ছেলেদের কি মুড সুইং হয়? কারণ, লক্ষণ এবং সমাধানের বিস্তারিত বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ

সমাজের একটি প্রচলিত ধারণা হলো মুড সুইং বা মেজাজের ওঠানামা কেবল নারীদেরই হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ব একেবারেই ভিন্ন কথা বলে। হ্যাঁ, ছেলেদেরও মুড সুইং হয় এবং এটি…

Debolina Roy

 

সমাজের একটি প্রচলিত ধারণা হলো মুড সুইং বা মেজাজের ওঠানামা কেবল নারীদেরই হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ব একেবারেই ভিন্ন কথা বলে। হ্যাঁ, ছেলেদেরও মুড সুইং হয় এবং এটি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়া। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO)-এর মতো নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, হরমোনের পরিবর্তন, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রার ওঠানামা, মানসিক চাপ, এবং বয়সের সাথে সাথে আসা শারীরিক পরিবর্তনের কারণে পুরুষদের মেজাজে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। নারীদের মুড সুইং যেমন ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের মাসিক চক্রের সাথে যুক্ত, তেমনি পুরুষদের মুড সুইং প্রধানত তাদের দৈনন্দিন টেস্টোস্টেরন চক্র, কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ এবং “ইরিটেবল মেল সিনড্রোম” (Irritable Male Syndrome বা IMS)-এর মতো অবস্থার কারণে ঘটে থাকে। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্বস্ত এবং বাস্তবসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে ছেলেদের মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ, লক্ষণ এবং এর প্রতিকার নিয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা করব।

পুরুষদের আবেগ এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজব্যবস্থা পুরুষদের একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বড় করে তুলেছে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শেখানো হয়, “ছেলেরা কাঁদে না” বা “আবেগ প্রকাশ করা দুর্বলতার লক্ষণ।” এই সামাজিক প্রত্যাশার কারণে পুরুষরা তাদের আবেগ, কষ্ট, হতাশা বা মানসিক চাপ সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাদের ভেতরে আবেগের কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

আবেগ যখন ভেতরে অবদমিত থাকে, তখন তা অন্য কোনো রূপে প্রকাশ পায়। অনেক সময় হঠাৎ করে রেগে যাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া বা খিটখিটে মেজাজ দেখানো—এগুলো সবই অবদমিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, পুরুষরা আবেগহীন নন; বরং তারা সামাজিক কাঠামোর কারণে আবেগ প্রকাশে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। মেজাজের এই হঠাৎ পরিবর্তন বা মুড সুইং পুরুষদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা শারীরিক এবং মানসিক—উভয় কারণেই ঘটতে পারে।

ছেলেদের মুড সুইং বলতে আসলে কী বোঝায়?

মুড সুইং বা মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন মানুষের মানসিক অবস্থা কোনো সুনির্দিষ্ট বা দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে বদলে যায়। এই মুহূর্তে যে মানুষটি হাসিখুশি আছেন, পরমুহূর্তেই তিনি চরম হতাশ, রাগান্বিত বা বিরক্ত হয়ে উঠতে পারেন।

ছেলেদের ক্ষেত্রে এই মুড সুইং সাধারণত দুঃখ বা কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। এটি মূলত প্রকাশ পায় বিরক্তি, একগুঁয়েমি, হঠকারিতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে। এটি কোনো চারিত্রিক ত্রুটি নয়, বরং মস্তিষ্ক এবং শরীরের রাসায়নিক পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক ফলাফল।

ছেলেদের মুড সুইং কেন হয়? বৈজ্ঞানিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণসমূহ

ছেলেদের মুড সুইংয়ের পেছনে একাধিক শারীরিক, হরমোনাল এবং মানসিক কারণ জড়িত থাকে। নিচে এই কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. হরমোনের প্রভাব এবং টেস্টোস্টেরনের ভূমিকা

পুরুষদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মূল চালিকাশক্তি হলো টেস্টোস্টেরন হরমোন। নারীদের হরমোন চক্র যেমন ২৮-৩০ দিনের হয়, পুরুষদের হরমোন চক্র ঘটে প্রতিদিনের ভিত্তিতে।

