ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক, আপনার কাছে যদি ৫২.৫ তোলা রুপার সমপরিমাণ অর্থ বা সম্পদ পূর্ণ এক বছর অলসভাবে গচ্ছিত থাকে, তবে আপনার ওপর যাকাত ফরজ। বর্তমান বাজার দর (জানুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী, প্রতি গ্রাম রুপার দাম প্রায় ৩১৪.৪৮ টাকা । সেই হিসেবে, আপনার কাছে যদি আনুমানিক ১,৯২,৫৭৫ টাকা (এক লক্ষ বিরানব্বই হাজার পাঁচশত পঁচাত্তর টাকা) থেকে ২,১৬,৫৮০ টাকা নগদ গচ্ছিত থাকে, তবে আপনাকে যাকাত দিতে হবে। যদিও স্বর্ণের হিসেবে এই নিসাব অনেক বেশি (প্রায় ১৪-১৫ লক্ষ টাকা), কিন্তু ফক্বিহদের মতে, গরিবের উপকারের স্বার্থে নগদ টাকার ক্ষেত্রে রুপার নিসাবই গ্রহণযোগ্য।
নিচে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের সর্বশেষ বাজার দরের ভিত্তিতে যাকাতের নিসাবের বিস্তারিত আলোচনা ও হিসাব তুলে ধরা হলো।
যাকাত কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
যাকাত ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। এটি কোনো ঐচ্ছিক দান নয়, বরং ধনীদের সম্পদের ওপর গরিবের নির্ধারিত অধিকার। পবিত্র কুরআনে সালাতের (নামাজ) সাথে সাথেই যাকাতের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। “নিসাব” হলো সম্পদের সেই ন্যূনতম পরিমাণ, যার মালিক হলে শরিয়ত অনুযায়ী একজনকে ধনী বা স্বচ্ছল হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তার ওপর যাকাত ফরজ হয়।
যাকাত ব্যবস্থা সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি কেবল আত্মশুদ্ধিই নয়, বরং সম্পদকে পবিত্র করার একটি মাধ্যম।
২০২৬ সালে যাকাতের নিসাবের বর্তমান বাজার মূল্য
যাকাতের নিসাব মূলত দুটি ধাতুর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত: স্বর্ণ এবং রৌপ্য (রুপা)। নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য বা শেয়ারের ক্ষেত্রে এই দুই ধাতুর যেকোনো একটির বাজার মূল্যকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।
১. স্বর্ণের নিসাব
স্বর্ণের ক্ষেত্রে নিসাব হলো ৭.৫ তোলা (ভরি) বা ৮৭.৪৮ গ্রাম স্বর্ণ ।
২. রুপার নিসাব
রুপার ক্ষেত্রে নিসাব হলো ৫২.৫ তোলা (ভরি) বা ৬১২.৩৬ গ্রাম রুপা ।
নিচে জানুয়ারি ২০২৬-এর তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিস্তারিত টেবিল দেওয়া হলো:
| ধাতুর ধরন | নিসাবের পরিমাণ (গ্রাম) | প্রতি গ্রামের বর্তমান দাম (প্রায়) | মোট নিসাব মূল্য (টাকা – BDT) |
|---|---|---|---|
| রুপা (Silver) | ৬১২.৩৬ গ্রাম | ৩১৪.৪৮ টাকা | ১,৯২,৫৭৫ টাকা |
| স্বর্ণ (24K Gold) | ৮৭.৪৮ গ্রাম | ১৭,৫২৩ টাকা | ১৫,৩৩,০০০ টাকা |
| স্বর্ণ (22K Gold) | ৮৭.৪৮ গ্রাম | ১৬,০৫১ টাকা | ১৪,০৪,০০০ টাকা |
দ্রষ্টব্য: বাজার দর প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই যাকাত আদায়ের সময় ওই দিনের স্থানীয় বাজার দর জেনে নেওয়া উত্তম।
ফজরের নামাজের সময়: ইসলামের প্রথম ফরজ ইবাদত
নগদ টাকার ক্ষেত্রে কোন নিসাব ধরবেন? স্বর্ণ নাকি রুপা?
এটি একটি সাধারণ বিভ্রান্তি। স্বর্ণের নিসাব ধরলে প্রায় ১৪-১৫ লক্ষ টাকা না থাকলে যাকাত ফরজ হয় না। কিন্তু রুপার নিসাব ধরলে মাত্র ১.৯২ লক্ষ টাকা থাকলেই যাকাত দিতে হয়।
অধিকাংশ ইসলামি স্কলার এবং ফক্বিহদের মতে, নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে যেই নিসাবটি কম (অর্থাৎ রুপার নিসাব), সেটিই গ্রহণ করা উচিত। এর কারণ হলো:
১. এতে গরিব ও অসহায় মানুষ বেশি উপকৃত হয়।
২. সতর্কতার খাতিরে এটি অধিক গ্রহণযোগ্য।
সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (CZM)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রুপার নিসাবের ভিত্তিতে যাকাত আদায় করা অধিক যুক্তিযুক্ত, যা প্রায় ২,১৬,৫৮০ টাকার আশেপাশে হতে পারে (তাদের ব্যবহৃত রেট অনুযায়ী) । তবে লাইভ মার্কেট রেট অনুযায়ী এটি ১.৯২ লক্ষ টাকা থেকেও শুরু হতে পারে ।
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ
শুধুমাত্র নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই যাকাত ফরজ হয় না। এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হতে হয়:
১. স্বাধীন ও মুসলিম হওয়া
যাকাতদাতার স্বাধীন এবং মুসলিম হওয়া আবশ্যক। অমুসলিমদের ওপর যাকাত ফরজ নয়।
২. পূর্ণ মালিকানা
সম্পদটি আপনার পূর্ণ মালিকানায় থাকতে হবে। অর্থাৎ, আপনি চাইলেই সেই সম্পদ খরচ বা বিক্রি করতে পারেন। অফিসের প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অন্যের কাছে আটকে থাকা টাকা (যা পাওয়ার আশা নেই) তার ওপর যাকাত আসবে না।
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদ
উপরে উল্লিখিত স্বর্ণ বা রুপার নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে।
৪. এক চন্দ্র বছর অতিক্রান্ত হওয়া (হাওলানে হাওল)
নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর (চান্দ্রবর্ষ হিসেবে ৩৫৪ দিন) আপনার মালিকানায় থাকতে হবে। বছরের শুরুতে এবং শেষে যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে মাঝখানে কিছু কমলেও যাকাত দিতে হবে।
৫. ঋণমুক্ততা
আপনার যদি এমন কোনো ঋণ থাকে যা পরিশোধ করলে আর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে না, তবে আপনার ওপর যাকাত ফরজ নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ (যেমন হাউজ লোন) সাধারণত এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, শুধুমাত্র অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য ঋণের কিস্তি বাদ দেওয়া হয়।
কোন কোন সম্পদের ওপর যাকাত দিতে হয়?
অনেকে মনে করেন শুধু নগদ টাকার ওপর যাকাত দিতে হয়। এটি ভুল ধারণা। নিচের সম্পদগুলোর সমষ্টি যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তবে যাকাত দিতে হবে:
-
নগদ অর্থ: হাতে থাকা টাকা, ব্যাংকে জমানো টাকা (সেভিংস, ফিক্সড ডিপোজিট ইত্যাদি), মোবাইল ওয়ালেটে (বিকাশ, নগদ) থাকা টাকা।
-
স্বর্ণ ও রুপা: ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত, বার বা গয়না—সব ধরনের স্বর্ণ-রুপার বাজার মূল্য ধরতে হবে।
-
ব্যবসায়িক পণ্য: বিক্রির উদ্দেশ্যে কেনা যেকোনো পণ্য (জমি, ফ্ল্যাট, কাপড়, মুদি মালামাল)। এর বর্তমান বাজার মূল্য হিসাব করতে হবে।
-
শেয়ার ও বন্ড: শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকৃত অর্থের বর্তমান মূল্য।
-
গবাদি পশু: নির্দিষ্ট সংখ্যক উট, গরু, ছাগল বা ভেড়া থাকলে (এর ভিন্ন নিসাব আছে)।
-
কৃষি পণ্য: বৃষ্টির পানিতে জন্মানো ফসলের ১০% (উশর) এবং সেচের মাধ্যমে জন্মানো ফসলের ৫%।
যেসব সম্পদের ওপর যাকাত নেই
-
বসবাসের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট।
-
ব্যবহারের জন্য গাড়ি বা যানবাহন।
-
ঘরের আসবাবপত্র, পোশাক এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
-
কলকারখানার যন্ত্রপাতি (মেশিনারি), যা উৎপাদনের কাজে লাগে কিন্তু নিজে বিক্রি হয় না।
যাকাত হিসাব করার সহজ পদ্ধতি
আপনার যাকাত বের করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: আপনার সব যাকাতযোগ্য সম্পদ একত্রিত করুন।
-
নগদ টাকা + ব্যাংক ব্যালেন্স + স্বর্ণ-রুপার মূল্য + ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য + ফেরত পাওয়ার যোগ্য ঋণ।
ধাপ ২: আপনার মোট দায় বা ঋণ বাদ দিন।
-
মোট সম্পদ – তাৎক্ষণিক ঋণ = নিট যাকাতযোগ্য সম্পদ।
ধাপ ৩: নিট সম্পদ যদি নিসাবের (১,৯২,৫৭৫ টাকার) বেশি হয়, তবে তার ২.৫% (আড়াই শতাংশ) যাকাত হিসেবে দান করতে হবে।
ভারত থেকে টি-২০ বিশ্বকাপ সরানোর চাপ: দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট কূটনৈতিক সংকটের মুখে
উদাহরণ:
ধরি, জনাব রফিকের সম্পদ নিম্নরূপ:
-
নগদ টাকা: ১,০০,০০০ টাকা
-
স্বর্ণের গয়না (২ ভরি): ৩,২০,০০০ টাকা
-
ব্যবসায়িক পণ্য: ৫০,০০০ টাকা
-
মোট সম্পদ: ৪,৭০,০০০ টাকা
জনাব রফিকের ২০,০০০ টাকা ঋণ আছে।
তাহলে, নিট সম্পদ = ৪,৭০,০০০ – ২০,০০০ = ৪,৫০,০০০ টাকা।
যেহেতু ৪,৫০,০০০ টাকা রুপার নিসাবের (১,৯২,৫৭৫ টাকা) চেয়ে বেশি, তাই তাকে যাকাত দিতে হবে।
যাকাতের পরিমাণ: ৪,৫০,০০০ x ২.৫% = ১১,২৫০ টাকা।
সাধারণ ভুল ধারণা ও সতর্কতা
১. স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর যাকাত: স্ত্রীর গয়নার যাকাত স্বামীকেই দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। গয়নার মালিক স্ত্রী, তাই শরিয়ত অনুযায়ী স্ত্রীকেই তার যাকাত আদায় করতে হবে। তবে স্বামী চাইলে উপহার হিসেবে স্ত্রীর পক্ষ থেকে দিয়ে দিতে পারেন।
২. ব্যবহার্য গয়না: অনেক মা-বোন মনে করেন, নিত্য ব্যবহার্য গয়নার যাকাত দিতে হয় না। কিন্তু হানাফি মাজহাব মতে, ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত সকল স্বর্ণ-রুপার যাকাত দিতে হবে যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়।
৩. ট্যাক্স ও যাকাত এক নয়: সরকারকে দেওয়া আয়কর (Income Tax) এবং আল্লাহর রাস্তায় দেওয়া যাকাত সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্যাক্স দিলেও যাকাত মাফ হয় না।
যাকাত কেবল একটি অর্থনৈতিক ইবাদত নয়, এটি জান্নাতে যাওয়ার একটি মাধ্যম এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে ১ লক্ষ ৯২ হাজার বা ২ লক্ষ টাকা অনেকের কাছেই সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এই পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলেই আপনি যাকাতের আওতায় পড়বেন। তাই আজই আপনার সম্পদের সঠিক হিসাব করুন এবং নির্দিষ্ট খাতে যাকাত পৌঁছে দিয়ে নিজের সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করুন। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিকভাবে যাকাত আদায়ের তৌফিক দান করুন।











