ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা: সম্পূর্ণ গাইডলাইন যা প্রতিটি মানুষের জানা জরুরি

ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা আধুনিক জীবনযাত্রার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৮৯.৮ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যা বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস রোগীদের…

Avatar

 

ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা আধুনিক জীবনযাত্রার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৮৯.৮ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যা বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে ৪৩% বা প্রায় ৩৮.৬ মিলিয়ন মানুষ জানেই না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। স্বাভাবিক রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সাধারণত খালি পেটে ৭০-৯৯ mg/dL (৩.৯-৫.৫ mmol/L) এবং খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL (৭.৮ mmol/L) এর নিচে থাকে।

ডায়াবেটিস কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী বিপাকীয় রোগ যেখানে শরীর রক্তে শর্করার মাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই অবস্থা তখন ঘটে যখন অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করে না অথবা শরীর উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ইনসুলিন একটি হরমোন যা রক্ত থেকে গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে, যেখানে এটি শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, অন্ধত্ব এবং পায়ের সমস্যা সহ গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা বোঝা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। ল্যানসেট জার্নালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে ২১২ মিলিয়নেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন, যা বিশ্বব্যাপী মোট ডায়াবেটিস রোগীদের এক-চতুর্থাংশ।

রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা

খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা সাধারণত সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা না খেয়ে করা হয়। এই পরীক্ষা ডায়াবেটিস নির্ণয় এবং পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি। Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এবং American Diabetes Association (ADA) এর নির্দেশিকা অনুসারে, খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক মাত্রা ৭০-৯৯ mg/dL বা ৩.৯-৫.৫ mmol/L হওয়া উচিত।

যদি খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১০০-১২৫ mg/dL (৫.৬-৬.৯ mmol/L) হয়, তাহলে সেটিকে প্রিডায়াবেটিস বলা হয়। এই অবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। Mayo Clinic এর তথ্য অনুযায়ী, খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১২৬ mg/dL (৭.০ mmol/L) বা তার বেশি হলে, এবং দুটি পৃথক পরীক্ষায় এই ফলাফল পাওয়া গেলে, ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়।

খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা

খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা স্বাভাবিক। পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল বা খাবারের দুই ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা এই মাত্রা পরিমাপ করে। স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে, খাবারের দুই ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১৪০ mg/dL (৭.৮ mmol/L) এর নিচে থাকা উচিত।

British Heart Foundation এর বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি খাবারের দুই ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১৪০-১৯৯ mg/dL (৭.৮-১১.০ mmol/L) হয়, তাহলে সেটি প্রিডায়াবেটিস নির্দেশ করে। যদি এই মাত্রা ২০০ mg/dL (১১.১ mmol/L) বা তার বেশি হয়, তাহলে সেটি ডায়াবেটিসের লক্ষণ। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য, খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের লক্ষ্যমাত্রা টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ৯ mmol/L (১৬২ mg/dL) এর নিচে এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ৮.৫ mmol/L (১৫৩ mg/dL) এর নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

র‍্যান্ডম ব্লাড সুগার টেস্ট

র‍্যান্ডম প্লাজমা গ্লুকোজ পরীক্ষা দিনের যেকোনো সময় করা যায়, খাওয়ার সময় বিবেচনা না করেই। এই পরীক্ষা বিশেষভাবে টাইপ ১ ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয় যখন জরুরি ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় প্রয়োজন। স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে, র‍্যান্ডম ব্লাড সুগার ১১.১ mmol/L (২০০ mg/dL) এর নিচে থাকে। যদি এই মাত্রা ২০০ mg/dL বা তার বেশি হয় এবং ডায়াবেটিসের অন্যান্য লক্ষণ থাকে, তাহলে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়।

HbA1c পরীক্ষা: দীর্ঘমেয়াদী রক্তে শর্করার সূচক

HbA1c কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

HbA1c বা গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা গত তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে। এই পরীক্ষা ডায়াবেটিস নির্ণয় এবং দীর্ঘমেয়াদী গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। হিমোগ্লোবিন হল লোহিত রক্তকণিকায় থাকা একটি প্রোটিন যা অক্সিজেন বহন করে। যখন রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকে, তখন এটি হিমোগ্লোবিনের সাথে যুক্ত হয়।