  • দৈনন্দিন চক্র: একজন সুস্থ পুরুষের শরীরে সকালবেলা টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, যার ফলে সকালে তারা বেশি উদ্যমী এবং আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা বা রাত হওয়ার সাথে সাথে এই মাত্রা কমতে থাকে, যার কারণে রাতে অনেক পুরুষই ক্লান্ত এবং খিটখিটে অনুভব করেন।

  • বয়সজনিত পরিবর্তন: ৩০ বছর বয়সের পর থেকে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন উৎপাদন প্রতি বছর প্রায় ১% হারে কমতে শুরু করে। টেস্টোস্টেরনের এই ধীরগতির পতনের ফলে চল্লিশ বা পঞ্চাশের কোঠায় পৌঁছালে পুরুষদের মেজাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যা অনেক সময় ‘অ্যান্ড্রোপজ’ (Andropause) বা পুরুষ মেনোপজ নামে পরিচিত।

২. ইরিটেবল মেল সিনড্রোম (Irritable Male Syndrome বা IMS)

২০০১ সালে স্কটিশ গবেষক জেরাল্ড লিংকন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ওপর গবেষণা করে প্রথম ‘ইরিটেবল মেল সিনড্রোম’ (IMS) শব্দটি ব্যবহার করেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (NIH)-এর ডেটাবেসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টেস্টোস্টেরন হরমোন হঠাৎ কমে গেলে পুরুষদের মধ্যে এক ধরণের স্নায়বিক চাপ, বিরক্তি, অলসতা এবং বিষণ্ণতার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাকেই IMS বলা হয়।

যখন একজন পুরুষ IMS-এর মধ্য দিয়ে যান, তখন সামান্য কথায় তিনি রেগে যেতে পারেন, সঙ্গীর প্রতি অসহনশীল আচরণ করতে পারেন এবং নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। এটি ছেলেদের মুড সুইংয়ের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ।

৩. মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হরমোনের আধিক্য

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পুরুষদের ওপর আর্থিক, পারিবারিক এবং পেশাগত দিক থেকে প্রচুর মানসিক চাপ থাকে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে শরীরে ‘কোর্টিসল’ (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, কোর্টিসলের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। হরমোনের এই ভারসাম্যহীনতা পুরুষদের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে তোলে এবং এর ফলে তীব্র মুড সুইং দেখা দেয়।

৪. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং ক্লান্তি

মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি। যখন একজন পুরুষ দিনের পর দিন অপর্যাপ্ত ঘুমে ভোগেন, তখন তার মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ (যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে ছোটখাটো বিষয়কেও তারা বড় সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করেন এবং মেজাজ দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে।

৫. বিষণ্ণতা এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা

বিষণ্ণতা (Depression), উদ্বেগ (Anxiety), এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Bipolar Disorder)-এর মতো মানসিক রোগগুলো মুড সুইংয়ের বড় কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, সারা বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভুগছেন এবং পুরুষদের মধ্যে এর প্রকোপ উল্লেখযোগ্য। পুরুষদের বিষণ্ণতা প্রায়শই কান্নার বদলে রাগ, হতাশা বা ওয়ার্কোহোলিজম (অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতা)-এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

নারী ও পুরুষের মুড সুইংয়ের তুলনামূলক পার্থক্য

যদিও মুড সুইং নারী ও পুরুষ উভয়েরই হয়, তবে এর বহিঃপ্রকাশে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। নিচের সারণির মাধ্যমে এই পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট নারীদের মুড সুইং পুরুষদের মুড সুইং
আবেগের বহিঃপ্রকাশ কান্না, বিষণ্ণতা, দুঃখবোধ এবং আবেগী হয়ে পড়া। বিরক্তি, রাগ, হঠকারিতা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ।
হরমোনের প্রভাব মাসিক চক্র (PMS), গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজ কেন্দ্রিক। প্রাত্যহিক টেস্টোস্টেরন চক্র, স্ট্রেস এবং অ্যান্ড্রোপজ (Andropause) কেন্দ্রিক।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া তারা সাধারণত অন্যদের সাথে কথা বলে আবেগ হালকা করেন। তারা নিজেদের গুটিয়ে নেন, চুপচাপ হয়ে যান (Stonewalling)।
ক্ষতিকর প্রবণতা অতিরিক্ত খাবার খাওয়া বা একাকী বোধ করা। ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া।

