দুর্গাপুজো ২০২৫ এর সম্পূর্ণ সূচি প্রকাশ! জানুন বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত সব তারিখ

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো এবার পড়েছে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। পঞ্জিকা অনুসারে, ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষ। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর রবিবার মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু…

Riddhi Datta

 

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো এবার পড়েছে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। পঞ্জিকা অনুসারে, ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষ। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর রবিবার মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পাঁচদিনের মূল উৎসব।

মহাষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকাল থেকে। আর সন্ধিপুজো অনুষ্ঠিত হবে দুপুর ১টা ২১ মিনিট থেকে ২টা ৯ মিনিটের মধ্যে। এ বছর পুরো চার দিন ধরে পালিত হবে দুর্গাপুজো, যা বাঙালিদের জন্য অতিরিক্ত আনন্দের খবর।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পঞ্জিকা অনুসারে, এবারের দুর্গাপুজো শুরু হবে ২৮ সেপ্টেম্বর মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে। বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা অনুযায়ী, ষষ্ঠী তিথি থাকবে সকাল ১০টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত। এই দিনেই সন্ধ্যাবেলা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস পালিত হবে।

মহাসপ্তমী পড়েছে ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার। এদিন বেলা ১২টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত সপ্তমী তিথি থাকবে। নবপত্রিকা স্নান, স্থাপন এবং সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভের পাশাপাশি সপ্তমীবিহিত পুজো করা হবে এই দিনে। এই তিথিতে ঘটস্থাপনা এবং নবপত্রিকা প্রতিষ্ঠার রীতি অনুসরণ করা হয় প্রতিটি মণ্ডপে।

এবারের দুর্গাপুজোর মূল আকর্ষণ মহাষ্টমী পড়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার। দুর্গাষ্টমী তিথি থাকবে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত। এদিন দেবী দুর্গার আরাধনা, মহাস্নান এবং ষোড়শোপচার পুজো অনুষ্ঠিত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিপুজো এদিনই হয়। দুপুর ১টা ২১ মিনিট থেকে ২টা ৯ মিনিটের মধ্যে সন্ধিপুজো সেরে নিতে হবে।

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে বেলুড় মঠে এবার দুর্গাপুজোর বিশেষ আয়োজন করা হবে। মহাসপ্তমী ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার পুজো শুরু হবে সকাল ৫টা ৪০ মিনিটে। মহাষ্টমী ৩০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার পুজো শুরু হবে একই সময়ে। কুমারী পুজো শুরু হবে সকাল ৯টায়। আর সন্ধিপুজো হবে সন্ধ্যা ৫টা ৪৩ মিনিট থেকে ৬টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত।

মহানবমী পালিত হবে ১ অক্টোবর বুধবার। নবমী তিথি থাকবে দুপুর ২টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত। মহানবমীর মহাস্নান ও ষোড়শোপচার পুজো এই তিথিতে অনুষ্ঠিত হবে। এই দিনে বিভিন্ন মণ্ডপে মহাহোম যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। দেবীকে চণ্ডিকা রূপে দর্শন করা হয় এই তিথিতে।

বিজয়া দশমী পড়েছে ২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। দশমী তিথি থাকবে দুপুর ২টা ৫৬ মিনিট পর্যন্ত। এদিন দেবীর বরণ, সিঁদুর খেলা এবং বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। বিসর্জনের শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে ভক্তরা বিদায় জানাবেন মা দুর্গাকে।

এ বছর দুর্গাপুজোর একটি বিশেষ দিক হল মহাসপ্তমী সোমবার পড়ায় দেবীর আগমন হবে গজ বা হাতিতে। শাস্ত্র অনুযায়ী এটি দেবীর উৎকৃষ্টতম বাহন। দেবীর আগমন হাতিতে হলে মর্ত্যলোক ভরে ওঠে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধিতে। ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় এবং পরিশ্রমের সুফল পান মর্তলোকের অধিবাসীগণ।

তবে বিজয়া দশমী বৃহস্পতিবার পড়ায় দেবীর গমন হবে দোলা বা পালকিতে। শাস্ত্রমতে এর ফল “দোলায়াং মকরং ভবেৎ” অর্থাৎ মহামারী, ভূমিকম্প, খরা, যুদ্ধ ও অতিমৃত্যু হতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেবীর আগমন ও গমন কখনও অমঙ্গলের হতে পারে না।

পুজোপ্রেমীদের জন্য সুখের খবর হল, গত বছরের মতো এবার পুজো তিন দিনের হবে না। পুরো চার দিন ধরে পালিত হবে শারদোৎসব। ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী আলাদা দিনে পড়েছে। তাই বাঙালিরা পাবেন পূর্ণ চার দিনের উৎসবের স্বাদ।

দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে রাজ্যজুড়ে। কুমোরটুলিতে শিল্পীরা মন দিয়ে তৈরি করছেন দেবীর মূর্তি। বিভিন্ন পুজো কমিটি থিম ঠিক করে নিয়েছে। প্যান্ডেল তৈরির কাজও শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন স্থানে। শিল্পীরা রাতদিন খেটে তৈরি করছেন অভিনব প্যান্ডেল।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে এবারও দুর্গাপুজোর জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। গত বছর প্রতি ক্লাবের জন্য ৮৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল। এবার তা বৃদ্ধি করে ১ লক্ষ টাকা করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পালিত হবে ৬ অক্টোবর সোমবার। কালীপুজো এবং দীপাবলি উৎসব পড়েছে ২০ অক্টোবর সোমবার। ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পালিত হবে ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। এই সব উৎসবমিলিয়ে অক্টোবর মাসটি হয়ে উঠবে বাঙালির উৎসবের মাস।

এবারের দুর্গাপুজো উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসবেন পশ্চিমবঙ্গে। পুজোকে ঘিরে প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। পোশাক, গয়না, ইলেকট্রনিক্স, খাবার থেকে শুরু করে ভ্রমণ – সব ক্ষেত্রেই উৎসবের আগে বিক্রির জোয়ার দেখা যায়। এর ফলে রাজ্যের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

পুজোর সময় আবহাওয়া নিয়েও রয়েছে ইতিবাচক পূর্বাভাস। এ বছর দুর্গাপুজোর সময় কিছুটা এগিয়ে আসার কারণে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলেও বড় কোন দুর্যোগের পূর্বাভাস নেই। আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, পুজো চলাকালীন সময়ে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে তবে তা উৎসবে বিশেষ বাধা সৃষ্টি করবে না।

পুষ্পাঞ্জলি প্রেমীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহাষ্টমীর দিন সকাল থেকেই অঞ্জলি দেওয়া যাবে। তবে সবচেয়ে শুভ সময় হবে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা ২১ মিনিটের মধ্যে। এরপরেই শুরু হয়ে যাবে সন্ধিপুজো। যারা অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে পারবেন না, তারা নবমীর দিনেও অঞ্জলি দিতে পারবেন।

রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় থিম পুজোর ধুম লেগেছে। কলকাতার পাশাপাশি হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদসহ প্রতিটি জেলায় বিশেষ থিমের পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। এমনকি গ্রাম-বাংলার সাধারণ পুজোতেও এখন থিমের ছোঁয়া লেগেছে।

উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত পুজোগুলি ইতিমধ্যে তাদের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। শ্রীভূমি, একডালিয়া এভারগ্রিন, সুরুচি সংঘ, বগবাজার সার্বজনীন, সন্তোষ মিত্র স্কয়ার, মুদিয়ালি ক্লাবের মতো জনপ্রিয় পুজোগুলি এবারও বিশেষ কিছু করতে চলেছে বলে জানা গেছে।

এবারের দুর্গাপুজো হবে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ গত কয়েক বছরের করোনা পরিস্থিতির পর এবার পুরোদমে পালিত হতে চলেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব। ভক্তরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াতে পারবেন নির্বিঘ্নে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবার-দাবার, আলোর সাজসজ্জা – সবকিছুই হবে পূর্ণ মাত্রায়।

বাঙালির এই সর্ববৃহৎ উৎসবকে ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে উন্মাদনা। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিনের এই উৎসব হয়ে উঠবে বাঙালির প্রাণের স্পন্দন। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি মা দুর্গার আগমনে।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন