হ্যাঁ, শীতকালে অধিকাংশ মানুষের রক্তচাপ কিছুটা বেড়ে যায় – এটি কোনো গুজব নয়, বিশ্বব্যাপী শত শত গবেষণায় প্রমাণিত সত্য। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (AHA) ২০২৩ সালের একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের সিস্টোলিক প্রেশার শীতে গড়ে ১.৭ মিলিমিটার মার্কারি (mm Hg) পর্যন্ত বাড়ে এবং প্রেশার নিয়ন্ত্রণের হার প্রায় ৫% কমে যায়। মেয়ো ক্লিনিকের মতে, ঠান্ডায় রক্তনালী সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এমনটা ঘটে। তাই শীত এলে প্রেশারের রোগীরা অতিরিক্ত সতর্ক থাকুন!
শীতকালে রক্তচাপ বাড়ার কারণ কী?
শীতকালে পরিবেশের তাপমাত্রা কমে গেলে শরীর স্বাভাবিকভাবে তাপ সংরক্ষণের চেষ্টা করে। ফলে ত্বকের কাছাকাছি রক্তনালীগুলো সংকুচিত (vasoconstriction) হয়ে যায়। এতে রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে যায়, কিন্তু রক্তের পরিমাণ একই থাকে – ফলে চাপ বেড়ে যায়। এটিকে শীতকালীন হাইপারটেনশনের প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেছে।
অন্যান্য কারণগুলো হলো:
- শীতে শারীরিক কার্যকলাপ কমে যায়, ওজন বাড়ে।
- লবণাক্ত খাবার (পিঠা-পুলি, ভাজাপোড়া) বেশি খাওয়া হয়।
- ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পড়ে (সূর্যের আলো কম পাওয়া যায়)।
- সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়।
বয়স অনুযায়ী Blood Pressure: কোন বয়সে কত থাকা উচিত
কতটা বাড়ে রক্তচাপ? সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এক নজরে
বিভিন্ন দেশে করা গবেষণায় শীত-গ্রীষ্মের পার্থক্য স্পষ্ট। নিচে কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে তথ্য তুলে ধরা হলো:
| গবেষণা/সোর্স | বছর | নমুনা সংখ্যা | শীতে সিস্টোলিক প্রেশার বৃদ্ধি | মন্তব্য | |
|---|---|---|---|---|---|
| American Heart Association (USA) | 2023 | ৬০,০০০+ হাইপারটেনশন রোগী | গড়ে ১.৭ mm Hg | প্রেশার নিয়ন্ত্রণ ৫% কমে | |
| Meta-analysis (47টি ট্রায়াল) | 2020 | লক্ষাধিক | গড়ে ৫-৬ mm Hg (অফিস/হোম মাপা) | বয়স্ক ও চিকিৎসাধীন রোগীদের বেশি | |
| Three-City Study (France) | 2009 (আপডেট ২০২৩) | ৮,৮০০+ (৬৫+ বয়সী) | শীতে ১০% বেশি হাই প্রেশার রিডিং | ৮০+ বয়সে সবচেয়ে বেশি | |
| China Kadoorie Biobank | 2021 | ৫,০৬,০০৭৩ জন | গড়ে ১০ mm Hg (গ্রীষ্ম-শীত) | ১০°সে তাপমাত্রা কমলে ৫.৭ mm Hg বাড়ে | |
| North India Population Study | 2018 | গ্রামীণ-শহুরে | শীতে গড়ে ৯/৫.৫ mm Hg বেশি | গ্রামে বেশি প্রভাব |
এই তথ্যগুলো দেখিয়ে দেয় যে, শীতকালীন প্রেশার বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশ-ভারতের মতো উপমহাদেশেও একই রকম।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
সবাই কমবেশি প্রভাবিত হলেও কিছু গ্রুপে ঝুঁকি অনেক বেশি:
- ৬৫ বছরের বেশি বয়স্করা (রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়)।
- যাঁদের ইতিমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ আছে বা ডায়াবেটিস।
- ধূমপায়ীরা – তাঁদের শীতে প্রেশি বাড়ে (৭.৩ mm Hg বনাম নন-স্মোকারের ২.৭ mm Hg)।
- গ্রামাঞ্চলে বাসকারী (ইনডোর হিটিং কম)।
স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর সেরা সময়: সকালে পড়া নাকি রাতে? জেনে নিন বিজ্ঞান কী বলছে
শীতে রক্তচাপ বাড়লে কী কী সমস্যা হতে পারে?
শীতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঘটনা ২০-৩০% বেশি হয়, যার একটা বড় কারণ এই প্রেশার বৃদ্ধি। AHA-র মতে, শুধু ২ mm Hg সিস্টোলিক বাড়লেও স্ট্রোকের ঝুঁকি ১০% এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ৭% বাড়ে।
শীতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত উপায়
১. নিয়মিত মাপুন, বিশেষ করে সকালে: হোম মনিটরিং করলে শীতের পরিবর্তন আগেই ধরা পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত হোম BP মাপেন, তাঁদের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি ২০% কম।
২. ঘরের তাপমাত্রা ১৮-২০°সে রাখুন: জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘর গরম রাখলে শীতে প্রেশার ৫-১০ mm Hg কম থাকে।
৩. লবণ কমান, পটাশিয়াম বাড়ান: দিনে লবণ ৫ গ্রামের নিচে রাখুন। কলা, শাকসবজি, দই খান।
৪. ব্যায়াম চালিয়ে যান, তবে ইনডোর: প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি বা যোগা। বাইরে ঠান্ডায় হাঁটলে প্রেশার উল্টো বাড়তে পারে।
৫. ওষুধের ডোজ শীতে বাড়াতে হতে পারে: AHA সুপারিশ করে, শীতের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শীতে ওষুধের ডোজ ১০-২০% বাড়ালে নিয়ন্ত্রণ ভালো থাকে।
৬. ভিটামিন ডি চেক করুন: শীতে সূর্য কম, তাই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
শীতকালীন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সহজ চেকলিস্ট
| কাজ | কতবার/কীভাবে | উপকার |
|---|---|---|
| হোম BP মাপা | প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা | পরিবর্তন আগে ধরা পড়ে |
| ঘর গরম রাখা | হিটার/গরম কাপড় | ৫-১০ mm Hg কমায় |
| লবণ কমানো | দিনে <৫ গ্রাম | সোডিয়াম রিটেনশন কমে |
| হাঁটা/ব্যায়াম | ৩০ মিনিট, ইনডোর | ওজন ও প্রেশার দুটোই নিয়ন্ত্রণে |
| ডাক্তারি চেকআপ | শীতের শুরুতে | ওষুধ অ্যাডজাস্ট করা যায় |
শীতকালে রক্তচাপ বাড়া একটি স্বীকৃত চিকিৎসা সত্য, যা আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন, মেয়ো ক্লিনিক ও ইউরোপিয়ান সোসাইটি অফ হাইপারটেনশনের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বারবার নিশ্চিত করেছে। গড়ে ৫-১০ mm Hg বৃদ্ধি হলেও বয়স্ক, ধূমপায়ী ও পূর্ব-রোগীদের ক্ষেত্রে এটি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে সচেতনতা, নিয়মিত মনিটরিং এবং সামান্য জীবনযাত্রার পরিবর্তন দিয়ে এই ঝুঁকি পুরোরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শীত এলেই প্রেশার মাপা শুরু করুন, ঘর গরম রাখুন এবং চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন – এই সহজ পদক্ষেপগুলো আপনার জীবন বাঁচাতে পারে। সুস্থ থাকুন, শীত উপভোগ করুন!