Dr Lal PathLabs এবং অন্যান্য প্রধান ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলির তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে HbA1c মাত্রা ৪%-৫.৬% এর মধ্যে থাকে। এটি ৩৬ mmol/mol এর নিচে বা ৫.৫% এর নিচে হওয়া আদর্শ। যদি HbA1c মাত্রা ৫.৭%-৬.৪% হয়, তাহলে সেটি প্রিডায়াবেটিস নির্দেশ করে এবং ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। HbA1c মাত্রা ৬.৫% বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য HbA1c লক্ষ্যমাত্রা

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য, HbA1c এর লক্ষ্যমাত্রা সাধারণত ৬.৫% (৪৮ mmol/mol) বা তার নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যদিও এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। National Institute for Health and Care Excellence (NICE) এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ৭% (৫৩ mmol/mol) বা তার নিচে HbA1c মাত্রা রাখা উচিত। কিছু ক্ষেত্রে, বয়স্ক রোগী বা যাদের জটিলতার ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য ৭.৫%-৮% পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

রক্তে শর্করার মাত্রা: সম্পূর্ণ তুলনামূলক চার্ট

পরীক্ষার ধরন স্বাভাবিক প্রিডায়াবেটিস ডায়াবেটিস
খালি পেটে গ্লুকোজ ৭০-৯৯ mg/dL (৩.৯-৫.৫ mmol/L) ১০০-১২৫ mg/dL (৫.৬-৬.৯ mmol/L) ১২৬ mg/dL বা বেশি (৭.০ mmol/L+)
খাবারের ২ ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL এর নিচে (৭.৮ mmol/L) ১৪০-১৯৯ mg/dL (৭.৮-১১.০ mmol/L) ২০০ mg/dL বা বেশি (১১.১ mmol/L+)
র‍্যান্ডম ব্লাড সুগার ২০০ mg/dL এর নিচে (১১.১ mmol/L) প্রযোজ্য নয় ২০০ mg/dL বা বেশি (১১.১ mmol/L+)
HbA1c ৪%-৫.৬% (২০-৩৮ mmol/mol) ৫.৭%-৬.৪% (৩৯-৪৬ mmol/mol) ৬.৫% বা বেশি (৪৮ mmol/mol+)

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রক্তে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা

টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পার্থক্য

টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না কারণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলি ধ্বংস করে দেয়। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত শৈশবে বা কৈশোরে শুরু হয় এবং সারাজীবন ইনসুলিন ইনজেকশনের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।

Healthline এর চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খাবারের আগে রক্তে গ্লুকোজের লক্ষ্যমাত্রা ৫-৭ mmol/L (৯০-১২৬ mg/dL), খাবারের পর ৫-৯ mmol/L (৯০-১৬২ mg/dL) এবং ঘুমানোর আগে ৪-৭ mmol/L (৭২-১২৬ mg/dL) রাখা উচিত। টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে, খাবারের আগে ৪-৭ mmol/L (৭২-১২৬ mg/dL) এবং খাবারের পর ৮.৫ mmol/L (১৫৩ mg/dL) এর নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

শিশুদের ডায়াবেটিস মাত্রা

শিশু এবং কিশোরদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের জন্য, খাবারের আগে ৪-৭ mmol/L, খাবারের পর ৫-৯ mmol/L এবং ঘুমানোর আগে ৪-৭ mmol/L রাখা উচিত। হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা খুব কম রক্তে শর্করার ঝুঁকির কারণে শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা উচ্চতর রাখা হয়।

