মতোই, এই সিনেমাতেও নায়ক-নায়িকার মধ্যে একাধিক দীর্ঘায়িত এবং প্রগাঢ় শারীরিক ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য ছিল। এই দৃশ্যগুলো ট্রেলারে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল, যা দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল এবং বিতর্ক উভয়ই তৈরি করে।
  • নারী চরিত্রের চিত্রায়ণ: তবে মূল বিতর্ক ছিল নারী চরিত্রটিকে (ইন্দু) নিয়ে। সাধারণত তেলেগু সিনেমায় নায়িকাদের ‘নিষ্পাপ’ হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু এই সিনেমায় নায়িকা তার নিজের যৌন চাহিদা পূরণের জন্য নায়ককে ব্যবহার করে এবং পরে তাকে ত্যাগ করে। এই নেতিবাচক এবং ‘সাহসী’ নারী চরিত্রায়ন অনেককে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
  • বাণিজ্যিক সাফল্য: টাইমস অফ ইন্ডিয়া-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ২ কোটি টাকায় নির্মিত সিনেমাটি ২৫ কোটিরও বেশি আয় করে, যা প্রমাণ করে যে বিতর্ক সত্ত্বেও দর্শকরা নতুন ধরনের গল্প গ্রহণে আগ্রহী ছিল।

৬. ৯০এমএল (তামিল, ২০১৯)

‘বিগ বস’ খ্যাত অভিনেত্রী পেইন্টিং অভিনীত ‘৯০এমএল’ (90ML) তামিল সিনেমায় এক ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা ছিল, যা সরাসরি নারী স্বাধীনতা এবং তাদের যৌন আকাঙ্ক্ষার কথা বলে।

বিতর্কের কারণ:

সিনেমাটি পাঁচজন নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে, যারা তাদের জীবন, প্রেম, যৌনতা এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে।

  • খোলামেলা বিষয়বস্তু: সিনেমায় নারী চরিত্রদের মদ্যপান, ধূমপান, লিভ-ইন রিলেশনশিপ এবং তাদের যৌন ফ্যান্টাসি নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়।
  • সমকামিতার ইঙ্গিত: সিনেমায় সমকামিতারও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ছিল, যা তামিল মূলধারার সিনেমার জন্য বিরল।
  • তীব্র প্রতিক্রিয়া: সিনেমাটি মুক্তির পর তামিলনাড়ুতে সাংস্কৃতিক ঝড় ওঠে। একাধিক রক্ষণশীল গোষ্ঠী সিনেমাটির প্রদর্শন বন্ধ করার দাবি জানায়। তাদের অভিযোগ, এই সিনেমা তামিল সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে এবং মহিলাদের ‘বিপথে’ চালিত করছে। পরিচালক অনিতা উদীন এবং অভিনেত্রী ওভিয়া তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়।

৭. দণ্ডুপাল্যা (কন্নড়, ২০১২)

‘দণ্ডুপাল্যা’ (Dandupalya) একটি কন্নড় ক্রাইম থ্রিলার, যা দণ্ডুপাল্যা নামক এক কুখ্যাত অপরাধী গ্যাং-এর বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত।

বিতর্কের কারণ:

সিনেমাটি তার চরম হিংসা, নগ্নতা এবং কাঁচা বাস্তবতার জন্য সমালোচিত হয়েছিল।

  • হিংসা ও যৌনতা: সিনেমাটিতে খুন, ধর্ষণ এবং অন্যান্য অপরাধের দৃশ্যগুলি অত্যন্ত গ্রাফিক এবং বিশদভাবে দেখানো হয়েছিল।
  • পূজা গান্ধীর দৃশ্য: অভিনেত্রী পূজা গান্ধীর একটি দৃশ্য, যেখানে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে নগ্ন হতে বাধ্য করা হয়, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। সমালোচকদের মতে, এই দৃশ্যটি অপ্রয়োজনীয় এবং নিছক প্রচারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
  • সেন্সরশিপ: CBFC সিনেমাটিতে অসংখ্য কাট করার নির্দেশ দেয়। ব্যাঙ্গালোর মিরর-এর মতো সমালোচকরাও এর অতিরিক্ত হিংস্রতার সমালোচনা করেন। তা সত্ত্বেও, সিনেমাটি কন্নড় বক্স অফিসে হিট হয় এবং এর একাধিক সিক্যুয়েলও নির্মিত হয়।

৮. সিন্ধু সমভেলি (তামিল, ২০১০)

পরিচালক সামি (Samy) তার বিতর্কিত চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত। ‘সিন্ধু সমভেলি’ (Sindhu Samaveli) তার সবচেয়ে কুখ্যাত সৃষ্টিগুলির মধ্যে অন্যতম।

বিতর্কের কারণ:

সিনেমাটির মূল বিতর্ক ছিল এর বিষয়বস্তু, যা ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে বড় ট্যাবুগুলির মধ্যে একটিকে স্পর্শ করে।

  • অজাচার সম্পর্ক: সিনেমাটির গল্প এক তরুণীকে (অনাকা) নিয়ে, যে তার নিজের শ্বশুরের (গজ) সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
  • জনরোষ: এই ধরনের ‘অজাচার’ (Incestuous) সম্পর্ককে পর্দায় দেখানোয় দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তামিলনাড়ুর বিভিন্ন সিনেমা হলে ভাঙচুর চালানো হয় এবং সিনেমাটির প্রদর্শন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
  • আইনি পদক্ষেপ: জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলিও এই বিতর্কের খবর প্রকাশ করে। পরিচালকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তাকে জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে হয়। এই সিনেমাটি প্রমাণ করে যে, শৈল্পিক স্বাধীনতার নামে সামাজিক ট্যাবুকে স্পর্শ করার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, যা অতিক্রম করলে সমাজ তা গ্রহণ করে না।

৯. গুন্টুর কারাম (তেলেগু, ২০২৪)

মহেশ বাবু অভিনীত এবং ত্রিবিক্রম শ্রীনিবাস পরিচালিত ‘গুন্টুর কারাম’ (Guntur Kaaram) সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একটি সিনেমা, যা প্রমাণ করে যে বিতর্ক শুধু অন্তরঙ্গ দৃশ্যের জন্য নয়, নারীর ‘অবমাননাকর’ চিত্রায়ণের জন্যও হতে পারে।

বিতর্কের কারণ:

সিনেমাটির বিরুদ্ধে ‘অন্তরঙ্গতা’ বা ‘নগ্নতা’ প্রদর্শনের অভিযোগ ছিল না, বরং অভিযোগ ছিল এর ‘অশ্লীল’ ইঙ্গিত এবং নারীর অবমাননার।

  • আইটেম সং এবং দৃশ্য: সিনেমার একটি গানে অভিনেত্রী শ্রীলীলার (Sreeleela) নাভির উপর ফোকাস করা বা কিছু দৃশ্যে তার প্রতি মহেশ বাবুর আচরণকে অনেকেই অবমাননাকর (objectification) বলে মনে করেন।
  • আধুনিক বিতর্ক: এটি দেখায় যে, সময়ের সাথে সাথে বিতর্কের ধরণও বদলেছে। আজকাল দর্শকরা শুধু ‘কী দেখানো হচ্ছে’ তাই নয়, ‘কীভাবে দেখানো হচ্ছে’ তা নিয়েও সোচ্চার। সমালোচকরা পরিচালকের ‘রিগ্রেসিভ’ বা পশ্চাৎপদ মানসিকতার সমালোচনা করেন। এটি প্রমাণ করে, এমনকি একজন সুপারস্টারের সিনেমাও এখন এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে ছাড় পায় না।

১০. কাদাল (তামিল, ২০১৩)

মণি রত্নম, যিনি তার পরিশীলিত এবং শৈল্পিক সিনেমার জন্য পরিচিত, তিনিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তার পরিচালিত ‘কাদাল’ (Kadal) সিনেমাটি এক অপ্রত্যাশিত কারণে সমালোচিত হয়েছিল।

বিতর্কের কারণ:

সিনেমাটিতে দুই নবাগত শিল্পী, গৌতম কার্তিক এবং থুলাসি নায়ারের মধ্যে একটি চুম্বন দৃশ্য ছিল।

  • সাধারণ চুম্বনের বিতর্ক: আজকের মানদণ্ডে এটি খুবই সাধারণ মনে হলেও, ২০১৩ সালে মণি রত্নমের মতো একজন ‘পারিবারিক’ পরিচালকের সিনেমায় এই দৃশ্যটি অনেককে অবাক করেছিল।
  • সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা: তামিলনাড়ুর গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে দর্শকরা এই দৃশ্যটিকে সহজভাবে নেয়নি। এটি দেখায় যে, তামিল দর্শক, এমনকি মূলধারার বিনোদনেও, অন্তরঙ্গতার প্রকাশে কতটা রক্ষণশীল হতে পারে। আইবিটাইমস (IBTimes) এর মতো রিভিউতে এই দৃশ্যটি নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছিল। এই বিতর্কটি প্রমাণ করে যে, অনেক সময় বিতর্কের কারণ দৃশ্যটির ‘তীব্রতা’ নয়, বরং নির্মাতার ‘পরিচিতি’ এবং দর্শকদের ‘প্রত্যাশা’-র উপরও নির্ভর করে।

IMDb-এ ৮+ রেটিং পাওয়া ১০টি বাংলা সিনেমা: বাংলা সিনেমার মহাকাব্য

পরিসংখ্যান কী বলছে? (What do the statistics say?)

বিতর্ক সত্ত্বেও, অনেক ‘A’ রেটেড বা বিতর্কিত সিনেমা বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পেয়েছে। এটি এক ধরণের প্যারাডক্স তৈরি করে: দর্শকরা যা দেখে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন, তা-ই হয়তো একান্তে উপভোগ করেন।

  • অর্জুন রেড্ডি: প্রায় ৪-৫ কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত, এই সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ৫০ কোটি টাকারও বেশি আয় করে।
  • আরএক্স ১০০: প্রায় ২ কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত, এই সিনেমাটি প্রায় ২৫ কোটি টাকার ব্যবসা করে।
  • দণ্ডুপাল্যা: এই সিনেমার বাজেট এবং আয়ও উল্লেখযোগ্য ছিল, যা কন্নড় ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন ট্রেন্ড সেট করে।

এই ডেটা Box Office India বা IB Times এর মতো ট্রেড পোর্টালগুলি থেকে যাচাই করা যেতে পারে। এই পরিসংখ্যানগুলি দেখায় যে ‘বিতর্ক’ প্রায়শই সিনেমার জন্য একটি শক্তিশালী মার্কেটিং টুল হিসেবে কাজ করে।

নীচের সারণীতে সিনেমাগুলির একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:

সিনেমার নাম (Film Name) ভাষা (Language) মুক্তির সাল (Year) বিতর্কের মূল কারণ (Reason for Controversy)
অর্জুন রেড্ডি (Arjun Reddy) তেলেগু ২০১৭ অন্তরঙ্গ দৃশ্য, ভাষা, ‘misogyny’
আড়াই (Aadai) তামিল ২০১৯ টিজারে নগ্ন দৃশ্য
এস. দুর্গা (S. Durga) মালায়ালম ২০১৭ শিরোনাম বিতর্ক, থিম
আভালুদে রাভুকাল (Avalude Raavukal) মালায়ালম ১৯৭৮ যৌনকর্মীর সহানুভূতিশীল চিত্রায়ণ
আরএক্স ১০০ (RX 100) তেলেগু ২০১৮ দীর্ঘায়িত ও কাঁচা অন্তরঙ্গ দৃশ্য
৯০এমএল (90ML) তামিল ২০১৯ নারী স্বাধীনতার খোলামেলা চিত্রায়ণ
দণ্ডুপাল্যা (Dandupalya) কন্নড় ২০১২ চরম হিংসা ও নগ্নতা
সিন্ধু সমভেলি (Sindhu Samaveli) তামিল ২০১০ অজাচার (Incestuous) সম্পর্ক
গুন্টুর কারাম (Guntur Kaaram) তেলেগু ২০২৪ নারীর অবমাননাকর দৃশ্য (Objectification)
কাদাল (Kadal) তামিল ২০১৩ নবাগতদের চুম্বন দৃশ্য

দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা এক বর্ণময় এবং জটিল জগৎ। একদিকে যেমন এটি তার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে তেমনই এটি বৈশ্বিক সিনেমার সাথে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন বিষয়বস্তু নিয়ে পরীক্ষা করতেও পিছপা হয় না। এই ১০টি সিনেমা সেই পরীক্ষারই নিদর্শন।

এই চলচ্চিত্রগুলি বিতর্কিত হয়েছে কারণ তারা সমাজের স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডিকে (Comfort Zone) ধাক্কা দিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে প্রথাগত নৈতিকতা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। ‘অশ্লীলতা’ এবং ‘শিল্প’-এর মাঝের রেখাটি খুব সূক্ষ্ম এবং তা ব্যক্তি, সমাজ এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। ১৯৭৮ সালে যা ‘অশ্লীল’ ছিল (‘আভালুদে রাভুকাল’), তা আজ ‘ক্লাসিক’। ২০১৭ সালে যা ‘সাহসী’ ছিল (‘অর্জুন রেড্ডি’), তা হয়তো ২০৩০ সালে ‘সাধারণ’ বলে মনে হবে।

এই বিতর্কগুলি আসলে সমাজের বিবর্তনেরই প্রতিফলন। যতক্ষণ নির্মাতারা বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করবেন এবং সেন্সর বোর্ড সাংস্কৃতিক অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে, ততক্ষণ এই শৈল্পিক সংঘাত চলতেই থাকবে। এই সিনেমাগুলি হয়তো সমালোচিত হয়েছে, কিন্তু একই সাথে তারা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমাকে আরও পরিণত, সাহসী এবং বৈচিত্র্যময় হতে সাহায্য করেছে।

About Author
আরও পড়ুন