ছেলেদের মুড সুইংয়ের প্রধান লক্ষণসমূহ

আপনার বা আপনার কাছের কোনো পুরুষের মুড সুইং হচ্ছে কি না, তা কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখে বোঝা সম্ভব:

  • আকস্মিক রাগ এবং বিরক্তি: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে রেগে যাওয়া বা সামান্য কথায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো।

  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: বন্ধু-বান্ধব, পরিবার বা সঙ্গীর কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। একা থাকার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া।

  • কর্মস্পৃহা কমে যাওয়া: যে কাজগুলো করতে একসময় ভালো লাগত, হঠাৎ করে সেগুলোর প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া।

  • অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া: মনের ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ করতে না পেরে একদম নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া। অনেকেই এই সময় প্রশ্ন করলে “আমি ঠিক আছি” বলে এড়িয়ে যান।

  • শারীরিক লক্ষণ: মনোযোগের অভাব, ঘুমের ব্যাঘাত, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং যৌন স্পৃহা বা লিবিডো কমে যাওয়া।

  • ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ: মানসিক চাপ থেকে বাঁচতে বা মুড ঠিক করতে অতিরিক্ত ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন বা ড্রাগসের দিকে ঝুঁকে পড়া।

 মুড সুইং ও পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গবেষণায় পুরুষদের মুড সুইং এবং মানসিক সমস্যার ভয়াবহ কিছু চিত্র উঠে এসেছে:

  • NIMH-এর রিপোর্ট: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৭.৭% কোনো না কোনো মুড ডিসঅর্ডারে (Mood Disorder) ভুগছেন। এর মধ্যে অনেকেই গুরুতর মুড সুইংয়ের শিকার।

  • WHO-এর রিপোর্ট: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৫.৭% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছেন, যার মধ্যে পুরুষদের হার প্রায় ৪.৬%।

  • আত্মহত্যার ঝুঁকি: WHO-এর ডেটা অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ লক্ষ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। আবেগ প্রকাশ করতে না পারা এবং তীব্র মুড সুইংয়ের কারণে পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা নারীদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।

  • অ্যান্ড্রোপজ ডেটা: চিকিৎসকদের মতে, ৬০ বছর বয়সের পর প্রায় ২০% পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়, যা তাদের মেজাজ খিটখিটে করে তোলার প্রধান কারণ।

(উল্লেখ্য, উপরোক্ত পরিসংখ্যানগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ-এর অফিসিয়াল গবেষণাপত্র থেকে সংগৃহীত।)

মুড সুইং বা মেজাজের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়

মুড সুইং কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়। সঠিক জীবনযাপন এবং সচেতনতার মাধ্যমে এটি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিচে কিছু বিজ্ঞানসম্মত এবং কার্যকর উপায় আলোচনা করা হলো:

১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি

মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য রক্ষায় খাদ্যের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ঠিক রাখতে জিংক, ভিটামিন ডি, এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, ডিম, পালং শাক এবং বীজ জাতীয় খাবার পুরুষদের হরমোনাল ব্যালান্স ঠিক রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো মেজাজ আরও খিটখিটে করে দেয়।

২. নিয়মিত ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রম

শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করলে শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ (Endorphin) নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া নিয়মিত ওয়েট লিফটিং বা ভারোত্তোলন জাতীয় ব্যায়াম টেস্টোস্টেরন হরমোনের উৎপাদন প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি করে, যা মুড সুইং রোধে অত্যন্ত কার্যকর।

৩. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা

মানসিক চাপ কমাতে এবং মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিতে প্রতিদিন রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম অত্যন্ত জরুরি। ঘুমের অভাব হলে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা মুড সুইংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

৪. মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা (Stress Management)

কর্মক্ষেত্রের বা ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন, ইয়োগা, বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করা যেতে পারে। দিনের কিছুটা সময় নিজের পছন্দের কাজের জন্য, যেমন—বই পড়া, গান শোনা বা বাগান করার জন্য বরাদ্দ রাখলে মানসিক প্রশান্তি মেলে।

৫. থেরাপি এবং কাউন্সেলিং

যদি মুড সুইং খুব বেশি মাত্রায় হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তবে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের (Psychiatrist বা Psychologist) শরণাপন্ন হওয়া উচিত। ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি’ (CBT) মুড সুইং এবং অবদমিত রাগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকরী একটি পদ্ধতি।

৬. সঙ্গীর সাথে খোলামেলা আলোচনা

পুরুষদের উচিত তাদের মানসিক অবস্থা নিয়ে সঙ্গীর সাথে কথা বলা। “আমি এখন একটু চাপে আছি” বা “আমার মনটা আজ ভালো নেই”—এই ছোট কথাগুলো সম্পর্ককে সহজ করে দেয় এবং সঙ্গীকে পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে।

পরিবারের এবং সঙ্গীর ভূমিকা

একজন পুরুষের মুড সুইং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তার স্ত্রী, সঙ্গী বা পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যখন দেখবেন আপনার পুরুষ সঙ্গীটি হঠাৎ রেগে যাচ্ছেন বা একদম চুপ হয়ে গেছেন, তখন তার ওপর পাল্টা রাগ না দেখিয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন।

তাকে তার নিজস্ব কিছু সময় (Space) দিন। বারবার “কী হয়েছে?” বলে বিরক্ত না করে তাকে শান্ত হওয়ার সুযোগ দিন। তিনি শান্ত হলে তাকে আশ্বস্ত করুন যে, তিনি একা নন এবং আপনি তার মানসিক পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন। সামাজিক যে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুরুষরা আবেগ চেপে রাখেন, পরিবারকেই সেই দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে তাকে ভালোবাসার পরিবেশ দিতে হবে।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি?

মাঝেমধ্যে মেজাজ পরিবর্তন হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যদি নিচের পরিস্থিতিগুলো তৈরি হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:

  • যখন মুড সুইংয়ের কারণে দৈনন্দিন কাজ বা অফিসে চরম ব্যাঘাত ঘটে।

  • যখন অকারণে রাগের বশবর্তী হয়ে নিজেকে বা অন্য কাউকে আঘাত করার প্রবণতা তৈরি হয়।

  • টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যদি তীব্র বিষণ্ণতা, হতাশা বা শূন্যতা কাজ করে।

  • মদ্যপান বা ড্রাগসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি জন্মালে।

  • আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা মাথায় এলে।

এমন পরিস্থিতিতে একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (হরমোন বিশেষজ্ঞ) বা সাইকিয়াট্রিস্ট (মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ)-এর সাথে পরামর্শ করে রক্তে টেস্টোস্টেরন, থাইরয়েড এবং অন্যান্য হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায় যে, “ছেলেদের মুড সুইং হয় না”—এটি সম্পূর্ণ একটি অবৈজ্ঞানিক এবং ভ্রান্ত ধারণা। পুরুষরাও রক্ত-মাংসের মানুষ, তাদেরও হরমোনের পরিবর্তন হয় এবং তাদেরও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইরিটেবল মেল সিনড্রোম (IMS) থেকে শুরু করে কর্মজীবনের স্ট্রেস—সবকিছু মিলিয়েই পুরুষদের মেজাজে ওঠানামা ঘটে। আমাদের সমাজকে এই সত্যটি মেনে নিতে হবে এবং পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উপহাস করার বদলে তাদের প্রতি আরও বেশি সহানুভূতিশীল হতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, খোলামেলা যোগাযোগ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে মুড সুইংয়ের মতো সমস্যা খুব সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। পুরুষদের আবেগ প্রকাশের জন্য একটি নিরাপদ ও মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন