রঙের উৎসব দোলযাত্রা বা দোল পূর্ণিমা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এবং আনন্দোদ্দীপক উৎসব। ২০২৬ সালের দোল পূর্ণিমা পালিত হবে ৩রা মার্চ, মঙ্গলবার। দৃক পঞ্চাঙ্গ (Drik Panchang) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য পঞ্জিকার রিয়েল-টাইম ডেটা অনুসারে, ২০২৬ সালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে ২রা মার্চ, সোমবার বিকেল ০৫:৫৫ মিনিটে এবং শেষ হবে ৩রা মার্চ, মঙ্গলবার বিকেল ০৫:০৭ মিনিটে। যেহেতু হিন্দু ধর্মে উদয় তিথিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাই ৩রা মার্চ মঙ্গলবারেই সমগ্র ভারতে এবং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে দোল উৎসব ও শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা মহাসমারোহে পালিত হবে। তবে এবারের দোল পূর্ণিমার একটি বিশেষত্ব হলো, এই দিনটিতে একটি পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণও (Lunar Eclipse) সংঘটিত হতে চলেছে, যা জ্যোতিষশাস্ত্রের দিক থেকে দিনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
দোল পূর্ণিমা ২০২৬-এর সঠিক তারিখ ও পঞ্জিকা অনুযায়ী সময়সূচি
দোল উৎসবের দিনক্ষণ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথির উপর। আপনি যদি বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজো বা রাধা-কৃষ্ণের বিশেষ আরাধনা করার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে সঠিক সময়সূচি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
পূর্ণিমা তিথির বিস্তারিত সময়সারণী
নিচে ছকের মাধ্যমে পূর্ণিমা তিথি শুরু ও শেষের সঠিক সময় উল্লেখ করা হলো (ভারতীয় প্রমাণ সময় অনুযায়ী):
| বিবরণ | তারিখ | সময় |
| দোল পূর্ণিমা উৎসবের মূল দিন | ৩ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার | সারাদিনব্যাপী |
| পূর্ণিমা তিথি শুরু | ২ মার্চ ২০২৬, সোমবার | বিকেল ০৫:৫৫ মিনিট |
| পূর্ণিমা তিথি শেষ | ৩ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার | বিকেল ০৫:০৭ মিনিট |
| হোলিকা দহন বা ন্যাড়াপোড়া | ২ মার্চ ২০২৬, সোমবার | সন্ধ্যা ০৬:২১ মিনিটের পর |
| মূল হোলি (অন্যান্য রাজ্যে) | ৪ মার্চ ২০২৬, বুধবার | সারাদিনব্যাপী |
দ্রষ্টব্য: স্থানীয় সময় এবং বিভিন্ন পঞ্জিকা (যেমন গুপ্তপ্রেস বা বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত) অনুযায়ী কয়েক মিনিটের সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, তবে মূল তিথি উপরিউক্ত সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
দোল পূর্ণিমা ও হোলির মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকেই দোল পূর্ণিমা এবং হোলিকে একই উৎসব বলে মনে করেন, কিন্তু এই দুটির উদযাপন পদ্ধতি এবং পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনটিকে মূলত ‘দোলযাত্রা’ হিসেবে পালন করা হয়। এই দিনটি শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানির প্রেমলীলার স্মরণে নিবেদিত। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। তাই দোলের দিন সকালে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে আবির দিয়ে স্নান করানো হয় এবং দোলায় চড়িয়ে কীর্তন করা হয়।
অন্যদিকে, উত্তর ও মধ্য ভারতে এই উৎসবটি ‘হোলি’ নামে অধিক পরিচিত। এটি মূলত ভক্ত প্রহ্লাদ ও রাক্ষসী হোলিকার কাহিনীর সাথে যুক্ত। হোলির আগের দিন রাতে ‘হোলিকা দহন’ করা হয়, যা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। ২০২৬ সালে হোলিকা দহন হবে ২রা মার্চ এবং মূল রং খেলার উৎসব ‘হোলি’ পালিত হবে ৪ঠা মার্চ।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি এবং গৌর পূর্ণিমার তাৎপর্য
বাংলার বুকে দোল পূর্ণিমার আরেকটি বিশাল ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। এই পবিত্র পূর্ণিমা তিথিতেই ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তিনি ছিলেন ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী।
এই কারণে ইসকন (ISKCON) সহ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই দিনটিকে ‘গৌর পূর্ণিমা’ হিসেবে অত্যন্ত ভক্তিভরে পালন করেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বর লাভের পথ দেখিয়েছিলেন। মায়াপুর ও নবদ্বীপে এই সময় মাসব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী সমবেত হন।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট: দোল যাত্রা এবং হোলির পিছনের প্রাচীন কাহিনী
দোল পূর্ণিমা এবং হোলির মধ্যে অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এই দুই উৎসবের ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, যা ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির অমর প্রেমের কাহিনী
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনটিকে মূলত ‘দোলযাত্রা’ হিসেবে পালন করা হয়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ প্রথম আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। কৃষ্ণের গায়ের রং ছিল ঘন নীল, তাই তিনি রাধার ফর্সা মুখে রং মাখিয়ে দিয়েছিলেন প্রেমের প্রতীক হিসেবে। এই থেকেই দোল উৎসবের সূচনা। দোলের দিন সকালে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে সুসজ্জিত দোলায় চড়িয়ে কীর্তন করা হয়, যেখান থেকে ‘দোলযাত্রা’ নামের উৎপত্তি।
ভক্ত প্রহ্লাদ ও হোলিকা দহন
উত্তর ও মধ্য ভারতে এই উৎসবটি ‘হোলি’ নামে অধিক পরিচিত এবং এটি অসুররাজ হিরণ্যকশিপু ও তাঁর পুত্র ভক্ত প্রহ্লাদের কাহিনীর সাথে যুক্ত। হিরণ্যকশিপু ঈশ্বরকে মানতেন না, কিন্তু তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য হিরণ্যকশিপু তাঁর বোন হোলিকার সাহায্য নেন। হোলিকা বর পেয়েছিলেন যে আগুনে তিনি পুড়বেন না। প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে হোলিকা আগুনে প্রবেশ করলেও, বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ বেঁচে যান এবং হোলিকা ভস্মীভূত হন। এই অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই দোলের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ বা ন্যাড়াপোড়া করা হয়।
কামদেব ও মহাদেবের কাহিনী
দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলে হোলি উৎসবটি প্রেমের দেবতা কামদেবের আত্মত্যাগের স্মরণে পালিত হয়। পার্বতীর প্রতি মহাদেবের প্রেম জাগানোর জন্য কামদেব শিবের তপস্যা ভঙ্গ করেছিলেন। ক্রুদ্ধ মহাদেব তাঁর তৃতীয় নয়ন খুলে কামদেবকে ভস্ম করে দেন। পরে কামদেবের স্ত্রী রতির প্রার্থনায় শিব শান্ত হন। এই ঘটনাটিকেও রঙের উৎসবের একটি কারণ হিসেবে মানা হয়।
দোল পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণের বিশেষ প্রভাব ২০২৬
জ্যোতিষশাস্ত্র এবং হিন্দু ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩রা মার্চ দোল পূর্ণিমার দিনে একটি পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হতে চলেছে। এটি একটি অত্যন্ত বিরল মহাজাগতিক ঘটনা যা এই দিনটির আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
চন্দ্রগ্রহণের সময় সাধারণত কিছু বিশেষ নিয়মকানুন ও সূতক কাল মেনে চলতে হয়।
-
পূজা সম্পন্ন করার সময়: যেহেতু ৩রা মার্চ বিকেল ৫:০৭ মিনিটে পূর্ণিমা তিথি শেষ হচ্ছে এবং চন্দ্রগ্রহণ রয়েছে, তাই পণ্ডিতদের মতে, সকালের দিকেই বা দুপুরের মধ্যে রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা ও দোলায় আবির দেওয়ার মূল পর্বটি সেরে নেওয়া শ্রেয়।
-
সত্যনারায়ণ পুজো: অনেকেই এই দিন বাড়িতে সত্যনারায়ণ ব্রত পালন করেন। চন্দ্রগ্রহণের প্রভাবে সূতক কাল শুরুর আগেই শুভ মুহূর্তে পূজার নৈবেদ্য নিবেদন করা সবচেয়ে মঙ্গলজনক।
-
জ্যোতিষিক প্রভাব: জ্যোতিষীদের মতে, এই গ্রহণে সূর্য, চন্দ্র, বুধ এবং অন্যান্য গ্রহের একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি হবে। এর ফলে মেষ, মিথুন এবং সিংহ রাশির জাতক-জাতিকাদের জন্য বিশেষ আর্থিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে কিছু রাশিকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
দোল উৎসব পালনের সঠিক নিয়ম ও পূজা বিধি
ঐতিহ্য ও রীতিনীতি মেনে দোল উদযাপন করলে পরিবারে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে। অ্যাস্ট্রোশিওর (AstroSure) এর বৈদিক নির্দেশিকা অনুযায়ী দোল পালনের সঠিক বিধি নিচে দেওয়া হলো:
১. দোলা বা দোলনা প্রস্তুতকরণ: সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন। এরপর একটি ছোট কাঠের দোলনা বা সিংহাসন গাঁদা ফুল ও অন্যান্য তাজা ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে নিন।
২. বিগ্রহ স্নান ও শৃঙ্গার: শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির বিগ্রহকে পঞ্চামৃত (দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি) দিয়ে আলতো করে স্নান করান। এরপর তাঁদের নতুন হলুদ বা জাফরান রঙের রেশমি বস্ত্র পরিয়ে দিন।
৩. প্রথম আবির নিবেদন: পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে রং খেলার আগে, প্রথম এক চিমটে গোলাপি বা হলুদ সুগন্ধি আবির রাধা-কৃষ্ণের চরণকমলে নিবেদন করুন। এটি ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির প্রতীক।
৪. দোলনা দোলানো: ভক্তিভরে হরিনাম বা কৃষ্ণ মন্ত্র জপ করতে করতে দোলনাটি মৃদুভাবে দোলান। এই প্রক্রিয়াটিই হলো দোলযাত্রার প্রধান আকর্ষণ।
৫. ভোগ নিবেদন: পুজোর ভোগ হিসেবে মালপোয়া, জাফরান দেওয়া সন্দেশ, ফুঁটকড়াই (গুড় ও খৈ-এর মিশ্রণ) এবং মিষ্টান্ন নিবেদন করুন।
৬. আরতি ও প্রসাদ বিতরণ: সবশেষে কর্পূর ও ধূপ দিয়ে আরতি করুন এবং পরিবারের সকলের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করুন। এই দিনটিতে নিরামিষ আহার গ্রহণ করা সবচেয়ে ভালো।
বাস্তু টিপস এবং শুভ রং: দোল পূর্ণিমায় কীভাবে সৌভাগ্য ফেরাবেন?
বাস্তুশাস্ত্র অনুসারে, রঙের উৎসব দোল শুধুমাত্র আনন্দ করার দিন নয়, বরং এটি বাড়ি থেকে নেতিবাচক শক্তি দূর করার একটি দারুণ সুযোগ। এশিয়ানেট নিউজ বাংলার বাস্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
-
প্রবেশদ্বার পরিষ্কার রাখা: দোলের দিন সকালে বাড়ির মূল প্রবেশদ্বার ভালো করে জল দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং সেখানে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকুন। এতে বাড়িতে ইতিবাচক শক্তির প্রবেশ ঘটে।
-
সঠিক রঙের ব্যবহার: রাসায়নিক রং এড়িয়ে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ভেষজ আবির ব্যবহার করুন। গোলাপি, হলুদ এবং সবুজ রং বাস্তুমতে অত্যন্ত শুভ। লাল রং শক্তির প্রতীক হলেও, অতিরিক্ত ব্যবহার এড়িয়ে চলা ভালো।
-
ঈশান কোণে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন: বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণে (ঈশান কোণ) একটি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালান। এটি আপনার গৃহে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ বয়ে আনবে এবং অর্থনৈতিক জটিলতা দূর করবে।
-
দানের গুরুত্ব: দোলের দিন গরিব ও অসহায় মানুষদের কিছু মিষ্টি বা বস্ত্র দান করুন। এই নিঃস্বার্থ কাজ আপনার জীবনের অনেক বাধা-বিঘ্ন কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে।
পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্যে দোলের ছুটি ও পরিসংখ্যান
