স্বপ্নদোষ বা ‘ওয়েট ড্রিমস’ (Wet Dreams) না হওয়া নিয়ে আপনি কি চিন্তিত? আপনার মনে কি এই ভয় কাজ করছে যে, এটি আপনার বাবা হওয়ার ক্ষমতাকে বা পুরুষত্বকে প্রভাবিত করতে পারে? প্রথমেই আপনাকে আশ্বস্ত করছি, স্বপ্নদোষ না হওয়ার সাথে বাবা হতে না পারার সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রচলিত ভুল ধারণা। আপনার প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি নির্ভর করে আপনার শুক্রাণুর গুণমান, সংখ্যা এবং তার গতিশীলতার উপর, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। স্বপ্নদোষ হলো একটি স্বাভাবিক শারীরিক ঘটনা, যা কারো হতে পারে, আবার কারো নাও হতে পারে; এটি কোনোভাবেই আপনার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার মাপকাঠি নয়।
এই আর্টিকেলটিতে আমরা এই প্রচলিত ভুল ধারণাটির পেছনের বিজ্ঞানকে বিশ্লেষণ করব। আমরা জানব স্বপ্নদোষ আসলে কী, কেন এটি হয়, এবং কেন এটি না হওয়াটা কোনো উদ্বেগের বিষয় নয়। একই সাথে, আমরা পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটির আসল নির্ধারকগুলি কী কী, শুক্রাণুর স্বাস্থ্য কীভাবে ভালো রাখা যায়, এবং কখন সত্যিই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই তথ্যের মাধ্যমে আপনি আপনার শরীর সম্পর্কে সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন, যা আপনাকে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবে।
যৌনজীবনে লবঙ্গের জাদু: সহবাসের আগে লবঙ্গ খেলে কি উপকার পাওয়া যায়?
স্বপ্নদোষ (Nocturnal Emission): এটি আসলে কী?
স্বপ্নদোষ, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নকটার্নাল এমিসন’ (Nocturnal Emission) বলা হয়, হলো ঘুমের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে বীর্যস্খলন। এটি সাধারণত কৈশোরে বা যৌবনের শুরুতে বেশি দেখা যায়, যখন শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে।
স্বপ্নদোষের পেছনের বিজ্ঞান
আমাদের শরীর ক্রমাগত শুক্রাণু বা স্পার্ম (Sperm) তৈরি করে। এই শুক্রাণুগুলি এপিডিডাইমিসে (Epididymis) জমা থাকে। যখন শরীর মনে করে যে সঞ্চিত শুক্রাণুর পরিমাণ বেশি হয়ে গেছে বা পুরনো শুক্রাণুগুলিকে প্রতিস্থাপন করা দরকার, তখন এটি শরীর থেকে তা বের করে দেয়। ঘুমের মধ্যে, বিশেষ করে যখন মানুষ যৌন উত্তেজক স্বপ্ন দেখে (যদিও স্বপ্ন মনে নাও থাকতে পারে), তখন এই প্রক্রিয়াটি ঘটতে পারে।
স্বপ্নদোষকে শরীরের একটি স্বাভাবিক ‘রিলিজ মেকানিজম’ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। এটি শরীরকে সুস্থ এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করে।
কেন স্বপ্নদোষের হার একেকজনের একেকরকম?
স্বপ্নদোষ হওয়া বা না হওয়া বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমন:
- বয়স: সাধারণত টিনএজারদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায় এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর হার কমতে থাকে।
- যৌন কার্যকলাপ: যারা নিয়মিত হস্তমৈথুন (Masturbation) বা যৌন মিলনের মাধ্যমে বীর্যস্খলন করেন, তাদের স্বপ্নদোষ কম হতে পারে, কারণ তাদের শরীরে বীর্য জমার সুযোগ কম পায়।
- হরমোনের মাত্রা: টেস্টোস্টেরনের মাত্রার তারতম্য এর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
- মানসিক অবস্থা: আপনি কী নিয়ে ভাবছেন বা আপনার ঘুমের ধরণও একে প্রভাবিত করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক (Cleveland Clinic) এর মতো প্রখ্যাত স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি স্পষ্ট করে যে, স্বপ্নদোষ হওয়া বা না হওয়া—উভয়ই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এর সাথে শারীরিক দুর্বলতা বা অসুস্থতার কোনো যোগ নেই।
স্বপ্নদোষ না হওয়া কি অস্বাভাবিক?