ভারতে ডায়াবেটিসের বর্তমান পরিস্থিতি

আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান

ভারতে ডায়াবেটিসের প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। International Diabetes Federation (IDF) এর ডায়াবেটিস অ্যাটলাস ১১তম সংস্করণ (এপ্রিল ২০২৫) অনুসারে, ২০২৪ সালে ভারতে ২০-৭৯ বছর বয়সী প্রায় ৮৯.৮ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিসে নির্ণীত হয়েছেন, যা বিশ্বব্যাপী প্রতি সাত জন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে একজন। এটি ১০.৫% প্রাদুর্ভাবের হার নির্দেশ করে এবং চীনের পরে বিশ্বে ভারতকে দ্বিতীয় স্থানে রাখে।

যা আরও উদ্বেগজনক তা হলো, এই ৮৯.৮ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৪৩% বা প্রায় ৩৮.৬ মিলিয়ন মানুষ জানেই না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। ল্যানসেট এবং NCD-RisC এর একটি যুগান্তকারী গবেষণা অনুমান করেছে যে ২০২২ সালে ভারতে ২১২ মিলিয়নেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন, যা বিশ্বব্যাপী মোট ডায়াবেটিস রোগীদের এক-চতুর্থাংশ। উদ্বেগজনকভাবে, এদের মধ্যে প্রায় ৬২% কোনো চিকিৎসা নিচ্ছিলেন না।

ভবিষ্যৎ প্রজেকশন

Frontiers in Endocrinology জার্নালে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব হার ২০২২ সালে ৬১৫০.১৯ থেকে ২০২৫ সালে ৬৯৬০.৩৩ এবং ২০২৭ সালের মধ্যে ৭৫১২.৫৯ এ পৌঁছাবে বলে প্রজেক্ট করা হয়েছে। আরও দূরের ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, IDF প্রজেক্ট করেছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ১৫৬.৭ মিলিয়ন ডায়াবেটিক প্রাপ্তবয়স্ক থাকবে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা একটি জরুরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনা

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, বিশেষ করে সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সুষম খাদ্য যেখানে প্রচুর শাকসবজি, ফল, পুরো শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিন থাকে, রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখে।

ওজন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শরীরের অতিরিক্ত ওজন বিশেষত পেটের চারপাশে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়। গবেষণা দেখায় যে মাত্র ৫-১০% ওজন হ্রাস টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। প্রিডায়াবেটিস অবস্থায়, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায়ই এই অবস্থা বিপরীত করা সম্ভব।

নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং পর্যবেক্ষণ

ডায়াবেটিস প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা জটিলতা প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। WHO এবং ভারত সরকার ২০২৩ সালে একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ চালু করেছে যেখানে ২০২৫ সালের মধ্যে ৭৫ মিলিয়ন উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষকে স্ট্যান্ডার্ড কেয়ারে নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে। এই উদ্যোগ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধির উপর জোর দেয়।

যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের নিয়মিত রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের দিনে একাধিকবার, এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের তাদের চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুযায়ী পরীক্ষা করা উচিত। HbA1c পরীক্ষা প্রতি তিন থেকে ছয় মাসে একবার করা উচিত দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ মূল্যায়নের জন্য।

চিকিৎসা এবং ওষুধ

টাইপ ১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় সবসময় ইনসুলিন থেরাপি প্রয়োজন। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় মেটফরমিন সাধারণত প্রথম লাইনের ওষুধ, যার সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ওষুধ যোগ করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট এবং SGLT2 ইনহিবিটরের মতো নতুন ওষুধের শ্রেণি ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই ওষুধগুলি শুধুমাত্র রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে না বরং ওজন হ্রাস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস

গর্ভাবস্থায় কিছু মহিলা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (GDM) বিকশিত করেন, যা সাধারণত প্রসবের পর চলে যায়। তবে এটি মা এবং শিশু উভয়ের জন্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায় এবং পরবর্তী জীবনে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মহিলাদের জন্য খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজ ৯৫ mg/dL এর নিচে এবং খাবারের এক ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL বা খাবারের দুই ঘণ্টা পর ১২০ mg/dL এর নিচে রাখার লক্ষ্য থাকে।