২০২৬ সালে দোলের সরকারি ছুটি নিয়ে অনেকেই আগে থেকে পরিকল্পনা করে থাকেন। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ৩রা মার্চ মঙ্গলবার দোলযাত্রা উপলক্ষে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে সরকারি ছুটি থাকবে। সমস্ত স্কুল, কলেজ এবং অধিকাংশ সরকারি অফিস এই দিন বন্ধ থাকবে। ওড়িশাতেও এই দিনটি ‘দোলা পুণ্যিমা’ হিসেবে পালিত হয় এবং সেখানেও সরকারি ছুটি থাকে।
শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে দোলযাত্রাকে ‘বসন্ত উৎসব’ হিসেবে প্রবর্তন করেছিলেন। এখানে রঙের পাশাপাশি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে। হলুদ শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরিহিত ছাত্র-ছাত্রীরা প্রভাতফেরিতে অংশ নেয়, রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় এবং আবির খেলে। এটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
মথুরা, বৃন্দাবন এবং বরসানার হোলি
উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবনে হোলির উদযাপন প্রায় ৪০ দিন ধরে চলে। বরসানার ‘লাঠমার হোলি’ বিশ্ববিখ্যাত, যেখানে মহিলারা পুরুষদের মজা করে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন এবং পুরুষরা ঢাল দিয়ে আত্মরক্ষা করেন। এছাড়াও এখানকার ফুলওয়ালি হোলি বা ফুলের হোলি দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমান।
পুরুলিয়ার বসন্ত উৎসব এবং ছৌ নাচ
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে দোল উৎসব এক ভিন্ন মাত্রা পায়। লাল পলাশ ফুলে ঘেরা পরিবেশে স্থানীয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নাচ এবং বিখ্যাত ‘ছৌ নাচ’-এর মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নেওয়া হয়।
পাঞ্জাবের হোলা মহল্লা
পাঞ্জাবের আনন্দপুর সাহিবে শিখ সম্প্রদায় এই উৎসবটিকে ‘হোলা মহল্লা’ হিসেবে পালন করেন। এখানে রঙের পরিবর্তে শিখ যোদ্ধাদের সামরিক দক্ষতা, মার্শাল আর্ট এবং তরবারি চালনার কসরত প্রদর্শন করা হয়।
দোল উৎসবের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও মিষ্টি
যেকোনো ভারতীয় উৎসবই সুস্বাদু খাবার ছাড়া অসম্পূর্ণ। দোল বা হোলি উপলক্ষে ভারতের ঘরে ঘরে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পদ তৈরি করা হয়:
-
মালপোয়া এবং সন্দেশ: পশ্চিমবঙ্গে দোলের দিন বাড়িতে মালপোয়া, ক্ষীরের সন্দেশ এবং ফুঁটকড়াই (গুড় ও খৈ-এর মিশ্রণ) তৈরি করা অত্যন্ত সাধারণ একটি রেওয়াজ।
-
গুজিয়া (Gujiya): উত্তর ভারতে হোলির প্রধান মিষ্টি হলো গুজিয়া। এটি ময়দার তৈরি একটি মুচমুচে মিষ্টি, যার ভেতরে ক্ষোয়া, ড্রাই ফ্রুটস এবং চিনির পুর দেওয়া থাকে।
-
ঠান্ডাই (Thandai): দুধ, বাদাম, মৌরি, গোলাপ জল এবং বিভিন্ন মশলার মিশ্রণে তৈরি এই ঠান্ডা পানীয়টি হোলির ক্লান্তি দূর করতে দারুণ কার্যকর।
-
দহি ভল্লা: বিউলির ডালের তৈরি নরম বড়া, যা মিষ্টি দই এবং চাটনির সাথে পরিবেশন করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, দোল পূর্ণিমা ২০২৬ আমাদের জীবনে নতুন আশা, আনন্দ এবং সৌহার্দ্যের বার্তা নিয়ে উপস্থিত হবে। ৩রা মার্চের এই পবিত্র তিথিতে একদিকে যেমন ভক্তিভরে রাধা-গোবিন্দের আরাধনা করা হবে, অন্যদিকে তেমনই আবিরের রঙে মুছে যাবে সমাজের সমস্ত ভেদাভেদ। চন্দ্রগ্রহণের মতো বিশেষ গ্রহসন্নিবেশ থাকায় এই দিনটিতে নিয়ম ও নিষ্ঠা মেনে পূজা করলে আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি জাগতিক সমৃদ্ধিও লাভ করা সম্ভব। রঙের এই পবিত্র উৎসব আপনার এবং আপনার পরিবারের জীবনে অনাবিল সুখ, সুস্বাস্থ্য এবং অবিরাম শান্তি বয়ে আনুক। আসুন, সমস্ত নেতিবাচকতাকে দূরে সরিয়ে আমরা প্রত্যেকেই ভালোবাসার রঙে নিজেদের রাঙিয়ে তুলি।











