সাঁতার একটি চমৎকার ব্যায়াম, কিন্তু এরপরেই কি আপনার ত্বক টানটান, শুষ্ক এবং খসখস লাগছে? আপনি একা নন। এই সাধারণ সমস্যাটির একটি নির্দিষ্ট নাম আছে: “সুইমার্স জেরোসিস” (Swimmer’s Xerosis) বা সাঁতারুর শুষ্ক ত্বক। এর প্রধান কারণ হলো সুইমিং পুলের জলে থাকা ক্লোরিন এবং এমনকি সমুদ্রের নোনা জল, যা ত্বকের প্রাকৃতিক তেলের স্তর বা ‘সেবাম’ (sebum) নষ্ট করে দেয়। এই সেবাম আমাদের ত্বককে আর্দ্র রাখে এবং বাইরের জীবাণু থেকে রক্ষা করে। যখন এই রক্ষাকবচ (skin barrier) দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই ত্বকের রুক্ষতা, চুলকানি এবং অস্বস্তি শুরু হয়। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা সমীক্ষায় (ResearchGate) দেখা গেছে যে, তরুণ সাঁতারুদের মধ্যে ৭৮.৬% এরও বেশি প্রতিযোগী গত এক বছরে ত্বকের কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগেছেন, যার মধ্যে চুলকানি (৮৫%) এবং র্যাশ (৫০%) সবচেয়ে সাধারণ। এই নিবন্ধে, আমরা বৈজ্ঞানিক কারণ, পরিসংখ্যান এবং আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি (AAD) -এর মতো বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সমস্যাটির গভীরতা বিশ্লেষণ করব এবং এর থেকে মুক্তির একটি সম্পূর্ণ রুটিন ধাপে ধাপে আলোচনা করব।
সাঁতারুজের জেরোসিস (Swimmer’s Xerosis): এটি আসলে কী?
আমরা যখন “সাঁতারের পর শুষ্ক ত্বক” বলি, তখন আমরা প্রায়শই একটি চিকিৎসাগতভাবে স্বীকৃত অবস্থাকে উল্লেখ করি, যা “সুইমার্স জেরোসিস” নামে পরিচিত। ‘জেরোসিস’ শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে যার অর্থ ‘শুষ্ক’।
এটি সাধারণ শুষ্ক ত্বকের থেকে কিছুটা আলাদা। সাধারণ শুষ্ক ত্বক আবহাওয়া বা জেনেটিক কারণে হতে পারে, কিন্তু সুইমার্স জেরোসিস সরাসরি এবং বারবার রাসায়নিক (যেমন ক্লোরিন) এবং দীর্ঘক্ষণ জলের সংস্পর্শে আসার ফলে ঘটে। টাইপোলজি (Typology) -এর একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ অনুসারে, এই অবস্থাটি ঘটে যখন ত্বকের একেবারে বাইরের স্তর, অর্থাৎ স্ট্র্যাটাম কর্নিয়াম (Stratum Corneum) -এর লিপিড কাঠামো (যা ত্বককে হাইড্রেটেড রাখে) ভেঙে যায়।
এর ফলে ত্বকের জল ধারণ ক্ষমতা (Water-Holding Capacity) মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার ফলে ত্বক আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। ফলাফল? ত্বক শুধু শুষ্কই হয় না, এটি রুক্ষ, খসখস (flaky) এবং কখনও কখনও ফাটা (cracked) দেখায়।
কেন সাঁতারের পর আপনার ত্বক এত রুক্ষ হয়ে যায়? (বিজ্ঞানের চোখে)
সাঁতারের পর ত্বকের এই রুক্ষতার জন্য কোনো একটি কারণ দায়ী নয়। এটি একাধিক উপাদানের সম্মিলিত ফল।
প্রধান শত্রু: ক্লোরিন (Chlorine)
সুইমিং পুল পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য ক্লোরিন অপরিহার্য। এটি একটি শক্তিশালী অক্সিডাইজিং এজেন্ট যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করে। কিন্তু সমস্যা হলো, ক্লোরিন ‘ভালো’ এবং ‘খারাপ’-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
১. সেবাম (Sebum) অপসারণ: অ্যাডভান্সড ডার্মাটোলজি (Advanced Dermatology) -এর মতে, ক্লোরিন ত্বকের প্রাকৃতিক সেবাম বা তেলের স্তরকে আক্রমণ করে এবং তা দ্রবীভূত করে ফেলে। এই সেবাম আমাদের ত্বকের প্রথম এবং প্রধান রক্ষাকবচ। এটি ত্বককে জলরোধী (waterproof) রাখে এবং আর্দ্রতা লক করে। সেবাম সরে গেলে ত্বক সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
২. প্রোটিন এবং লিপিডের ক্ষতি: ক্লোরিন শুধু তেল নয়, ত্বকের কোষগুলিকে একত্রে ধরে রাখা লিপিড এবং প্রোটিনকেও (যেমন কেরাটিন) ভেঙে দেয়। এটি ত্বকের কাঠামোকে দুর্বল করে তোলে।
৩. pH স্তরের ভারসাম্যহীনতা: সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) সুপারিশ করে যে পুলের জলের pH স্তর ৭.০ থেকে ৭.৮ -এর মধ্যে থাকা উচিত। যদি pH খুব বেশি (অ্যালকালাইন) বা খুব কম (অ্যাসিডিক) হয়, তবে ক্লোরিন কম কার্যকর হয় এবং ত্বকে জ্বালা বা চুলকানি অনেক বেশি হয়।
সুইমার’স ইয়ার’—গ্রীষ্মের আনন্দে লুকিয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর বিপদ!
নোনা জল (Saltwater) কি তুলনামূলক ভালো?
অনেকে মনে করেন নোনা জলের পুলে (Saltwater Pool) সাঁতার কাটা ভালো, কারণ এতে ক্লোরিনের কড়া গন্ধ নেই। কিন্তু নোনা জলের পুলগুলিও জীবাণুমুক্তকরণের জন্য ক্লোরিন ব্যবহার করে; তারা শুধু ‘সল্ট ক্লোরিনেটর’ নামক একটি সিস্টেমের মাধ্যমে লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) ভেঙে ক্লোরিন তৈরি করে।
তবে, সমুদ্রের নোনা জল একটি ভিন্ন প্রক্রিয়াতে কাজ করে। এখানে অসমোসিস (Osmosis) বা অভিস্রবণ প্রক্রিয়াটি মূল কারণ। সমুদ্রের জলে লবণের ঘনত্ব আমাদের ত্বকের কোষের ভিতরের জলের ঘনত্বের চেয়ে অনেক বেশি। এই কারণে, নোনা জল আক্ষরিক অর্থেই আমাদের ত্বক থেকে আর্দ্রতা শুষে নেয়, যার ফলে ডিহাইড্রেশন এবং শুষ্কতা দেখা দেয়।
দীর্ঘক্ষণ জলে থাকা (Prolonged Water Immersion)
“বেশি জল মানে বেশি হাইড্রেশন” – এই ধারণাটি ত্বকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভুল। আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, বেশিক্ষণ স্নান করলে বা জলে থাকলে আঙুলের ডগা কুঁচকে যায়। এটি একটি সংকেত যে ত্বকের বাইরের স্তরটি অতিরিক্ত জল শোষণ করেছে।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণা (ResearchGate) ব্যাখ্যা করে যে, দীর্ঘক্ষণ জলে ডুবে থাকলে ত্বকের ‘হাইড্রো-লিপিডিক ফিল্ম’ (জল এবং তেলের মিশ্রণে তৈরি একটি পাতলা স্তর) দ্রবীভূত হতে শুরু করে। এটি ত্বকের বাধা বা ব্যারিয়ারকে দুর্বল করে দেয় এবং সাঁতার শেষ হওয়ার পরে দ্রুত আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হওয়ার পথ তৈরি করে।
অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারণ (Other Factors)
- সূর্যের আলো (Sun Exposure): আপনি যদি আউটডোর পুলে সাঁতার কাটেন, তবে ক্লোরিন এবং জলের পাশাপাশি সূর্যের অতিবেগুনী (UV) রশ্মিও ত্বকের ক্ষতি করে। এই ‘ডাবল অ্যাটাক’ ত্বকের কোলাজেন ভেঙে দেয় এবং শুষ্কতা বাড়িয়ে তোলে।
- দ্রুত বাষ্পীভবন (Rapid Evaporation): সাঁতারের পর জল থেকে উঠে আসার সাথে সাথে, বিশেষ করে যদি ইনডোর পুলের বাতাস শুষ্ক হয়, ত্বকের উপরিভাগ থেকে জল দ্রুত বাষ্পীভূত হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি ত্বকের গভীর স্তর থেকেও আর্দ্রতা টেনে নেয়।
পরিসংখ্যান কী বলছে? সাঁতারুরদের মধ্যে ত্বকের সমস্যা কতটা সাধারণ?
এই সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, পরিসংখ্যানও এর প্রমাণ দেয়। সাঁতারু, বিশেষ করে যারা নিয়মিত বা প্রতিযোগিতামূলকভাবে সাঁতার কাটেন, তারা ত্বকের সমস্যায় বেশি ভোগেন।
- উচ্চ প্রাদুর্ভাব: আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একটি সমীক্ষায় (ResearchGate) দেখা গেছে যে ৭৮.৬% তরুণ সাঁতারু ত্বকের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
- চুলকানি ও র্যাশ: একই সমীক্ষায়, ৮৫% সাঁতারু চুলকানি এবং ৫০% র্যাশের অভিযোগ করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে ত্বকের বাধা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
- একজিমার ঝুঁকি: সাঁতার এবং একজিমার (Atopic Dermatitis) মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র পাওয়া গেছে। PubMed Central -এ প্রকাশিত একটি ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা গেছে যে সাঁতারুদের মধ্যে একজিমা এবং কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস (chlorine rash) বেশি দেখা যায়।
- সংক্রমণের ঝুঁকি: যখন ত্বকের বাধা ভেঙে যায়, তখন ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করা সহজ হয়। ওই একই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ১০.৯% সাঁতারু ইমপেটিগো (একটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ) এবং ২.৭% ফলিকুলাইটিস (হেয়ার ফলিকলের প্রদাহ) -এর মতো সমস্যায় ভুগেছেন।
এই ডেটাগুলি পরিষ্কারভাবে দেখায় যে সাঁতারের পর ত্বকের যত্ন নেওয়া কেবল সৌন্দর্য নয়, এটি ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য।
“সুইমার্স ইচ” বনাম “সুইমার্স জেরোসিস”: পার্থক্য জানুন
ত্বকের যত্ন নেওয়ার আগে, সমস্যাটি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই “সুইমার্স জেরোসিস” (শুষ্কতা) এবং “সুইমার্স ইচ” (চুলকানি)-কে এক করে ফেলেন, কিন্তু এগুলি সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জিনিস।
| বৈশিষ্ট্য | সুইমার্স জেরোসিস (শুষ্কতা) | সুইমার্স ইচ (চুলকানি) |
| কারণ | ক্লোরিন, নোনা জল বা দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার ফলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল (সেবাম) নষ্ট হয়ে যাওয়া। | প্রাকৃতিক জলাশয়ে (পুকুর, হ্রদ) থাকা নির্দিষ্ট পরজীবী (cercarial parasites) -এর প্রতি অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া। |
| সাধারণ স্থান | ক্লোরিনযুক্ত বা নোনা জলের সুইমিং পুল এবং সমুদ্র। | সাধারণত মিষ্টি জলের হ্রদ, পুকুর বা জলাভূমি। পরিষ্কার, ক্লোরিনযুক্ত পুলে এটি হয় না। |
| লক্ষণ | ত্বক টানটান, শুষ্ক, রুক্ষ, খসখস, ফাটল, সামান্য চুলকানি। | ত্বকে লালচে ফুঁসকুড়ি, পিম্পল বা ফোস্কার মতো র্যাশ, তীব্র চুলকানি। |
এই নিবন্ধের বাকি অংশটি সুইমার্স জেরোসিস বা ক্লোরিন/জল দ্বারা সৃষ্ট রুক্ষতা এবং শুষ্কতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে।
প্রতিরোধের সেরা উপায়: সাঁতারের আগে ও সময়কালীন যত্ন
ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর তা সারানোর চেয়ে, ক্ষতি প্রতিরোধ করা সবসময়ই ভালো। সাঁতারের জলে নামার আগেই আপনার ত্বকের যত্নের রুটিন শুরু হয়।
সাঁতারের আগের ‘বর্ম’ (The ‘Armor’ Before Swimming)
জলে নামার আগে ত্বকের উপর একটি কৃত্রিম বাধা তৈরি করা হলো সবচেয়ে স্মার্ট কৌশল।
১. অভ্যন্তরীণ হাইড্রেশন (Internal Hydration): আপনার ত্বক ভিতর থেকে হাইড্রেটেড থাকলে তা বাইরের চাপ ভালোভাবে সহ্য করতে পারে। সাঁতারের আগে এবং পরে পর্যাপ্ত জল পান করুন।
২. প্রি-সুইম লোশন বা তেল (Pre-Swim Lotion or Oil): আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি (AAD) বিশেষ করে যাদের একজিমা বা সংবেদনশীল ত্বক আছে, তাদের সাঁতারের আগে ময়শ্চারাইজার বা পেট্রোলিয়াম জেলি (Petrolatum) লাগানোর সুপারিশ করে।
- কীভাবে কাজ করে: এই ধরনের লোশন (যাতে ডাইমেথিকোন বা পেট্রোলিয়াম থাকে) ত্বকের উপর একটি ‘অক্লুসিভ’ (Occlusive) বা আবরণ তৈরি করে। এটি আপনার ত্বক এবং ক্লোরিনযুক্ত জলের মধ্যে একটি দেওয়ালের মতো কাজ করে, ক্লোরিনকে সরাসরি ত্বকের ক্ষতি করতে বাধা দেয়।
- প্রাকৃতিক বিকল্প: ভার্জিন নারকেল তেল বা শিয়া বাটার (Shea Butter) -ও একটি চমৎকার প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে।
৩. জলরোধী সানস্ক্রিন (Water-Resistant Sunscreen): আপনি যদি দিনের বেলায় বাইরে সাঁতার কাটেন, তবে এটি অপরিহার্য। AAD সাঁতারের জন্য SPF 30 বা তার বেশি (Broad-Spectrum এবং Water-Resistant) সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। সানস্ক্রিন শুধু UV রশ্মি থেকেই বাঁচায় না, এটি ক্লোরিনের বিরুদ্ধে একটি অতিরিক্ত বাধা হিসেবেও কাজ করে। সাঁতারের অন্তত ১৫-২০ মিনিট আগে এটি লাগান।
সাঁতারের সময়কালীন যত্ন (During the Swim)
১. প্রাক-স্নান বা রিন্স (Pre-Rinse): জলে নামার আগে এক মিনিটের জন্য পরিষ্কার জলে স্নান করে নিন। এর দুটি বড় সুবিধা আছে:
- CDC-এর মতে, এটি আপনার ত্বক থেকে ঘাম, ময়লা এবং প্রসাধনী ধুয়ে ফেলে, যা পুলে ক্লোরিনের সাথে বিক্রিয়া করে ‘ক্লোরামাইন’ (Chloramines) নামক বিরক্তিকর রাসায়নিক তৈরি করতে বাধা দেয়। এই ক্লোরামাইনই পুলের ‘কড়া গন্ধ’ এবং চোখ-ত্বক জ্বালার জন্য দায়ী।
- আপনার ত্বক একটি স্পঞ্জের মতো। এটি যদি প্রথমে পরিষ্কার জল শোষণ করে নেয়, তবে এটি পরে কম ক্লোরিনযুক্ত জল শোষণ করবে।
২. সুইম ক্যাপ এবং গগলস (Swim Cap and Goggles): যদিও এটি সরাসরি ত্বকের সাথে সম্পর্কিত নয়, তবে চুল এবং চোখের চারপাশের সংবেদনশীল ত্বককে রক্ষা করতে এটি সাহায্য করে।
সাঁতারের পর ত্বকের পুনর্গঠন: একটি সম্পূর্ণ রুটিন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ)
