জয়েন করুন

মন্দির-মসজিদ নয়, চাকরি! সিপিএমের ইস্তেহারে কার জন্য কী প্রতিশ্রুতি

CPIM West Bengal Manifesto 2026: ভোটের সময়ে প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সব ইস্তেহার একরকমও নয়। কেউ ভাতা বাড়ানোর কথা বলে, কেউ অবকাঠামো, কেউ বা পরিচয়ের রাজনীতি। সিপিএম এবার যে…

avatar
Written By : Ishita Ganguly
Updated Now: April 5, 2026 3:12 PM
CPIM West Bengal Manifesto 2026: ভোটের সময়ে প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সব ইস্তেহার একরকমও নয়। কেউ ভাতা বাড়ানোর কথা বলে, কেউ অবকাঠামো, কেউ বা পরিচয়ের রাজনীতি। সিপিএম এবার যে বার্তা সামনে আনল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে চাকরি, মজুরি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিত্য খরচে কিছুটা স্বস্তির কথা।

৪ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত সিপিআই(এম)-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তেহারে মূল স্লোগান হিসেবে সামনে এসেছে “Jobs (চাকরি), Not Temple-Mosque Politics (মন্দির-মসজিদের রাজনীতি নয়)”। ইস্তেহারে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এই লেখায় আমরা শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকা দেব না। দেখব, সেগুলোর বাস্তব মানে কী, কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন, আর কোন কোন জায়গায় ভোটারের ঠান্ডা মাথায় প্রশ্ন করা উচিত। কারণ ইস্তেহার পড়ার সেরা উপায় হল—শুধু শুনে খুশি না হয়ে, বুঝে নেওয়া।

 সিপিএমের বড় প্রতিশ্রুতিগুলো

খাত প্রতিশ্রুতি কারা সবচেয়ে বেশি নজর দেবেন
কর্মসংস্থান প্রতি পরিবারে স্থায়ী চাকরি, নথিভুক্ত বেকারদের জন্য অন্তত ২টি চাকরির বিকল্প, সরকারি শূন্যপদ পূরণ যুবক-যুবতী, চাকরিপ্রার্থী পরিবার
কাজের সুযোগ গ্রামে ২০০ দিন, শহরে ১২০ দিনের কাজ গ্রামীণ শ্রমিক, নিম্নআয়ের পরিবার
বিদ্যুৎ নন-ইনকাম ট্যাক্সদাতাদের জন্য ১০০ ইউনিট পর্যন্ত ফ্রি, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত অর্ধেক দামে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, ছোট পরিবার
মজুরি গ্রাম ও শহরে দৈনিক ৬০০ টাকা, অসংগঠিত ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৭০০ টাকা শ্রমজীবী মানুষ, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী
পেনশন প্রবীণদের মাসে ৬,০০০ টাকা Senior Citizens (প্রবীণ নাগরিক)
কৃষি ১৬টি ফসলে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ Minimum Support Price (ন্যূনতম সহায়ক মূল্য) কৃষক পরিবার
শিক্ষা রাজ্য বাজেটের ২০% শিক্ষা খাতে, স্নাতক স্তর পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব ছাত্রছাত্রী, নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবার
স্বাস্থ্য রাজ্য বাজেটের ১০% স্বাস্থ্য খাতে, প্রতি জেলায় নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও আধুনিক হাসপাতাল সকল সাধারণ মানুষ
নারী ও সমাজ ২০ লক্ষ Self-Help Groups (স্বনির্ভর গোষ্ঠী), জেলায় জেলায় অভয়া বাহিনী মহিলা, গ্রামীণ পরিবার, নিরাপত্তা-সংকটগ্রস্ত অঞ্চল
শিল্প ও প্রশাসন ক্ষুদ্র-মাঝারি-ভারী শিল্প পুনরুজ্জীবন, IT Parks (তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক), দুর্নীতির তদন্ত কমিশন যুবক, ব্যবসায়ী, শিল্পাঞ্চল

 

চাকরিই কেন এই ইস্তেহারের কেন্দ্রবিন্দু?