একেবারেই না। একজন পুরুষের যদি কখনো স্বপ্নদোষ না-ও হয়, তবুও তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং প্রজননক্ষম হতে পারেন। অনেক পুরুষই আছেন যাদের সারাজীবনে কখনো স্বপ্নদোষ হয় না, অথবা হলেও তা এতই কম যে তারা তা খেয়াল করেন না। এটি কোনোভাবেই নির্দেশ করে না যে তাদের শরীরে শুক্রাণু তৈরি হচ্ছে না বা তাদের কোনো যৌন সমস্যা রয়েছে।
বাবা হওয়ার আসল চাবিকাঠি: শুক্রাণুর স্বাস্থ্য
স্বপ্নদোষের মিথ থেকে বেরিয়ে এসে এবার আমাদের নজর দেওয়া উচিত সেই বিষয়টির উপর যা সত্যিই আপনার বাবা হওয়ার ক্ষমতা নির্ধারণ করে—সেটি হলো আপনার ফার্টিলিটি (Fertility) বা প্রজনন ক্ষমতা। পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তাদের বীর্যে (Semen) থাকা শুক্রাণুর (Sperm) স্বাস্থ্যের উপর।
একজন পুরুষকে প্রজননক্ষম বা ‘ফারটাইল’ (Fertile) হিসেবে গণ্য করা হয় যখন তার বীর্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক সুস্থ, সবল এবং গতিশীল শুক্রাণু থাকে, যা সফলভাবে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে পারে।
সিমেন অ্যানালিসিস (Semen Analysis): ফার্টিলিটি পরীক্ষার গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড
আপনার প্রজনন ক্ষমতা কেমন তা বোঝার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হলো সিমেন অ্যানালিসিস (Semen Analysis) বা বীর্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে আপনার বীর্যের নমুনাকে বিভিন্ন মাপকাঠিতে বিচার করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, একটি সুস্থ বীর্যের নমুনায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলি দেখা হয়:
| প্যারামিটার (Parameter) | সুস্থ মাত্রা (WHO 6th Edition, 2021) | এর অর্থ কী? |
| বীর্যের পরিমাণ (Volume) | ১.৪ মিলিলিটার বা তার বেশি | প্রতিবার বীর্যস্খলনে মোট বীর্যের পরিমাণ। |
| শুক্রাণুর ঘনত্ব (Concentration) | প্রতি মিলিলিটারে ১৬ মিলিয়ন বা তার বেশি | প্রতি মিলি বীর্যে কতগুলি শুক্রাণু আছে। |
| মোট শুক্রাণুর সংখ্যা (Total Count) | প্রতি বীর্যস্খলনে ৩৯ মিলিয়ন বা তার বেশি | মোট শুক্রাণুর সংখ্যা। |
| গতিশীলতা (Motility) | ৪০% বা তার বেশি (প্রোগ্রেসিভ + নন-প্রোগ্রেসিভ) | মোট শুক্রাণুর কত শতাংশ নড়াচড়া করতে পারে। |
| প্রোগ্রেসিভ গতিশীলতা (Progressive Motility) | ৩২% বা তার বেশি | কত শতাংশ শুক্রাণু সক্রিয়ভাবে সামনের দিকে এগোতে পারে। |
| মরফোলজি (Morphology) | ৪% বা তার বেশি (সঠিক আকার ও আকৃতি) | কত শতাংশ শুক্রাণুর গঠন স্বাভাবিক (মাথা, ঘাড়, লেজ ঠিক আছে)। |
আপনি যদি এই টেবিলটি দেখেন, তাহলে স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে এখানে স্বপ্নদোষের কোনো উল্লেখ নেই। আপনার স্বপ্নদোষ হোক বা না হোক, যদি আপনার সিমেন অ্যানালিসিস রিপোর্ট এই প্যারামিটারগুলির কাছাকাছি থাকে, তবে আপনার বাবা হতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের (Male Infertility) আসল কারণগুলি
যখন কোনো দম্পতি এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে কোনো সুরক্ষা ছাড়াই নিয়মিত যৌন মিলনের পরেও গর্ভধারণে ব্যর্থ হন, তখন তাকে বন্ধ্যাত্ব বা ‘ইনফার্টিলিটি’ (Infertility) বলা হয়। এর পেছনে নারী বা পুরুষ উভয়েরই কারণ থাকতে পারে।
আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন (ASRM) এর মতে, প্রায় ৪০-৫০% বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে পুরুষের দিকে সমস্যা বা ‘মেল ফ্যাক্টর’ (Male Factor) জড়িত থাকে। এই কারণগুলি স্বপ্নদোষের সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং সেগুলি হলো:
১. শুক্রাণু উৎপাদন সংক্রান্ত সমস্যা (Production Problems)
এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
- অলিগোস্পার্মিয়া (Oligospermia): শুক্রাণুর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়া।
- অ্যাজোস্পার্মিয়া (Azoospermia): বীর্যে কোনো শুক্রাণু না থাকা।
- ভ্যারিকোসেল (Varicocele): অণ্ডকোষের (Testicles) শিরার স্ফীতি, যা অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং শুক্রাণুর উৎপাদন ব্যাহত করে। এটি পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ।
২. শুক্রাণু পরিবহন সংক্রান্ত সমস্যা (Blockage/Delivery Problems)
শুক্রাণু তৈরি হলেও তা বীর্যের সাথে মিশে শরীর থেকে বের হতে না পারা। এটি হতে পারে কোনো ইনফেকশন, পুরনো সার্জারি বা জেনেটিক কারণে।
৩. হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা (Hormonal Imbalances)
টেস্টোস্টেরন, এলএইচ (LH) বা এফএসএইচ (FSH) হরমোনের মাত্রায় গণ্ডগোল হলে তা শুক্রাণু উৎপাদনকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
৪. জেনেটিক কারণ (Genetic Factors)
কিছু জেনেটিক সিনড্রোম (যেমন ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম) পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে।
৫. জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত কারণ (Lifestyle & Environmental Factors)
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক, যা আমরা পরবর্তী বিভাগে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কীভাবে আপনার শুক্রাণুর স্বাস্থ্য এবং ফার্টিলিটি উন্নত করবেন?
খুশির খবর হলো, অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনে শুক্রাণুর স্বাস্থ্য এবং গুণমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। আপনার স্বপ্নদোষ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, এই বৈজ্ঞানিক উপায়গুলির দিকে মনোযোগ দিন:
১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (Healthy Diet)
আপনি যা খান তা সরাসরি আপনার শুক্রাণুর স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার: ফল (বেরি, কমলা), শাকসবজি (পালং শাক, ব্রকলি) শুক্রাণুকে ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ (কোষের ক্ষতি) থেকে রক্ষা করে।
- জিঙ্ক (Zinc): শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। সামুদ্রিক মাছ, মাংস, বাদাম এবং বীজ-এ জিঙ্ক পাওয়া যায়।
- ফোলেট (Folate): স্বাস্থ্যকর শুক্রাণু তৈরিতে জরুরি। গাঢ় সবুজ শাক, বিনস এবং লেবু জাতীয় ফলে পাওয়া যায়।
- ভিটামিন সি এবং ই: এই ভিটামিনগুলিও শুক্রাণুর ডিএনএ (DNA) সুরক্ষিত রাখে।
২. ধূমপান এবং তামাক বর্জন (Quit Smoking)
ধূমপান পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান শত্রু। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (NIH) এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান শুক্রাণুর ঘনত্ব (count) কমিয়ে দেয়, গতিশীলতা (motility) নষ্ট করে এবং শুক্রাণুর ডিএনএ-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৩. অ্যালকোহল সেবন সীমিত করুন (Limit Alcohol)
অতিরিক্ত মদ্যপান টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে এবং শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। আপনার যদি বাবা হওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তবে মদ্যপান ছেড়ে দেওয়া বা একেবারে কমিয়ে আনা উচিত।
৪. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন (Maintain Healthy Weight)
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা (Obesity) হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং শুক্রাণুর গুণমান কমিয়ে দেয়। একইভাবে, খুব কম ওজনও ক্ষতিকর হতে পারে।
৫. নিয়মিত ব্যায়াম (Regular Exercise)
হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম, যেমন হাঁটা, দৌড়ানো বা সাঁতার কাটা, শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বাড়ায় এবং শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখে। তবে, অতিরিক্ত বা খুব কঠোর ব্যায়াম (যেমন অতিরিক্ত সাইক্লিং বা স্টেরয়েড ব্যবহার) হিতে বিপরীত হতে পারে।
৬. অণ্ডকোষের তাপমাত্রা ঠিক রাখুন (Avoid Overheating)
শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন।
- গরম পানিতে গোসল (Hot baths/saunas) এড়িয়ে চলুন।
- দীর্ঘ সময় ধরে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।
- খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস (Tight underwear) না পরে ঢিলেঢালা অন্তর্বাস পরুন।
৭. মানসিক চাপ কমান (Manage Stress)
অতিরিক্ত মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে এবং যৌন মিলনের ইচ্ছাও (Libido) কমিয়ে দেয়। ধ্যান (Meditation), যোগব্যায়াম (Yoga) বা আপনার শখের কাজে সময় দিয়ে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন।
প্রচলিত ভুল ধারণা বনাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
স্বপ্নদোষ এবং পুরুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা অহেতুক ভীতি এবং লজ্জার কারণ হয়। আসুন সেগুলিকে বিজ্ঞানের আলোয় দেখি।
মিথ ১: ঘন ঘন স্বপ্নদোষ মানে শারীরিক দুর্বলতা বা “ধাতু ক্ষয়”।
বাস্তবতা: এটি সম্পূর্ণ ভুল। স্বপ্নদোষ একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে শরীর পুরনো শুক্রাণু বের করে দেয়। এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং একটি সুস্থ প্রজনন ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে।
মিথ ২: স্বপ্নদোষ না হওয়া মানে পুরুষত্বহীনতা বা যৌন অক্ষমতা।
বাস্তবতা: যেমনটি আগেই বলা হয়েছে, স্বপ্নদোষ না হওয়াটাও স্বাভাবিক। এর সাথে যৌন ক্ষমতা বা ইরেকটাইল ডিসফাংশন (Erectile Dysfunction) এর কোনো সম্পর্ক নেই।
মিথ ৩: বীর্য “সংরক্ষণ” করলে তা শক্তি বাড়ায় বা স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
বাস্তবতা: শরীর একটি নির্দিষ্ট চক্রে ক্রমাগত নতুন শুক্রাণু তৈরি করতে থাকে। বীর্যস্খলন না করলে শুক্রাণুগুলো একটা সময় মরে যায় এবং শরীর সেগুলোকে শোষণ করে নেয় (Reabsorbed)। বীর্য ধরে রাখার সাথে শারীরিক শক্তি বাড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
কখন আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলা উচিত?