বয়স্কদের ডায়াবেটিস

বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে, হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে রক্তে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা শিথিল করা হয়। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য, HbA1c লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫%-৮% হতে পারে, বিশেষত যাদের একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা জ্ঞানীয় দুর্বলতা রয়েছে। প্রতিটি রোগীর জন্য ব্যক্তিগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপের আধুনিক প্রযুক্তি

কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (CGM)

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং সিস্টেম ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় একটি গেম চেঞ্জার হয়ে উঠেছে। এই ডিভাইসগুলি ত্বকের নিচে একটি ছোট সেন্সর ব্যবহার করে প্রতি কয়েক মিনিটে রক্তে গ্লুকোজ মাপে এবং স্মার্টফোন বা রিসিভারে রিয়েল-টাইম ডেটা প্রদান করে। এটি রোগীদের রক্তে শর্করার প্রবণতা দেখতে এবং খাবার, ব্যায়াম এবং ওষুধের প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে।

স্মার্ট গ্লুকোমিটার

আধুনিক গ্লুকোমিটারগুলি ব্লুটুথের মাধ্যমে স্মার্টফোনের সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপে সঞ্চয় করতে পারে। এই অ্যাপগুলি গ্রাফ এবং চার্টের মাধ্যমে ডেটা বিশ্লেষণ করে, প্রবণতা চিহ্নিত করে এবং এমনকি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে রিপোর্ট শেয়ার করার সুবিধা দেয়। এই প্রযুক্তিগুলি ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনাকে আরও সুবিধাজনক এবং কার্যকর করে তুলেছে।

ডায়াবেটিসের জটিলতা প্রতিরোধ

দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস সময়ের সাথে সাথে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্ষতি করতে পারে। হৃদরোগ এবং স্ট্রোক ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা এবং মৃত্যুর প্রধান কারণ। উচ্চ রক্তে শর্করা রক্তনালীগুলির ক্ষতি করে, যা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি দুই থেকে তিন গুণ বাড়িয়ে দেয়।

ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বা কিডনির ক্ষতি আরেকটি গুরুতর জটিলতা যা শেষ পর্যন্ত কিডনি বিকল এবং ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি চোখের রক্তনালীগুলির ক্ষতি করে এবং অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ। নিউরোপ্যাথি বা স্নায়ুর ক্ষতি বিশেষত পা এবং পায়ে অনুভূতি হারানো, ব্যথা এবং আলসার সৃষ্টি করতে পারে, যা গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গচ্ছেদ পর্যন্ত হতে পারে।

জটিলতা প্রতিরোধের কৌশল

রক্তে শর্করার মাত্রা লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা জটিলতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। গবেষণা দেখায় যে HbA1c মাত্রা ১% কমানো মাইক্রোভাসকুলার জটিলতার ঝুঁকি প্রায় ৩৭% কমায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, যার মধ্যে বার্ষিক চোখের পরীক্ষা, কিডনি ফাংশন টেস্ট এবং পায়ের পরীক্ষা রয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা শনাক্ত করতে এবং চিকিৎসা শুরু করতে সাহায্য করে।

রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান ত্যাগ করা হৃদরোগ এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। একটি সুসংগঠিত ডায়াবেটিস কেয়ার টিম যার মধ্যে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, ডায়েটিশিয়ান, ডায়াবেটিস এডুকেটর এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ রয়েছে, ব্যাপক যত্ন প্রদান করতে পারে।

রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা বোঝা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনার ভিত্তি। খালি পেটে ৭০-৯৯ mg/dL, খাবারের দুই ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL এর নিচে এবং HbA1c ৫.৬% এর নিচে রাখা স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত হয়। ভারতে ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান হার একটি জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করছে, যেখানে ৮৯.৮ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং আরও অনেকে এটি সম্পর্কে অজ্ঞাত। জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং কঠোর গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা প্রতিরোধ করে। প্রতিটি ব্যক্তির উচিত তাদের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ব্যক্তিগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং একটি কার্যকর ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা।

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম

আরও পড়ুন