ছাঁকা তেলে রান্নার সময় যে ৭টি ভুল আপনার স্বাস্থ্য নষ্ট করছে – সঠিক কৌশল জানলে সুস্বাদু ও কম তেলে রান্না সম্ভব

Deep Frying Mistakes Harming Your Health: ভারতীয় রান্নাঘরে ছাঁকা তেলে ভাজার ঐতিহ্য শত বছরের পুরনো। সিঙাড়া, সমোসা, বেগুনি, পকোড়া, লুচি, গুলাব জামুন থেকে শুরু করে নানা রকম ভাজাভুজি আমাদের খাদ্যাভ্যাসের…

Ishita Ganguly

 

Deep Frying Mistakes Harming Your Health: ভারতীয় রান্নাঘরে ছাঁকা তেলে ভাজার ঐতিহ্য শত বছরের পুরনো। সিঙাড়া, সমোসা, বেগুনি, পকোড়া, লুচি, গুলাব জামুন থেকে শুরু করে নানা রকম ভাজাভুজি আমাদের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ছাঁকা তেলের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। একটি সাম্প্রতিক ভারতীয় গবেষণায় দেখা গেছে যে ভারতে মাথাপিছু বার্ষিক তেল খরচ ১৩.৬৪ কেজি এবং প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার বাড়িতে তেল পুনর্ব্যবহার করে থাকেন। উচ্চ তাপমাত্রায় তেল বারবার ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকারক ট্রান্স ফ্যাট এবং ফ্রি র‍্যাডিক্যাল তৈরি হয় যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং লিভারের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে আশার কথা হলো, ছাঁকা তেলে রান্নার কৌশলে সামান্য পরিবর্তন আনলেই ক্ষতির পরিমাণ অনেকখানি কমানো সম্ভব এবং খাবারও হয় বেশি সুস্বাদু ও কম তেলযুক্ত।

ছাঁকা তেলে রান্নার স্বাস্থ্যঝুঁকি বুঝুন

উচ্চ তাপমাত্রায় তেল গরম করলে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে যে ১৬০ থেকে ২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তেল গরম করলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট অ্যাসিডের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথের (NIH) গবেষণা অনুযায়ী, ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় তেল গরম করলে ট্রান্স ফ্যাট তৈরির পরিমাণ ন্যূনতম থাকে, কিন্তু ২৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। প্রতিবার তেল পুনর্ব্যবহার করলে এর ট্রান্স ফ্যাট কন্টেন্ট বাড়তে থাকে, যা এলডিএল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি এবং এইচডিএল কোলেস্টেরল হ্রাস করে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে পুরনো তেল পুনর্ব্যবহার করলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং ফ্যাটি লিভারের মতো রোগের কারণ হতে পারে।

ভুল ১: ভুল তেল নির্বাচন করা

ছাঁকা তেলে রান্নার সবচেয়ে বড় ভুল হলো ভুল তেল বেছে নেওয়া। প্রতিটি তেলের একটি নির্দিষ্ট স্মোক পয়েন্ট বা ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা থাকে। যখন তেল তার স্মোক পয়েন্টের উপরে গরম হয়, তখন এটি ভাঙতে শুরু করে এবং ক্ষতিকারক যৌগ নির্গত করে। ভারতীয় রান্নার জন্য উচ্চ স্মোক পয়েন্টযুক্ত তেল বেছে নেওয়া জরুরি। সরিষার তেলের স্মোক পয়েন্ট ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাদামের তেলের ২৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রিফাইন্ড নারকেল তেলের ২৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ডিপ ফ্রাইং-এর জন্য উপযুক্ত। অন্যদিকে, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের স্মোক পয়েন্ট মাত্র ১৬০-১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছাঁকা তেলে রান্নার জন্য উপযুক্ত নয়। পুষ্টিবিদ জুহি আগরওয়াল সুপারিশ করেন যে ভারতীয় রান্নার জন্য সরিষা, বাদাম, নারকেল তেল অথবা ঘি ব্যবহার করা উচিত কারণ এগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীল থাকে।

ভুল ২: তেলের তাপমাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা

তেলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ছাঁকা তেলে রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খ্যাতনামা শেফ সঞ্জীব কপূর জোর দিয়ে বলেন যে তেল বেশি গরম হলে খাবার বাইরে থেকে পুড়ে যায় কিন্তু ভিতর কাঁচা থেকে যায়, আবার কম গরম তেলে ভাজলে খাবার প্রচুর তেল শুষে নেয়। আদর্শ ডিপ ফ্রাইং তাপমাত্রা হলো ১৭৫ থেকে ১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩৫০-৩৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। রন্ধন বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেন যে একটি থার্মোমিটার ব্যবহার করে তেলের তাপমাত্রা মনিটর করা উচিত। থার্মোমিটার না থাকলে একটি পুরনো পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন: তেলে একটি ছোট আটার টুকরো বা পাউরুটির টুকরো দিন; যদি এটি দ্রুত সোনালি বাদামী হয়ে যায় তবে তেল প্রস্তুত। মাঝারি গরম তেলে ভাজলে খাবার সমানভাবে রান্না হয় এবং মুচমুচে টেক্সচার পাওয়া যায়।