স্বপ্নদোষ না হওয়ার জন্য আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে, নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দিলে একজন বিশেষজ্ঞের (Andrologist বা Urologist) পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:
- আপনি এবং আপনার সঙ্গী যদি এক বছর (বা আপনার সঙ্গীর বয়স ৩৫-এর বেশি হলে ছয় মাস) ধরে চেষ্টা করার পরেও গর্ভধারণে ব্যর্থ হন।
- যদি আপনার বীর্যস্খলনে সমস্যা হয় (যেমন, খুব তাড়াতাড়ি বা খুব দেরিতে হওয়া)।
- যদি আপনি ইরেকশন (Erection) ধরে রাখতে বা পেতে সমস্যা অনুভব করেন।
- যদি আপনি অণ্ডকোষে (Testicles) কোনো ব্যথা, ফোলাভাব বা পিণ্ড (Lump) অনুভব করেন।
- যদি আপনার যৌন মিলনের ইচ্ছা (Libido) খুব কমে যায়।
- যদি আপনার অতীতে কোনো যৌনবাহিত রোগ (STD) বা প্রজনন অঙ্গে কোনো সার্জারি হয়ে থাকে।
একজন ডাক্তার আপনার সঠিক ইতিহাস শুনে, কিছু শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে সিমেন অ্যানালিসিস ও হরমোন টেস্টের মাধ্যমে আপনার সমস্যার মূল কারণটি খুঁজে বের করতে পারবেন।
আধুনিক চিকিৎসা এবং সমাধান
যদি সিমেন অ্যানালিসিস বা অন্যান্য পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়ে (যা স্বপ্নদোষের সাথে সম্পর্কিত নয়), আধুনিক বিজ্ঞানে তার অনেক কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে।
১. জীবনযাত্রার পরিবর্তন
অনেক সময় ডাক্তার শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তনের (যা উপরে আলোচনা করা হয়েছে) পরামর্শ দিয়েই শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারেন।
২. ঔষধ
হরমোনের সমস্যা থাকলে তা ঔষধের মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। কখনো কখনো ইনফেকশনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
৩. সার্জারি (Surgery)
যদি ভ্যারিকোসেল (Varicocele) বা শুক্রাণু পরিবহনের পথে কোনো ব্লকেজ থাকে, তবে তা সার্জারির মাধ্যমে ঠিক করা যেতে পারে। মায়ো ক্লিনিক (Mayo Clinic) এর তথ্যমতে, ভ্যারিকোসেল সার্জারি অনেক পুরুষের ফার্টিলিটি উন্নত করতে সফল হয়েছে।
৪. অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি (ART)
যদি উপরের পদ্ধতিগুলি কাজ না করে বা শুক্রাণুর মান খুব দুর্বল হয়, তবে ART-এর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে:
- IUI (Intrauterine Insemination): প্রক্রিয়াজাত শুক্রাণুকে সরাসরি মহিলার জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।
- IVF (In Vitro Fertilization): শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুকে ল্যাবে নিষিক্ত করে তৈরি হওয়া ভ্রূণকে (Embryo) জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
- ICSI (Intracytoplasmic Sperm Injection): এটি IVF-এর একটি উন্নত রূপ, যেখানে একটি মাত্র সুস্থ শুক্রাণুকে বেছে নিয়ে সরাসরি ডিম্বাণুর মধ্যে ইনজেক্ট করা হয়। এটি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতিশীলতা খুব কম হলেও কার্যকরী হতে পারে।
দুশ্চিন্তা ছেড়ে সঠিক তথ্যে বিশ্বাস রাখুন
আশা করি এই বিস্তারিত আলোচনার পর এটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে, স্বপ্নদোষ না হওয়ার সাথে বাবা হতে পারার কোনো সম্পর্ক নেই।
স্বপ্নদোষ একটি পরিবর্তনশীল এবং ঐচ্ছিক শারীরিক ঘটনা, যা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে, আপনার প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া, যা আপনার শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল।
অপ্রয়োজনীয় মিথ বা ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে দুশ্চিন্তা করা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে আপনার প্রজনন স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আপনার শরীরকে বিশ্বাস করুন এবং কোনো কাল্পনিক সমস্যার পরিবর্তে আপনার বাস্তব স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দিন। স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখুন, সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন এবং ধূমপান-মদ্যপানের মতো ক্ষতিকারক অভ্যাস ত্যাগ করুন।
যদি আপনার ফার্টিলিটি নিয়ে কোনো বাস্তব উদ্বেগ থাকে বা আপনি সন্তান ধারণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তবে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে সরাসরি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সঠিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাই আপনাকে আসল চিত্রটি দেখাতে পারে এবং প্রয়োজনে সঠিক সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারে ।











