দিল্লির ঐতিহ্যবাহী লালকেল্লার কাছে সোমবার সন্ধ্যায় একটি গাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ২০-৩০ জন আহত হয়েছে। এই ঘটনা ঘটেছে রেড ফোর্ট মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি ব্যস্ত চৌরাস্তায়, যখন সন্ধ্যার ভিড়ে হাজারো মানুষ চলাচল করছিল। পুলিশ এখনও বিস্ফোরণের সঠিক কারণ নির্ধারণ করতে পারেনি, তবে সন্ত্রাসবাদী হামলার সন্দেহে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এই দিল্লি বিস্ফোরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা চারটি প্রশ্ন—কী ছিল বিস্ফোরক, চালক কে, কেন এমনটি ঘটল এবং কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আছে কি—এখনও অমীমাংসিত, যা সারা দেশে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
সোমবার বিকেল ৩টার দিকে একটি হোয়াইট হুন্ডাই আই২০ গাড়ি লালকেল্লার কাছে একটি পার্কিং এলাকায় প্রবেশ করে, যা পরে সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে। গাড়িটিতে একজন মুখোশধারী ব্যক্তি ছিলেন, যিনি প্রায় তিন ঘণ্টা গাড়ির ভিতরেই অপেক্ষা করেন। সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে সিগন্যালে দাঁড়ানোর কয়েক সেকেন্ড পরেই বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে গাড়িটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং আশপাশের ছয়টি গাড়ি, দুটি ই-রিকশা এবং একটি অটোরিকশায় আগুন লাগে। দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ফায়ার টেন্ডার পাঠানো হয়, এবং ৭টা ২৯ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এই দিল্লি বিস্ফোরণের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে কয়েকশো মিটার দূর থেকে আওয়াজ শোনা যায় এবং আশপাশের ভবনের জানালা ভেঙে পড়ে।
ফোনের ব্যাটারি বিস্ফোরণ: কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনও সেই দৃশ্য ভুলতে পারছেন না। চাঁদনি চকের এক দোকানদার রাজিভ বলেছেন, “আমার গাড়ির শাওয়ার গ্লাস ভেঙে গেল, এমন আগুনের গোলা দেখলাম যেন স্বপ্নের মতো।” আরেকজন সাক্ষী ইরফান বর্ণনা করেছেন, “হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ হলো, দৌড়ে গিয়ে দেখি কারো হাত ছিঁড়ে পড়ে আছে, ফুসফুস পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। পরিবারের লোকেরা কীভাবে এটা সামলাবে, ভাবতেই পারছি না।” এই দিল্লি বিস্ফোরণের পর লোকনায়ক হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা চলছে, কিন্তু অনেক আত্মীয়স্বজনের জন্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাজিশ মালিক, যিনি তার শ্যালককে খুঁজছিলেন, বলেছেন, “হাসপাতালে নিরাপত্তা এতটাই কড়া যে ভিতরে যাওয়া যাচ্ছে না। অন্তত বলুন কে ক্রিটিক্যাল, কে মারা গেছে।”
এই ঘটনার পটভূমি আরও জটিল। সকালেই হরিয়ানার ফরিদাবাদে পুলিশ দুজন কাশ্মীরি চিকিৎসককে গ্রেফতার করে, যাদের কাছ থেকে ২,৯০০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক, টাইমার, রিমোট কন্ট্রোল, রাইফেল এবং লাইভ গুলি উদ্ধার হয়। এই চিকিৎসকরা জয়েশ-এ-মোহাম্মদ এবং আনসার গাজওয়াতুল হিন্দের সাথে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছে। কিন্তু দিল্লি পুলিশ এখনও এই গ্রেফতারের সাথে বিস্ফোরণের কোনো যোগসূত্র নিশ্চিত করেনি। গাড়িটির মালিক মোহাম্মদ সালমানকে গুরুগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যিনি ২০১৩ সালে গাড়িটি কিনেছিলেন এবং পরে বিক্রি করেছিলেন। তবে সন্দেহী উমর মোহাম্মদ, পুলওয়ামার একজন চিকিৎসক, যিনি একই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত বলে জানা যাচ্ছে, তার সাথে গাড়ির যোগাযোগ রয়েছে। এই দিল্লি বিস্ফোরণের তদন্তে এনআইএ এবং এনএসজি জড়িত হয়েছে, এবং আইপিসি-র পাশাপাশি ইউএপিএ (আনলॉফুল অ্যাকটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) এবং এক্সপ্লোসিভস অ্যাক্টের অধীনে মামলা দায়ের হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ কমিশনার সতীশ গোলচা বলেছেন, “গাড়িটি স্লো-মুভিং ছিল, সিগন্যালে থামার পর বিস্ফোরণ ঘটে। আশপাশের গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হাসপাতাল পরিদর্শন করে বলেছেন, “সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করব।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুটান সফরের সময় বলেছেন, “সকল দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।” বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধি এটাকে “হৃদয়বিদারক এবং উদ্বেগজনক” বলে বর্ণনা করেছেন, এবং দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল “ষড়যন্ত্রের তদন্ত” দাবি করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে মার্কিন দূতাবাস সতর্কতা জারি করে বলেছে, “লালকেল্লা এবং চাঁদনি চক এড়িয়ে চলুন।” ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, জাপানসহ অনেক দেশ শোক প্রকাশ করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে এই দিল্লি বিস্ফোরণ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একজন টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন, “দিল্লির লালকেল্লায় বিস্ফোরণ—১৩ জন মারা গেছে! পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ভারতীরা এটাকে পাকিস্তানের দোষ দেবে।” আরেক পোস্টে বলা হয়েছে, “সন্দেহী গাড়িতে তিন ঘণ্টা বসে ছিলেন—সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কাঁপছে সবাই।” কলকাতায় সতর্কতা জারির পর স্থানীয়রা বলছেন, “এমন ঘটনা যেকোনো সময় হতে পারে, নিরাপত্তা বাড়ানো দরকার।” বিভিন্ন শহরে—মুম্বাই, চেন্নাই, শ্রীরামপুর—অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
রেড ফোর্ট বিস্ফোরণে ১৩ জনের মৃত্যুতে শোকাহত মোদী, শাহের সঙ্গে নিরাপত্তা পর্যালোচনা করলেন
এখন চারটি প্রশ্নই অমীমাংসিত, যা তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু। প্রথম, বিস্ফোরণের সঠিক কারণ কী? ফরেনসিক টিম এখনও নমুনা বিশ্লেষণ করছে, কিন্তু অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বা আইইডি-এর মতো বিস্ফোরকের সন্দেহ রয়েছে। দ্বিতীয়, গাড়ির চালক কে ছিলেন? সিসিটিভিতে মুখোশধারী একজন দেখা গেছে, এবং উমর মোহাম্মদকে সন্দেহ করা হচ্ছে, কিন্তু নিশ্চিতকরণ হয়নি। তৃতীয়, এটি দুর্ঘটনা নাকি অকালপ্রকাশ? তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর সিগন্যালে বিস্ফোরণ—এটা সুইসাইড বোমিং কি না, তা স্পষ্ট নয়। চতুর্থ, কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আছে কি? ফরিদাবাদের গ্রেফতারের সাথে যোগ থাকলে দেশজুড়ে আরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এই দিল্লি বিস্ফোরণের তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, টোল প্লাজার রেকর্ড এবং সন্দেহভাজনদের রুট খতিয়ে দেখছেন।
এই ঘটনা শুধু দিল্লির নয়, সারা ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরীক্ষা। বিহারের দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের পরদিন এমন হামলা সন্ত্রাসীদের কৌশল নির্দেশ করে। পুলিশের সূত্র জানাচ্ছে, সন্দেহভাজনরা “হোয়াইট কলার টেরর” এর মাধ্যমে—অর্থাৎ শিক্ষিত ব্যক্তিদের দিয়ে—হামলা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তদন্ত এগোচ্ছে, কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থাকবে। জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, এবং সরকারের উপর দ্রুত ন্যায়বিচারের চাপ পড়ছে। এই দিল্লি বিস্ফোরণ যদি সন্ত্রাসী হামলা প্রমাণিত হয়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পরবর্তী দিনগুলোতে তদন্তের ফলাফল কী আনবে, তা দেখার বিষয়।