ভুল ৩: কড়াইয়ে একসাথে অনেক খাবার ভাজা

অনেকেই তাড়াহুড়ো করে একসাথে প্রচুর পরিমাণে খাবার তেলে ফেলে দেন। শেফ সঞ্জীব কপূরের মতে, এটি ছাঁকা তেলে রান্নার একটি প্রধান ভুল। কড়াইয়ে ভিড় করলে তেলের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায়, ফলে খাবার সঠিকভাবে রান্না হয় না এবং প্রচুর তেল শোষণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে যখন ঠান্ডা খাবার তেলে যোগ করা হয়, তখন তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি কমে যেতে পারে। অল্প অল্প করে ব্যাচে ভাজলে তেলের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং খাবার মুচমুচে হয়। প্রতিটি টুকরোর চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা উচিত যাতে তেল সঠিকভাবে সঞ্চালিত হতে পারে এবং খাবার সমানভাবে রান্না হয়। এছাড়াও, কম পরিমাণে ভাজলে খাবার উল্টানো সহজ হয় এবং সমস্ত দিক থেকে সমানভাবে ভাজা হয়।

ভুল ৪: তেল পুনর্ব্যবহার করা

ভারতের ৮০ শতাংশ পরিবার ছাঁকা তেল পুনর্ব্যবহার করে থাকে, যা একটি গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি। NDTV-তে প্রকাশিত পুষ্টিবিদ সুমন আগরওয়ালের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, তেল পুনর্ব্যবহার করা কখনোই উচিত নয় কারণ এটি বিষাক্ত রাসায়নিক উৎপন্ন করে যা অন্ত্র, হৃদয় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। প্রতিবার তেল গরম করলে এতে ফ্রি র‍্যাডিক্যাল উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা কোষ, প্রোটিন এবং ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পুনর্ব্যবহৃত তেল মস্তিষ্কের ক্ষতি ত্বরান্বিত করতে পারে এবং আলঝেইমার্স ও পারকিনসন্সের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে তেল সিল করা পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত এবং ঠান্ডা, অন্ধকার জায়গায় রাখা উচিত। তবে সবচেয়ে ভালো হলো প্রতিবার তাজা তেল ব্যবহার করা। যদি অবশ্যই পুনর্ব্যবহার করতে হয়, তবে তেল ছেঁকে পরিষ্কার করে একবারের বেশি ব্যবহার করবেন না।

ভুল ৫: প্রতিবার ভাজার পরে তেল পরিষ্কার না করা

এক বার ভাজার পরে তেলে ছোট ছোট পোড়া টুকরো ভেসে থাকে। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, এই পোড়া টুকরোগুলি রেখে দিলে পরের খাবারে পোড়া গন্ধ ও স্বাদ চলে আসে এবং খাবার অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। রন্ধন বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেন যে প্রতি ব্যাচের পরে একটি ছোট ছাঁকনি বা চালনি ব্যবহার করে পোড়া কণা এবং খাদ্য অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলা উচিত। এই পোড়া টুকরোগুলি তেলে থাকলে তা দ্রুত পুনরায় পুড়ে যায় এবং তেলের গুণমান নষ্ট করে। এছাড়াও, এগুলি অ্যাক্রিলামাইডের মতো ক্ষতিকারক যৌগ তৈরি করতে পারে যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত তেল পরিষ্কার করলে খাবারের স্বাদ ভালো থাকে এবং তেল কিছুটা বেশি সময় ব্যবহারযোগ্য থাকে। তবে মনে রাখবেন, পরিষ্কার করা মানে তেল পুনর্ব্যবহারের সুপারিশ নয়।

ভুল ৬: ভেজা খাবার সরাসরি তেলে দেওয়া

ভেজা বা আর্দ্র খাবার সরাসরি গরম তেলে দিলে তেল ছিটকে পড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এছাড়াও, অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে খাবার মুচমুচে হয় না এবং প্রচুর তেল শোষণ করে। রন্ধন বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে ভাজার আগে খাবার কাগজের তোয়ালে বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। সবজি ভাজার ক্ষেত্রে, ধোয়ার পরে কমপক্ষে ১৫-২০ মিনিট রেখে দিন যাতে পৃষ্ঠের জল বাষ্পীভূত হয়। মাছ বা মাংস ভাজার সময় মেরিনেট করার পরে অতিরিক্ত মেরিনেড ঝরিয়ে নিতে হবে। পাণিপুরি, পাপড় বা অন্যান্য শুকনো খাবার ভাজার সময় নিশ্চিত করুন যে সেগুলো সম্পূর্ণ শুকনো। এই সহজ পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করলে খাবার বেশি ক্রিস্পি হবে, কম তেল ধরবে এবং রান্না নিরাপদ হবে। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি রিপোর্ট অনুসারে, সবজি ভাজার আগে ভাপিয়ে নিলেও রান্নার সময় এবং তেলের ব্যবহার উভয়ই কমে।

ভুল ৭: সঠিক রান্নার সরঞ্জাম ব্যবহার না করা

ছাঁকা তেলে রান্নার জন্য সঠিক সরঞ্জাম নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুটো করা চামচ বা স্লটেড স্পুন ব্যবহার করলে খাবার তোলার সময় অতিরিক্ত তেল সাথে সাথে ঝরে যায়। একটি গভীর কড়াই বা ফ্রাইং প্যান ব্যবহার করুন যাতে খাবার সম্পূর্ণভাবে তেলে ডুবে যায় এবং সমানভাবে রান্না হয়। পেট্রোলিয়াম বেসড তেলের জন্য স্টেইনলেস স্টিল বা কাস্ট আয়রন কড়াই উত্তম কারণ এগুলো তাপ সমানভাবে বিতরণ করে। ভাজা খাবার তোলার পরে একটি ওয়্যার র‍্যাক বা কাগজের তোয়ালে বিছানো প্লেটে রাখুন যাতে অতিরিক্ত তেল ঝরে যায়। প্রফেশনাল শেফরা ডিপ ফ্রাই থার্মোমিটার ব্যবহারের পরামর্শ দেন কারণ এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। নন-স্টিক কড়াই কম তেলে রান্নার জন্য ভালো, তবে উচ্চ তাপমাত্রার ডিপ ফ্রাইং-এর জন্য উপযুক্ত নয়।

তেল কম ব্যবহারের অতিরিক্ত কৌশল

যদিও ছাঁকা তেলে রান্নার সময় উপরের ৭টি ভুল এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবুও কিছু অতিরিক্ত কৌশল অনুসরণ করলে তেলের ব্যবহার আরও কমানো সম্ভব। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, বোতল থেকে সরাসরি তেল ঢালার পরিবর্তে চামচ বা স্প্রে বোতল ব্যবহার করা উচিত। এয়ার ফ্রায়ার একটি চমৎকার বিকল্প যা খুব কম তেলে ভাজার মতো ফলাফল দেয়। সবজি, মাছ বা মাংস ভাজার আগে হালকা ব্রেডিং বা কর্নফ্লাওর কোটিং করলে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি হয় যা তেল শোষণ কমায়। খাবার একই সাইজের করে কাটলে সব একসাথে রান্না হয় এবং বারবার তেল গরম করার প্রয়োজন হয় না। ভাজা খাবারের বিকল্প হিসেবে গ্রিলিং, বেকিং বা ভাপে রান্না করাও স্বাস্থ্যকর। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভাপে সবজি আধা-সিদ্ধ করে নিয়ে তারপর হালকা ভাজলে তেল এবং সময় উভয়ই সাশ্রয় হয়।

স্বাস্থ্যকর ভাজার জন্য তেলের তুলনা

বিভিন্ন তেলের স্মোক পয়েন্ট এবং পুষ্টিগুণ জানা জরুরি। নিচের তালিকায় ভারতীয় রান্নার জন্য উপযুক্ত তেলগুলির বিবরণ দেওয়া হলো:

তেলের নাম স্মোক পয়েন্ট ডিপ ফ্রাইং-এ উপযুক্ততা বৈশিষ্ট্য
সরিষার তেল ২৫০°সে উচ্চ ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ, হৃদয়ের জন্য ভালো
বাদামের তেল ২৩২°সে উচ্চ উচ্চ তাপে স্থিতিশীল, স্বাদযুক্ত
রিফাইন্ড নারকেল তেল ২৩২°সে উচ্চ স্যাচুরেটেড ফ্যাট, উচ্চ তাপ সহ্য করে
সয়াবিন তেল ২৩৪°সে মাঝারি সাশ্রয়ী, তবে বারবার গরম করা উচিত নয়
এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ১৬০-১৯০°সে নিম্ন ডিপ ফ্রাইং-এর জন্য অনুপযুক্ত
ICAR এবং অন্যান্য কৃষি গবেষণা সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে, বাদামের তেল (গ্রাউন্ডনাট অয়েল) ভারতীয় ডিপ ফ্রাইং-এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কারণ এটি উচ্চ তাপমাত্রায় ভাঙে না এবং স্বাদ নিরপেক্ষ। পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব ভারতে সরিষার তেল ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর উচ্চ স্মোক পয়েন্ট ও পুষ্টিগুণ এটিকে একটি চমৎকার পছন্দ করে তোলে।