সাঁতার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আপনার ত্বকের ‘পুনরুদ্ধার’ প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। আপনি যত দেরি করবেন, ক্লোরিন এবং শুষ্কতা আপনার ত্বকের তত বেশি ক্ষতি করবে।
ধাপ ১: তাৎক্ষণিক ধোলাই (Step 1: The Immediate Rinse)
পুল থেকে বেরিয়েই প্রথম কাজ হলো শাওয়ার নেওয়া। এক মুহূর্তও দেরি করবেন না। তোয়ালে দিয়ে গা মোছার আগে বা পোশাক পরার আগে, সরাসরি শাওয়ারের নিচে চলে যান।
- জল কেমন হবে: ঈষদুষ্ণ বা সামান্য ঠান্ডা জল ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত গরম জল ত্বকের প্রাকৃতিক তেল আরও বেশি করে কেড়ে নেয়, যা শুষ্ক ত্বককে আরও শুষ্ক করে তোলে।
- লক্ষ্য: লক্ষ্য হলো ত্বক থেকে সমস্ত ক্লোরিন, লবণ এবং অন্যান্য রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণভাবে ধুয়ে ফেলা।
ধাপ ২: সঠিক ক্লিনজার (Step 2: The Right Cleanser)
জল দিয়ে ধোয়ার পর, আপনাকে একটি সঠিক ক্লিনজার বা বডি ওয়াশ ব্যবহার করতে হবে।
- সাবান-মুক্ত (Soap-Free): সাধারণ ক্ষারীয় বার সাবান (Bar Soap) ব্যবহার করা একদমই চলবে না। এগুলি ত্বকের pH স্তরের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং ত্বককে মারাত্মকভাবে শুষ্ক করে তোলে।
- কী ব্যবহার করবেন: একটি হাইড্রেটিং, জেন্টল, সালফেট-মুক্ত (Sulfate-Free) এবং pH-ব্যালান্সড বডি ওয়াশ বা ক্লিনজার ব্যবহার করুন।
- বিশেষজ্ঞ টিপ (ভিটামিন সি): কিছু সাঁতারু-বিশেষজ্ঞ ভিটামিন সি (Vitamin C) যুক্ত বডি ওয়াশ বা স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এর কারণ হলো ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) ক্লোরিনকে রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় (Neutralize) করতে পারে। এটি ক্লোরিনের অবশিষ্টাংশকে ত্বকের সাথে লেগে থাকতে দেয় না এবং এর অক্সিডেটিভ ক্ষতি বন্ধ করে।
ধাপ ৩: আর্দ্রতা লক করা (Step 3: Locking in Moisture)
এটিই আপনার রুক্ষ ত্বককে নরম করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
১. “৩-মিনিটের নিয়ম” (The “3-Minute Rule”): আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি (AAD) এই নিয়মটির উপর খুব জোর দেয়। স্নান বা শাওয়ার শেষ করার পর, তিন মিনিটের মধ্যে আপনাকে ময়শ্চারাইজার লাগাতে হবে।
২. “ভেজা ত্বকের নিয়ম” (The “Damp Skin Rule”): তোয়ালে দিয়ে ত্বক ঘষে ঘষে মুছবেন না। আলতো করে চেপে চেপে জল শুষে নিন, কিন্তু ত্বককে সম্পূর্ণ শুষ্ক করবেন না। ত্বক যখন সামান্য স্যাঁতসেঁতে বা ‘ড্যাম্প’ (Damp) থাকে, ঠিক তখনই ময়শ্চারাইজার লাগান। এটি ময়শ্চারাইজারকে ত্বকের উপরিভাগের জলকে ‘লক’ বা ‘সিল’ করতে সাহায্য করে, যা হাইড্রেশন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কোন উপাদানগুলি খুঁজবেন? (Which Ingredients to Look For?)
সাঁতারের পর আপনার ময়শ্চারাইজারে তিনটি বিশেষ ধরনের উপাদান থাকা দরকার:
- হিউমেক্ট্যান্টস (Humectants): এই উপাদানগুলি বাতাস এবং ত্বকের গভীর স্তর থেকে জল টেনে এনে ত্বকের উপরিভাগে ধরে রাখে।
- উদাহরণ: হায়ালুরোনিক অ্যাসিড (Hyaluronic Acid), গ্লিসারিন (Glycerin), ইউরিয়া (Urea) যেমনটা টাইপোলজি উল্লেখ করেছে, প্যান্থেনল (Panthenol)।
- ইমোলিয়েন্টস (Emollients): এই উপাদানগুলি ত্বকের কোষগুলির মধ্যেকার ফাঁকগুলি পূরণ করে, যার ফলে ত্বক মসৃণ এবং নরম অনুভূত হয়। এগুলি ত্বকের ব্যারিয়ার মেরামত শুরু করে।
- উদাহরণ: সেরামাইডস (Ceramides) – এটি সাঁতারুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলির মধ্যে একটি, কারণ এটি ত্বকের প্রাকৃতিক লিপিড বাধার অনুকরণ করে। এছাড়াও শিয়া বাটার (Shea Butter), স্কোয়ালেন (Squalane), এবং ফ্যাটি অ্যাসিড।
- অক্লুসিভ (Occlusives): এই উপাদানগুলি ত্বকের উপর একটি শারীরিক বাধা তৈরি করে, যা আর্দ্রতাকে বাষ্পীভূত হতে দেয় না (Transepidermal Water Loss – TEWL কমায়)।
- উদাহরণ: পেট্রোলিয়াম জেলি (Petroleum Jelly / Vaseline), ল্যানোলিন (Lanolin), ডাইমেথিকোন (Dimethicone), এবং ঘন ক্রিম।
সাঁতারুদের জন্য সেরা রুটিন: প্রথমে একটি হায়ালুরোনিক অ্যাসিড সিরাম (হিউমেক্ট্যান্ট) লাগান, তারপর একটি সেরামাইড-সমৃদ্ধ লোশন (ইমোলিয়েন্ট) এবং প্রয়োজন হলে, খুব শুষ্ক জায়গায় (যেমন কনুই, হাঁটু) পেট্রোলিয়াম জেলি (অক্লুসিভ) -এর একটি পাতলা স্তর দিন।
ধাপ ৪: এক্সফোলিয়েশন (সপ্তাহে ১-২ বার)
সাঁতারের ফলে ত্বকে যে মৃত, রুক্ষ কোষের স্তর জমা হয়, তা অপসারণ করা দরকার। তবে এখানে খুব সতর্ক থাকতে হবে।
- কখন করবেন না: যদি আপনার ত্বকে জ্বালা, র্যাশ বা কাটা-ছেঁড়া থাকে, তবে কখনোই এক্সফোলিয়েট করবেন না।
- কীভাবে করবেন: সাঁতারের ঠিক পরে নয়, বরং সপ্তাহের অন্য কোনো দিন এটি করুন। খসখসে ফিজিক্যাল স্ক্রাব (Physical Scrub) এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি দুর্বল ত্বককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
- বিকল্প: ল্যাকটিক অ্যাসিড (Lactic Acid) বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিড (Glycolic Acid) -এর মতো মৃদু কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট (Chemical Exfoliant) ব্যবহার করুন। এটি মৃত কোষগুলিকে আলতোভাবে দ্রবীভূত করে ত্বককে মসৃণ করে।
বিশেষ যত্ন: সংবেদনশীল ত্বক, একজিমা এবং শিশুদের জন্য
সবার ত্বক এক নয়। যারা ইতিমধ্যেই ত্বকের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন।
- একজিমা (Eczema): আপনার যদি একজিমা থাকে, তবে সাঁতার আপনার জন্য একটি বড় ট্রਿগার হতে পারে। AAD-এর পরামর্শ অনুযায়ী, সাঁতারের আগে পেট্রোলিয়াম জেলি -এর একটি পুরু স্তর লাগানো আপনার জন্য অপরিহার্য। এটি ক্লোরিনের বিরুদ্ধে সেরা বাধা।
- শিশুদের ত্বক (Children’s Skin): শিশুদের ত্বক প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় পাতলা এবং বেশি সংবেদনশীল হয়। তাদের জন্য উপরে উল্লিখিত সমস্ত পদক্ষেপ (প্রি-সুইম লোশন, তাৎক্ষণিক রিন্স, ৩-মিনিটের মধ্যে ময়শ্চারাইজিং) আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করুন। সর্বদা সুগন্ধি-মুক্ত (Fragrance-Free) এবং হাইপোঅ্যালার্জেনিক (Hypoallergenic) পণ্য ব্যবহার করুন।
- ক্লোরিন র্যাশ (Chlorine Rash): যদি সাঁতারের পর প্রতিবার আপনার ত্বকে লাল, চুলকানিযুক্ত র্যাশ হয়, তবে আপনার ক্লোরিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বা ‘কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস’ থাকতে পারে। প্রি-সুইম লোশন ব্যবহার করা এবং ভিটামিন সি স্প্রে দিয়ে ক্লোরিন নিষ্ক্রিয় করা এখানে খুব জরুরি।
অবিশ্বাস্য নিদ্রাহীন জীবন: পৃথিবীর ৭টি প্রাণী যারা প্রায় কখনোই ঘুমায় না!
সাঁতার এবং আপনার চুল (একটি অতিরিক্ত টিপস)
যে ক্লোরিন আপনার ত্বকের ক্ষতি করে, তা আপনার চুলেরও সমান ক্ষতি করে। এটি চুলের প্রাকৃতিক তেল কেড়ে নেয়, কিউটিকল ভেঙে দেয় এবং চুলকে শুষ্ক, ভঙ্গুর করে তোলে। আউটডোর পুলে থাকা কপার (Copper) কণা ক্লোরিনের সাথে বিক্রিয়া করে চুলে সবুজাভ আভা (Swimmer’s Green) তৈরি করতে পারে।
সমাধান: ১. জলে নামার আগে চুল পরিষ্কার জল দিয়ে ভিজিয়ে নিন। ২. চুলে সামান্য কন্ডিশনার বা তেল (নারকেল তেল) লাগিয়ে নিন। এটি একটি বাধা তৈরি করবে। ৩. একটি সিলিকন সুইম ক্যাপ পরুন। ৪. সাঁতারের পর অবিলম্বে একটি জেন্টল বা ক্ল্যারিফাইং শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন এবং কন্ডিশনার ব্যবহার করুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সাঁতারের পর ত্বকের শুষ্কতা সঠিক যত্ন এবং ময়শ্চারাইজিংয়ের মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়। তবে, নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দিলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা ডার্মাটোলজিস্টের সাথে পরামর্শ করুন:
- যদি র্যাশ বেদনাদায়ক হয়, ফোস্কা পড়ে বা চুলকানি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
- যদি ত্বক ফেটে গিয়ে রক্তপাত হয় বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয় (যেমন পুঁজ, ফোলাভাব)।
- সঠিক যত্ন নেওয়ার পরেও যদি শুষ্কতা বা চুলকানি এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়।
- যদি আপনার ২০২১ সালের সমীক্ষা -এ উল্লিখিত ইমপেটিগো বা ফলিকুলাইটিসের মতো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়।
“বর্ষায় পুরুষদের ত্বক হারাচ্ছে জৌলুস? জেনে নিন চমকপ্রদ সমাধান!”
সাঁতার এবং স্বাস্থ্যকর ত্বক একসাথে সম্ভব
সাঁতার বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। এটি শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি অসাধারণ ব্যায়াম। আসল সমাধানটি হলো জ্ঞান এবং প্রস্তুতি। ক্লোরিন বা নোনা জল আপনার ত্বকের শত্রু নয়, যদি আপনি জানেন কীভাবে তাদের সাথে মোকাবিলা করতে হয়।
মনে রাখবেন তিনটি মূল মন্ত্র: রক্ষা করুন, পরিষ্কার করুন এবং আর্দ্র করুন (Protect, Cleanse, Moisturize)। সাঁতারের আগে আপনার ত্বককে একটি বাধা দিয়ে ‘রক্ষা’ করুন, সাঁতারের পর অবিলম্বে ক্লোরিন ‘পরিষ্কার’ করুন এবং সবশেষে, ৩-মিনিটের মধ্যে একটি ভালো মানের ময়শ্চারাইজার দিয়ে ত্বকের আর্দ্রতা ‘লক’ করে দিন। এই বিশেষজ্ঞ-সমর্থিত রুটিনটি অনুসরণ করলে, আপনি সাঁতারের সমস্ত সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন এবং আপনার ত্বকও থাকবে নরম, মসৃণ এবং স্বাস্থ্যকর।