সিপিএম আগে থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে এবারের নির্বাচনী প্রচারে তাদের প্রধান জোর থাকবে কর্মসংস্থানে। পরে প্রকাশিত ইস্তেহারেও সেটাই সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি পরিবারে স্থায়ী চাকরির প্রতিশ্রুতি, নথিভুক্ত বেকারদের অন্তত দুটি চাকরির বিকল্প, পাঁচ বছরের মধ্যে সব সরকারি শূন্যপদ পূরণ এবং স্বচ্ছ SSC, CSC, PSC পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়মিত নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চাকরির প্রসঙ্গকে শুধু “সরকারি চাকরি”তে আটকে রাখা হয়নি। শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কুটির শিল্প, মাঝারি ও ভারী শিল্প, এমনকি IT Parks তৈরির কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ইস্তেহারের ভাষায় একটি বড় Employment Model (কর্মসংস্থান কাঠামো) দেখানোর চেষ্টা আছে—যেখানে সরকারি নিয়োগ, শিল্পায়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন একসঙ্গে ভাবা হয়েছে।

যুবকদের কাছে এই বার্তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পশ্চিমবঙ্গে চাকরি, পরীক্ষায় অনিয়ম, নিয়োগে স্বচ্ছতা—এসব ইস্যু গত কয়েক বছর ধরে জনমনে বড় জায়গা নিয়েছে। তাই শুধু “চাকরি দেব” বললে হবে না; কীভাবে, কোন খাতে, কত সময়ে—এই প্রশ্নগুলোই এখন বেশি জরুরি। সিপিএমের ইস্তেহার সেই দিকেই কথাবার্তা শুরু করেছে, যদিও বাস্তব রূপায়ণের রূপরেখা ভোটারের আরও খুঁটিয়ে দেখা দরকার।

হাঁটা কম, চাপ বেশি, আর চুপচাপ বাড়ছে সুগার—ডায়াবেটিসে এগিয়ে কোন রাজ্যগুলো

চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারের কী কী প্রশ্ন করা উচিত?

  • প্রতি পরিবারে স্থায়ী চাকরি—এটি কি সরকারি, বেসরকারি, না মিশ্র মডেল?
  • নথিভুক্ত বেকার বলতে কোন ডেটাবেস ধরা হবে?
  • দুটি চাকরির বিকল্প মানে কি সাক্ষাৎকারের সুযোগ, না প্রকৃত নিয়োগের নিশ্চয়তা?
  • পাঁচ বছরে শূন্যপদ পূরণ করতে আর্থিক ও প্রশাসনিক রোডম্যাপ কী?

এই প্রশ্নগুলো তোলা মানে প্রতিশ্রুতিকে খাটো করা নয়। বরং গণতন্ত্রে ইস্তেহারকে সিরিয়াসলি নেওয়ার এটিই সবচেয়ে পরিণত উপায়।

গ্রামে ২০০ দিন, শহরে ১২০ দিনের কাজ—এর মানে কতটা বড়?

ইস্তেহারে গ্রামীণ এলাকায় বছরে ২০০ দিনের কাজ এবং শহরে ১২০ দিনের কাজের কথা বলা হয়েছে। এটি কেবল কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং আয়-নিরাপত্তারও প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সারা বছর স্থায়ী উপার্জন নেই, তাদের কাছে এমন প্রস্তাব বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।

গ্রামে ১০০ দিনের কাজ নিয়ে মানুষ আগে থেকেই পরিচিত। তাই ২০০ দিনের কথা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শোনায়। অন্যদিকে শহরে ১২০ দিনের কাজের প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শহুরে দরিদ্র ও অস্থায়ী শ্রমিকরা প্রায়ই এই ধরনের সুরক্ষার বাইরে থেকে যান। যদি বাস্তবে কোনও Urban Work Guarantee (শহুরে কাজের নিশ্চয়তা) কাঠামো আনা যায়, তা হলে সেটি আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

তবে এখানেও প্রশ্ন রয়ে যায়—কাজের ধরন কী হবে, কোন দপ্তর বাস্তবায়ন করবে, এবং মজুরি কত দিনে হাতে আসবে? ইস্তেহার আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভোটারের কাজ হল বাস্তবতার হিসাব কষা।

বিনামূল্যে বিদ্যুৎ: কারা পাবেন, কীভাবে স্বস্তি মিলতে পারে?

সিপিএমের ইস্তেহারের সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা ঘোষণাগুলির একটি হল বিদ্যুৎ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি। রিপোর্ট অনুযায়ী, যারা Income Tax (আয়কর) দেন না, তাদের জন্য ১০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে এবং ২০০ ইউনিট পর্যন্ত অর্ধেক দামে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক শক্তি খুব সহজে বোঝা যায়। শহর ও মফস্বলের বহু পরিবারেই বিদ্যুৎ বিল এখন মাসিক খরচের একটি স্থায়ী চাপ। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, অবসরপ্রাপ্ত দম্পতি, ছোট ব্যবসায়ী, বা একমাত্র উপার্জনকারী সদস্যের উপর নির্ভরশীল পরিবার—এদের জন্য ১০০ ইউনিট ফ্রি মানে মাসিক বাজেটে সরাসরি কিছুটা স্বস্তি।

তবে এখানে খুঁটিনাটি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। “নন-ইনকাম ট্যাক্সদাতা” বলতে কি শুধু ব্যক্তিগত আয়করদাতা বোঝানো হচ্ছে? পরিবারের কেউ একজন আয়কর দিলে কি পুরো পরিবার বাদ পড়বে? ১০০ ইউনিট কি মাসিক, না দ্বিমাসিক বিলিং ধরে? অর্ধেক দাম বলতে এনার্জি চার্জ, না মোট বিল? ভোটারদের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।

তবু রাজনৈতিক বার্তাটা স্পষ্ট—সিপিএম নিত্য ব্যয়ের চাপ কমানোর এক সরাসরি প্রতীকী প্রতিশ্রুতি সামনে রাখতে চাইছে। বিদ্যুৎ এমন একটি ক্ষেত্র, যা গরিব-মধ্যবিত্ত উভয়ের দৈনন্দিন জীবনে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলে। তাই এই প্রতিশ্রুতি শিরোনামে আসাটাই স্বাভাবিক।

মজুরি, পেনশন আর সামাজিক সুরক্ষা—এই অংশটা কেন চোখে রাখবেন?

ইস্তেহারে গ্রাম ও শহর মিলিয়ে দৈনিক ৬০০ টাকার মজুরি এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম ৭০০ টাকার মজুরির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য মাসিক ৬,০০০ টাকার পেনশন, এবং প্রান্তিক ও Queer Workers (লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় কর্মী)-দের জন্য সমমজুরি ও Social Security (সামাজিক সুরক্ষা)-র প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

এই অংশটি অনেক ইস্তেহারে থাকে না, বা থাকলেও খুব ছোট করে লেখা থাকে। সিপিএম এখানে একসঙ্গে মজুরি, পেনশন এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য আলাদা ন্যূনতম মজুরির কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাস্তবে এই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও কম পারিশ্রমিক দেখা যায়।

প্রবীণদের জন্য ৬,০০০ টাকার পেনশনও রাজনৈতিকভাবে বড় প্রতিশ্রুতি। ওষুধ, ডাক্তার, বাজার, বিদ্যুৎ—সব মিলিয়ে স্থির আয়ের বাইরে থাকা প্রবীণদের কাছে এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মর্যাদারও প্রশ্ন। তবে এখানেও ভোটারের দেখা উচিত—সবার জন্য, না নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য; কীভাবে বাছাই হবে; কেন্দ্র-রাজ্যের বিদ্যমান প্রকল্পের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে।

কৃষকদের জন্য কী আছে?

কৃষিক্ষেত্রে সিপিএম ১৬টি ফসলে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ Minimum Support Price (ন্যূনতম সহায়ক মূল্য) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কৃষক রাজনীতির ভাষায় এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা, কারণ MSP শুধু দাম নয়, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার সঙ্গেও জড়িত।

বাংলার ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য প্রধান সমস্যা শুধু উৎপাদন নয়, উৎপাদনের পরে বিক্রি। বাজারে দামের ওঠানামা, পাইকারি দামের চাপ, পরিবহণ খরচ—সব মিলিয়ে লাভ প্রায়ই কমে যায়। যদি সত্যিই উৎপাদন খরচের দেড়গুণ দামে ১৬টি ফসলের ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তা হলে কৃষকের হাতে নগদ আয় বাড়তে পারে।

তবে এই প্রতিশ্রুতির প্রাণ লুকিয়ে থাকে বাস্তব ব্যবস্থাপনায়। কোন ১৬টি ফসল? রাজ্য সরকার নিজে কিনবে, না সহায়ক কাঠামো তৈরি করবে? কত দ্রুত অর্থ মিলবে? এই জায়গাগুলো স্পষ্ট না হলে কৃষকের আস্থা পুরোপুরি তৈরি হয় না। তবু ইস্তেহারে কৃষিকে কেবল আবেগের জায়গা হিসেবে নয়, আয়ের প্রশ্ন হিসেবে তোলা হয়েছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাজেটের কথাও বলা হয়েছে

ইস্তেহার অনুযায়ী, রাজ্য বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে এবং ১০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক স্তর পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব এবং প্রতিটি জেলায় নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও আধুনিক হাসপাতাল গড়ার কথাও বলা হয়েছে।

এখানে দুটো বিষয় আলাদা করে নজর কাড়ে। এক, শুধু “স্কুল-কলেজের উন্নতি” ধরনের সাধারণ ভাষা নয়, বাজেটের অনুপাতও বলা হয়েছে। দুই, Undergraduate Level (স্নাতক স্তর) পর্যন্ত টিউশন ফি মকুবের প্রতিশ্রুতি সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে টার্গেট করে। যে পরিবারে একাধিক সন্তান পড়াশোনা করছে, তাদের জন্য এই ধরনের ঘোষণা বাস্তব খরচ কমাতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও আধুনিক হাসপাতালের প্রতিশ্রুতি জেলাভিত্তিক বৈষম্য কমানোর দিকেও ইঙ্গিত দেয়। কলকাতাকেন্দ্রিক চাপ কমিয়ে জেলায় চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া যে কোনও সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এই অংশটি শুনতে ভালো লাগলেও, বাস্তবে জমি, শিক্ষক, ডাক্তার, যন্ত্রপাতি, পরিচালন ব্যয়—সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লাগবে।

নারী নিরাপত্তা, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং ‘অভয়া বাহিনী’—কী বার্তা দিচ্ছে?

নারী সুরক্ষা ও আর্থিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সিপিএম ২০ লক্ষ Self-Help Groups (স্বনির্ভর গোষ্ঠী) তৈরির কথা বলেছে। তার সঙ্গে প্রতিটি জেলায় পুলিশের তত্ত্বাবধানে একটি স্বশাসিত “অভয়া বাহিনী” গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে, যাতে নির্যাতিতাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।

এই অংশে রাজনৈতিক বার্তা দু’স্তরের। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে সংগঠিত নারী গোষ্ঠী তৈরি। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগে দ্রুত, বিশ্বাসযোগ্য সহায়ক কাঠামো। বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে নারী নিরাপত্তা এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ফলে “অভয়া বাহিনী” নামের আলাদা কাঠামো তৈরি করার কথা বলা নিছক প্রশাসনিক নয়, প্রতীকী বার্তাও বটে।

তবে ভোটারের প্রশ্ন এখানেও থাকা উচিত। এই বাহিনীর আইনি কাঠামো কী হবে? পুলিশের অধীনে থেকেও কতটা স্বাধীনতা থাকবে? অভিযোগকারীর গোপনীয়তা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, আইনি সহায়তা—এসব কি থাকবে? ভালো উদ্দেশ্যকে কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে না পারলে অনেক ঘোষণা কাগজেই থেকে যায়।

কিভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ বিল চেক করব? জানুন বিস্তারিত

শিল্প, IT Parks, কুটির উদ্যোগ—সিপিএম কী বোঝাতে চাইছে?

ইস্তেহারে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প পুনরুজ্জীবন, মাঝারি ও ভারী শিল্পের উন্নয়ন, এবং IT Parks তৈরির কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কেবল চাকরির সংখ্যা নয়, চাকরির উৎস কোথা থেকে আসবে, তারও একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে।

এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পনীতি নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। একদিকে জমি ও শিল্পের রাজনীতি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের চাহিদা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। সিপিএমের বর্তমান ভাষা থেকে বোঝা যায়, তারা শিল্পায়নকে আবারও কেন্দ্রীয় প্রশ্ন করতে চাইছে, তবে আগের অভিজ্ঞতার রাজনৈতিক অভিঘাত মাথায় রেখে।

যুবকদের একাংশের কাছে IT Parks-এর কথা আকর্ষণীয় লাগতে পারে, কারণ এটি সরাসরি পরিষেবা খাত, Startups (উদ্যোক্তা উদ্যোগ), Back Office (ব্যাক-অফিস) কাজ, এবং নতুন প্রজন্মের চাকরির সম্ভাবনার সঙ্গে জুড়ে আছে। তবে বড় প্রশ্ন সেই একই—কোথায়, কত বিনিয়োগে, কত সময়ে?

দুর্নীতিমুক্ত “নতুন বাংলা”—এই প্রতিশ্রুতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ইস্তেহারের শেষ দিকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলির একটি হল দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান। সিপিএম বিশেষ তদন্ত কমিশন গড়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা বলেছে এবং “Corruption-Free New Bengal (দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলা)”র ডাক দিয়েছে। একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধেও শূন্য-সহনশীলতার অবস্থান জানানো হয়েছে।

এটি নিছক নৈতিক অবস্থান নয়; রাজনৈতিক অবস্থানও। কারণ কর্মসংস্থান, নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা—সবকিছুর সঙ্গে দুর্নীতির প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। ভোটাররা এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি খোঁজেন বিশ্বাসযোগ্যতা। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ইস্তেহারের ভাষাকে শক্তিশালী করলেও, মানুষ দেখতে চাইবেন—কী ধরনের প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

কার জন্য কী লাভ হতে পারে? সহজ ভাষায় বুঝে নিন

চাকরিপ্রার্থী যুবক-যুবতী: সরকারি শূন্যপদ পূরণ, স্বচ্ছ নিয়োগ পরীক্ষা, শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি—এই অংশটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার: ১০০ ইউনিট পর্যন্ত ফ্রি বিদ্যুৎ এবং ২০০ ইউনিট পর্যন্ত অর্ধেক দামে বিদ্যুৎ—মাসিক বাজেটে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রামীণ পরিবার: ২০০ দিনের কাজ, কৃষিপণ্যে সহায়ক মূল্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ—সব মিলিয়ে আয়-নিরাপত্তার বার্তা রয়েছে।

প্রবীণ নাগরিক: ৬,০০০ টাকার পেনশন তাদের কাছে বড় স্বস্তির প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠতে পারে।

ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবক: স্নাতক স্তর পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব এবং শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব সরাসরি নজরে রাখার মতো।

মহিলা ও স্বনির্ভর গোষ্ঠী: ২০ লক্ষ গোষ্ঠী তৈরির প্রতিশ্রুতি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর কথা এই অংশকে আলাদা গুরুত্ব দেয়।

এই ইস্তেহার অন্যদের থেকে কোথায় আলাদা শোনায়?

এবারের রাজনৈতিক পরিবেশে যখন ধর্ম, পরিচয়, ভাতা ও প্রতীকের লড়াই খুব জোরে চলছে, তখন সিপিএম তাদের কেন্দ্রীয় স্লোগানে চাকরিকে সামনে এনেছে। মার্চ মাসেই তাদের নেতারা বলেছিলেন, প্রচারের প্রধান ভিত্তি হবে Job Creation (কর্মসংস্থান); ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ইস্তেহার সেই অবস্থানকেই স্পষ্ট আকার দিয়েছে।

তবে “আলাদা” শোনালেই সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভোটারেরা এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী। তারা জানতে চান—টাকা কোথা থেকে আসবে, কত বছরে হবে, আর প্রতিশ্রুতি ভাঙলে জবাবদিহি কী। তাই সিপিএমের ইস্তেহারের আসল পরীক্ষা শুরু হবে কাগজে নয়, জনমতের আদালতে।

ভোটারদের জন্য ছোট্ট চেকলিস্ট

  • প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কি সময়সীমা দেওয়া আছে?
  • ঘোষণার আর্থিক উৎস বা বাজেটের ইঙ্গিত আছে কি?
  • যেখানে “ফ্রি” বলা হচ্ছে, সেখানে যোগ্যতার শর্ত কী?
  • চাকরির প্রতিশ্রুতিতে বাস্তব নিয়োগ-প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে কি?
  • কৃষি ও শিল্প—দুটির মধ্যে বাস্তব ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে?
  • দুর্নীতি রুখতে প্রতিষ্ঠানগত ব্যবস্থা কতটা স্পষ্ট?

এই প্রশ্নগুলো মাথায় রেখে ইস্তেহার পড়লে রাজনীতি অনেক বেশি পরিষ্কার লাগে। শিরোনাম তখন আর শুধু উত্তেজনা তৈরি করে না, বরং বোঝার দরজা খুলে দেয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সিপিএমের ইস্তেহারে চাকরি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি কী?

সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হল প্রতি পরিবারে স্থায়ী চাকরি এবং নথিভুক্ত বেকারদের জন্য অন্তত দুটি চাকরির বিকল্পের কথা বলা। এর পাশাপাশি পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি শূন্যপদ পূরণ এবং স্বচ্ছ নিয়োগ পরীক্ষার আশ্বাসও রয়েছে। তাই চাকরির প্রসঙ্গটি এখানে আলাদা কোনও ছোট প্রতিশ্রুতি নয়, পুরো ইস্তেহারের কেন্দ্রীয় বার্তা।

বিনামূল্যে বিদ্যুৎ কারা পেতে পারেন বলে ইস্তেহারে বলা হয়েছে?

রিপোর্ট অনুযায়ী, যারা আয়কর দেন না, তাদের জন্য ১০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে এবং ২০০ ইউনিট পর্যন্ত অর্ধেক দামে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে বাস্তবে এই সুবিধা কাদের ক্ষেত্রে কীভাবে লাগু হবে, তার খুঁটিনাটি এখনও জানা জরুরি। তাই ঘোষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, প্রয়োগের শর্ত বুঝে নেওয়া দরকার।

কৃষকদের জন্য সিপিএম কী বলেছে?

কৃষকদের জন্য ১৬টি ফসলে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ সহায়ক মূল্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের ঘোষণা কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার দাবির সঙ্গে যুক্ত। তবে কোন ফসল, কী পদ্ধতিতে, কোন সংস্থার মাধ্যমে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বাস্তব মূল্যায়নের জন্য খুবই জরুরি।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে ইস্তেহারের সবচেয়ে নজরকাড়া দিক কোনটি?

শিক্ষার জন্য রাজ্য বাজেটের ২০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যের জন্য ১০ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব আলাদা নজর কাড়ে। তার সঙ্গে স্নাতক স্তর পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব, প্রতি জেলায় নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও আধুনিক হাসপাতালের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। ফলে এই অংশটি শুধু স্লোগানধর্মী নয়, কাঠামোগত দাবি হিসেবেও সামনে এসেছে।

এই ইস্তেহারকে ভোটার কীভাবে বিচার করবেন?

শুধু “কী দেওয়া হবে” শুনলেই হবে না; দেখতে হবে “কীভাবে দেওয়া হবে”। সময়সীমা, আর্থিক উৎস, বাস্তবায়নকারী দপ্তর, যোগ্যতার শর্ত—এসবই ইস্তেহার বিচার করার আসল মানদণ্ড। প্রতিশ্রুতি যত বড়, প্রশ্নও তত পরিষ্কার হওয়া উচিত—এটাই সচেতন ভোটারের লক্ষণ।

শেষ কথা

সিপিএমের এবারের ইস্তেহার স্পষ্টভাবে চাকরি, বিদ্যুৎ বিলের স্বস্তি, কৃষকের দাম, শ্রমজীবীর মজুরি, প্রবীণের পেনশন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রশ্ন তুলেছে। এতে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি আছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত; আবার এমন কিছু ঘোষণাও আছে, যেগুলোর বাস্তবতা বুঝতে আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এটি শুধু নির্বাচনী কাগজ নয়, ভোটারকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ছবি দেখানোর চেষ্টা। আপনি সিপিএমের সমর্থক হন বা না হন, ইস্তেহারটি পড়ার সঠিক উপায় হল—কী বলা হয়েছে, কাকে বলা হয়েছে, আর তা বাস্তবে সম্ভব কি না—এই তিনটি প্রশ্ন একসঙ্গে করা। তবেই ভোটের আগে স্লোগান আর বাস্তবের পার্থক্যটা পরিষ্কার হবে।

আরও পড়ুন

ডিউটি পেয়েছেন? মক পোলেই ভুল করলে বিপদ! WB Election Duty 2026 গাইড লিস্টে নাম খুঁজে পাচ্ছেন না? বাংলার বাড়ি 2026 চেক করার সহজ উপায় বিধানসভা ভোট ২০২৬: WhatsApp গুজব নয়, আসল ছুটির নিয়ম জানুন বারবার খুঁজেও Krishak Bandhu আইডি পাচ্ছেন না? সহজ রাস্তা জেনে নিন এতদিনে ঘুম ভাঙল? রাজ্য দিচ্ছে ৪ বছরের DA বকেয়া—কারা পাচ্ছেন জেনে নিন