ছাঁকা তেলের খাবার সুস্বাদু করার গোপন কৌশল

শেফ সঞ্জীব কপূর তাঁর রান্নার টিপসে কয়েকটি বিশেষ কৌশল শেয়ার করেছেন যা খাবার আরও সুস্বাদু করে। তিনি বলেন, ভাজার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না এবং বারবার খাবার উল্টাবেন না। সঠিক তাপমাত্রায় খাবার একবার বা দুবার উল্টালেই যথেষ্ট। বেশি ছোঁয়াছুঁয়ি করলে খাবার ভেঙে যেতে পারে এবং তেল শোষণ বাড়ে। মেরিনেড করার সময় লেবুর রস বা ভিনিগার যোগ করলে খাবার টেন্ডার হয় এবং কম সময়ে রান্না হয়। বেসন, রাইস ফ্লাওর বা কর্নফ্লাওর দিয়ে কোটিং করলে খাবার ক্রিস্পি হয় এবং তেল কম শোষণ করে। ভাজা খাবারে চাট মশলা, লেবুর রস বা তাজা কাটা পেঁয়াজ দিলে স্বাদ বৃদ্ধি পায়। প্রফেশনাল রেস্তোরাঁগুলো প্রায়ই ডাবল ফ্রাইং টেকনিক ব্যবহার করে – প্রথমে কম তাপমাত্রায় রান্না করে এবং পরে উচ্চ তাপমাত্রায় ক্রিস্প করে। এটি নিশ্চিত করে যে খাবার ভিতর থেকে ভালোভাবে রান্না হয় এবং বাইরে মুচমুচে থাকে।

ভারতীয় রান্নাঘরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা

IMARC গ্রুপের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতে ২০২৫ সালে ভোজ্য তেলের বাজার ২৫.৩৩ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে এবং ২০৩৪ সাল নাগাদ এটি ২৮.৩৪ মিলিয়ন টন হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বাস্থ্য সচেতন তেল ব্যবহারের গুরুত্বও বাড়ছে। পরিবারে স্বাস্থ্যকর রান্নার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, ছাঁকা তেলে ভাজা খাবারের পরিমাণ সীমিত করুন এবং সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি না খাওয়ার চেষ্টা করুন। দ্বিতীয়ত, বিকল্প রান্নার পদ্ধতি যেমন গ্রিলিং, বেকিং, স্টিমিং এবং এয়ার ফ্রাইং অন্বেষণ করুন। তৃতীয়ত, গুণমানসম্পন্ন তেল কিনুন এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন – সিল করা পাত্রে, ঠান্ডা ও অন্ধকার স্থানে। চতুর্থত, পরিবারের সদস্যদের, বিশেষত শিশুদের, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে শিক্ষিত করুন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে রান্নায় বিভিন্ন ধরনের তেল ব্যবহার করা উচিত কারণ প্রতিটি তেলের নিজস্ব পুষ্টিগুণ রয়েছে। একটি তেল সব ধরনের রান্নার জন্য উপযুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, অলিভ অয়েল সালাদ এবং কম তাপের রান্নার জন্য ভালো, কিন্তু ডিপ ফ্রাইং-এর জন্য নয়।

ছাঁকা তেলে রান্না করা ভারতীয় খাদ্য সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে উপরে উল্লেখিত ৭টি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চললে এবং সঠিক কৌশল অনুসরণ করলে ছাঁকা তেলের ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সঠিক তেল নির্বাচন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অল্প পরিমাণে ভাজা, তেল পুনর্ব্যবহার না করা, নিয়মিত পরিষ্কার করা, শুকনো খাবার ভাজা এবং সঠিক সরঞ্জাম ব্যবহার – এই সাতটি নীতি মেনে চললে খাবার হবে বেশি সুস্বাদু, মুচমুচে এবং কম তেলযুক্ত। মনে রাখবেন, প্রতিটি ছোট পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে আপনার এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং ঐতিহ্যবাহী স্বাদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আমরা সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার উপভোগ করতে পারি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে এই কৌশলগুলি আপনার রান্নাঘরে প্রয়োগ করুন এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার দিকে এগিয়ে যান।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন