মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব? চিকিৎসাবিজ্ঞান, আইন ও বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

হাসপাতালের আইসিইউ (ICU) বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ওয়েটিং রুমে বসে থাকা স্বজনদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে গভীর উৎকণ্ঠায়। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে শুয়ে থাকা প্রিয় মানুষটির বুকে লাগানো অজস্র তার, মুখে অক্সিজেনের…

Avatar

 

হাসপাতালের আইসিইউ (ICU) বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ওয়েটিং রুমে বসে থাকা স্বজনদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে গভীর উৎকণ্ঠায়। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে শুয়ে থাকা প্রিয় মানুষটির বুকে লাগানো অজস্র তার, মুখে অক্সিজেনের মাস্ক, আর পাশে মনিটরের টিপ টিপ শব্দ—সব মিলিয়ে এক ভীতিজনক পরিবেশ। এর মধ্যেই মাঝে মাঝে লোকমুখে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, “রোগী মারা যাওয়ার পরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেবল টাকার লোভে লাশ আইসিইউতে আটকে রেখেছে।” এই কথাগুলো কি শুধুই গুজব, নাকি এর পেছনে কোনো ভয়াবহ সত্য লুকিয়ে আছে? মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব—এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মনে বারবার ঘুরেফিরে আসে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। আগে যা অসম্ভব ছিল, এখন প্রযুক্তির কল্যাণে তা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে কি মৃত্যুকেও ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব? নাকি আমরা জীবিত এবং মৃতের মাঝখানের সূক্ষ্ম রেখাটি বুঝতে ভুল করছি? এই আর্টিকেলে আমরা আবেগের জায়গা থেকে সরে এসে বিজ্ঞান, যুক্তি এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে এই স্পর্শকাতর বিষয়টির গভীরে যাব। জানব, কখন আশা শেষ হয়ে যায়, আর কখন প্রযুক্তি আমাদের চোখের সামনে এক ‘মিথ্যা প্রাণের’ নাটক তৈরি করে।

১. মৃত্যু আসলে কী? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘ট্রাইপড অফ লাইফ’

মৃত্যু কোনো একটি মুহূর্তের ঘটনা নয়, বরং এটি একটি প্রক্রিয়া। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একজন মানুষকে মৃত ঘোষণা করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে। আমাদের দেহ তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাকে বলা হয় ‘ট্রাইপড অফ লাইফ’ (Tripod of Life):

১. হৃদপিণ্ড (Heart)

২. ফুসফুস (Lungs)

৩. মস্তিষ্ক (Brain)

এই তিনটির যেকোনো একটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে বাকিগুলোও অকেজো হয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট আসার পর এই সমীকরণটি কিছুটা বদলে গেছে। মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব—এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে আমাদের মৃত্যুর ধরণগুলো চিনতে হবে।

সোমাটিক ডেথ বনাম মলিকুলার ডেথ

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মৃত্যুকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

  • সোমাটিক ডেথ (Somatic Death): যখন মানুষের চেতনার বা ব্যক্তিত্বের মৃত্যু ঘটে, অর্থাৎ ব্রেন বা মস্তিষ্ক মারা যায়, কিন্তু শরীরের অন্যান্য কোষ তখনও জীবিত থাকতে পারে। আইসিইউতে এই অবস্থাটিই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করে।

  • মলিকুলার ডেথ (Molecular Death): সোমাটিক ডেথের ১-২ ঘণ্টা পর যখন শরীরের প্রতিটি কোষ ও টিস্যু (যেমন পেশী, চামড়া) মারা যায় এবং পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

আইসিইউতে রোগীরা সাধারণত সোমাটিক ডেথ বা ব্রেন ডেথ পর্যায়ে পৌঁছান, যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে শরীরের বাকি অংশগুলোকে সাময়িকভাবে সচল রাখা হয়। এটি দেখেই পরিবারের লোকেরা মনে করেন রোগী বেঁচে আছেন।

টেবিল ১: মৃত্যুর বিভিন্ন পর্যায় ও লক্ষণ

পর্যায় লক্ষণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের অবস্থান
ক্লিনিক্যাল ডেথ হৃদস্পন্দন ও শ্বাস বন্ধ। ৩-৪ মিনিটের মধ্যে সিপিআর (CPR) দিলে বাঁচানো সম্ভব।
ব্রেন ডেথ মস্তিষ্কের স্টেম সেলের মৃত্যু। এটিই প্রকৃত ও আইনি মৃত্যু। ফিরে আসা অসম্ভব।
বায়োলজিক্যাল ডেথ টিস্যু ও কোষের মৃত্যু। শরীর শক্ত হয়ে যায় (Rigor Mortis), পচন শুরু হয়।

২. কোমা এবং ব্রেন ডেথ: এক নয়, ভিন্ন বাস্তবতা

অনেকেই ‘কোমা’ (Coma) এবং ‘ব্রেন ডেথ’ (Brain Death)-কে এক মনে করেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। কোমাতে থাকা রোগী বেঁচে থাকেন, কিন্তু ব্রেন ডেথ হওয়া রোগী মৃত। মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই কোমার উদাহরণ টানেন, যা সঠিক নয়।

মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে?

আমাদের মস্তিষ্কের দুটি প্রধান অংশ আছে। ওপরের অংশ (Cortex) আমাদের চিন্তা, স্মৃতি ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। আর নিচের অংশ বা ‘ব্রেন স্টেম’ (Brain Stem) আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

  • কোমা: কোমাতে ওপরের অংশ কাজ করে না (তাই রোগী অজ্ঞান থাকেন), কিন্তু ব্রেন স্টেম সচল থাকে। অর্থাৎ রোগী নিজে শ্বাস নিতে পারেন, তার হার্ট চলে। তিনি যেকোনো সময় জ্ঞান ফিরে পেতে পারেন।

  • ব্রেন ডেথ: ব্রেন ডেথে পুরো মস্তিষ্ক, বিশেষ করে ব্রেন স্টেম নষ্ট হয়ে যায়। ব্রেন স্টেম নষ্ট হলে মস্তিষ্ক আর শরীরকে শ্বাস নেওয়ার সিগন্যাল দিতে পারে না। এটি একটি অপরিবর্তনীয় অবস্থা।

[Image showing Brain vs Brain Stem function difference]

টেবিল ২: কোমা, ভেজিটেটিভ স্টেট এবং ব্রেন ডেথ-এর পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য কোমা (Coma) ভেজিটেটিভ স্টেট (Vegetative State) ব্রেন ডেথ (Brain Death)
চেতনা থাকে না (ঘুমন্ত)। চোখ খোলা রাখতে পারে, কিন্তু বোধশক্তি নেই। সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায়ই নিজে নিতে পারে। নিজে শ্বাস নিতে পারে। মেশিনের সাহায্য ছাড়া শ্বাস অসম্ভব।
ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল সম্ভাবনা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব। ০% (কোনো সম্ভাবনা নেই)।
আইনি স্ট্যাটাস জীবিত। জীবিত। মৃত।

৩. আইসিইউর যন্ত্রপাতি: কীভাবে ‘জীবিত’ থাকার বিভ্রম তৈরি করে?

আইসিইউ হলো এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কাজগুলো যন্ত্রের মাধ্যমে করানো হয়। যখন একজন মানুষ মারা যান (ব্রেন ডেথ), তখনো এই যন্ত্রগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এখানেই তৈরি হয় যত ভুল বোঝাবুঝি।

ভেন্টিলেটরের মেকানিজম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের নকল

স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্ক ফুসফুসকে সংকেত দেয় বাতাস টানার জন্য। কিন্তু ব্রেন ডেথ হলে এই সংকেত বন্ধ হয়ে যায়। তখন ভেন্টিলেটর নামক যন্ত্রটি গলার নল দিয়ে ফুসফুসে বাতাস পাম্প করে।

  • বাতাস ঢুকলে বুক ফুলে ওঠে।

  • বাতাস বের হলে বুক নেমে যায়।

    বাইরে থেকে আত্মীয়রা দেখেন রোগীর বুক ওঠানামা করছে। তারা ভাবেন, “শ্বাস যখন চলছে, তখন প্রাণ আছে।” কিন্তু আসলে রোগী শ্বাস নিচ্ছেন না, তাকে শ্বাস দেওয়ানো হচ্ছে। মেশিন বন্ধ করলেই বুক ওঠানামা থেমে যাবে।

হৃদপিণ্ডের স্বয়ংক্রিয়তা (Autonomicity of Heart)

মানুষের হৃদপিণ্ডের একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে। মস্তিষ্কের সংকেত ছাড়াও এটি কিছুক্ষণ চলতে পারে, যদি এতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ থাকে। ভেন্টিলেটর অক্সিজেন দিচ্ছে, আর ডাক্তাররা হয়তো শক্তিশালী ওষুধ (যেমন: Adrenaline, Noradrenaline) ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে ঢোকাচ্ছেন। এই ওষুধের প্রভাবে মৃত মস্তিষ্কের মানুষের হৃদপিণ্ডও কিছুদিন পাম্প করতে পারে। মনিটরে আঁকাবাঁকা রেখা দেখা যায়। কিন্তু এটি কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা হৃদস্পন্দন, স্বাভাবিক জীবন নয়।

টেবিল ৩: আইসিইউ মনিটরের বিভ্রান্তিকর সংকেত

আমরা যা দেখি আসলে যা ঘটছে
বুকে ওঠানামা ভেন্টিলেটর জোর করে বাতাস ঢোকাচ্ছে।
গরম শরীর রক্ত সঞ্চালন কৃত্রিমভাবে চালু থাকায় এবং আইসিইউর তাপমাত্রার কারণে শরীর গরম থাকতে পারে।
প্রসাব হওয়া কিডনি শরীরের রক্তচাপের ওপর নির্ভর করে কাজ করে। কৃত্রিমভাবে রক্তচাপ ঠিক রাখলে কিডনি কাজ করতে পারে।
হজমের ক্রিয়া অনেক সময় ব্রেন ডেথ রোগীর খাবার হজমও হতে পারে, কারণ পাকস্থলী কিছুটা স্বাধীনভাবে কাজ করে।

৪. মৃতদেহের নড়াচড়া: লাজারাস সিনড্রোম ও ভৌতিক ভীতি

সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং ভীতিকর বিষয় হলো যখন মৃত ঘোষিত রোগী হঠাৎ হাত-পা নাড়িয়ে ওঠেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘লাজারাস রিফ্লেক্স’ (Lazarus Reflex) বা ‘লাজারাস সাইন’। বাইবেলের লাজারাসের নামানুসারে এর নামকরণ, যিনি মৃত্যুর পর জেগে উঠেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো পুনরুত্থান নয়।

কেন মৃত মানুষ নড়াচড়া করে?

ব্রেন ডেথ মানে মস্তিষ্ক মৃত, কিন্তু মেরুদণ্ড বা স্পাইনাল কর্ড (Spinal Cord) তখনও পুরোপুরি মরে যায় না। স্পাইনাল কর্ডের নিজস্ব কিছু রিফ্লেক্স বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা থাকে।

  • উদাহরণ: আইসিইউতে ব্রেন ডেথ রোগীর হাতে সুঁই ফোটালে বা পায়ে সুড়সুড়ি দিলে হাত-পা নড়ে উঠতে পারে।

  • ভয়াবহ রূপ: অনেক সময় মৃতদেহ দুই হাত বুকের কাছে তুলে আনে, যেন সে নিজেকে রক্ষা করতে চাইছে। এটি দেখে পরিবারের লোকজন হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থায় পৌঁছান এবং ডাক্তারদের ওপর চড়াও হন।

ডাক্তার হিসেবে এটি বোঝানো খুবই কঠিন যে, এই নড়াচড়া মস্তিষ্কের নির্দেশে হচ্ছে না, এটি ব্যাঙের কাটা পায়ের মতো রিফ্লেক্স মাত্র। তাই মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব—এই প্রশ্ন যখন আসে, তখন এই রিফ্লেক্সগুলোই মানুষকে বিশ্বাস করায় যে রোগী বেঁচে আছেন।

টেবিল ৪: সাধারণ রিফ্লেক্স বনাম লাজারাস রিফ্লেক্স

রিফ্লেক্সের ধরণ উৎস অর্থ
ব্যথায় সাড়া দেওয়া মস্তিষ্ক (Brain)। রোগী জীবিত এবং ব্যথা অনুভব করছেন।
চোখের মণি ছোট হওয়া ব্রেন স্টেম। ব্রেন স্টেম সচল আছে।
লাজারাস সাইন (হাত তোলা) স্পাইনাল কর্ড। ব্রেন ডেথ হয়ে গেছে, এটি শুধুই স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া।
নি-জার্ক (হাঁটুতে টোকা) স্পাইনাল কর্ড। এটি মৃত্যুর প্রমাণও নয়, জীবনের প্রমাণও নয়।

৫. ডাক্তাররা কীভাবে নিশ্চিত হন রোগী মৃত? (টেস্ট প্রটোকল)

একজন রোগীকে মৃত ঘোষণা করা বা ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া কোনো সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে রোগী যখন আইসিইউতে ভেন্টিলেটরে থাকেন। ভারত ও বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আইন অনুযায়ী, ব্রেন ডেথ ঘোষণার জন্য অত্যন্ত কড়া নিয়ম বা ‘প্রটোকল’ মানতে হয়।

অ্যাপনিয়া টেস্ট (The Ultimate Confirmation)

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো অ্যাপনিয়া টেস্ট (Apnea Test)।

১. রোগীকে ১০০% অক্সিজেন দেওয়া হয়।

২. এরপর ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়।

৩. ডাক্তাররা ৮-১০ মিনিট অপেক্ষা করেন।

৪. এই সময়ে দেখা হয়, রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়ার কারণে মস্তিষ্ক কোনো শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে কি না (বুক বা পেট নড়ে কি না)।

৫. যদি কোনো নড়াচড়া না হয়, তবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে শ্বাস-কেন্দ্র (Respiratory Center) নষ্ট হয়ে গেছে।

এছাড়াও ‘কোল্ড ক্যালোরিক টেস্ট’ (কানে বরফ জল দিয়ে চোখের নড়াচড়া দেখা) এবং ‘ডল’স আই রিফ্লেক্স’ পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষায় ফেল করলেই কেবল মৃত ঘোষণা করা হয়। সাধারণত ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে দুইবার এই পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হয়।

৬. হাসপাতাল কেন মৃতদেহ আটকে রাখে? (বানিজ্যিক অভিযোগ বনাম বাস্তবতা)

এখন আসি সেই অপ্রিয় সত্য কথায়। কেন আমরা শুনি হাসপাতাল মৃতদেহ আটকে রেখেছে? মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব—এর উত্তর ‘না’ হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি ঘটে। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ থাকে:

১. পরিবারের মেনে না নেওয়া (Denial)

অনেক সময় রোগীর বয়স কম হলে বা হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবার মৃত্যু মেনে নিতে চায় না। ডাক্তাররা লাইফ সাপোর্ট খুলে নিতে চাইলে আত্মীয়রা মারমুখী হয়ে ওঠেন। এমতাবস্থায় ডাক্তাররা বাধ্য হয়ে ভেন্টিলেটর চালু রাখেন, যতক্ষণ না হার্ট পুরোপুরি থামছে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট)। এই সময়টুকুতে হাসপাতালের বিল বাড়ে, কিন্তু ডাক্তারদের কিছু করার থাকে না।

২. অঙ্গদান বা অর্গ্যান ডোনেশন

এটি হলো একমাত্র ইতিবাচক কারণ। যদি রোগীর পরিবার অঙ্গদানে রাজি থাকে, তবে ব্রেন ডেথের পরেও শরীরকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়। কিডনি, লিভার বা হার্ট যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য রক্ত সঞ্চালন চালু রাখা হয়। এটি কোনো অপরাধ নয়, বরং মহৎ কাজ।

৩. অসাধু ব্যবসায়িক মানসিকতা (Medical Malpractice)

দুর্ভাগ্যবশত, কিছু কর্পোরেট হাসপাতাল বা ক্লিনিক মুনাফার লোভে অনৈতিক কাজ করে। তারা জানে রোগী মৃত (ব্রেন ডেথ), তবুও তারা পরিবারকে মিথ্যা আশা দিয়ে আইসিইউতে রেখে দেয়। “অবস্থা সংকটাপন্ন, আমরা চেষ্টা করছি”—এই বলে দিন পার করে। এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং চিকিৎসা-নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।

টেবিল ৫: কখন বুঝবেন ডাক্তার সৎ, আর কখন ব্যবসা করছেন?

সৎ ডাক্তারের লক্ষণ অসৎ বা ব্যবসায়িক আচরণের লক্ষণ
স্পষ্টভাবে জানাবেন ব্রেন ডেথ হয়েছে এবং ফেরার সম্ভাবনা নেই। “কিছু বলা যাচ্ছে না”, “অলৌকিক কিছু হতে পারে”—এমন অস্পষ্ট কথা বলবেন।
লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার জন্য কাউন্সেলিং করবেন। লাইফ সাপোর্ট খোলার কথা বলবেন না, বরং আরও দামী ওষুধের কথা বলবেন।
অ্যাপনিয়া টেস্ট বা ইইজি (EEG) রিপোর্টের প্রমাণ দেখাবেন। টেস্টের রিপোর্ট দেখাতে চাইবেন না বা লুকাবেন।
বিলের বিষয়ে স্বচ্ছ থাকবেন। প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে বিল বাড়াতে থাকবেন।

৭. আইন কী বলে? (ভারত ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট)

ভারতে ‘Transplantation of Human Organs Act (THOA) 1994’ অনুযায়ী ব্রেন ডেথ-কে আইনগত মৃত্যু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক মারা গেলে হৃদপিণ্ড চললেও সেই ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে গণ্য করা হবে। ডাক্তাররা তখন লাইফ সাপোর্ট খুলে নিতে পারেন। তবে এর জন্য ৪ জন ডাক্তারের একটি বোর্ডের সম্মতির প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ থাকতে হয় (যিনি ওই হাসপাতালের কর্মচারী নন)।

তবে বাংলাদেশে ব্রেন ডেথ নিয়ে আইন এখনও ততটা সুনির্দিষ্টভাবে সাধারণ আইসিইউ-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না, যতটা অঙ্গদানের ক্ষেত্রে হয়। তাই অনেক সময় ডাক্তাররা আইনি জটিলতা এড়াতে হার্ট বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।

৮. ফাইনাল থটস: আবেগ বনাম বাস্তবতা

পরিশেষে, মৃত ব্যক্তিকে কি আইসিইউতে রাখা সম্ভব? উত্তর হলো—প্রযুক্তি দিয়ে একটি মৃতদেহকে কিছুদিন ‘জীবন্ত’ দেখানো সম্ভব, কিন্তু তাকে জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ব্রেন ডেথ মানেই জীবনের সমাপ্তি।

প্রিয়জনকে হারানো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু যখন ডাক্তাররা নিশ্চিত করেন যে মস্তিষ্ক আর কাজ করছে না, তখন তাকে যন্ত্রের শেকলে বেঁধে রাখা মানে তার শরীরের অসম্মান করা এবং পরিবারের ওপর বিশাল আর্থিক ও মানসিক বোঝা চাপানো। সচেতন হোন। অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করুন। রিপোর্ট দেখুন। যদি সন্দেহ হয়, তবে অন্য হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। মৃত্যুকে মেনে নেওয়াই তখন প্রিয়জনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

(Disclaimer: এই লেখাটি সাধারণ সচেতনতার জন্য। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।)

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম

আরও পড়ুন